প্রতিদিন কতটা ফাইবার খাওয়া জরুরি, বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের মাঝে কিটো ডায়েট, অ্যাটকিনস ডায়েট বা হাই-প্রোটিন ক্রেজের মতো নানা ডায়েটের ট্রেন্ড আমরা দেখেছি। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন করে ঝড় তুলেছে সর্বশেষ ম্যাক্রো-নিউট্রিয়েন্ট ট্রেন্ড নিয়ে, যার নাম ফাইবারম্যাক্সিং!
ওজন কমানো থেকে শুরু করে সুস্থ হার্ট, রোগ প্রতিরোধ, এমনকি সুন্দর উজ্জ্বল ত্বকের সমাধান হিসেবে এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাইবার বা আঁশজাতীয় খাবারকে জাদুকরী কিছু বলে প্রচার করা হচ্ছে। ইনফ্লুয়েন্সাররা তো বটেই, বড় বড় কোম্পানিগুলোও এখন সোডা, কুকিজ এমনকি কফি ক্রিমারেও ফাইবার মিশিয়ে বিক্রি করছে! কিন্তু এই ফাইবারম্যাক্সিং কি সত্যিই কাজ করে, নাকি এটিও নিছক কোনো সোশ্যাল মিডিয়া হুজুগ?
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট সুনানা সোহি বলেন, ‘এই ধরনের ট্রেন্ডগুলোর আসল সমস্যা হলো, মানুষ বুঝতে চায় না যে শুধু একটা নির্দিষ্ট জিনিস দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না। সুস্থ জীবনযাপনের জন্য কেবল একটি নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ওপর নির্ভর করলেই চলে না।’
তাহলে কি ফাইবারম্যাক্সিং পুরোটাই ভুয়া? তা নয়। তবে ফাইবার খাওয়ার পরিমাণ হুড়মুড় করে বাড়ানোর আগে এর ভালো-খারাপ দিকগুলো জেনে নেওয়া জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট সুনানা সোহি বলেন, ‘এই ধরনের ট্রেন্ডগুলোর আসল সমস্যা হলো, মানুষ বুঝতে চায় না যে শুধু একটা নির্দিষ্ট জিনিস দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।'
ফাইবারম্যাক্সিং আসলে কী
সহজ কথায় ফাইবারম্যাক্সিং হলো ডায়েটে প্রচুর পরিমাণে আঁশজাতীয় খাবার যোগ করা। ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রায়ই দই, স্মুদি বা ওটসের সঙ্গে চিয়া বা ফ্ল্যাক্স সিড মেশানোর পরামর্শ দেন।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক রাবিয়া ডি লাটুর বলছেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা চিকিৎসকরা অনেক আগে থেকেই ফাইবার খাওয়ার কথা বলে আসছি। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যাশট্যাগ দিয়ে প্রচার করায় যদি বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়, তবে সেটা অবশ্যই ভালো।’
তবে সমস্যা হলো, অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই ফাইবার খাওয়ার পরিমাণ গেমের স্কোরের মতো বাড়াতে গিয়ে ভুল পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন। কেউ কেউ সরাসরি পাউডার ফাইবার চামচে করে খাচ্ছেন, যা গলায় আটকে গিয়ে শ্বাসরোধের মতো মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। আবার কেউ ফাইবার পাওয়ার আশায় কলার খোসা বা কিউই ফলের লোমশ খোসা পর্যন্ত চিবিয়ে খাচ্ছেন!
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক রাবিয়া ডি লাটুর বলছেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা চিকিৎসকরা অনেক আগে থেকেই ফাইবার খাওয়ার কথা বলে আসছি।'
ফাইবার কেন দরকার
খাবারের ফাইবার মূলত হজমপ্রক্রিয়া ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এটি দুই ধরনের হয়—অদ্রবণীয় ফাইবার ও দ্রবণীয় ফাইবার। অদ্রবণীয় ফাইবার হজম না হয়ে মলের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। এটি মলের আকার বৃদ্ধি করে এবং পরিপাকতন্ত্র পরিষ্কার রাখে। অন্যদিকে দ্রবণীয় ফাইবার জেলের মতো হয় এবং অন্ত্রে খাবার হজমকে ধীর করে দেয়, যাতে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে।
দ্রবণীয় ফাইবার আমাদের রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও দারুণ কাজ করে। এছাড়া ফাইবার দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে বলে ওজন কমাতেও সাহায্য করে।
তবে ফাইবার খাওয়ার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য আপনাকে পাগল হওয়ার দরকার নেই। বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। চলুন সেগুলো জানা যাক।
দ্রবণীয় ফাইবার আমাদের রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেও দারুণ কাজ করে। এছাড়া ফাইবার দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে বলে ওজন কমাতেও সাহায্য করে।
১. ধীরে শুরু করুন
সাধারণত মহিলাদের দিনে ২৫ গ্রাম এবং পুরুষদের ৩৮ গ্রাম ফাইবার খাওয়া উচিত। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেই এর অর্ধেকও খাই না। আপনি যদি এখন একেবারে ফাইবার না খান, তবে হুট করেই ২৫ গ্রামে চলে যাবেন না। প্রতি সপ্তাহে খাবারে ৫ গ্রাম করে ফাইবার বাড়ান। তা না হলে পেটে গ্যাস বা হজমের সমস্যা হতে পারে।
২. প্রাকৃতিক খাবারের ওপর জোর দিন
সোশ্যাল মিডিয়ায় ফাইবার পাউডার বা গামির খুব চল দেখা গেলেও, ডা. সোহির মতে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ফাইবারই সবচেয়ে ভালো। শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, বাদাম, এবং গোটা শস্য ফাইবারের সেরা উৎস। ডা. সোহি বলেন, ‘আমাদের পেটের ব্যাকটেরিয়াগুলোরও নিজস্ব পছন্দ আছে। তাই আপনি যত বেশি ভিন্ন ধরনের উদ্ভিদজাত ফাইবার খাবেন, আপনার পেট তত বেশি সুস্থ থাকবে।’ সপ্তাহে অন্তত ৩০টি ভিন্ন উৎস থেকে ফাইবার নেওয়ার চেষ্টা করুন।
আপনি যদি এখন একেবারে ফাইবার না খান, তবে হুট করেই ২৫ গ্রামে চলে যাবেন না। প্রতি সপ্তাহে খাবারে ৫ গ্রাম করে ফাইবার বাড়ান। তা না হলে পেটে গ্যাস বা হজমের সমস্যা হতে পারে।
৩. উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার বেছে নিন
ফাইবারের জন্য আপনার ডায়েটে নানা ধরনের খাবার রাখতে পারেন। যেমন সবজি হিসেবে সবুজ শাক, ব্রকলি বা গাজর খেতে পারেন। অ্যাভোকাডো, আপেল, বেরি, নাশপাতি খেতে পারেন ফল হিসেবে। এ ছাড়া মসুর ডাল, মটরশুঁটি, কাঠবাদাম, পেস্তা, চিয়া সিড, ফ্ল্যাক্স সিড বার্লি, ওটস এবং লাল আটা খেতে পারেন।
৪. প্রচুর পানি পান করুন
ফাইবার স্পঞ্জের মতো পানি শোষণ করে। তাই আপনি যত বেশি ফাইবার খাবেন, আপনাকে তত বেশি পানি পান করতে হবে। ফাইবার বাড়ানোর পর যদি পেট ফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দেখা দেয়, তবে বুঝতে হবে আপনার শরীরে পানির ঘাটতি আছে।
মোদ্দাকথা হলো, ফাইবারম্যাক্সিংয়ের মতো বড় বড় শব্দের পেছনে না ছুটে আগে প্রতিদিনের সাধারণ ফাইবার খাওয়ার লক্ষ্যটা পূরণ করুন। কারণ তড়িঘড়ি করে ভালো কিছু করতে গেলে অনেক সময় হিতে বিপরীতই হয়!