নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করলেই কি নিজের নামে নাম রাখা যায়

আপনি যদি কোনো নতুন প্রজাতির আবিষ্কারক হন, তবে কি নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো নাম রাখতে পারবেন?ছবি: দারিউশ এম / শাটারস্টক

প্রতিবছরই পৃথিবীতে নতুন নতুন উদ্ভিদ, প্রাণী, এমনকি প্রাচীন জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হচ্ছে। কখনো হয়তো কোনো প্রজাতি আমাদের চোখের সামনেই ছিল কিন্তু আমরা তাকে আলাদা করে চিনতাম না, আবার কখনো উন্নত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা নতুন সদস্য খুঁজে পাচ্ছি। কিন্তু আপনি যদি এমন কোনো নতুন প্রজাতির আবিষ্কারক হন, তবে কি নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো নাম রাখতে পারবেন? নতুন কোনো প্রাণীর নামকরণের পেছনে রয়েছে বিশাল এক নিয়মের তালিকা। আর আপনি নিজের নামেই সেই প্রাণীর নাম রাখতে পারবেন কি না, তার উত্তরও মিলবে এখানেই।

প্রাণীদের নামকরণ করা হয় কীভাবে

সাধারণত প্রতিটি প্রাণীর নামকরণে সুইডিশ জীববিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াসের দ্বিপদ নামকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে প্রথমে প্রাণীর বংশ বা গণ এবং পরে প্রজাতির নাম বসানো হয়। এই নামগুলো সাধারণত লাতিন বা গ্রিক শব্দ থেকে আসে। যেমন, সিংহের বৈজ্ঞানিক নাম প্যান্থেরা লিও (Panthera leo) এবং মানুষের হোমো সেপিয়েন্স (Homo sapiens)। তবে ইদানীং নামকরণের ধরনে কিছুটা বদল এসেছে। এখন অনেক সময় বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি কিংবা বিজ্ঞানজগতের কোনো শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে সম্মান জানাতেও তাঁদের নামে প্রাণীর নাম রাখা হচ্ছে।

নতুন আবিষ্কৃত কোনো প্রাণী বা ডাইনোসরের নাম রাখতে হলে অবশ্যই আন্তর্জাতিক প্রাণিবিদ্যা নামকরণ কমিশন বা আইসিজেডএনের নিয়ম মেনে চলতে হয়। এই সংস্থাটিই নতুন নামের নিয়ম তৈরি করে এবং নামকরণ নিয়ে কোনো ঝামেলা হলে তার সমাধান করে দেয়। তাদের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিজ্ঞানী এমন কোনো নাম প্রস্তাব করতে পারবেন না, যা কোনো যুক্তিতেই আপত্তিকর বা কারও মনে কষ্ট দিতে পারে।

আরও পড়ুন
দ্বিপদ নামকরণ পদ্ধতিতে প্রথমে প্রাণীর বংশ বা গণ এবং পরে প্রজাতির নাম বসানো হয়। এই নামগুলো সাধারণত লাতিন বা গ্রিক শব্দ থেকে আসে। যেমন, সিংহের বৈজ্ঞানিক নাম প্যান্থেরা লিও

আইসিজেডএনের নিয়ম হলো, প্রতিটি প্রজাতির একটি দুই শব্দের নাম থাকবে। তবে সেটি যদি কোনো উপপ্রজাতি হয়, তবে তার নাম হবে তিন শব্দের। যেমন, অ্যাঙ্গোলান জিরাফের নাম হলো জিরাফা জিরাফা অ্যাঙ্গোলেনসিস (Giraffa giraffa angolensis)। এটি মূলত নামিবিয়া, জাম্বিয়া এবং জিম্বাবুয়ে অঞ্চলে পাওয়া সাধারণ জিরাফের একটি উপপ্রজাতি।

নতুন কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ আবিষ্কার করেই বিজ্ঞানীরা সাধারণত সেটি নিজের নামে রাখেন না। বিজ্ঞানের জগতে নিজের নামে প্রজাতির নাম রাখাকে অনেকটা অহংকার বা অভদ্রতা হিসেবে দেখা হয়। তাই বিজ্ঞানীরা সাধারণত তাঁদের প্রিয় কোনো শিক্ষক, বন্ধু বা কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির সম্মানে নতুন প্রজাতির নামকরণ করেন।

তবে কেউ যদি খুব করে চান নিজের নাম অমর করে রাখতে, তবে তিনি সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াসের মতো বুদ্ধি খাটাতে পারেন। লিনিয়াস একবার তাঁর এক কঠোর সমালোচককে বেশ মজার এক সাজা দিয়েছিলেন। তিনি একটি বিশ্রী আগাছার নাম রেখেছিলেন সেই সমালোচক ব্যক্তির নামে! এভাবে সরাসরি নিজের নাম ব্যবহার না করেও স্রেফ বুদ্ধির জোরে কাউকে জব্দ করা বা কাউকে সম্মান জানানো সম্ভব।

তবে নামকরণের ক্ষেত্রে সহজ পদ্ধতিই সেরা। আইসিজেডএনের বিশেষজ্ঞ জুডিথ উইনস্টন মনে করেন, প্রাণীর নাম এমন হওয়া উচিত, যেন একটি পাঁচ বছরের শিশুও তা সহজে উচ্চারণ করতে পারে। কারণ, সহজ ও সাবলীল নাম সবাই অনেক দিন মনে রাখতে পারে এবং তা দীর্ঘকাল টিকে থাকে।

আরও পড়ুন
সুইডিশ বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস একবার তাঁর এক কঠোর সমালোচককে বেশ মজার এক সাজা দিয়েছিলেন। তিনি একটি বিশ্রী আগাছার নাম রেখেছিলেন সেই সমালোচক ব্যক্তির নামে!

উদ্ভিদ, শৈবাল ও ছত্রাকের নামকরণ কীভাবে করা হয়

প্রাণীদের নামকরণের নিয়ম তো জানলাম, কিন্তু গাছপালা, শৈবাল কিংবা ছত্রাকের ক্ষেত্রে কী হয়? এদের জন্য রয়েছে সম্পূর্ণ আলাদা এক ব্যবস্থা। শৈবাল, ছত্রাক এবং উদ্ভিদের নামকরণের এই নিয়মগুলো নিয়ন্ত্রণ করে আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ শ্রেণিবিন্যাস সমিতি বা আইএপিটি। তাদের তৈরি করা ২০৩ পৃষ্ঠার একটি বিশাল নির্দেশিকা রয়েছে। সেখানে নতুন নাম রাখার সব নিয়ম বিস্তারিত বলা আছে। ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই নিয়মগুলো প্রতি ছয় বছর পরপর আপডেট বা হালনাগাদ করা হয়। তবে চিন্তার কিছু নেই, নতুনদের জন্য একটি সহজ নির্দেশিকাও রাখা হয়েছে সেখানে।

নাম রাখার এই প্রক্রিয়াটি বেশ মজার। উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম ঠিক করার সময় যেকোনো উৎস থেকে শব্দ বেছে নেওয়া যেতে পারে। এটি হতে পারে কোনো গুণবাচক শব্দ বা বিশেষণ, যা গাছের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত দেয়। আবার এটি হতে পারে কোনো বিশেষ্য বা ব্যক্তির নাম। এমনকি দুই বা তার বেশি শব্দকে হাইফেন দিয়ে যুক্ত করেও নতুন নাম তৈরি করা যায়। তবে শর্ত হলো, নামটি যেন মূল নামের সঙ্গে ব্যাকরণগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

আরও পড়ুন
উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম ঠিক করার সময় যেকোনো উৎস থেকে শব্দ বেছে নেওয়া যেতে পারে। এটি হতে পারে কোনো গুণবাচক শব্দ বা বিশেষণ, যা গাছের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত দেয়।

নতুন প্রজাতির নাম রাখার অধিকার কার

একটি নতুন প্রজাতির নাম কে রাখবেন, এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই জাগে। নিয়ম হলো, নতুন কোনো প্রজাতি যিনি প্রথম আবিষ্কার করেন, সাধারণত তিনিই নাম রাখার প্রথম সুযোগটি পান। তবে অনেক সময় পরিবেশ সংরক্ষণ বা নতুন গবেষণার খরচ জোগাতে নামকরণের এই অধিকার নিলামে তোলা হয়। অর্থাৎ, কোনো সংস্থা বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অন্য কাউকে নাম রাখার সুযোগ দিতে পারে।

আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রির জীবাশ্মবিদ মার্ক নোরেল জানান, নতুন কোনো ডাইনোসর, উদ্ভিদ বা ছত্রাক যিনিই প্রথম খুঁজে পাবেন ও এর বিস্তারিত বর্ণনা করবেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো এর নাম দিতে পারেন।

আগে এই নামগুলো কেবল লাতিন বা গ্রিক শব্দ থেকে আসত। কিন্তু এখন নিয়মে কিছুটা বদল এসেছে। বর্তমানে প্রাণীটি কোন এলাকায় পাওয়া গেছে, তার ওপর ভিত্তি করে নাম রাখার প্রবণতা বেড়েছে। যেমন, চীনে প্রচুর ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া যাচ্ছে বলে এখন অনেক ডাইনোসরের নামের সঙ্গে চীনা শব্দের মিশ্রণ দেখা যায়।

সুতরাং আপনি যদি প্রথম নতুন কোনো প্রজাতি খুঁজে পান এবং আপনার দেওয়া নামটি যদি আন্তর্জাতিক নিয়মগুলোর সঙ্গে মিলে যায়, তবে আপনি নিজের পছন্দের নামই রাখতে পারবেন। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, নামটি যেন আপত্তিকর না হয় এবং অন্য কেউ আগে থেকেই সেই একই নাম ব্যবহার করে না থাকে।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: আইএফএল সায়েন্স, ডিসকভার ওয়াইল্ডলাইফ ও ন্যাচারাল সায়েন্স

আরও পড়ুন