পৃথিবীর সবচেয়ে হালকা ধাতু লিথিয়াম
পৃথিবীর সবচেয়ে হালকা ধাতুর কথা যদি বলা হয়, তাহলে সবার আগে আসবে লিথিয়ামের নাম। এই মৌলটি এতই হালকা যে পানির চেয়েও এর ঘনত্ব কম। আবার তা এতই সক্রিয় যে প্রকৃতিতে একে কখনো খাঁটি অবস্থায় পাওয়া যায় না। অথচ এ মৌলই আজকের প্রযুক্তি বিপ্লবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, স্মার্টওয়াচ, বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে মহাকাশযানের অনেক যন্ত্রপাতিও লিথিয়ামের ওপর নির্ভরশীল। একসময় যে মৌলকে শুধু কৌতূহলের বস্তু মনে করা হতো, তাকে ঘিরে এখন বিশ্বের বড় বড় শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে নতুন প্রতিযোগিতা।
অন্যান্য মৌলের মতো লিথিয়ামের জন্ম নক্ষত্রের কেন্দ্রের অগ্নিকুণ্ডে নয়, বরং সৃষ্টির একদম আদিমুহূর্তে। বিগ ব্যাং বা মহাবিশ্বের জন্ম মুহূর্তের কিছু পরে মাত্র কয়েকটি হালকা মৌল তৈরি হয়েছিল। এদের মধ্যে লিথিয়াম অন্যতম। হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামের সেই আদিম ধূলিমেঘের ভিড়ে অতি সামান্য পরিমাণে তৈরি হয়েছিল এই মৌল।
পৃথিবীতে লিথিয়ামের আবিষ্কারের কাহিনিটিও বেশ চমকপ্রদ। উনিশ শতকের গোড়ার দিকের ঘটনা। সেবার ব্রাজিলীয় প্রকৃতিবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনায়ক হোসে বনিফাসিও দে আন্দ্রাদা বেড়াতে গেছেন সুইডেনের উতো দ্বীপে। সেখানেই ফ্যাকাশে রঙের একটি সুন্দর আকরিক খুঁজে পান তিনি। সেই অচেনা খনিজের নাম দেওয়া হয় পেটালাইট। দেখতে রত্নপাথরের মতো এ আকরিক নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণাগারে নানা নাড়াচাড়া করা হলো। কিন্তু এর আসল রহস্য উন্মোচিত হতে লেগে গেল আরও প্রায় ১৭ বছর।
নতুন এই মৌলটির সন্ধান মিলেছিল পাথরের খনিজে। তাই এর নাম হয়ে গেল লিথিয়াম—পাথরের সন্তান। একই কারণে লিথিয়ামকে বলা যায় প্রথম খনিজ থেকে পাওয়া ক্ষারীয় ধাতু।
এই আকরিকের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করেন তরুণ সুইডিশ রসায়নবিদ জোহান অগাস্ট আরফওয়েডসন। সেই ১৮১৭ সালে। তিনি লক্ষ্য করেন, এতে একটি ক্ষারধর্মী পদার্থ রয়েছে। সেটা সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি বুঝতে পারলেন, সেটা সম্পূর্ণ নতুন একটি মৌলের যৌগ।
এর আগে, সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের মতো ক্ষারীয় মৌলগুলো আবিষ্কৃত হয়েছিল উদ্ভিদের ছাই থেকে। কিন্তু লিথিয়াম মৌলটি পাওয়া গিয়েছিল খনিজ পদার্থ থেকে। তাই গ্রিক শব্দ লিথোস (অর্থ পাথর) থেকে এর নাম রাখা হয় লিথিয়াম—পাথরের সন্তান। একই কারণে লিথিয়ামকে বলা যায় প্রথম ‘খনিজ থেকে পাওয়া’ ক্ষারীয় ধাতু। তবে আকরিক থেকে লিথিয়াম শনাক্ত করলেও আরফওয়েডসন নিজে কখনো বিশুদ্ধ লিথিয়াম ধাতু আলাদা করতে পারেননি। সেই কৃতিত্ব ব্রিটিশ বিজ্ঞানী উইলিয়াম থমাস ব্র্যান্ডের। ১৮২১ সালে তড়িৎ বিশ্লেষণের বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে খাঁটি লিথিয়াম তৈরি করেন তিনি। দেখা গেল, খাঁটি লিথিয়াম দেখতে রুপালি সাদা। তাই কেউ কেউ একে সাদা সোনাও বলেন।
মৌলের পর্যায় সারণিতে হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামের ঠিক পরেই লিথিয়ামের অবস্থান। এর পারমাণবিক সংখ্যা ৩। অর্থাৎ একটি লিথিয়াম পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে তিনটি প্রোটন। এটি ক্ষার ধাতু বা আলকালি মেটাল পরিবারের সদস্য। এ পরিবারে রয়েছে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, রুবিডিয়াম, সিজিয়াম ও ফ্রান্সিয়াম। পরিবারের অন্য সদস্যদের মতো লিথিয়ামের বাইরের কক্ষে থাকে একটি মাত্র ইলেকট্রন। এই একটি ইলেকট্রন ছেড়ে দিতে তার বিশেষ বেগ পেতে হয় না। ফলে এটি খুব সহজেই রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়।
রসায়নের পর্যায় সারণিতে হাইড্রোজেন আর হিলিয়ামের ঠিক পরেই লিথিয়ামের অবস্থান। এর পারমাণবিক সংখ্যা ৩। অর্থাৎ একটি লিথিয়াম পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে তিনটি প্রোটন।
এর ভৌত ও রাসায়নিক ধর্ম বেশ অদ্ভুত। এর ঘনত্ব যে পানির চেয়ে যে কম তা তো আগেই বলেছি (পানির অর্ধেকেরও কম)। সে কারণে ধাতুটি পানিতে ভেসে থাকে। সাধারণ তাপমাত্রায় এ মৌল এতই নরম যে রান্নাঘরের সাধারণ একটি ছুরি দিয়ে একে পনিরের মতো টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা যায়।
তবে চেহারা দেখে একে যতই শান্ত আর কোমল মনে হোক না কেন, স্বভাবে তা চরম ক্ষ্যাপাটে ও প্রতিক্রিয়াশীল। বাতাসে রাখা মাত্রই অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে এর গায়ের রূপোলি চমক একমুহূর্তে কালো হয়ে যায়। আর পানির সংস্পর্শে এলে তো কথাই নেই— ধীরে ধীরে পানির সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু হয়।
তৈরি হয় লিথিয়াম হাইড্রোক্সাইড এবং বেরিয়ে আসে হাইড্রোজেন গ্যাস। এই বিক্রিয়ায় তাপও উৎপন্ন হয়। তবে সোডিয়াম বা পটাশিয়ামের মতো বিস্ফোরক না হলেও লিথিয়ামকে কখনোই অবহেলা করা যায় না। বড় টুকরো হলে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এই বিক্রিয়ায় আগুনও লেগে যেতে পারে। এসব ধর্মের কারণেই প্রকৃতিতে একে কখনোই একাকী বা বিশুদ্ধ ধাতব হিসেবে পাওয়া যায় না। তাই এর ক্ষয় ও বিস্ফোরণ এড়াতে রসায়নাগারে একে সব সময় পেট্রোলিয়াম জেলি বা ঘন তেলের নিচে ডুবিয়ে রাখতে হয়।
বাতাসে রাখা মাত্রই অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে লিথিয়ামের গায়ের রূপোলি চমক একমুহূর্তে কালো হয়ে যায়। আর পানির সংস্পর্শে এলে তো কথাই নেই— ধীরে ধীরে পানির সঙ্গে বিক্রিয়া শুরু হয়।
২.
প্রকৃতিতে লিথিয়ামকে বিরল বলা যায় না। পৃথিবীর ভূত্বকে এর পরিমাণ অনেক পরিচিত ধাতুর চেয়েও বেশি। কিন্তু সমস্যা হলো, এটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। কোথাও বিশাল আকরিক আকারে জমা হয় না। তাই একে সংগ্রহ করা তুলনামূলক কঠিন ও ব্যয়বহুল।
স্পোডুমিন, পেটালাইট এবং লেপিডোলাইট নামের কয়েকটি খনিজে লিথিয়াম পাওয়া যায়। আবার লবণাক্ত হ্রদের পানিতেও বিপুল পরিমাণ লিথিয়াম দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। দক্ষিণ আমেরিকার চিলি, বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনার বিশাল লবণ মরুভূমি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিথিয়াম ভাণ্ডার। এই অঞ্চলকে অনেকেই বলেন লিথিয়াম ত্রিভুজ।
আজকের পৃথিবীতে লিথিয়ামের সবচেয়ে বড় পরিচয় ব্যাটারির মাধ্যমে। বিশ শতকের শেষ ভাগ পর্যন্ত ব্যাটারির জগতে আধিপত্য ছিল সীসা, নিকেল ও ক্যাডমিয়ামের। কিন্তু ইলেকট্রনিক যন্ত্র ছোট হতে শুরু করলে দরকার পড়ে এমন এক ব্যাটারির, যা হবে হালকা, দীর্ঘস্থায়ী এবং বারবার চার্জ করা যাবে। এই সমস্যার অসাধারণ সমাধান এনে দেয় লিথিয়াম।
এই প্রযুক্তির পেছনের মূল কারিগর ছিলেন তিন বিজ্ঞানী—জন গুডএনাফ, স্ট্যানলি হুইটিংহ্যাম আর আকিরা ইয়োশিনো। এই আবিষ্কারের জন্য ২০১৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তাঁরা।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এত জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কারণ হলো, লিথিয়াম খুবই হালকা হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর পরিমাণে বৈদ্যুতিক শক্তি ধরে রাখতে পারে। একই ওজনের অন্য কোনো ধাতুর তুলনায় লিথিয়াম-ভিত্তিক ব্যাটারি অনেক বেশি কার্যকর। এ কারণে বিদ্যুৎচালিত গাড়ির বিপ্লব মূলত এই একটি মৌলের কাঁধে ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে। আজ পৃথিবীতে যত স্মার্টফোন তৈরি হচ্ছে, প্রায় সবগুলোতেই রয়েছে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। শুধু ফোন নয়, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ড্রোন, কর্ডলেস ড্রিল, ক্যামেরা, বৈদ্যুতিক সাইকেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি—সবখানেই লিথিয়ামের দাপট। বিশ্বের বড় বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এখন কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে লিথিয়াম ব্যাটারির কারখানায়। কারণ ভবিষ্যতের পরিবহনব্যবস্থার বড় অংশই নির্ভর করবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর।
লবণাক্ত হ্রদের পানিতে বিপুল পরিমাণ লিথিয়াম দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে। দক্ষিণ আমেরিকার চিলি, বলিভিয়া ও আর্জেন্টিনার বিশাল লবণ মরুভূমি পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিথিয়াম ভাণ্ডার।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির মূল রহস্য হলো লিথিয়াম আয়নের সহজে চলাচল করার ক্ষমতা। চার্জ দেওয়ার সময় লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যায়। আবার ব্যবহার করার সময় উল্টো পথে ফিরে আসে। এই যাতায়াতের মধ্য দিয়েই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। লিথিয়াম খুব হালকা হওয়ার কারণে একটি পরমাণু থেকে প্রচুর শক্তি আহরণ করা যায়। তাই একই ওজনের ব্যাটারিতে অন্য প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করা সম্ভব।
লিথিয়ামের ব্যবহার কিন্তু শুধু ব্যাটারিতেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিশেষ ধরনের কাচ ও সিরামিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যা উচ্চ তাপমাত্রায়ও সহজে ফেটে যায় না। বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে লিথিয়াম মিশিয়ে তৈরি করা হয় অত্যন্ত হালকা কিন্তু শক্তিশালী সংকর ধাতু। এসব সংকর ধাতু বিমানকে হালকা করে, ফলে জ্বালানি খরচ কমে যায়।
মহাকাশ গবেষণাতেও লিথিয়ামের গুরুত্ব অনেক। কিছু মহাকাশযানে বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে লিথিয়াম হাইড্রোক্সাইড ব্যবহার করা হয়েছে। অ্যাপোলো অভিযানের সময় মহাকাশচারীদের শ্বাস-প্রশ্বাসের ফলে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণে এই যৌগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মানুষের প্রাণ বাঁচানোর নেপথ্যেও তাই ছিল লিথিয়াম।
লিথিয়ামের আরও একটি বিস্ময়কর ব্যবহার রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানে। রোগ সারাতে লিথিয়াম ব্যবহারের প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়া যায় দ্বিতীয় শতকে! রোমান সাম্রাজ্যের চিকিৎসক ইফেসাসের সোরানাস খেয়াল করেছিলেন, কিছু নির্দিষ্ট শহরের বিশেষ ঝরনার পানি পান করলে উন্মাদের মতো আচরণ করা মানসিক রোগীরা কেন যেন শান্ত হয়ে যায়। তিনি মেলানঙ্কোলিয়া বা তীব্র হতাশায় ভোগা রোগীদের সেই ঝরনার পানি পানের প্রেসক্রিপশন দিতেন। এখন জানা গেছে, সেই ঝরনাগুলোর পানিতে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক লিথিয়াম দ্রবীভূত ছিল!
লিথিয়াম খুব হালকা হওয়ার কারণে একটি পরমাণু থেকে প্রচুর শক্তি আহরণ করা যায়। তাই একই ওজনের ব্যাটারিতে অন্য প্রযুক্তির তুলনায় অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করা সম্ভব।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে লিথিয়ামকে এক আশীর্বাদ হিসেবে নিয়ে আসেন অস্ট্রেলিয়ার মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জন কেড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি গিনিপিগের ওপর লিথিয়াম ইউরেট ইনজেকশন দিয়ে পরীক্ষা করেন। তিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন, ইনজেকশন দেওয়ার পর অত্যন্ত চঞ্চল ও খিটখিটে স্বভাবের গিনিপিগগুলো এক লহমায় শান্ত হয়ে গেল। তারা কোনো প্রতিবাদ না করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একদম সুবোধ বালকের মতো চিত হয়ে শুয়ে থাকত। এই শান্ত ভাব কোনো তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা ঝিমুনি ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি।
ড. কেড নিজের ওপর লিথিয়াম প্রয়োগ করে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এরপর বহু বছর মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন মারাত্মক বাইপোলার রোগীকে লিথিয়াম দেওয়া শুরু করেন। ফলাফল হলো অসাধারণ! কয়েক দিনের মধ্যে রোগীটি শান্ত হলো।
কয়েক মাসের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে নিজের পুরনো চাকরি শুরু করলেন। এরপর একে ট্র্যাংকুইলাইজার বা প্রশান্তিদায়ক ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের প্রচার শুরু করলেন তিনি। কিন্তু সামান্য পরিমাণ লিথিয়ামের ওভারডোজও যে প্রাণঘাতী হতে পারে। চিকিৎসকের কঠোর পরামর্শ ছাড়া এর ব্যবহার মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্নায়ুকোষ থেকে সেরোটোনিন ও ডোপামিন নামক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণে লিথিয়াম সাহায্য করে। এটি মস্তিষ্কে এই রাসায়নিক পদার্থগুলো গ্রহণকারী রিসেপ্টরের সংখ্যাও পরিবর্তন করে। তবে ঠিক কোন প্রভাবটির কারণে কিছু মানসিক রোগের তীব্র কষ্ট লাঘব হয়, তা আজও অজানা।
ড. কেড নিজের ওপর লিথিয়াম প্রয়োগ করে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এরপর বহু বছর মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজন মারাত্মক বাইপোলার রোগীকে লিথিয়াম দেওয়া শুরু করেন।
আরেকটি চমকপ্রদ তথ্য হলো, বিশ শতকের শুরুর দিকে লিথিয়াম লবণ পানীয়তেও ব্যবহার করা হতো। জনপ্রিয় কোমল পানীয় সেভেন-আপ প্রথম বাজারে আসে ১৯২৯ সালে। সেটা বাজারে এনেছিলেন চার্লস লেইপার গ্রিগ নামের এক ব্যক্তি। তখন এর নাম ছিল বিব-লেবেল লিথিয়েটেড লেমন-লাইম সোডা। কারণ এতে লিথিয়াম সাইট্রেট মেশানো হতো। এর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দাবি ছিল, এই পানীয় মেজাজ ভালো রাখে ও হ্যাংওভার কমায়। খুব শিগগিরই নামটা একটু ছেটে ফেলে রাখা হলো সেভেন-আপ লিথিয়েটেড লেমন সোডা। আর ১৯৩৬ সাল নাগাদ এটি শুধুই সেভেন-আপ নামে পরিচিতি পায়।
পানীয়টির এই নামকরণের পেছনে অনেক রকম তত্ত্ব শোনা যায়। কেউ কেউ ভাবতেন সেভেন-আপের পিএইচ (pH) মাত্রা ৭ বলেই হয়তো এমন নাম। কিন্তু বাস্তবে এর পিএইচ কখনোই ৭ ছিল না। অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায়, এই পানীয়তে ব্যবহৃত সাতটি উপাদানের কারণেই এই নাম। তবে রসায়নবিদরা বিশ্বাস করতে ভালোবাসেন যে, পানীয়টির মূল উপাদানগুলোর একটি—লিথিয়ামের ভর সংখ্যা ৭ হওয়ার কারণেই এই নামকরণ করা হয়েছিল।
সে সময়ের মানুষ মনের বিষণ্ণতা দূর করতে বা চাঙ্গা হতে লিথিয়ামযুক্ত এই পানীয় দেদারসে গিলেছে। যদিও এ ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কয়েক দশক ধরেই লিথিয়াম লবণের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নিয়ে বেশ মাতামাতি চলছিল। উনিশ শতকের শেষভাগে লিথিয়ামযুক্ত পানির কূপগুলোকে কেন্দ্র করে স্পা শহরগুলো গড়ে উঠেছিল। এই পানি পান করলে বা এতে স্নান করলে ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) থেকে শুরু করে বাত—সব সেরে যায়, এমন সব গালগল্প শুনে মানুষ সেখানে দলে দলে ভিড় করত।
গ্রিগ মূলত আগে থেকেই জনপ্রিয় এই স্রোতেই গা ভাসিয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালে মার্কিন প্রশাসন পানীয়তে লিথিয়াম মেশানো নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দুই দশক মানুষ নিশ্চিন্তে লিথিয়ামমিশ্রিত সেভেন-আপ পান করে গেছে। ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে যে একসময় লিথিয়ামের মতো একটি উপাদান সাধারণ বাজারের সোডা পানীয়ের অংশ ছিল।
জনপ্রিয় কোমল পানীয় সেভেন-আপ প্রথম বাজারে আসে ১৯২৯ সালে। তখন এর নাম ছিল বিব-লেবেল লিথিয়েটেড লেমন-লাইম সোডা। কারণ এতে লিথিয়াম সাইট্রেট মেশানো হতো।
তবে লিথিয়ামের এই আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা ও চাহিদার সাথে সাথে পৃথিবীর বুকে কিছু নতুন পরিবেশগত সংকটও দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার লবণাক্ত হ্রদগুলো থেকে লিথিয়াম উত্তোলনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত পানি-নির্ভর। প্রতি টন লিথিয়াম আহরণ করতে লাখ লাখ লিটার ভূগর্ভস্থ পানি বাষ্পীভবন করতে হয়। ফলে ওই অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসী ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে।
আবার মেয়াদোত্তীর্ণ বা ব্যবহৃত লিথিয়াম ব্যাটারি সঠিকভাবে ধ্বংস বা রিসাইকেল না করে ফেলে দিলে, তা থেকে বিষাক্ত রাসায়নিক মাটিতে ও পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণের এক নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এই কারণে বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানীরা পুরোনো লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইকেল করার পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি উন্নত করার জন্য জোরেশোরে কাজ করছেন, যাতে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কাঁচামালের জোগান নিশ্চিতের পাশাপাশি প্রকৃতির ক্ষতি কমানো যায়।
