নোবেলিয়াম নাকি নো-বিলিভিয়াম

বেশ কিছু ছোট-বড় ও মাঝারি আকৃতির দ্বীপ-উপদ্বীপের সমন্বয়ে গড়া ছবির মতো সুন্দর শহর স্টকহোম। শহরের উত্তরে, একদম শেষ প্রান্তে ঐতিহ্যবাহী স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাসের ছোট্ট এক কোণে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে নোবেল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিকসের পুরনো ভবনটি। প্রায় ৬৭ বছর আগে এখান থেকেই সুইডিশ বিজ্ঞানীদের একটি ছোট্ট দল ঘোষণা দিয়েছিল পর্যায় সারণির মৌলিক পদার্থ ১০২ আবিষ্কারের। এনরিকো ফার্মির নিজ হাতে গড়া প্যানিস্পারনা বয়েজের মতোই চমকপ্রদ ছিল সেই দলটির গল্প। বার্কলির রেডিয়েশন ল্যাবরেটরির মতন ভারী পকেট তথা আর্থিক সঙ্গতি বা সিবর্গের মতো অভিজ্ঞ মৌল শিকারির সান্নিধ্য না থাকলে কী হবে, এই অখ্যাত গবেষক দলটাই তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও উন্নত ল্যাবগুলোকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল।

নোবেল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিকসের পুরনো ভবন

নিজেদের হাতে গড়া কিছু সস্তা যন্ত্রপাতি, আর অন্য পরীক্ষাগার থেকে ধার করে আনা কিছু টার্গেট (লক্ষ্য) ও বিম (রশ্মি) সঙ্গী করে চমকে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকে। চলুন জেনে আসা যাক সুইডিশ দলটির মৌল অনুসন্ধানের গল্প।

আরও পড়ুন
প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই ফিউশনের মাধ্যমে উৎপন্ন প্রাথমিক যৌগিক নিউক্লিয়াসটি বলতে গেলে তাৎক্ষনিকভাবে ভেঙ্গে গিয়ে রূপান্তরিত হয় স্বল্প ভরের দুটি নিউক্লিয়াসে। অর্থাৎ, ঘটে ফিশন!

২.

১৯৫৭ সালের কথা। কণা-ত্বরক যন্ত্রের মাধ্যমে নতুন মৌল অন্বেষণের প্রযুক্তি ততদিনে নিউট্রন ক্যাপচার ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে আরও এক ধাপ। মঞ্চে আবির্ভূত হয়েছে নতুন এক খেলোয়াড়, ফিউশন। পর্যায় সারণির দশম সদস্য (নিয়ন, Ne) পর্যন্ত মৌলদের তখন হরহামেশাই যন্ত্রগুলোতে বিম বা রশ্মি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রচণ্ড গতিতে লক্ষ্যের দিকে এসব ছোট নিউক্লিয়াস ছুঁড়ে দিয়ে এই ফিউশনের মাধ্যমেই সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা চলছিল অজানা মৌলিক পদার্থের। চমৎকার এই কৌশলটিও কিন্তু সমস্যার ঊর্ধ্বে ছিল না।

নিউক্লিয়াসের ভেতরে ধনাত্মক আধান বা চার্জের প্রোটনগুলো পরস্পরকে ক্রমাগত বিকর্ষণ করে। মৌলের ভর তথা প্রোটন সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এই বিকর্ষণ বলের মান পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। দুটি মৌলের নিউক্লিয়াস জোড়া লাগিয়ে ফিউশন ঘটাতে হলে এই বাধা—তথা কুলম্বের বাধা—অতিক্রম করার কোনো বিকল্প নেই। সেজন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমেই পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটর ব্যবহারে ত্বরিত করতেন হালকা মৌলের নিউক্লিয়াসদের। তারপর প্রচণ্ড শক্তিতে এদের ছুঁড়ে দেয়া হতো টার্গেট হিসেবে ব্যবহৃত ভারী নিউক্লিয়াসগুলোর দিকে।

মজার ব্যাপার হলো, এভাবে অজানা ভারী মৌল তৈরি করতে চাইলে সব কাজ ঠিকঠাক করলেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুব ক্ষীণ। কারণ, প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই ফিউশনের মাধ্যমে উৎপন্ন প্রাথমিক যৌগিক নিউক্লিয়াসটি বলতে গেলে তাৎক্ষনিকভাবে ভেঙ্গে গিয়ে রূপান্তরিত হয় স্বল্প ভরের দুটি নিউক্লিয়াসে। অর্থাৎ, ঘটে ফিশন! সেখানে ফিশন ব্যারিয়ারের চেয়েও বেশি শক্তির উপস্থিতির জন্যই এমনটা ঘটে। 

আরও পড়ুন
নিউক্লিয়াসের ভেতরে ধনাত্মক আধান বা চার্জের প্রোটনগুলো পরস্পরকে ক্রমাগত বিকর্ষণ করে। মৌলের ভর তথা প্রোটন সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এই বিকর্ষণ বলের মান পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে।

এ অযাচিত বাধা বিজ্ঞানীদের বেশ একটা মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সৌভাগ্যবশত তখন তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে স্বয়ং প্রকৃতি! পদার্থবিজ্ঞানের খুব সাধারণ একটি নিয়ম আছে। যখন কোন মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াস উত্তেজিত অবস্থায় থাকে, তখন সেটি যেকোনো উপায়ে শক্তি ছেড়ে দিয়ে স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা করে। মাত্রই উল্লেখ করা প্রাথমিক যৌগিক নিউক্লিয়াসটিও এর ব্যতিক্রম নয়। নিজের মধ্যে থাকা একগুচ্ছ নিউট্রন ও ফোটন ছেড়ে দেয়ার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা অর্জনের প্রানান্তকর চেষ্টা শুরু করে সেটি। এই ঘটনার নাম ইভাপোরেশন।

ইভাপোরেশনের কলকব্জা

বিষয়টাকে অনেকটা ডুবন্ত জাহাজ ভাসিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা হিসেবে সব ভারী বস্তু সমুদ্রে ফেলে দেয়ার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। কদাচিৎ এই চেষ্টা সফলতার মুখ দেখে। তখনই আবির্ভাব ঘটে নতুন মৌলের। অর্থাৎ হালকা ভরের নিউক্লিয়াসের সাথে ভারী নিউক্লিয়াসের ফিউশনে মোটা দাগে দুই ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে। এক, নতুন প্রাথমিক নিউক্লিয়াসের প্রায় তাৎক্ষনিক ভাঙ্গন; অথবা দুই, ইভাপোরশনের মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ নতুন নিউক্লিয়াসের আবির্ভাব। প্রায় সব সময়ই প্রথমটি ঘটে, আর দ্বিতীয়টি ঘটতে পারে নেহাত দৈবক্রমে। ইভাপোরেশনের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত হতে পারে। ২ নং ছবিতে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজে উপস্থাপন করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
পদার্থবিজ্ঞানের খুব সাধারণ একটি নিয়ম আছে। যখন কোন মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াস উত্তেজিত অবস্থায় থাকে, তখন সেটি যেকোনো উপায়ে শক্তি ছেড়ে দিয়ে স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা করে।

বছর তিনেক আগে, ১৯৫৪ সালে, ঠিক এই কৌশল প্রয়োগেই সুইডিশ বিজ্ঞানীদের দলটা পর্যায় সারণির শততম মৌল আবিষ্কারের দৌড়ে অংশ নিয়েছিল। স্টকহোমের অ্যাক্সিলারেটরে টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করা ইউরেনিয়াম পরমাণুদের দিকে তখন বেশ কিছু ঘন্টা ধরে একটানা অক্সিজেন আয়ন ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল। অবশ্য সে সময়ে তারা জানতেন না যে বছর খানেক আগেই আলবার্ট ঘিয়োরসোর নেতৃত্বে মার্কিনিরা প্রথম থার্মোনিউক্লিয়ার বোমা আইভি মাইকের নমুনা থেকে নিশ্চিতভাবে খোঁজ পেয়ে গেছে শততম মৌল ফার্মিয়ামের। কেবল নতুন প্রলয়ংকারি পারমাণবিক অস্ত্রের গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্যই এতদিন আবিষ্কারের ঘোষণা দিতে পারছিলেন না মার্কিন বিজ্ঞানীরা।

নিয়ন-২২ আইসোটোপ
ছবি: সিগমা-অলড্রিচ

সে যাত্রায় স্বপ্নভঙ্গ হলেও আশা হারাননি সুইডিশরা। আদাজল খেয়ে নেমে পড়েন মৌলিক পদার্থ ১০২ আবিষ্কারে। ইংল্যান্ড থেকে নানান ফন্দি-ফিকির করে যোগাড় করা প্লুটোনিয়ামদের অক্সিজেনের টার্গেট হিসেবে এবং সুইস নিয়ন-২২ আইসোটোপকে ইউরেনিয়াম টার্গেটের বিম হিসেবে ব্যবহার করে নেমে পড়েন গবেষণায়। তাত্ত্বিকভাবে এই ভিন্ন দুটি কম্বিনেশন থেকেই পাওয়া যাওয়ার কথা পরম আকাঙ্ক্ষিত অজানা মৌলিক পদার্থ ১০২। কিন্তু, সেবারেও তাদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। এহেন নিউক্লিয়ার বিক্রিয়াগুলোর নিম্ন ক্রস সেকশনের কাছে হার মানতে হয় তাদের। যথেষ্ট পরিমাণ নমুনা তৈরি না হওয়ায় তাদের স্বল্প বাজেটে ঘরোয়াভাবে বানানো যন্ত্রপাতিগুলোর পক্ষে নতুন মৌল শনাক্ত করা কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। 

আরও পড়ুন
ইংল্যান্ড থেকে নানান ফন্দি-ফিকির করে যোগাড় করা প্লুটোনিয়ামদের অক্সিজেনের টার্গেট হিসেবে এবং সুইস নিয়ন-২২ আইসোটোপকে ইউরেনিয়াম টার্গেটের বিম হিসেবে ব্যবহার করে শুরু করেন গবেষণা।

বারবার ব্যর্থতায়ও বিন্দুমাত্র মনোবল হারায়নি সুইডিশ বিজ্ঞানীদের দলটি। বরং নতুন উদ্যোমে ভিন্ন পরিকল্পনায় লক্ষ্যে পৌঁছাতে অবিচল থাকেন তাঁরা। এবারে তাঁরা দুই ভিন্ন ভুবনের বাসিন্দা, ইংল্যান্ডের অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ এস্টাবলিসমেন্ট এবং মার্কিন আর্গন ল্যাবরেটরির সাথে যুগ্মভাবে গবেষণা করতে শুরু করে। প্রথমেই আর্গন ল্যাব থেকে কুরিয়াম-২৪৪ আইসোটোপের নমুনা পাঠানো হলো ইংল্যান্ডে। ব্রিটিশরা সেগুলোকে অ্যালুমিনিয়াম পাতের সাথে সেঁটে দিয়ে টার্গেট হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে সোজা পাঠিয়ে দিল স্টকহোমে। এরপর সুইডিশ সাইক্লোট্রনে পাতগুলোর দিকে ছুঁড়ে দেয়া হলো ঝাঁকে ঝাঁকে কার্বন-১৩ আইসোটোপ।

কার্বন-১৩ আইসোটোপ
ছবি: সিগমা-অলড্রিচ

এই কণা-ত্বরক যন্ত্রটির সাথে বার্কলিতে ব্যবহার করা যন্ত্রের পার্থক্য ছিল খুব সামান্য। সুইডিশরা এতে স্বর্ণপাতের পরিবর্তে সস্তা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করছিল প্লাস্টিকের ক্যাচার নেট। এক্সপেরিমেন্ট শেষে এগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিলে সহজেই প্লাস্টিক গলে উন্মুক্ত হতো সদ্য তৈরি মৌলিক পদার্থ।

আরও পড়ুন
ব্রিটিশরা পাঠানো আর্গন ল্যাব থেকে কুরিয়াম-২৪৪ আইসোটোপের নমুনাগুলোকে অ্যালুমিনিয়াম পাতের সাথে সেঁটে দিয়ে টার্গেট হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী করে সোজা পাঠিয়ে দিল স্টকহোমে।

৩.

১৯৫৭ সালে ছয়টি আলাদা আলাদা টার্গেটকে প্রায় ত্রিশ মিনিট ধরে কার্বন-১৩ আইসোটোপের আঘাতে জর্জরিত করার পর সুইডিশ দলটি অবশেষে খানিকটা সাফল্যের (!) নাগাল পেয়েছিল। মৌলিক পদার্থ ১০২-এর আবির্ভাবের প্রথম নিদর্শন হিসেবে তিনটি টার্গেটে আলফা ক্ষয় প্রক্রিয়া শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, পরবর্তীতে করা হরেক রকম রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফলাফল আসে নেগেটিভ। অর্থাৎ, বহু চেষ্টা করেও মৌলটির ছিটে-ফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন বিজ্ঞানীরা বেশ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। এবারে কি তাঁরা নতুন মৌল আবিষ্কারের খবর জনসম্মুখে ঘোষণা করবেন? নাকি আরও শক্ত প্রমাণের অপেক্ষায় গবেষণা চালিয়ে যাবেন?

সুইডিশ বিজ্ঞানীরা জানতেন, তাঁদের প্রাপ্ত ফলাফল যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। এর পেছনে মূলত দায়ী এক্সপেরিমেন্টে ব্যবহৃত সস্তা ডিটেক্টরগুলোর নিম্ন সংবেদনশীলতা। কিন্তু তাঁরা ছিলেন নিরুপায়। মূল্যবান ও অধিক সংবেদনশীল যন্ত্র বানানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য তাঁদের একেবারেই ছিল না।

অবশ্য টাকা থাকলেও যে সব সমস্যার সমাধান হতো, তা নয়। আসলে নিউক্লিয়ার পদার্থবিজ্ঞানের শুরুর দিনগুলোতে গবেষণার যন্ত্রপাতি ছিল খুবই অপ্রতুল। উৎপাদন সীমিত হওয়ায় চাইলেই যখন-তখন বাজার থেকে ভালো মানের যন্ত্র কিনে আনার সুযোগ ছিল না। মৌল শিকারের এক্সপেরিমেন্টে তারা আলফা বিকিরণের স্পেকট্রাম মেপেছিলেন ঘরে বানানো ১৬ চ্যানেলের এনালাইজার দিয়ে। যাহোক, সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই আর্গন ল্যাবরেটরি ও অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ এস্টাবলিসমেন্টের মিলে যৌথভাবে সুইডিশ বিজ্ঞানীরা গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। সদ্য আবিষ্কৃত মৌলটির একটা নামও ঠিক করা হয়। তা হলো, নোবেলিয়াম।

আরও পড়ুন
সুইডিশ বিজ্ঞানীরা জানতেন, তাঁদের প্রাপ্ত ফলাফল যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। এর পেছনে মূলত দায়ী এক্সপেরিমেন্টে ব্যবহৃত সস্তা ডিটেক্টরগুলোর নিম্ন সংবেদনশীলতা। কিন্তু তাঁরা ছিলেন নিরুপায়।

কিংবদন্তিতুল্য সুইডিশ রসায়নবিদ, আবিষ্কারক, প্রকৌশলী ও বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরষ্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেল এবং সুইডিশ এলিমেন্ট হান্টিংয়ের সূতিকাগার খ্যাত নোবেল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিকসের সম্মানার্থে এমন নাম। খুব সম্ভবত যুতসই নামকরণের জন্যই নোবেলিয়াম আবিষ্কারের খবর জনসাধারণের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলে। নিঃসন্দেহে সেটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বার্কলির রেডিয়েশন ল্যাবরেটরির যেকোন নতুন মৌল আবিষ্কারের চেয়ে ঢের বেশি। আসলে আলফ্রেড নোবেল-নোবেলিয়াম-নোবেল প্রাইজ, বিষয় তিনটি একসূত্রে গাঁথা হয়ে গিয়েছিল।  

সুইডিশদের সাফল্যগাঁথা মার্কিন মুল্লুকে পৌঁছানোর সময়ে সিবর্গ ও ঘিয়োরসো ছিলেন বার্কলিতেই। তাঁরা কেউই খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। কারণটা সহজেই অনুমেয়। প্রকাশিত তথ্য-উপাত্তগুলো অসম্পূর্ণ এবং অনিশ্চয়তায় ভরপুর। দেরি না করে দুই কিংবদন্তী মৌল শিকারি সুইডিশ এক্সপেরিমেন্টটার পুনরাবৃত্তি করলেন। অচিরেই তাঁরা সিদ্ধান্তে এলেন, স্টকহোমের দাবি পুরোপুরি ভুল! মজা করে তাঁরা মৌলটির নতুন নাম রাখলেন ‘নো-বিলিভিয়াম’!

আরও পড়ুন
সুইডিশদের সাফল্যগাঁথা মার্কিন মুল্লুকে পৌঁছানোর সময়ে সিবর্গ ও ঘিয়োরসো ছিলেন বার্কলিতেই। তাঁরা কেউই খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। কারণটা সহজেই অনুমেয়।

৪.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন, উভয় দেশের বিজ্ঞানীদের পক্ষ থেকেই খুব দ্রুত সুইডিশদের নতুন মৌল আবিষ্কারের দাবি প্রত্যাহারের আহবান এসেছিল। সবার আপত্তির মুখে তথ্য-উপাত্ত পুনরায় পর্যবেক্ষণে রাজি হলেও, দিন শেষে সুইডিশ দলটি তাদের দাবিতে অটল থাকে। ‘আমরা মনে করি ১০২তম মৌলিক পদার্থের আবিষ্কারকের তকমা আমাদের জন্যই সংরক্ষিত থাকা উচিত’—এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন তাঁরা। 

প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করলেও সুইডিশদের গবেষণার ফলাফল বিজ্ঞানী মহলে শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। কণা-ত্বরক যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত নমুনায় ৮.৫±০.১ মেগা ইলেক্ট্রন ভোল্ট শক্তির আলফা বিকিরণ শনাক্ত করার মাধ্যমেই মূলত তাঁরা নোবেলিয়াম আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, নমুনাতে প্রায় দশ মিনিট অর্ধায়ু বিশিষ্ট নোবেলিয়াম-২৫১ অথবা নোবেলিয়াম-২৫২ আইসোটোপের দেখা মিলেছে।

কিন্তু পরে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়, নোবেলিয়াম-২৫৯-এর চেয়ে হালকা অন্য কোন আইসোটোপের (নোবেলিয়ামের) বেলায় অর্ধায়ুর মান কোনভাবেই তিন মিনিটের বেশি হতে পারে না। অন্যদিকে, সুইডিশ এক্সপেরিমেন্ট থেকে বেশি অর্ধায়ুর আরও ভারী নোবেলিয়াম আইসোটোপের দেখা পাওয়া পুরোপুরি অসম্ভব। খুব সম্ভবত তাদের শনাক্ত করা মৌলটি ছিল প্রায় আট মিনিট অর্ধায়ুর থোরিয়াম-২২৫ আইসোটোপ। এহেন নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় এদের উৎপন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। পাশাপাশি সুইডিশদের প্রয়োগ করা রাসায়নিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই আইসোটোপগুলোকে আলাদা করাও সম্ভব ছিল না বলে চোখ এড়িয়ে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত। সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে বছর দুয়েক পরে রণে ভঙ্গ দিয়েছিলেন তাঁরা। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন মৌলিক পদার্থ ১০২ আবিষ্কারের দাবি। ফলে আরেকটু দীর্ঘতর হয়েছিল পর্যায় সারণির প্রান্তসীমা বিস্তৃত করার অপেক্ষা!

আরও পড়ুন
কণা-ত্বরক যন্ত্র থেকে প্রাপ্ত নমুনায় ৮.৫±০.১ মেগা ইলেক্ট্রন ভোল্ট শক্তির আলফা বিকিরণ শনাক্ত করার মাধ্যমেই মূলত সুইডিশ বিজ্ঞানীর দলটি নোবেলিয়াম আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

কালের পরিক্রমায় অনেকের স্মৃতির মানসপট থেকেই মুছে গেছে নোবেল ইনস্টিটিউট ফর ফিজিকসের সুইডিশ বিজ্ঞানীদের মৌল শিকারের অভিযানের কথা। সেই সাথে বিস্মৃত হয়েছে একে ঘিরে বহুদিন ধরে চলা ঐতিহাসিক বিতর্ক। অবশ্য কেউ কেউ এখনও মনে করেন, সুইডিশরা আসলেই পরীক্ষাগারের চার দেয়ালের মাঝে মৌলিক পদার্থ ১০২ তৈরি করতে পেরেছিলেন, কিন্তু সেটা গৃহীত হয়নি। ঘরোয়াভাবে তৈরি করা যন্ত্রপাতি ও এলিমেন্ট হান্টিংয়ে অনভিজ্ঞ বিজ্ঞানীদের নিয়ে গড়া একটি দল রাতারাতি মৌল আবিষ্কার করে ফেলবে—এমনটা মেনে নেয়া তৎকালীন বিশ্বের বড় বড় ল্যাবরেটরিগুলোর পক্ষে বেশ কষ্টকর ছিল বৈকি!

বহু দিন ধরে ট্রান্সইউরেনিয়াম মৌল আবিষ্কারে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন বার্কলি রেডিয়েশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা। তখন পর্যন্ত ৯টি ভারী মৌলিক পদার্থ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তাঁদের হাত ধরেই। অন্যদিকে, বিশ্বের বাকি ল্যাবরেটরিগুলো খুঁজে পায়নি একটিও! সেজন্যই হয়তো একটা অলিখিত নিয়ম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল—বার্কলির মৌল শিকারিরাই কেবল পর্যায় সারণি সম্প্রসারণের যোগ্যতা রাখেন। অবশ্য খুব তাড়াতাড়ি সেই ভুল ভেঙ্গে গিয়েছিল। রেডিয়েশন ল্যাবরেটরির অর্জনে ভাগ বসাতে অনেকটা নীরবে নিভৃতে অগ্রসর হচ্ছিল রুশরা। এমনকি তাদেরও ছিল সিবর্গের মতোই এক অভিজ্ঞ মৌলশিকারী। সে গল্প না হয় তোলা থাকলো আরেকদিনের জন্য।

টীকা

১। ফিউশনের মাধ্যমে দুটি নিউক্লিয়াস একীভূত হয়ে নতুন নিউক্লিয়াসে রূপান্তরিত হয়, অবমুক্ত হয় শক্তি।

লেখক: সহকারি ব্যবস্থাপক, নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড

সূত্র: সুপারহেভি, কিট চ্যাপম্যান