সানস্ক্রিন কীভাবে কাজ করে এবং কতটা মাখা উচিত
বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আমরা যেমন রেইনকোট বা ছাতা ব্যবহার করি, তেমনি রোদে বের হওয়ার সময় অনেকেই ত্বকে সানস্ক্রিন লাগান। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সানস্ক্রিন কীভাবে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে আমাদের ত্বককে রক্ষা করে?
অনেকের ধারণা, সানস্ক্রিন কেবল কড়া রোদে বা গ্রীষ্মকালেই ব্যবহার করতে হয়। বিশেষ করে সৈকতে বেড়াতে গেলেই কেবল এর কথা আমাদের মনে পড়ে। আসলে বিষয়টি তেমন নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচাতে সারা বছরই সানস্ক্রিন ব্যবহার করা প্রয়োজন। মেঘলা দিন হোক বা শীতকাল, এই অদৃশ্য রশ্মি সব সময়ই আমাদের ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
এটি শুধু ত্বকের রং কালোই করে না, বরং ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। তাই সুস্থ থাকতে সানস্ক্রিন মাখা কেবল ঋতুভিত্তিক কোনো কাজ নয়, এটি হওয়া উচিত আমাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। তবে শুধু মাখলেই হবে না, ঠিক কতটা মাখলে ত্বক পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে, সেটি জানাও জরুরি। চলুন জেনে নেওয়া যাক, সানস্ক্রিনের কাজ করার পেছনের বিজ্ঞান ও এটি ব্যবহারের সঠিক নিয়ম।
সানস্ক্রিন মূলত দুইভাবে আমাদের ত্বককে রক্ষা করে। প্রথমত, এতে থাকে জিংক অক্সাইড বা টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডের মতো কিছু অজৈব খনিজ পদার্থ। এগুলো আমাদের ত্বকের ওপর একটি প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করে। সাদা রঙের কাপড় যেমন রোদ প্রতিফলিত করে দেয়, এই উপাদানগুলোও ঠিক একইভাবে ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মিকে আয়নার মতো প্রতিফলিত করে শরীর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
মেঘলা দিন হোক বা শীতকাল, সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি সব সময়ই আমাদের ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। এটি শুধু ত্বকের রং কালোই করে না, বরং ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে।
১৯৮০ বা ৯০-এর দশকে সমুদ্রসৈকতে গেলে বা আগের দিনে টেস্ট ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের নাক সাদা হয়ে থাকতে দেখা যেত। এর কারণ ছিল এই রাসায়নিকগুলো। তবে বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির কারণে সানস্ক্রিন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো এই কণাগুলোকে এতই ক্ষুদ্র করে তৈরি করে যে মাখার পর আমাদের ত্বকে আর আলাদা করে সাদা রং দেখা যায় না।
দ্বিতীয়ত, সানস্ক্রিনে অ্যাভোবেনজোন বা অক্সিবেনজোনের মতো কিছু জৈব রাসায়নিকও থাকে। এগুলো কিন্তু আয়নার মতো আলো প্রতিফলিত করে না। বরং এই অণুগুলো এদের রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে অতিবেগুনি রশ্মিকে নিজের ভেতর শুষে নেয়। যখন এই উপাদানগুলো বিকিরণ শোষণ করে, তখন এরা ধীরে ধীরে ভেঙে যায় এবং সামান্য তাপ উৎপন্ন করে।
ফলে ক্ষতিকর রশ্মিটি আর সরাসরি আমাদের ত্বক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। সহজ কথায়, একটি উপাদান আলোকে দেয়ালের মতো বাধা দেয়, আর অন্যটি স্পঞ্জের মতো শুষে নিয়ে আমাদের ত্বককে সুরক্ষিত রাখে।
সানস্ক্রিনের বোতলের গায়ে সব সময় এসপিএফ লেখা থাকে। এর কাজ কী?
এসপিএফ দিয়ে বোঝায় সান প্রটেকশন ফ্যাক্টর। এটি মূলত আমাদের ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর ইউভিবি বা অতিবেগুনি-বি রশ্মি থেকে কতটা রক্ষা করবে, তার একটি পরিমাপ। মনে রাখার সুবিধার্থে ইউভিবির ‘বি’ দিয়ে বার্ন বা পুড়ে যাওয়াকে বুঝে নিতে পারেন। কারণ এই রশ্মিই আমাদের ত্বক রোদে পুড়িয়ে দেয় এবং ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
সানস্ক্রিনে অ্যাভোবেনজোন বা অক্সিবেনজোনের মতো কিছু জৈব রাসায়নিকও থাকে। এই অণুগুলো এদের রাসায়নিক বন্ধনের মাধ্যমে অতিবেগুনি রশ্মিকে নিজের ভেতর শুষে নেয়।
সূর্যের আরেক ধরনের রশ্মি হলো ইউভিএ। এটি ত্বকের অনেক গভীরে প্রবেশ করে বয়সের ছাপ ফেলে দেয়। আমাদের ত্বকের গভীরে থাকে কোলাজেন ও ইলাস্টিন নামে প্রোটিন, যা ত্বককে টানটান ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এই ইউভিএ রশ্মি ত্বকের অনেক গভীরে প্রবেশ করে সেই প্রোটিনগুলোকে ভেঙে ফেলে। ফলে বয়সের আগেই ত্বকে ভাঁজ পড়ে যায়। অনেক সময় ত্বকে দাগ বা ছোপ ছোপ চিহ্নও দেখা দেয়। কিছু সানস্ক্রিনে ব্রড-স্পেকট্রাম লেখা থাকে, যার অর্থ এটি ইউভিএ এবং ইউভিবি রশ্মি থেকেই ত্বককে সুরক্ষা দেয়।
এসপিএফর পাশে একটা নম্বর থাকে। এগুলো দিয়ে কী বোঝানো হয়? আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজির মতে, এই নম্বরটি আপনার ত্বক লাল হতে কত সময় নেবে তা নির্দেশ করে। ধরুন, সানস্ক্রিন ছাড়া আপনার ত্বক রোদে পুড়লে ১০ মিনিটেই লাল হতে শুরু করে। আপনি যদি এসপিএফ ১৫ ব্যবহার করেন, তবে আপনার ত্বক স্বাভাবিকের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি সময় অর্থাৎ প্রায় ১৫০ মিনিট লাল হওয়া বা পোড়া থেকে রক্ষা পাবে। বেশির ভাগ স্বাস্থ্য সংস্থা এসপিএফ ১৫ থেকে ৫০-এর মধ্যে আছে এমন সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুসারে, এসপিএফ ১৫ সূর্যের ৯৩ শতাংশ ইউভিবি রশ্মি আটকাতে পারে। আর এসপিএফ ৩০ আটকাতে পারে ৯৭ শতাংশ। তবে মনে রাখা জরুরি, কোনো সানস্ক্রিনই ১০০ শতাংশ সুরক্ষা দিতে পারে না।
আমাদের ত্বকের গভীরে থাকে কোলাজেন ও ইলাস্টিন নামে প্রোটিন, যা ত্বককে টানটান ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু ইউভিএ রশ্মি ত্বকের অনেক গভীরে প্রবেশ করে সেই প্রোটিনগুলোকে ভেঙে ফেলে।
কতটা ব্যবহার করবেন ও কোনো ঝুঁকি আছে কি
আমরা অনেকেই সানস্ক্রিন মাখি, কিন্তু এর সঠিক পরিমাণ বা নিয়ম মেনে চলি না। স্কিন ক্যানসার ফাউন্ডেশনের পরামর্শ হলো, সানস্ক্রিন যত শক্তিশালীই হোক না কেন, সর্বোচ্চ সুরক্ষার জন্য প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর এটি পুনরায় মাখা উচিত। কিন্তু ঠিক কতটা মাখবেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সারা শরীর সুরক্ষিত রাখতে অন্তত এক আউন্স পরিমাণ সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি। আর শুধু মুখ ও ঘাড়ের জন্য বিজ্ঞানীরা একটি সহজ নিয়ম দিয়েছেন, টু ফিঙ্গার রুল। আপনার হাতের তর্জনী এবং মধ্যমার আঙুলের ওপর লম্বালম্বিভাবে যতটুকু সানস্ক্রিন ধরবে, ঠিক ততটুকু পরিমাণ সানস্ক্রিন আপনার মুখ ও ঘাড়ের জন্য যথেষ্ট। পরিমাণটি শুনতে একটু বেশি মনে হলেও, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে পুরোপুরি ঢেকে রাখতে এই পরিমাণটিই কার্যকর ঢাল হিসেবে কাজ করে।
তবে ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক সংস্থা এনভায়রনমেন্টাল ওয়ার্কিং গ্রুপের একটি প্রতিবেদনে সানস্ক্রিনে থাকা কিছু রাসায়নিক নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অক্সিবেনজোন নামে উপাদানটি আমাদের ত্বকের ভেতর দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। এমনকি সানস্ক্রিন মাখার অনেক পরেও প্রস্রাবে এর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তাই গবেষকদের একটি বড় অংশ শিশুদের ওপর এই রাসায়নিকযুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, রোদে যাওয়ার অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগে সানস্ক্রিন মেখে নেওয়া উচিত। কারণ, সানস্ক্রিনের ভেতরের রাসায়নিক উপাদানগুলো আপনার ত্বকের সঙ্গে পুরোপুরি মিশে যেতে ও একটি কার্যকর সুরক্ষার স্তর তৈরি করতে কিছুটা সময় নেয়। সঠিক সুরক্ষা পেতে ঘর থেকে বের হওয়ার অন্তত ১৫ মিনিট আগেই সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত।