বেজোসের কোটি টাকার চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া কে এই সাবরিনা, কেন তাঁকে ভবিষ্যতের আইনস্টাইন বলা হয়
শিকাগোর এক গ্যারেজে বসে ১৪ বছরের এক কিশোরী একমনে কী যেন জোড়াতালি দিচ্ছে। সাধারণ কিশোরীদের মতো রূপচর্চা বা ভিডিও গেম নিয়ে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। তাঁর চোখ বিমানের ইঞ্জিনের দিকে। নাট-বল্টু, অ্যালুমিনিয়ামের পাত ও তারের জঞ্জালের মাঝে বসে সে রীতিমতো এক জাদুকরের মতো কাজ করছে। দেখতে দেখতে নিজের হাতেই সে আস্ত এক ইঞ্জিনচালিত বিমান বানিয়ে ফেলল! শুধু বানানোই নয়, ১৬ বছর বয়সে সেই সিঙ্গল-ইঞ্জিন বিমান একাকী আকাশে উড়িয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল।
ভাবছেন, হলিউড মুভির গল্প শোনাচ্ছি? না, এটা বানানো গল্পের প্লট নয়। গল্পটা সাবরিনা গঞ্জালেস পাসটারস্কির বাস্তব জীবনের। আজ যাঁকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুনিয়ায় বলা হচ্ছে ‘পরবর্তী আইনস্টাইন’। কিন্তু কে এই নারী? কেন তাঁর নামের পাশে স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইনের নাম জুড়ে দেওয়া হচ্ছে? কেনই বা তিনি জেফ বেজোসের মতো বিলিয়নিয়ারের চোখ ধাঁধানো চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন?
চলুন, আধুনিক বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কন্যার গল্পটা একটু গভীরে গিয়ে জানা যাক।
দেখতে দেখতে নিজের হাতেই সাবরিনা আস্ত এক ইঞ্জিনচালিত বিমান বানিয়ে ফেলল! শুধু বানানোই নয়, ১৬ বছর বয়সে সেই সিঙ্গল-ইঞ্জিন বিমান একাকী আকাশে উড়িয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল।
এমআইটি থেকে হার্ভার্ড
কিউবান-আমেরিকান পরিবারের সন্তান সাবরিনার জন্ম ১৯৯৩ সালে। ছোটবেলা থেকেই মহাকাশ ও উড়োজাহাজ নিয়ে তার প্রবল আগ্রহ। মাত্র ৯ বছর বয়স থেকে সে বিমান চালানোর তালিম নিতে শুরু করে। নিজের হাতে বানানো ‘সেসনা ১৫০’ মডেলের কিট এয়ারক্রাফটটি যখন সে আকাশে ওড়াল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাভিয়েশন ম্যাগাজিনগুলো তাকে আখ্যা দিয়েছিল ‘অ্যাভিয়েশনের ভবিষ্যৎ’।
কিন্তু সাবরিনার স্বপ্ন শুধু আকাশে ওড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনের নিয়মগুলো জানতে চাইত। নিজের বানানো বিমানের সেই ভিডিও নিয়ে সে আবেদন করল ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) ভর্তির জন্য। অথচ শুরুতে তাকে রাখা হলো ওয়েটিং লিস্টে। কিন্তু তার সেই ভিডিও দেখলেন, এমআইটির অধ্যাপকদের চোখ কপালে উঠল। তাঁরা বুঝতে পারলেন, এই মেয়ে সাধারণ কেউ নয়।
এমআইটিতে ভর্তির পর সাবরিনা এমন এক ইতিহাস গড়লেন, যা গত কয়েক দশকে কোনো মেয়ে করতে পারেনি। তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নিখুঁত ৫.০ জিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর পিএইচডির জন্য পাড়ি জমান আরেক বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
নিজের হাতে বানানো সেসনা ১৫০ মডেলের কিট এয়ারক্রাফটটি যখন সাবরিনা আকাশে ওড়াল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাভিয়েশন ম্যাগাজিনগুলো তাকে আখ্যা দিয়েছিল অ্যাভিয়েশনের ভবিষ্যৎ।
জেফ বেজোস ও নাসাকে ‘না’
সাবরিনার মেধা ও বিমান বানানোর জাদুকরী ক্ষমতা খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ল কর্পোরেট দুনিয়ায়। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা এবং মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ব্লু অরিজিনের মালিক জেফ বেজোস তাকে সরাসরি চাকরির প্রস্তাব দেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ছিল প্রায় ১.১ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা! শুধু জেফ বেজোসই নন, মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মতো জগদ্বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানও তাকে লুফে নিতে চেয়েছিল।
কিন্তু সাবরিনা সবাইকে বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দেয়। কারণ তার স্বপ্ন কোনো বড় কোম্পানির চাকুরে বা কোটিপতি হওয়া নয়। তার নজর তখন মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্যের দিকে। সে বুঝতে পেরেছিল, মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য জানতে হলে তাঁকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গভীরে ডুব দিতে হবে। কোটি টাকার চেয়ে তাঁর কাছে ব্ল্যাকহোলের রহস্য সমাধান করাটা অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল।
অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস সাবরিনাকে সরাসরি চাকরির প্রস্তাব দেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবটি ছিল প্রায় ১.১ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ কোটি টাকা!
কেন তাঁকে পরবর্তী আইনস্টাইন বলা হয়, নিউটন নয় কেন
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, বিজ্ঞানের ইতিহাসে তো আইজ্যাক নিউটনও অনেক বড় নাম, তাহলে সাবরিনাকে কেন নিউটনের বদলে আইনস্টাইনের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে?
এর কারণ লুকিয়ে আছে সাবরিনার গবেষণার বিষয়ে। নিউটন কাজ করেছিলেন ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে। সেটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের গতিবিধি ব্যাখ্যা করে। যেমন আপেল কেন মাটিতে পড়ে, কিংবা গ্রহরা কেন নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরে, এসব নিয়ে। কিন্তু আইনস্টাইন কাজ করেছিলেন থিওরি অব রিলেটিভিটি নিয়ে। এই তত্ত্ব আলোচনা করে মহাকর্ষ, ব্ল্যাকহোল এবং স্থান-কালের মতো মহাবিশ্বের বিশাল বিষয়গুলো নিয়ে। সাবরিনাও কাজ করছেন ঠিক এই জায়গাতেই।
বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো থিওরি অব এভরিথিং। মানে এমন একটি তত্ত্ব দাঁড় করানো, যা মহাবিশ্বের সবকিছুকে ব্যাখ্যা করতে পারে। মুশকিল হলো, আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি এবং কোয়ান্টাম মেকানিকস তত্ত্ব আলাদাভাবে একদম নিখুঁত কাজ করলেও, এদেরকে একসঙ্গে মেলাতে গেলেই সব হিসাব উল্টে যায়। সাবরিনা ঠিক এই দুই ভিন্ন জগতের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি। সাবরিনা যেহেতু আইনস্টাইনের অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণতা দেওয়ার পথে হাঁটছেন, তাই তাকে পরবর্তী আইনস্টাইন বলাটাই সবচেয়ে যৌক্তিক।
সাবরিনা আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি এবং কোয়ান্টাম মেকানিকস তত্ত্বের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি।
পদার্থবিজ্ঞানে সাবরিনার যুগান্তকারী অবদান
খুব অল্প বয়সেই সাবরিনা এমন কিছু তাত্ত্বিক আবিষ্কার করেছে, যা বিশ্বের বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদেরও নজরে পড়েছে। তার কাজের মূল বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জন্য একটু সহজ করে ব্যাখ্যা করা যাক।
১. স্পিন মেমোরি ইফেক্ট: মহাকাশে যখন দুটি ব্ল্যাকহোল বা নিউট্রন স্টারের সংঘর্ষ হয়, তখন তৈরি হয় মহাকর্ষ তরঙ্গ। সাবরিনা এবং তার সহকর্মীরা তাত্ত্বিকভাবে প্রমাণ করে, এই তরঙ্গ যখন স্থান-কালের ভেতর দিয়ে যায়, তখন তা সেখানে একটি স্থায়ী ছাপ রেখে যায়। সাবরিনা দেখিয়ে দিয়েছে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শুধু স্থান-কালকে সংকুচিত বা প্রসারিতই করে না, এর ঘূর্ণনের কারণেও স্থান-কালের ওপর একটা সূক্ষ্ম কিন্তু স্থায়ী প্রভাব পড়ে। এটি পদার্থবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী ধারণা, যা ভবিষ্যতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণের কাজে বিশাল ভূমিকা রাখবে।
২. পিএসজেড ট্রায়াঙ্গেল: সাবরিনার হার্ভার্ডের পিএইচডি সুপারভাইজার অ্যান্ড্রু স্ট্রমিঞ্জার এবং আলেকজান্ডার জিবোইদভের সঙ্গে যৌথ কাজ এটি। এই গাণিতিক কাঠামো মহাবিশ্বের তিনটি আপাত-ভিন্ন বিষয়কে এক সুতোয় গেঁথেছে। এই তিনটি বিষয় হলো সফট থিওরেম (কম শক্তির কণার আচরণ), অ্যাসিম্পটোটিক সিমেট্রি (স্থান-কালের সীমানার প্রতিসাম্য) এবং মেমোরি ইফেক্ট। এই তিনটি কাজ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম মেকানিকস ও মহাকর্ষকে মেলানোর এক দারুণ ভিত্তি বা ডিকশনারি হিসেবে কাজ করছে।
৩. সেলেসটিয়াল হলোগ্রাফি: এটি সাবরিনার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং যুগান্তকারী প্রজেক্ট। এর মূল ধারণাটি রীতিমতো মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। হলোগ্রাফিক প্রিন্সিপল অনুযায়ী, আমাদের এই ত্রিমাত্রিক মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই হয়তো মহাবিশ্বের একদম শেষ সীমানার একটি দ্বিমাত্রিক সমতলে প্রজেক্ট করা কোনো হলোগ্রাম। ঠিক যেমন মুভির সমতল পর্দায় আলো ফেলে আমরা ত্রিমাত্রিক জগতের স্বাদ পাই, সেরকম। সাবরিনা এবং তার দল এই তত্ত্বের গাণিতিক কাঠামো দাঁড় করাচ্ছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে সেলেসটিয়াল হলোগ্রাফি। এর মাধ্যমে তারা রাতের আকাশের ওই বিশাল ক্যানভাসকে একটা হলোগ্রাম হিসেবে ধরে নিয়ে মহাকর্ষ এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বকে এক করার চেষ্টা করছেন।
হলোগ্রাফিক প্রিন্সিপল অনুযায়ী, আমাদের এই ত্রিমাত্রিক মহাবিশ্ব এবং এর ভেতরের সবকিছুই হয়তো মহাবিশ্বের একদম শেষ সীমানার একটি দ্বিমাত্রিক সমতলে প্রজেক্ট করা কোনো হলোগ্রাম।
স্টিফেন হকিংয়ের স্বীকৃতি
সাবরিনার কাজের গভীরতা কতটা, তার প্রমাণ মেলে খোদ স্টিফেন হকিংয়ের কাছ থেকে। ব্ল্যাকহোলে কোনো কিছু ঢুকে গেলে তার তথ্য চিরতরে হারিয়ে যায় কি না, এই ধাঁধাটি নিয়ে হকিং সারা জীবন কাজ করেছেন। ২০১৬ সালে স্টিফেন হকিং, ম্যালকম পেরি এবং অ্যান্ড্রু স্ট্রমিঞ্জারের লেখা বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘সফট হেয়ার অন ব্ল্যাকহোলস’-এ সাবরিনার গবেষণাকে সরাসরি উদ্ধৃত করা হয়। সাবরিনার কাজের সূত্র ধরেই হকিংয়ের দল দেখানোর চেষ্টা করেছিল, ব্ল্যাকহোল পুরোপুরি তথ্য ধ্বংস করে না; বরং ব্ল্যাকহোলের সীমানায় বা ইভেন্ট হরাইজনে অত্যন্ত কম শক্তির কণার মধ্যে সেই তথ্য জমা থাকতে পারে। একজন এত অল্প বয়সী গবেষকের জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে!
২০১৬ সালে স্টিফেন হকিং, ম্যালকম পেরি এবং অ্যান্ড্রু স্ট্রমিঞ্জারের লেখা বিখ্যাত গবেষণাপত্র সফট হেয়ার অন ব্ল্যাকহোলসে সাবরিনার গবেষণাকে সরাসরি উদ্ধৃত করা হয়।
বর্তমানে কী করছেন সাবরিনা
বর্তমানে কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউট ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্সে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছে সাবরিনা। সেখানে সে সেলেসটিয়াল হলোগ্রাফি ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান গবেষক। বিশ্বের সেরা গাণিতিক পদার্থবিদ, কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি এক্সপার্টদের নিয়ে একটি বিশাল দল গড়েছে। তাদের একটাই লক্ষ্য, স্থান-কাল এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের মিলন ঘটিয়ে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধার সমাধান করা।
ব্যক্তিজীবনে সাবরিনা পাসটারস্কি খুব সাধারণ জীবনযাপন করতে ভালোবাসে। স্মার্টফোন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি খুব একটা সময় নষ্ট করে না। তার নিজস্ব একটি সাদামাটা ওয়েবসাইট আছে, নাম ‘ফিজিক্সগার্ল ডটকম’। সেখানে সে নিয়মিত নিজের কাজের আপডেট দেয়। তার বয়সী তরুণ-তরুণীরা যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্ট গোনা এবং ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, তখন এই তরুণী নীরবে মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল গাণিতিক সমীকরণগুলো সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে।
টাকার মোহ, বড় কোম্পানির লোভনীয় প্রস্তাব বা পত্রিকার শিরোনাম হওয়ার নেশা সাবরিনাকে তার লক্ষ্য থেকে সরাতে পারেনি। জেফ বেজোসের মিলিয়ন ডলারের হাতছানি তার কাছে ব্ল্যাকহোলের রহস্যের কাছে নেহাতই তুচ্ছ মনে হয়েছে। মহাবিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে অসীমের জ্ঞান অন্বেষণেই তার আসল আনন্দ। বিজ্ঞানীদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে সে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানকে এমন কিছু উপহার দেবেন। আর সেজন্য বিশ্ববাসী তাকে নতুন প্রজন্মের আইনস্টাইন হিসেবেই চিরকাল মনে রাখবে!
