ভালো পাঠক হওয়ার সহজ তিন উপায়

ছবি: লিটারারি হাব

কোথাও যেন পড়েছিলাম, লেখকেরা নাকি সব রাক্ষুসে পাঠক হন। কথাটা মিথ্যে নয়। যখনই কোনো ভালো বই পড়ি, ভেতর থেকে লেখার একটা তীব্র তাগিদ অনুভব করি। এমন কোনো লেখকের দেখা আমি আজও পাইনি, যিনি মোটেও বই পড়েন না। সত্যি বলতে, পড়া আর লেখা এক সুতোয় গাঁথা। তবে পাঠক হতে হলে যে লেখক হতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। ভালো পাঠক হওয়াও জরুরি। তাই ভালো পাঠক হওয়ার তিনটি কৌশল জানা যাক।

১. বই হোক নিত্যসঙ্গী

টিভি দেখা বা ভিডিও গেম খেলার সঙ্গে বই পড়ার একটা বড় পার্থক্য আছে। বই পড়লে আপনি চটজলদি কোনো মজা পাবেন না। মুভিতে একটা ভালো দৃশ্য দেখলে যে আনন্দ পাওয়া যায়, বা গেম খেলে জিতলে যে আনন্দ হুট করেই পাওয়া যায়, পড়ার আনন্দটা তেমন হুট করে আসে না। এটা তৈরি হতে সময় লাগে। বিষয়টা ঝিরঝিরে বৃষ্টির মতো, ধীরে ধীরে আপনাকে ভিজিয়ে দেবে, আপনি প্রশান্তি পাবেন।

বই পড়ার আনন্দ হুট করে আসে না
ছবি: আনস্প্ল্যাশ

অনেকেই আফসোস করে বলেন, ‘ইশ! আমারও যদি বই পড়ার অভ্যাস থাকত!’ লেখক নাতালি গোল্ডবার্গ তাঁর ওয়াইল্ড মাইন্ড বইয়ে বলেছিলেন, মানুষ সারা জীবন শুধু ভাবনায় কাটিয়ে দেয় যে সে লিখবে, কিন্তু লেখা আর হয়ে ওঠে না। পড়ার ক্ষেত্রেও তাই। শুধু ভাবলেই হবে না, বইটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করতে হবে। জাস্ট ডু ইট।

আরও পড়ুন
মুভিতে একটা ভালো দৃশ্য দেখলে যে আনন্দ পাওয়া যায়, বা গেম খেলে জিতলে যে আনন্দ হুট করেই পাওয়া যায়, পড়ার আনন্দটা তেমন হুট করে আসে না। এটা তৈরি হতে সময় লাগে।

এর জন্য সহজ সমাধান হলো, সব সময় নিজের সঙ্গে একটা বই রাখা। স্মার্টফোনের যুগে আমরা যেমন ফোন ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারি না, বইকেও তেমন সঙ্গী বানিয়ে নিন। বাসে বসে আছেন, কারও জন্য অপেক্ষা করছেন কিংবা জ্যামে আটকে আছেন, ব্যাগ থেকে বইটা বের করে পড়া শুরু করুন।

প্রথম প্রথম একটু অদ্ভুত লাগলেও কিছুদিন পর দেখবেন, বই সঙ্গে না থাকলে আপনার খালি খালি লাগছে। সবসময় যে বই সঙ্গে রাখতেই হবে, এমনটাও নয়। চাইলে আপনি স্মার্টফোনেও বই পড়তে পারেন। বাংলা ভাষায় বই পড়ার জন্য এখন অনেক অ্যাপ পাওয়া যায়। অ্যাপ ডাউনলোড করে অনলাইনে বই কিনেও পড়তে পারেন।

স্মার্টফোনেও বই পড়া যায়
ছবি: সি-নেট

জাপানি দার্শনিক ইয়োশিমিচি নাকাজিমা তাঁর দ্য আনসোশ্যাল সোশ্যাবিলিটি বইয়ে নিঃসঙ্গ মানুষদের পরামর্শ দিয়েছেন, ‘আপনার জীবনে অন্তত একজন মানুষের সঙ্গে হলেও গভীর সম্পর্ক তৈরি করুন...এমন একজন মানুষ, যে আপনার অস্তিত্বে আনন্দ পায়। এমন একজন মানুষ থাকলেই আপনি এগিয়ে যেতে পারবেন।’

আমি মনে করি, বইকেও আপনি সেই মানুষটির জায়গায় বসাতে পারেন।

আরও পড়ুন
সবসময় যে বই সঙ্গে রাখতেই হবে, এমনটাও নয়। চাইলে আপনি স্মার্টফোনেও বই পড়তে পারেন। বাংলা ভাষায় বই পড়ার জন্য এখন অনেক অ্যাপ পাওয়া যায়।

২. বিছানা, চা ও বই

কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সময় ব্যাগ গোছানোর আগেই আমি কয়েকটা বই ভরে নিই। যদিও খুব ভালো করেই জানি, সেখানে গিয়ে বই পড়ার সময় বা সুযোগ কোনোটিই হয়তো হবে না। তবু ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার সময় দুটি বই নিয়েছিলাম! আর অনলাইনে তো বই আছেই!

এখনো কল্পনায় একটা দৃশ্য ভাসে—শীতের মধ্যে গায়ে কম্বল জড়িয়ে বসে আছি, সামনে চা ধোঁয়া ছড়াচ্ছে, আর আমি গভীর মনোযোগে স্টিফেন কিং পড়ছি। একজন মানুষ যখন বইয়ে ডুবে থাকে, তখন তার মধ্যে এক বিশেষ ধরনের আভা তৈরি হয়। তার চোখের দৃষ্টিতে একধরনের প্রশান্তি থাকে। দৃশ্যটা দারুণ।

শীতের মধ্যে গায়ে কম্বল জড়িয়ে বসে আছেন, সামনে চা আর বই!
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

কিন্তু বাস্তবতা হলো, ছুটিতে গিয়ে আমি এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারি না। ছুটিতে তেমন কোনো কাজ থাকে না বলে ৩০ মিনিট পরেই উসখুস শুরু করি। হয়তো বইটা খুলে বসি। ১০ পাতা পড়ি, আবার উঠে যাই। তাই বলে কি হাল ছেড়ে দিয়েছি? মোটেও না। বরং ১০ পাতা যে পড়লাম, সেটাই মন্দ কী!

তবে রাতে তো আর তেমন উসখুস করার উপায় নেই। তখন বিছানার শুয়ে মোবাইলটা সাইলেন্ট  করে বই পড়ার একটা পরিবেশ তৈরি করি। সারা দিনের ক্লান্তি শেষে যখন বালিশে হেলান দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টাই, তখন বইয়ের পাতায় পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে হারিয়ে যেতে পারি।

আরও পড়ুন
একজন মানুষ যখন বইয়ে ডুবে থাকে, তখন তার মধ্যে এক বিশেষ ধরনের আভা তৈরি হয়। তার চোখের দৃষ্টিতে একধরনের প্রশান্তি থাকে। দৃশ্যটা দারুণ।

৩. বই শেষ করতেই হবে, এমন কোনো দিব্যি নেই

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের বিখ্যাত বই দুর্গেশনন্দিনী আমি বহুবার পড়ার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়েছি। বইয়ের শুরুর দিকেই ভাষা এত জটিল যে বুঝতেই পারতাম না।

আবার বছরখানেক পড়ে যখন আরেকটু ভালো পাঠক হয়ে উঠলাম, তখন বইটা আবার পড়া শুরু করলাম। এবার আগের তুলনায় একটু ভালো বুঝলাম। কিন্তু তাও সবটা পড়া গেল না। এভাবে চার বার চেষ্টা করেও সম্পূর্ণ বইটি শেষ করতে পারিনি। ৬ বছরের মধ্যে পাঁচবারের চেষ্টায় বইটি শেষ হলো। শেষ করার পর মনে হলো, কী দারুণ একটা বই পড়লাম!

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের বিখ্যাত বই দুর্গেশনন্দিনী
ছবি: উইকিপিডিয়া

তবে সব বই যে জোর করে শেষ করতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। যদি দেখেন কোনো বই আপনাকে একদমই টানছে না, তবে সেটা রেখে দিন। কোনো অনুশোচনা রাখার দরকার নেই। সব বই আপনার পড়তে ভালো লাগবে না। জোর করে অপছন্দের বইটি না পড়ে নতুন কোনো বই শুরু করুন। জোর করে বই শেষ করতে গেলে পড়ার আনন্দটাই মাটি হয়ে যেতে পারে। তখন বই পড়াকে মনে হয় বিরক্তিকর কাজ।

আরও পড়ুন
চার বার চেষ্টা করেও দুর্গেশনন্দিনী বইটি সম্পূর্ণ শেষ করতে পারিনি। ৬ বছরের মধ্যে পাঁচবারের চেষ্টায় বইটি শেষ হলো। শেষ করার পর মনে হলো, কী দারুণ একটা বই পড়লাম!

তবে হ্যাঁ, সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচি বদলায়। আজ যে বইটা আপনার কাছে বোরিং লাগছে, দু বছর পর হয়তো সেটাই আপনার সবচেয়ে প্রিয় বই হয়ে উঠবে! দুর্গেশনন্দিনী বইটার ক্ষেত্রে যেমন আমার হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের লেখক হেনরি ডেভিড থরো ১৮৪৫ সালে লোকালয় ছেড়ে জঙ্গলে গিয়ে কুঁড়েঘর বানিয়ে ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন জীবনের আসল নির্যাসটুকু শুষে নিতে। তিনি লিখেছিলেন:

‘আমি অরণ্যে গিয়েছিলাম কারণ আমি বুঝেশুনে বাঁচতে চেয়েছিলাম...আমি দেখতে চেয়েছিলাম জীবন আমাকে কী শেখাতে চায়। মৃত্যুর সময় যাতে আমার মনে না হয়, আমি আসলে বাঁচিইনি।’

নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাসটা তৈরি করতে হবে
ছবি: দ্য কনভারসেশন

আমাদের আপাতত সব ছেড়ে বনে যেতে হবে না। শুধু নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাসটা তৈরি করতে হবে। শুধু যে পড়তেই হবে, তাও নয়। চাইলে আপনি অডিও গল্পও শুনতে পারেন। যাত্রাপথে তো আমরা অনেকেই গান শুনি, কিন্তু একবার একটি গল্প শুনে দেখুন। এরপর থেকে হয়তো আপনার গল্প শুনতে ভালো লাগবে।

সূত্র: লিটারারি হাব

আরও পড়ুন