সায়েন্স ফিকশন লেখকেরা কেন মৌলিক সংখ্যা পছন্দ করেন
অসীম মৌলিক সংখ্যার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা - ৪
সায়েন্স ফিকশন লেখকেরা এলিয়েনদের সঙ্গে পৃথিবীবাসীর যোগাযোগ করানোর গল্প লিখতে গিয়ে বড় সমস্যায় পড়েন। তাঁরা কি ধরে নেবেন যে এলিয়েনরা খুব বুদ্ধিমান এবং আমাদের ভাষা আগে থেকেই শিখে নিয়েছে? নাকি তাদের কাছে কোনো অদ্ভুত অনুবাদ যন্ত্র আছে যা সব ভাষা তরজমা করে দেয়? নাকি ধরে নেবেন যে মহাবিশ্বের সবাই ইংরেজিতেই কথা বলে?
অনেক লেখক এই সমস্যার একটা চমৎকার সমাধান বের করেছেন। তাঁরা ধরে নেন, গণিতই মহাবিশ্বের একমাত্র সর্বজনীন ভাষা। আর এই ভাষার প্রথম বর্ণমালা মৌলিক সংখ্যা।
উদাহরণ হিসেবে কার্ল সাগানের বিখ্যাত উপন্যাস কন্টাক্ট-এর কথা বলা যায়। উপন্যাসের একটি চরিত্র এলি। সে সেটি (SETI) গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করে। হঠাৎ মহাকাশ থেকে আসা একটা সিগন্যাল ধরা পড়ে। এলি বুঝতে পারে এটা সাধারণ কোনো নয়েজ নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে আসা কিছু পালস।
সে অনুমান করে, স্পন্দনগুলো বাইনারি সংখ্যার সংকেত। সেগুলো দশমিক সংখ্যায় রূপান্তর করতেই একটা প্যাটার্ন চোখে পড়ে। ৫৯, ৬১, ৬৭, ৭১...। সবগুলোই মৌলিক সংখ্যা! এভাবে ৯০৭ নম্বর পর্যন্ত মৌলিক সংখ্যার সিগন্যাল আসতেই থাকে। এলি নিশ্চিত হয়, এটা কোনো দৈব ঘটনা হতে পারে না। কেউ হয়তো ভিনগ্রহ থেকে আমাদের ‘হ্যালো’ বলছে!
এলি সেটি গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করে। হঠাৎ মহাকাশ থেকে আসা একটা সিগন্যাল ধরা পড়ে। এলি বুঝতে পারে এটা সাধারণ কোনো নয়েজ নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে আসা কিছু পালস।
অনেক গণিতবিদ বিশ্বাস করেন, মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তে যদি ভিন্ন জীববিজ্ঞান, ভিন্ন রসায়ন, এমনকি ভিন্ন পদার্থবিজ্ঞানও থাকে, তবুও গণিত একই থাকবে। ভেগা নক্ষত্রের কোনো গ্রহে বসে কোনো এলিয়েন যদি মৌলিক সংখ্যার বই পড়ে, সে-ও ৫৯ এবং ৬১-কে মৌলিক সংখ্যা হিসেবেই চিনবে। কারণ কেমব্রিজের বিখ্যাত গণিতবিদ জি.এইচ. হার্ডি যেমনটা বলেছিলেন, ‘আমরা এভাবে ভাবছি বলে এই সংখ্যাগুলো মৌলিক নয়, বরং গাণিতিক বাস্তবতাটাই এমন। এটাই মহাবিশ্বের নিয়ম।’
মৌলিক সংখ্যাগুলো হয়তো পুরো মহাবিশ্বজুড়েই এক, কিন্তু আমাদের মতোই ভিনগ্রহের প্রাণীরাও কি এগুলো নিয়ে একই রকম গল্প বলে? হাজার বছর ধরে আমরা এই সংখ্যাগুলো নিয়ে গবেষণা করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সত্য আবিষ্কার করেছি। এই আবিষ্কারের প্রতিটি ধাপে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির ছাপ লেগে আছে। কে জানে, হয়তো মহাবিশ্বের অন্য কোনো সভ্যতা সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এই সংখ্যাগুলো নিয়ে ভেবেছে। হয়তো তারা এমন সব উপপাদ্য আবিষ্কার করেছে, যা আমরা এখনো জানতেই পারিনি!
মৌলিক সংখ্যা দিয়ে যোগাযোগ করার বুদ্ধিটা শুধু কার্ল সাগানের একার নয়। ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে খোদ মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাও মৌলিক সংখ্যা ব্যবহার করেছে। ১৯৭৪ সালে পুয়ের্তো রিকোর আরেসিবো রেডিও টেলিস্কোপ থেকে মহাকাশের ‘M13’ নামে এক নক্ষত্রপুঞ্জের দিকে একটি বার্তা পাঠানো হয়। এই নক্ষত্রপুঞ্জে প্রচুর নক্ষত্র আছে বলে জায়গাটি বেছে নেওয়া হয়। তাই বার্তাটি কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর কানে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বেশি।
কেমব্রিজের বিখ্যাত গণিতবিদ জি.এইচ. হার্ডি যেমনটা বলেছিলেন, ‘আমরা এভাবে ভাবছি বলে এই সংখ্যাগুলো মৌলিক নয়, বরং গাণিতিক বাস্তবতাটাই এমন। এটাই মহাবিশ্বের নিয়ম।’
বার্তাটিতে ছিল একগাদা ০ ও ১-এর সিরিজ। এই সংখ্যাগুলো সাজিয়ে একটি সাদা-কালো পিক্সেল ছবি তৈরি করা সম্ভব। সেই ছবিতে বাইনারি পদ্ধতিতে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যা, ডিএনএর গঠন, সৌরজগত এবং আরেসিবো টেলিস্কোপের ছবি আঁকা ছিল। মাত্র ১ হাজার ৬৭৯টি পিক্সেল থাকায় ছবিটা খুব বেশি স্পষ্ট হয়নি, কিন্তু সংখ্যাটি (১৬৭৯) বেছে নেওয়া হয়েছিল ইচ্ছে করেই। কারণ এর মধ্যেই ছবিটা সাজানোর সূত্র লুকিয়ে ছিল। ১,৬৭৯ হলো ২৩ এবং ৭৩-এর গুণফল। তাই এই পিক্সেলগুলোকে মাত্র দুইভাবেই আয়তাকারে সাজানো সম্ভব। যদি ২৩টি সারি ও ৭৩টি কলাম করা হয়, তবে হিজিবিজি কিছু একটা দেখাবে। কিন্তু যদি উল্টোটা করা হয়, অর্থাৎ ৭৩টি সারি ও ২৩টি কলামে সাজানো হয়, তবেই স্পষ্ট ছবিটি ফুটে উঠবে।
ওই নক্ষত্রপুঞ্জ আমাদের থেকে ২৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। তাই আমরা এখনো উত্তরের অপেক্ষায় আছি। তবে আগামী ৫০ হাজার বছরের আগে কোনো উত্তর পাওয়ার আশা করবেন না যেন!
যদিও মৌলিক সংখ্যাগুলো সর্বজনীন, কিন্তু গণিতের ইতিহাসে আমরা এগুলোকে একেক সময় একেকভাবে লিখেছি। লেখার পদ্ধতিটাও একেক সংস্কৃতিতে একেক রকম। আমাদের এই গ্রহের বিভিন্ন দেশে মৌলিক সংখ্যা কীভাবে লেখা হতো, তার একটা চিত্র এখন আমরা দেখব।
১,৬৭৯ হলো ২৩ এবং ৭৩-এর গুণফল। তাই এই পিক্সেলগুলোকে মাত্র দুইভাবেই আয়তাকারে সাজানো সম্ভব। যদি ২৩টি সারি ও ৭৩টি কলাম করা হয়, তবে হিজিবিজি কিছু একটা দেখাবে।
এই মৌলিক সংখ্যাটি কত
ইতিহাসের শুরুর দিকে গণিতচর্চা হয়েছিল প্রাচীন মিসরে। এই ছবিতে যেভাবে লেখা দেখছেন, ঠিক এভাবেই তারা লিখত ২০০,২০১ সংখ্যা।
খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে নীল নদের তীরে বসতি গড়তে শুরু করে। মিসরীয় সমাজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজনীয়তা। ট্যাক্সের হিসাব রাখা, জমি মাপা করা কিংবা পিরামিড তৈরির জন্য তাদের সংখ্যার দরকার হতো। ভাষার জন্য যেমন হায়ারোগ্লিফ ব্যবহার করত, সংখ্যার জন্য ব্যবহার করত বিশেষ চিহ্ন।
১০-এর ঘাতের ওপর ভিত্তি করে একটি সংখ্যাপদ্ধতি তৈরি করেছিল তারা। সেটা ছিল বর্তমানের দশমিক পদ্ধতির মতো। তবে ১০ সংখ্যাটি বেছে নেওয়ার পেছনে কোনো গাণিতিক কারণ ছিল না, আমাদের হাতের আঙুল ১০টি বলেই এই সংখ্যাটি বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, তারা তখনো স্থানীয় মান আবিষ্কার করতে পারেনি।
আমরা যখন ২২ লিখি, তখন প্রথম ২-এর মান ২০ এবং পরের ২-এর মান ২। অর্থাৎ সংখ্যার অবস্থান অনুযায়ী মান বদলায়। কিন্তু মিসরীয়দের এই সুবিধা ছিল না। ১০-এর প্রতিটি নতুন ঘাতের জন্য তাদের নতুন নতুন চিহ্ন তৈরি করতে হতো।
২০০,২০১ সংখ্যাটি হয়তো তারা অল্প কিছু চিহ্ন দিয়েই লিখে ফেলতে পারত। কিন্তু ৯৯,৯৯,৯৯১ মৌলিক সংখ্যাটি হায়ারোগ্লিফে লিখতে হলে তাদের মোট ৫৫টি চিহ্ন আঁকতে হতো! মিসরীয়রা মৌলিক সংখ্যার গুরুত্ব তখনো বোঝেনি, কিন্তু তারা গণিতে বেশ এগিয়ে ছিল। পিরামিডের আয়তন বের করার সূত্র কিংবা ভগ্নাংশের ধারণা ছিল। তবে তাদের সংখ্যা লেখার পদ্ধতিটা বেশি সুবিধাজনক ছিল না। এদিক থেকে তাদের প্রতিবেশী ব্যাবিলনীয়রা ছিল অনেক বেশি স্মার্ট।
খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে মানুষ যাযাবর জীবন ছেড়ে নীল নদের তীরে বসতি গড়তে শুরু করে। মিসরীয় সমাজের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে হিসাব-নিকাশের প্রয়োজনীয়তা।
এই মৌলিক সংখ্যাটি কত
প্রাচীন ব্যাবিলনীয়রা ৭১ সংখ্যাটিকে ঠিক এভাবেই লিখত। মিসরীয় সাম্রাজ্য যেমন নীল নদের তীরে গড়ে উঠেছিল, ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল ইউফ্রেটিস নদীর তীরে। খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দের দিকে আজকের ইরাক, ইরান ও সিরিয়ার বড় অংশ তাদের দখলে ছিল। বিশাল সাম্রাজ্য চালানোর জন্য হিসাব-নিকাশে দক্ষ হয়ে উঠেছিল তারা। হিসাব রাখত মাটির তৈরি ক্লে ট্যাবলেটে। নরম কাদার ওপর কাঠের কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে লিখত, তারপর রোদে শুকাত। তাদের লেখার এই স্টাইলকে বলা হয় কিউনিফর্ম।
খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের দিকে ব্যাবিলনীয়রাই প্রথম স্থানীয় মানের ব্যবহার শুরু করে। তবে মিসরীয়দের মতো ১০ ভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি ব্যবহার না করে তারা ব্যবহার করত ৬০ ভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি। অর্থাৎ তাদের পদ্ধতির বেস বা ভিত্তি ছিল ৬০। ১-৫৯ পর্যন্ত সংখ্যার জন্য আলাদা আলাদা চিহ্নের কম্বিনেশন ছিল। কিন্তু যখনই সংখ্যাটি ৬০ হতো, তা বাঁ পাশের কলামে সরিয়ে নিত; ঠিক যেমন আমরা ৯-এর পর ১০ লেখার সময় ১-কে বাঁ পাশের দশকের ঘরে বসাই।
মিসরীয় সাম্রাজ্য যেমন নীল নদের তীরে গড়ে উঠেছিল, ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল ইউফ্রেটিস নদীর তীরে। খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ অব্দে আজকের ইরাক, ইরান ও সিরিয়ার বড় অংশ তাদের দখলে ছিল।
ওপরের ছবিতে যে মৌলিক সংখ্যাটি দেখছেন, সেটা ৭১। এখানে ৬০-এর একটি সেট ও সঙ্গে ১১-এর চিহ্ন যোগ করে ৭১ বানানো হয়েছে। অর্থাৎ, ৬০ + ১১ = ৭১। ৫৯ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো লেখার সময় ১ থেকে ৯ পর্যন্ত খাড়া দাগ দিয়ে বোঝাত। আর ১০ বোঝাতে ব্যবহার করত একটি বিশেষ চিহ্ন।
দশমিক পদ্ধতির চেয়ে ৬০ ভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি বেছে নেওয়া গাণিতিকভাবে অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত। কারণ ৬০ সংখ্যাটি প্রচুর সংখ্যা দিয়ে ভাগ যায়। মানে এর উৎপাদক অনেক বেশি। হিসাব-নিকাশের জন্যও দারুণ সুবিধাজনক। যেমন, আমাদের কাছে ৬০টি শিম থাকে, সেগুলোকে আমরা নানাভাবে ভাগ করতে পারব:
৬০ = ৩০ × ২ = ২০ × ৩ = ১৫ × ৪ = ১২ × ৫ = ১০ × ৬
গণিতের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি গিয়েছিল ব্যাবিলনীয়রা। সেটি হলো শূন্য। ধরুন, আপনি কিউনিফর্মে ৩,৬০৭ সংখ্যাটি লিখতে চান। মানে ৩৬০০ বা ৬০ স্কয়ারের একটি সেটের সঙ্গে ৭টি একক সেট নিতে হবে। কিন্তু তা দেখতে অনেকটা ৬৭-এর (একটি ৬০ ও ৭টি একক) মতো হয়ে যেতে পারে। ৩,৬০৭ সংখ্যাটিও মৌলিক আবার ৬৭ সংখ্যাটিও মৌলিক। কিন্তু সংখ্যা দুটি তো এক নয়!
দশমিক পদ্ধতির চেয়ে ৬০ ভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি বেছে নেওয়া গাণিতিকভাবে অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত। কারণ ৬০ সংখ্যাটি প্রচুর সংখ্যা দিয়ে ভাগ যায়। মানে এর উৎপাদক অনেক বেশি।
এই সমস্যা মেটাতে ব্যাবিলনীয়রা একটি ছোট চিহ্ন ব্যবহার করত। এই চিহ্নটি বোঝাত, ৬০-এর কলামে কিছু নেই, জায়গাটা ফাঁকা। তাই ৩,৬০৭ লেখার সময় তারা মাঝখানে ওই চিহ্নটি বসিয়ে দিত।
কিন্তু তারা শূন্যকে স্বতন্ত্র সংখ্যা হিসেবে ভাবেনি। তাদের কাছে শূন্য ছিল শুধুই একটি চিহ্ন। এই চিহ্ন ব্যবহার করত শুধু স্থানীয় মানের ফাঁকা জায়গা বোঝাতে। শূন্যকে একটি সংখ্যা হিসেবে মর্যাদা দিতে গণিতকে আরও ২ হাজার ৭০০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সপ্তম শতাব্দীতে ভারতীয়রাই প্রথম শূন্যকে সংখ্যা হিসেবে ব্যবহার করে এবং এর বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করে।
সংখ্যা লেখার উন্নত পদ্ধতির পাশাপাশি ব্যাবিলনীয়রা দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের প্রথম পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। মাধ্যমিক স্কুলে বর্তমানে এই পদ্ধতি শেখানো হয়। পিথাগোরাসের সমকোণী ত্রিভুজের উপপাদ্যের প্রাথমিক ধারণাও তাদের ছিল। কিন্তু ব্যাবিলনীয়রা যে মৌলিক সংখ্যার সৌন্দর্য বুঝতে পেরেছিল, এমন কোনো প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।
