গণিত যেভাবে খাবারের মেনু ঠিক করে দেয়
বন্ধুকে নিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় গেলেন রাতের খাবার খেতে। টেবিলের ওপাশে আপনার বন্ধু মেনু কার্ড নিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছেন। ঠিক এই সময়ে ওয়েটার এসে দাঁড়ালেন টেবিলের কাছে। তাঁর হাতে নোটপ্যাড, চোখে বিনীত প্রশ্ন—কী অর্ডার করবেন, স্যার?
মুহূর্তটা অদ্ভুত এক স্নায়ুচাপের। আপনি এখানকার চিকেন মাসালা আগে খেয়েছেন, স্বাদটা দারুণ, এখনো যেন জিবে লেগে আছে। কিন্তু মেনুর নিচের দিকে একটা নতুন আইটেমের নাম লেখা ‘শেফস স্পেশাল মিস্ট্রি মিট’। আপনার মন বলছে, নতুনটা ট্রাই করে দেখলে কেমন হয়? আবার পরক্ষণেই ভয় হচ্ছে, যদি খেতে জঘন্য হয়? টাকাটাও জলে যাবে, রাতের খাওয়াটাও হবে মাটি! উল্টো দিকে চেনা খাবারটা অর্ডার করলে কোনো ঝুঁকি নেই, পেট পুরে খাওয়া যাবে। কিন্তু কে জানে, হয়তো ওই নতুন আইটেমটাই এই রেস্তোরাঁর সেরা খাবার ছিল, যা আপনি একটু ঝুঁকির ভয়ে মিস করে গেলেন!
এই যে দোটানা, এটা শুধু আপনার একার নয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো দিন এই সংকটে পড়েছেন। হয়তো রেস্তোরাঁয় গিয়ে সবাই একই সমস্যায় পড়েননি, কিন্তু কোনো না কোনো বিষয়ে দোটানায় নিশ্চয়ই পড়েছেন!
ওপরের রেস্তোরাঁর কাহিনিটা দ্য বিগ ব্যাং থিওরির কোনো দৃশ্য বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আপনি কি জানেন, কী খাবেন আর কী খাবেন না; এই ছোট্ট সমস্যার সমাধান লুকিয়ে আছে গণিতের একটি চমৎকার সূত্রের ভেতর?
ফাইনম্যান একটি নির্দিষ্ট সীমা বের করেছিলেন। তাঁর মতে, আপনি একটি রেস্তোরাঁয় কতবার যাবেন, তার ওপর নির্ভর করবে আপনার সিদ্ধান্ত।
গল্পের শুরু ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান এবং তাঁর বন্ধু রালফ লেইটন গিয়েছিলেন পাসাডেনার কাছে গ্লেনডেল এলাকার একটি থাই রেস্তোরাঁয়। এই লেইটন কিন্তু যে–সে মানুষ নন। তিনি ১৯৬৪ সালের বিখ্যাত দ্য ফাইনম্যান লেকচার্স অন ফিজিকস বইয়ের সহলেখক রবার্ট লেইটনের ছেলে। পরে ১৯৮৫ সালে ফাইনম্যানের জনপ্রিয় আত্মজীবনী শিওরলি ইউ আর জোকিং, মিস্টার ফাইনম্যান! লিখতে এই লেইটনই তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।
সেদিন থাই রেস্তোরাঁয় বসে লেইটন এক অদ্ভুত দ্বিধায় পড়লেন। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় খাবার জিঞ্জার চিকেন। আজ কি আবার সেই চেনা জিঞ্জার চিকেন অর্ডার করবেন, নাকি মেনু কার্ডের অন্য কোনো নতুন খাবার চেখে দেখবেন?
ফাইনম্যান ছিলেন জাত বিজ্ঞানী। তিনি সবকিছুর ভেতরেই গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান খুঁজতেন। লেইটনের এই দ্বিধা দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে একটা কাগজ টেনে নিলেন এবং হিজিবিজি করে গণিতের নানা সূত্র লিখতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দাবি করলেন, এই সমস্যার একটি নিখুঁত গাণিতিক সমাধান তিনি বের করে ফেলেছেন!
ফাইনম্যান একটি নির্দিষ্ট সীমা বের করেছিলেন। তাঁর মতে, আপনি একটি রেস্তোরাঁয় কতবার যাবেন, তার ওপর নির্ভর করবে আপনার সিদ্ধান্ত। নির্দিষ্ট কয়েকবার নতুন খাবার চেখে দেখার পর একজন বুদ্ধিমান মানুষের উচিত আর কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নিজের সবচেয়ে প্রিয় খাবারটি অর্ডার করা।
১৯৮৫ সালে ফাইনম্যানের জনপ্রিয় আত্মজীবনী শিওরলি ইউ আর জোকিং, মিস্টার ফাইনম্যান! লিখতে লেইটনই ফাইনম্যানকে সাহায্য করেছিলেন।
ফাইনম্যান আসলে সেদিন রেস্তোরাঁর টেবিলে বসে যা সমাধান করেছিলেন, তা গণিত ও অর্থনীতির ভাষায় ডিসিশন থিওরি। অর্থনীতি ও মনস্তত্ত্বের ঠিক মাঝখানের এই শাখা মানুষের একা নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করে। ফাইনম্যানের এই সমস্যা ডিসিশন থিওরির একটি বৃহত্তর পরিবারের অংশ, যাকে বলা হয় স্টপিং প্রবলেমস বা থামার সমস্যা।
বিষয়টা একটু খোলাসা করে বলি। ধরুন, আপনি গাড়ি নিয়ে একটি শপিং মলে গেছেন। ঢোকার মুখেই একটি পার্কিং স্পেস ফাঁকা দেখলেন। আপনি কি সেখানে গাড়ি পার্ক করবেন, নাকি আরও সামনে এগোবেন এই ভেবে যে লিফটের আরও কাছাকাছি কোনো স্পট ফাঁকা পাওয়া যেতে পারে? বেশি লোভ করে যদি সামনে যান এবং দেখেন কোনো জায়গা ফাঁকা নেই, তবে আপনাকে পুরোটা ঘুরে আবার পেছনে আসতে হবে। ততক্ষণে হয়তো প্রথম ফাঁকা জায়গাটাও অন্য কেউ দখল করে নেবে।
কিংবা ধরুন, আপনি বাড়ি কিনবেন। প্রথম যে বাড়িটি দেখলেন, সেটি আপনার বেশ পছন্দ হলো। আপনি কি সেটিই কিনে ফেলবেন, নাকি আরও দশটি বাড়ি দেখবেন? যদি দশটি বাড়ি দেখার পর মনে হয় প্রথমটিই সেরা ছিল, তখন হয়তো দেখবেন অন্য কেউ সেটি কিনে নিয়েছে।
জীবনের সঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম খাটে। আমরা সব সময় এই দোটানায় থাকি। আমাদের সামনে এখন যে বিকল্পটি আছে, সেটি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি আরও ভালো কিছুর আশায় খোঁজ চালিয়ে যাব? এই যে অন্বেষণ বনাম ব্যবহারের চিরন্তন লড়াই, এটিই হলো স্টপিং প্রবলেম।
বেশি লোভ করে যদি সামনে যান এবং দেখেন কোনো জায়গা ফাঁকা নেই, তবে আপনাকে পুরোটা ঘুরে আবার পেছনে আসতে হবে। ততক্ষণে হয়তো প্রথম ফাঁকা জায়গাটাও অন্য কেউ দখল করে নেবে।
ফাইনম্যানের সেই হিজিবিজি লেখা কাগজটা যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন রালফ লেইটন। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে লেইটন ওই মাকড়সার জালের মতো প্যাঁচানো হাতের লেখাগুলোর যতটা সম্ভব পাঠোদ্ধার করে অনলাইনে প্রকাশ করেন। প্রায় এক দশক পর, ২০১৩ সালে নিউ জার্সির প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির কগনিটিভ সায়েন্টিস্ট টম গ্রিফিথস ও তাঁর সহকর্মী ব্রায়ান ক্রিশ্চিয়ান একটি বই লেখার সময় এই সমস্যার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গ্রিফিথস প্রথমবারের মতো ফাইনম্যানের ওই নোটগুলোর পূর্ণাঙ্গ পাঠোদ্ধার করেন।
কিন্তু বিষয়টি সেখানেই থমকে ছিল আরও প্রায় এক দশক। ২০২১ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষক ক্রিশ্চিয়ান ও তাঁর দল ঠিক করেন, তাঁরা বিষয়টি নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা চালাবেন।
ক্রিশ্চিয়ান বলেন, ‘আমরা ফাইনম্যানের নোটের অর্থ বুঝতে পেরেছিলাম ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে অনেক কাজ বাকি ছিল।’ তাঁরা শুধু ফাইনম্যানের সূত্রটি যে নিখুঁত ছিল, তা-ই প্রমাণ করেননি, বরং এই সমস্যার একটি সাধারণীকৃত রূপও সমাধান করেছেন।
বিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন, ফাইনম্যানের ওই গাণিতিক সমাধানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আচরণের কোনো মিল আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখবেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের কগনিটিভ সাইকোলজিস্ট ইভান রুসেকের সঙ্গে মিলে তাঁরা রেস্তোরাঁর এই সমস্যাকে একটি অনলাইন গেমে রূপান্তর করলেন। এই গবেষণায় অংশ নেন মোট ২ হাজার ৫২০ জন স্বেচ্ছাসেবী।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষক ক্রিশ্চিয়ান বলেন, ‘আমরা ফাইনম্যানের নোটের অর্থ বুঝতে পেরেছিলাম ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে অনেক কাজ বাকি ছিল।’
খেলার নিয়মটা ছিল খুব চমৎকার। অংশগ্রহণকারীদের বলা হলো, কল্পনা করুন আপনি একটি নতুন শহরে বেড়াতে গেছেন। সেখানে আপনি এক থেকে চার সপ্তাহ থাকবেন। আপনাকে প্রতি রাতে ঠিক করতে হবে আপনি কোন রেস্তোরাঁয় খাবেন। আপনি যে রেস্তোরাঁটি বেছে নেবেন, তার মানের ওপর ভিত্তি করে আপনাকে ১ থেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে পয়েন্ট দেওয়া হবে। আপনার লক্ষ্য হলো পুরো সফরে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট সংগ্রহ করা।
গবেষকেরা অবাক হয়ে দেখলেন, অংশগ্রহণকারীরা অবচেতনভাবেই ফাইনম্যানের সূত্রের কাছাকাছি একটি কৌশল অবলম্বন করছেন! সফরের শুরুর দিকে, অর্থাৎ যখন হাতে অনেক দিন সময় বাকি, তখন মানুষ নতুন নতুন রেস্তোরাঁ খুঁজে দেখার ঝুঁকি নিচ্ছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ১০০-এর কাছাকাছি কোনো দারুণ রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া। কিন্তু সফরের শেষ দিক যখন সময় ঘনিয়ে আসছিল, তখন তাঁদের মধ্যে নতুন রেস্তোরাঁ খোঁজার প্রবণতা একদম কমে যায়। তখন তাঁরা তাঁদের খুঁজে পাওয়া সেরা রেস্তোরাঁটিতেই বারবার খেতে শুরু করেন।
এই গবেষণার ফল গত ১ জুন প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নাল–এ প্রকাশিত হয়। মজার ব্যাপার হলো, ওই ২ হাজার ৫২০ জন মানুষের কেউই কিন্তু ফাইনম্যানের মতো কাগজ-কলম নিয়ে বর্গমূলের জটিল গাণিতিক সূত্র কষতে বসেননি। তা সত্ত্বেও মানুষের মস্তিষ্ক স্বজ্ঞাতভাবেই প্রায় নিখুঁত গাণিতিক পথে হেঁটেছে।
সফরের শুরুর দিকে, অর্থাৎ যখন হাতে অনেক দিন সময় বাকি, তখন মানুষ নতুন নতুন রেস্তোরাঁ খুঁজে দেখার ঝুঁকি নিচ্ছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ১০০-এর কাছাকাছি কোনো দারুণ রেস্তোরাঁর খোঁজ পাওয়া।
তবে ফাইনম্যানের এই নিখুঁত গাণিতিক মডেলেও একটি ছোট ফাঁক আছে। শোহাম চোশেন-হিলেল মনে করেন, অর্থনীতি বা বিপণনের ক্ষেত্রে এই মডেল দারুণ কার্যকর হলেও রেস্তোরাঁয় মানুষের আচরণের পুরোটা এটি ধারণ করতে পারে না। ফাইনম্যানের গণিত বলছে, আপনি যদি একবার আপনার জন্য সেরা খাবারটি খুঁজে পান, তবে আপনার উচিত আজীবন শুধু সেটাই অর্ডার করে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবে আপনি যদি রোজ রাতে একই পিৎজা বা একই বিরিয়ানি খান, তবে ১০ দিনের মাথায় ওই খাবারের প্রতি আপনার চরম বিতৃষ্ণা চলে আসবে। গাণিতিক মডেল মানুষের এই একঘেয়েমিকে হিসাবে ধরেনি। বাস্তব জীবনে একজন মানুষ হয়তো একদিন তাঁর প্রিয় খাবারটি খাবেন, অন্য দিন মেনু ঘেঁটে নতুন কিছু খুঁজবেন।
কিন্তু গবেষক ক্রিশ্চিয়ান বলেন, এই মডেলের মূল উদ্দেশ্য মানুষের প্রতিটি আচরণ মাপা নয়। এর কাজ হলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি মৌলিক টানাপোড়েনকে প্রকাশ করা। আমরা কি আমাদের সবচেয়ে পছন্দের, নিরাপদ জিনিসটি নিয়েই থাকব; নাকি নতুন কিছুর স্বাদ নেওয়ার জন্য ঝুঁকি নেব?
আপনি যদি রোজ রাতে একই পিৎজা বা একই বিরিয়ানি খান, তবে ১০ দিনের মাথায় ওই খাবারের প্রতি আপনার চরম বিতৃষ্ণা চলে আসবে। গাণিতিক মডেল মানুষের এই একঘেয়েমিকে হিসাবে ধরেনি।
গণিত হয়তো আপনাকে বলে দেবে না, কোন খাবার খেতে কেমন হবে; কিন্তু গণিত ঠিকই হিসাব করে বলে দেয়, জীবনের কোন পর্যায়ে এসে আমাদের নতুন জিনিসের খোঁজ থামিয়ে পাওয়া জিনিসটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। তাই আবার যদি রেস্তোরাঁয় বসে মেনু কার্ড হাতে দ্বিধায় ভোগেন, তাহলে ফাইনম্যানের মতো পকেট থেকে একটা কলম বের করে একটু হিসাব কষে নিতে পারেন! আশপাশে খাতা-কলম না পেলে সাহায্য নিতে পারেন আপনার ৮৬ বিলিয়ন নিউরনের!
