বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত ছক্কা তৈরিতে গণিতবিদদের লেখেছে ১৫ বছর

গণিতবিদদের একটি দল আবিষ্কার করেছেন, পাঁচটি ৬০ তলের ছক্কা নির্দিষ্টভাবে সাজিয়ে নিলে যেকোনো সংখ্যক খেলোয়াড়ের জন্য একেবারে নিখুঁতভাবে খেলার ক্রম ঠিক করা যায়। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এতে কারও সঙ্গে কারও ফল সমান হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এই সমাধান পেতে বিজ্ঞানীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৫ বছর। কেন?

গণিতবিদ এরিক হার্শবার্গার এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাঁচটি ৬০ তলের ছক্কা তৈরি করেছেন, যা নিখুঁতভাবে খেলার ক্রম ঠিক করতে পারেছবি: অবার্ন ইউনিভার্সিটি

বোর্ড গেম খেলার সময় সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা কোনটি? কে আগে দান চালবে! এই একটি বিষয় ঠিক করতে গিয়ে বারবার ছক্কা ছুড়তে হয়, অনেক সময় দুজনের একই সংখ্যা চলে আসায় আবারও নতুন করে শুরু করতে হয়। কিন্তু এমন যদি হতো, টেবিলের মাঝখানে রাখা কয়েকটি ছক্কা থেকে যে কেউ চোখ বন্ধ করে একটি তুলে নিল, আর একবার ছুড়েই একেবারে নিখুঁত ও সমতাভিত্তিকভাবে সিরিয়াল ঠিক হয়ে গেল? কোনো 'টাই' হবে না, দ্বিতীয়বারও ছুড়তে হবে না।

শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও, গণিতের দুনিয়ায় এটি এক ভয়ংকর জটিল ধাঁধা। আর এই ধাঁধার জট খুলতেই বিজ্ঞানীদের সময় লেগেছে পাক্কা ১৫ বছর! তৈরি হয়েছে ৬০ তলের এমন এক জাদুকরী ছক্কা, যাকে বলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে নিখুঁত ছক্কা।

আরও পড়ুন
পাঁচজন খেলতে বসলে প্রত্যেকে একটি করে ছক্কা নেবে, আবার তিনজন খেললেও ব্যাগ থেকে ইচ্ছামতো তিনটি ছক্কা তুলে নিলে যেন সবার জেতার সুযোগ সমান থাকে।

১৫ বছরের গবেষণায় গণিতবিদদের অবিশ্বাস্য আবিষ্কার

২০১০ সালের কথা। একটি গেমিং কনভেনশনের নৈশভোজে বোর্ড গেম ডিজাইনার জেমস আর্নেস্ট তাঁর বন্ধু ও যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন ইউনিভার্সিটির গণিতবিদ এরিক হার্শবার্গারকে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি ছিল, ‘এমন কি কোনো ছক্কার সেট বানানো সম্ভব, যা দিয়ে খেলোয়াড়রা প্রত্যেকে একটি করে ছক্কা ছুড়বে এবং সবারই প্রথম দান পাওয়ার সমান সুযোগ থাকবে?’ শর্ত হলো, কোনো টাই হওয়া চলবে না এবং কেউ দুবার ছক্কা ছুড়তে পারবে না।

সেই রাতে হার্শবার্গারের কাছে এর কোনো উত্তর ছিল না। কিন্তু প্রশ্নটি তাঁর মাথায় গেঁথে যায়। সহজ ভাষায় ছক্কায় টাই এড়ানোর উপায় হলো সবগুলোতে আলাদা আলাদা সংখ্যা বসিয়ে দেওয়া। আসল বিপদ হলো, সংখ্যাগুলোকে প্রতিটি ছক্কায় এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে শুধু পুরো সেটের জন্যই নয়, বরং সেটের যেকোনো কয়েকটি ছক্কা নিয়ে খেললেও সবার জেতার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে একদম সমান থাকে। পাঁচজন খেলতে বসলে প্রত্যেকে একটি করে ছক্কা নেবে, আবার তিনজন খেললেও ব্যাগ থেকে ইচ্ছামতো তিনটি ছক্কা তুলে নিলে যেন সবার জেতার সুযোগ সমান থাকে।

আরও পড়ুন
এই ছক্কাগুলো শুধু কে আগে যাবে তা-ই নির্ধারণ করে না, বরং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো সিরিয়ালও একদম সমান সম্ভাবনায় ঠিক করে দেয়। গণিতের ভাষায় একে বলে পারমুটেশন ফেয়ারনেস।

হার্শবার্গার তাঁর ছোটবেলার বন্ধু ও গণিতবিদ রবার্ট ফোর্ডকে সঙ্গে নিয়ে কাজে নেমে পড়েন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁরা তিন খেলোয়াড়ের জন্য একটি সমাধান বের করেন। সাধারণ ছয় পিঠের তিনটি ছক্কায় ১ থেকে ১৮ পর্যন্ত সংখ্যা নিখুঁতভাবে সাজিয়ে এটি তৈরি হয়। এরপর ফোর্ড পুরোপুরি হাতে হিসাব করে চারজন খেলোয়াড়ের জন্য ১২ পিঠের চারটি ছক্কার নকশা তৈরি করেন। এগুলো এতই জনপ্রিয় হয় যে, হার্শবার্গার নিজেই লেজার কাটারে নকশা করে সেগুলো বিশ্বজুড়ে বিক্রি শুরু করেন।

গবেষণা করতে গিয়ে তাঁরা চমকপ্রদ এক তথ্য আবিষ্কার করেন। এই ছক্কাগুলো শুধু কে আগে যাবে তা-ই নির্ধারণ করে না, বরং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো সিরিয়ালও একদম সমান সম্ভাবনায় ঠিক করে দেয়। গণিতের ভাষায় একে বলে পারমুটেশন ফেয়ারনেস।

আরও পড়ুন
হার্শবার্গার তাঁর ছোটবেলার বন্ধু ও গণিতবিদ রবার্ট ফোর্ডকে সঙ্গে নিয়ে কাজে নেমে পড়েন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাঁরা তিন খেলোয়াড়ের জন্য একটি সমাধান বের করেন।

মহাবিশ্বের মোট পরমাণুর চেয়েও বেশি সমীকরণ

চারজনের জন্য সমাধান মিললেও পাঁচজনের বেলায় এসে গণিতবিদেরা রীতিমতো ধাক্কা খেলেন। তাত্ত্বিকভাবে পাঁচজনের জন্য এমন ছক্কা বানানো সম্ভব হলেও, সংখ্যা সাজানোর সমীকরণটি ছিল অকল্পনীয় বড়। হার্শবার্গারের মতে, এর সম্ভাব্য কম্বিনেশনের সংখ্যা ছিল ১০-এর ওপর ১২৮ ঘাত, মানে ১০১২৮। এটা আমাদের চেনা মহাবিশ্বের মোট পরমাণুর সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি!

যদি বিশ্বের সব সুপারকম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কোটি কোটি বছর ধরে কাজে লাগানো হতো, তবু ব্রুট-ফোর্স পদ্ধতিতে এর সমাধান বের করা সম্ভব ছিল না। বছরের পর বছর কেটে গেলেও এমন কোনো সমাধান মিলছিল না, যা বাস্তবে হাতে নিয়ে খেলা যায়। কারণ ১৮০ পিঠের ছক্কা বানালে সেটি আর হাতে ধরে রাখার মতো অবস্থায় থাকবে না।

অবশেষে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে অপ্রত্যাশিত এক ইমেইল আসে কানাডিয়ান সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার পল মেয়ারের কাছ থেকে। তিনি চারজন খেলোয়াড়ের ডেটার কিছু লুকানো প্যাটার্ন নিয়ে কাজ করছিলেন এবং একটি বিশেষ প্রোগ্রাম লিখেছিলেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, তাঁর ওই প্রোগ্রামটি পাঁচজন খেলোয়াড়ের জন্য ৬০ পিঠের পাঁচটি ছক্কার নিখুঁত কনফিগারেশন বের করে ফেলে। এই পাঁচটি ছক্কার গায়ে ১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত সংখ্যাগুলো এমনভাবে বসানো ছিল, যা আগের সব কঠিন শর্ত এক নিমেষে পূরণ করে। দীর্ঘ ১৫ বছর খোঁজার পর অবশেষে মেলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য!

আরও পড়ুন
বছরের পর বছর কেটে গেলেও এমন কোনো সমাধান মিলছিল না, যা বাস্তবে হাতে নিয়ে খেলা যায়। কারণ ১৮০ পিঠের ছক্কা বানালে সেটি আর হাতে ধরে রাখার মতো অবস্থায় থাকবে না।

ছক্কার যে জাদুতে মুগ্ধ বিজ্ঞানীরা

চার খেলোয়াড়ের ছক্কার সেটগুলো অনেক আগে থেকেই যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রিটেইল শপে বিক্রি হচ্ছিল। এবার পাঁচ খেলোয়াড়ের ৬০ পিঠের ছক্কাটিও বাণিজ্যিকভাবে তৈরির উপযুক্ত হয়ে ওঠে। তবে এই দারুণ অর্জনের গল্পটি এখানেই থেমে থাকেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন ইউনিভার্সিটি সে সময় তাদের গণিত বিভাগের জন্য নতুন ভবন তৈরি করছিল। হার্শবার্গার প্রস্তাব দেন, এই যুগান্তকারী পাঁচটি ছক্কার বিশালাকার ভাস্কর্য তৈরি করে সেখানে রাখার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সানন্দে রাজি হয়ে যায়। হার্শবার্গার নিজের উড-শপে বসে মাসের পর মাস খেটে পাইন, পপলার, ওক, আখরোট এবং মেহগনি কাঠের সমন্বয়ে পাঁচটি বিশাল আকারের ছক্কা তৈরি করেন। এই শরতেই উদ্বোধন হওয়া নতুন গণিত ভবনে এখন সেগুলো স্থায়ীভাবে শোভা পাচ্ছে।

হার্শবার্গারের কাছে এর মূল উদ্দেশ্য হলো গণিতকে মানুষের কাছে দৃশ্যমান ও আকর্ষণীয় করে তোলা। জ্যামিতির এই জাদুকরী রূপ দেখে মানুষ যাতে বুঝতে পারে, গণিতের সবচেয়ে মজার সমস্যাগুলো দেখতে খুব সহজ হলেও, এর সমাধান করতে যুগের পর যুগ কেটে যেতে পারে!

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন