গণিতের নিয়ম ভেঙে আবিষ্কৃত হলো ইনফিনিটির দুটি নতুন রূপ
অসীম বা ইনফিনিটির কি শেষ আছে? নাকি অসীমের ভেতরেও লুকিয়ে আছে আরও বড় অসীম? প্রশ্নটা শুনে ছোটদের ধাঁধা মনে হতে পারে। কিন্তু গণিতবিদদের কাছে এটি নিছক ধাঁধা নয়, অত্যন্ত সিরিয়াস গবেষণার বিষয়।
একটা বিষয় অন্তত নিশ্চিত, ইনফিনিটি শুধু এক প্রকার হয় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গণিতবিদেরা অসীমকে একটি মই বা সিড়ির সঙ্গে তুলনা করে সাজিয়েছেন। ১, ২, ৩...এর মতো স্বাভাবিক সংখ্যার অসীম সেটটি থাকে এই মইয়ের একটি ধাপে। তার চেয়ে ওপরের ধাপে থাকে বাস্তব সংখ্যার অসীম সেট। এর মধ্যে দশমিক ও ঋণাত্মক সংখ্যাও আছে। এটি আগেরটির চেয়ে অনেক বিশাল। এখান থেকেই অসীম ওপরের দিকে উঠতে থাকে এবং তৈরি করে এক অন্তহীন পদক্রম।
সম্প্রতি ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনার গবেষকেরা এই বিশালত্বের মাঝে নতুন দুটি স্তর খুঁজে পেয়েছেন। আর সমস্যা হলো, এই নতুন দুই ইনফিনিটি গণিতের চেনা নিয়মগুলো একদমই মানছে না।
নতুন এই দুই ধরনের অসীমকে বলা হচ্ছে এক্সাক্টিং এবং আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল। এদের পূর্বসূরিদের মতো এরা অসীমের সাজানো গোছানো মইয়ের ধাপে সহজে বসতে চায় না। এদের আবিষ্কার গণিতবিদদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তাঁরা এখন ভাবছেন, অসীম আসলে কী? অসীমের একেবারে গভীরে কি ঘাপটি মেরে আছে কোনো বিশৃঙ্খলা?
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গণিতবিদেরা অসীমকে একটি মই বা সিড়ির সঙ্গে তুলনা করে সাজিয়েছেন। ১, ২, ৩...এর মতো স্বাভাবিক সংখ্যার অসীম সেটটি থাকে এই মইয়ের একটি ধাপে।
কতগুলো অসীম আছে জগতে
গণিতবিদেরা বহুদিন ধরেই অসীমকে ছোট থেকে বড় পদক্রমে সাজিয়ে আসছেন। উদাহরণস্বরূপ, স্বাভাবিক সংখ্যার অসীম সেটটি বাস্তব সংখ্যার অসীম সেটের চেয়ে ছোট। কারণ বাস্তব সংখ্যার মধ্যে ০ থেকে ১-এর মাঝেই অসীম পরিমাণ দশমিক সংখ্যা লুকিয়ে থাকে।
এই স্তরগুলো বোঝানোর জন্য গণিতবিদেরা লার্জ কার্ডিনাল অ্যাক্সিওম ব্যবহার করেন। এগুলো দিয়ে অসীম সংখ্যার বিশেষ বিশেষ ধরণ ও ক্ষমতা সংজ্ঞায়িত করা হয়। মইয়ের একদম নিচে আছে স্বাভাবিক সংখ্যার অসীম, যাকে বলা হয় আলেফ-নাল (ℵ₀)। ওপরের দিকে উঠলে দেখা মেলে আরও বড় ও জটিল অসীমের। যেমন মেজারেবল কার্ডিনাল, সুপারকমপ্যাক্ট কার্ডিনাল এবং তথাকথিত হিউজ কার্ডিনাল।
এই অ্যাক্সিওম বা স্বতঃসিদ্ধগুলো সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ও সরল রেখা মেনে চলে। মইয়ের প্রতিটি ধাপ তার আগের ধাপের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকে এবং একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি করে। কিন্তু এই অসীমগুলো যখন বড় হতে থাকে, তখন তারা গণিতের মৌলিক নিয়মগুলোকেই চরম সীমানায় নিয়ে যায়। যেমন, লার্জ কার্ডিনালগুলো জেডএফসির বাইরে অবস্থান করে। জেডএফসি হলো আধুনিক গণিতের ভিত্তি।
মইয়ের একদম নিচে আছে স্বাভাবিক সংখ্যার অসীম, যাকে বলা হয় আলেফ-নাল। ওপরের দিকে উঠলে দেখা মেলে আরও বড় ও জটিল অসীমের। যেমন মেজারেবল কার্ডিনাল, সুপারকমপ্যাক্ট কার্ডিনাল।
আইসিআরইএ এবং ইউনিভার্সিটি অব বার্সেলোনার গণিতবিদ জোন বাগারিয়া এদের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘এরা এমন সংখ্যা যা এতটাই বিশাল যে, গণিতের সাধারণ সূত্র দিয়ে এদের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না।’ এদের অস্তিত্ব মেনে নিতে হয় নতুন কিছু স্বতঃসিদ্ধের মাধ্যমে। তবুও এদের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ এদের মাধ্যমেই গণিতবিদেরা গণিতের এমন সব এলাকায় বিচরণ করতে পারেন, যা নাহলে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যেত।
এক্সাক্টিং এবং আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল হলো এই পরিবারের একদম নতুন সদস্য। বাগারিয়ার মতে, এই কার্ডিনালরা লার্জ কার্ডিনাল হায়ারার্কির একদম ওপরের দিকে বাস করে এবং এরা অ্যাক্সিওম অব চয়েস-এর সঙ্গে মানানসই।
এক্সাক্টিং কার্ডিনালরা আগের জানা লার্জ কার্ডিনালদের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বা বড়। মানে এরা গাণিতিক মহাবিশ্বের সঙ্গে এমনভাবে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে, যা আগে ভাবা যায়নি। আর আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনাল হলো এদেরই আরও শক্তিশালী সংস্করণ। এদের ভাবতে পারেন এক্সাক্টিং কার্ডিনালের সুপারপাওয়ারযুক্ত সংস্করণ হিসেবে।
গণিতবিদ জোন বাগারিয়ার মতে, কার্ডিনালরা লার্জ কার্ডিনাল হায়ারার্কির একদম ওপরের দিকে বাস করে এবং এরা অ্যাক্সিওম অব চয়েস-এর সঙ্গে মানানসই।
শৃঙ্খলা, বিশৃঙ্খলা এবং এইচওডি অনুমান
দশকের পর দশক ধরে গণিতবিদেরা তর্ক করে আসছেন, অসীমকে কি আদৌ বশে আনা সম্ভব? এই তর্কের মাঝখানে আশার আলো হিসেবে ছিল এইচওডি কনজেকচার। এই অনুমানটি ধারণা দেয়, যতই অবাধ্য অসীম আসুক না কেন, তারা একটি বৃহত্তর শৃঙ্খলার মধ্যেই থাকবে।
এইচওডি প্রস্তাব করে, অসীমভাবে বড় সেটগুলোকেও গণনা করে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব। এটি যদি সত্য হয়, তবে গাণিতিক মহাবিশ্বে একটি শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সবচেয়ে বড় অসীমের সঙ্গেও খাপ খেয়ে যাবে।
কিন্তু নতুন আবিষ্কৃত এই কার্ডিনালরা সব গুলিয়ে দিচ্ছে। এক্সাক্টিং এবং আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনালরা প্রচলিত প্যাটার্ন ভেঙে দিচ্ছে। গবেষণাপত্রটির সহ-লেখক এবং ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গণিতবিদ জুয়ান আগুইলেরা ব্যাখ্যা করেন, ‘সাধারণত অসীমের বড় ধারণাগুলো একটা অর্ডারে থাকে। কিন্তু আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনালরা আলাদা। এরা অসীমের আগের ধারণাগুলোর সঙ্গে খুব অদ্ভুত আচরণ করছে।’
এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যদি এই নতুন কার্ডিনালদের মেনে নেওয়া হয়, তবে তা এইচওডি কনজেকচারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে দাঁড়াবে। গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ আপডেট এই সন্দেহকে প্রায় বাস্তবে রূপ দিয়েছে। গবেষক দলটি দেখিয়েছে, এই কার্ডিনালদের অস্তিত্ব এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যাকে গণিতবিদেরা বলেন ‘V is far from HOD’। সহজ কথায়, গাণিতিক মহাবিশ্ব কোনো সাজানো-গোছানো লাইব্রেরি নয় যেখানে সব বই ক্যাটালগ করা আছে; বরং এটি এক বিশাল বন, যা আমাদের বোঝার ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
গণিতবিদ জুয়ান আগুইলেরা ব্যাখ্যা করেন, ‘সাধারণত অসীমের বড় ধারণাগুলো একটা অর্ডারে থাকে। কিন্তু আল্ট্রা-এক্সাক্টিং কার্ডিনালরা আলাদা।'
এই আবিষ্কারগুলো এমন সব জায়গায় প্রভাব ফেলে যা আপনি কল্পনাও করবেন না। ক্রিপ্টোগ্রাফি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং কসমোলজির ব্রেকথ্রুগুলোর মূলে রয়েছে এই অসীম। গণিতবিদেরা যখন অসীম সম্পর্কে নতুন কিছু জানেন, তখন তা সাইবার সিকিউরিটি বা ব্ল্যাকহোল গবেষণার পথ প্রশস্ত করে।
তবে এর আসল গুরুত্ব ইন্টিগ্রিটিতে। এক্সাক্টিং কার্ডিনাল হয়তো রাতারাতি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড বদলে দেবে না, কিন্তু আধুনিক কম্পিউটার সায়েন্স যে যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এই আবিষ্কার সেই যুক্তির সীমানা ঝুঁকির মুখে ফেলবে। গবেষণার এই ফলাফলগুলো প্রি-প্রিন্ট সার্ভার আরজিভে (arXiv) প্রকাশিত হয়েছে।