বোতল, বাক্স ও মজার গণিত
আপনার কাছে একই মাপের ৪৯টি দুধের বোতল আছে। এগুলোকে একটা বর্গাকার বাক্সে রাখতে হবে। সবচেয়ে সহজ বুদ্ধি হলো, ৭টা করে বোতল ৭টা সারিতে সাজিয়ে দেওয়া। এতে বাক্সের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ হবে ঠিক ৭ এককের। মনে হতে পারে, এর চেয়ে সহজ হিসাব আর হয় না! কিন্তু যদি বলি, বোতলগুলোকে একটু অন্যভাবে সাজালে এর চেয়েও ছোট একটা বর্গাকার বাক্সে এদেরকে দিব্যি এঁটে দেওয়া সম্ভব? কী, বাজি ধরবেন নাকি?
সার্ডিনস নামে দারুণ একটা মজার পার্টি গেম আছে। খেলাটার নিয়ম হলো, একটা ছোট আলমারি বা ওই ধরনের কোনো বদ্ধ জায়গায় কত বেশি মানুষ গাদাগাদি করে ঢোকানো যায়, সেটা দেখা। সার্ডিন মাছকে যেমন কৌটার ভেতর ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়, এই খেলাটাও ঠিক তেমনই। মজার ব্যাপার হলো, গণিতবিদরাও এই সার্ডিনস খেলাটা খেলতে দারুণ ভালোবাসেন! তবে মানুষ বা মাছ দিয়ে নয়; কারণ এদের আকার-আকৃতি বড্ড বেঢপ। গণিতের ছকে এদের ফেলা মুশকিল। তাই গণিতবিদদের পছন্দের জিনিস হলো নিখুঁত বৃত্ত।
তাঁদের প্রশ্নটা হলো, ৪৯টি একই মাপের দুধের বোতল সবচেয়ে ছোট কত বড় মাপের বর্গাকার বাক্সে রাখা সম্ভব? প্রশ্নটাকে একটু ঘুরিয়েও বলা যায়। ধরুন, আপনাকে একটা নির্দিষ্ট মাপের বর্গাকার বাক্স দেওয়া হলো। এখন সেই বাক্সের ভেতর ৪৯টি সমান মাপের বৃত্ত এমনভাবে আঁটাতে হবে যেন একটির ওপর আরেকটি উঠে না যায়। তাহলে একেকটি বৃত্তের ব্যাস সর্বোচ্চ কত বড় হতে পারে?
অনেকের মনে হতে পারে দুটো প্রশ্ন আলাদা। কিন্তু আসলে দুটো একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রথম ক্ষেত্রে আমরা বৃত্তের আকার ঠিক রেখে বাক্সের আকার বদলাচ্ছি। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বাক্সের আকার ঠিক রেখে বদলাচ্ছি বৃত্তের আকার। তাই স্কেলের হিসাবটা বাদ দিলে, যেকোনো একটা সমস্যার সমাধান করলেই অন্যটার উত্তর এমনিতেই বেরিয়ে আসে। তবে হ্যাঁ, এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে বোতলগুলোকে আমরা উল্টো করে বা শুইয়ে রাখব না। আরও ধরে নিচ্ছি, বোতলগুলোর তলার দিকটা একদম নিখুঁত বৃত্ত এবং বাক্সটা একটা নিখুঁত বর্গক্ষেত্র।
৪৯টি দুধের বোতল রাখার জন্য সবচেয়ে ছোট বর্গাকার বাক্স কোনটা? যে কেউ চট করে বলে দেবে, ৭ একক দৈর্ঘ্যের একটা বাক্স হলেই তো হলো! ৭টি করে বোতল ৭ লাইনে সাজিয়ে দিলেই কেল্লাফতে!
এ পর্যন্ত পড়ে ভাবতে পারেন, গণিতের ইতিহাস যত পুরোনো, এসব প্রশ্নের উত্তরও বুঝি ততটাই পুরোনো। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আজ যা যা জানি, তার আধুনিক গবেষণার বড় অংশই শুরু হয়েছে ১৯৬০ সাল বা তার পর থেকে। কারণ গণিতের এই শাখাটি ভীষণ সূক্ষ্ম ও প্যাঁচালো। এর গাণিতিক নাম কম্বিনেটোরিয়াল জিওমেট্রি। গণিতের এই শাখার উত্তরগুলো চট করে মাথায় আসে না। প্রমাণ বের করা তো আরও কঠিন!
ওপরে যে উদাহরণটা দিলাম, ৪৯টি দুধের বোতল রাখার জন্য সবচেয়ে ছোট বর্গাকার বাক্স কোনটা? যে কেউ চট করে বলে দেবে, ৭ একক দৈর্ঘ্যের একটা বাক্স হলেই তো হলো! ৭টি করে বোতল ৭ লাইনে সাজিয়ে দিলেই কেল্লাফতে!
শুনে একদম ঠিক মনে হচ্ছে, তাই না? কিন্তু গণিতে অনেক নিশ্চিত বিষয়ই শেষ পর্যন্ত ভুল প্রমাণিত হয়। এটিও তার ব্যতিক্রম নয়! ১৯৯৭ সালে কে. জে. নুরমেলা এবং পি. আর. জে. অস্টারগার্ড নামে দুজন গবেষক দেখালেন, ৪৯টি বৃত্তকে একটু অন্যভাবে সাজালে ওই ৭ একক দৈর্ঘ্যের বাক্সের চেয়েও সামান্য ছোট একটা বাক্সে দিব্যি এঁটে যায়! এই ছোট হওয়ার পরিমাণটা এতই সূক্ষ্ম যে, খালি চোখে দেখে বোঝার উপায়ই নেই।
১৯৯৭ সালে গবেষক কে. জে. নুরমেলা এবং পি. আর. জে. অস্টারগার্ড দেখালেন, ৪৯টি বৃত্তকে একটু অন্যভাবে সাজালে ওই ৭ একক দৈর্ঘ্যের বাক্সের চেয়েও সামান্য ছোট একটা বাক্সে দিব্যি এঁটে যায়!
এই নতুন আবিষ্কার জি. ওয়েঙ্গারডট নামে আরেকজন গণিতবিদের একটি ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছিল। ওয়েঙ্গারডট আগেই দেখিয়েছিলেন ১, ৪, ৯, ১৬, ২৫ এবং ৩৬টি বৃত্তের ক্ষেত্রে সাধারণ বর্গাকারে সাজানোই সবচেয়ে ভালো। মানে সারি ও কলামে সমানভাবে সাজানোই সবচেয়ে উত্তম। কিন্তু ৬৪, ৮১ বা এর চেয়ে বড় বর্গসংখ্যার ক্ষেত্রে এই নিয়ম সবসময় খাটে না। ৪৯টি বৃত্তের ক্ষেত্রে কী হবে, সেটা ওয়েঙ্গারডট তখন বের করতে পারেননি। তবে তিনি অনুমান করেছিলেন, ৪৯-এর ক্ষেত্রেও বর্গাকারে সাজানোই সেরা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়!
এখন আপনার মনে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে। বাক্স যত বড়ই হোক না কেন, বর্গাকারে সাজানো কেন সবসময় সবচেয়ে ভালো উপায় হবে না? একটু তলিয়ে ভাবলেই এর উত্তর পাওয়া যায়। অসীম কোনো সমতলে যদি আপনি বৃত্ত সাজাতে চান, তবে বর্গাকার কাঠামোর চেয়ে ষড়ভুজাকার কাঠামোতে অনেক বেশি ঘন করে বৃত্ত সাজানো যায়। উদাহরণ হিসেবে পুল খেলার শুরুতে টেবিলের ওপর বলগুলো যেভাবে সাজানো থাকে, সেটার কথা ভাবতে পারেন।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের বাক্সটা অসীম নয়। এর একটা নির্দিষ্ট সীমানা আছে এবং সীমানাগুলো চারকোনা, মানে বর্গাকার। এই চারকোনা সীমানার কারণে বৃত্তগুলো পুরোপুরি নিখুঁত ষড়ভুজাকার কাঠামো তৈরি করতে পারে না। ঠিক এই কারণেই অল্প সংখ্যক বৃত্তের ক্ষেত্রে বর্গাকারে সাজানোই সবচেয়ে ভালো।
ওয়েঙ্গারডট আগেই দেখিয়েছিলেন ১, ৪, ৯, ১৬, ২৫ এবং ৩৬টি বৃত্তের ক্ষেত্রে সাধারণ বর্গাকারে সাজানোই সবচেয়ে ভালো। মানে সারি ও কলামে সমানভাবে সাজানোই সবচেয়ে উত্তম।
কিন্তু বৃত্তের সংখ্যা যখন অনেক বাড়তে থাকে, তখন বাক্সের সীমানার প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। তখন ষড়ভুজাকার কাঠামোর কাছাকাছি কোনো প্যাটার্নে সাজালে বর্গাকার প্যাটার্নের চেয়ে বেশি বৃত্ত আঁটানো যায়। ঠিক এভাবেই ওয়েঙ্গারডট প্রমাণ করেছিলেন, বৃত্তের সংখ্যা ৬৪ বা তার চেয়ে বেশি হলে বর্গাকারে সাজানোর চেয়ে আরও ভালো বিন্যাস খুঁজে পাওয়া যায়। ৪৯টি বৃত্তের ক্ষেত্রটি ছিল একদম মাঝামাঝি পয়েন্ট। তাই এর সঠিক উত্তরটা বের করতে গণিতবিদদের বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল।
এই বিষয়গুলো সম্পর্কে লিখেছিলেন নেদারল্যান্ডসের গণিতবিদ হ্যান্স মেলিসেন। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট থিসিস হিসেবে এটি জমা দিয়েছিলেন তিনি। সেই থিসিসের নাম ছিল ‘প্যাকিং অ্যান্ড কভারিং উইথ সার্কেলস’। সম্ভবত এই ধরনের প্রশ্নের ওপর এটিই সবচেয়ে সেরা এবং পূর্ণাঙ্গ কাজ। এতে অনেক নতুন প্যাটার্ন, প্রমাণ এবং চমৎকার সব রেফারেন্স দেওয়া ছিল।
শুধু তো বৃত্ত নয়; আয়তক্ষেত্র, ত্রিভুজ বা অন্য নানা আকারের ক্ষেত্রেও এমন প্রশ্ন তোলা যায়। শিল্পকারখানার প্যাকেজিং থেকে শুরু করে ইলেকট্রনের পদার্থবিদ্যা; বাস্তব জীবনে এর অনেক ব্যবহার রয়েছে। তবে এই বিষয়টার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর ভেতরের নিখুঁত গণিতে।
১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট থিসিস হিসেবে এটি জমা দিয়েছিলেন গণিতবিদ হ্যান্স মেলিসেন। সেই থিসিসের নাম ছিল প্যাকিং অ্যান্ড কভারিং উইথ সার্কেলস।
একটি বর্গক্ষেত্রের ভেতর সমান মাপের বৃত্তগুলোকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে বৃত্তগুলো সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় হতে পারে। ১৯৬০ সালের আগে এই সমস্যাটি নিয়ে কোথাও তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। ওই বছর লিও মোজার ৮টি বৃত্তের জন্য একটি সমাধানের ধারণা দেন। খুব দ্রুতই তাঁর ধারণাটি সঠিক বলে প্রমাণিত হয়। এরপর বিভিন্ন সংখ্যক বৃত্ত নিয়ে একের পর এক গবেষণাপত্র প্রকাশ হতে থাকে। ১৯৬৫ সালে জে. শায়ার ৯টি পর্যন্ত বৃত্তের সমাধান প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ৫টি পর্যন্ত বৃত্তের সমাধান বের করা একদম সহজ। ৬টি বৃত্তের সমাধানের কৃতিত্ব তিনি দেন বেল ল্যাবসের রন গ্রাহামকে।
গণিতবিদেরা সাধারণত এই সমস্যাটিকে একটু ঘুরিয়ে চিন্তা করতে পছন্দ করেন, যাতে বারবার বৃত্ত নিয়ে মাথা ঘামাতে না হয়। কীভাবে?
ধরুন, দুটি সমান বৃত্ত একে অপরকে স্পর্শ করে আছে। মানে বৃত্ত দুটির কেন্দ্রের মাঝের দূরত্ব বৃত্তের ব্যাসের একদম সমান। আবার, কোনো বৃত্ত যদি বাক্সের সোজা দেয়াল স্পর্শ করে, তার মানে বৃত্তটির কেন্দ্র দেয়াল থেকে ঠিক ব্যাসার্ধের সমান দূরত্বে আছে।
তাই বৃত্তের এই সমস্যাটিকে আমরা এভাবে বলতে পারি—‘একটি নির্দিষ্ট বর্গক্ষেত্রের ভেতর ৪৯টি বিন্দু এমনভাবে স্থাপন করুন, যাতে যেকোনো দুটি বিন্দুর মাঝখানের ন্যূনতম দূরত্ব সবচেয়ে বেশি হয়।’ এখানে বিন্দুগুলো হলো সেই আগের বৃত্তগুলোর কেন্দ্র। আর যে বর্গক্ষেত্রটার কথা বলা হচ্ছে, সেটা আসল বাক্সটা নয়, বরং তার চেয়ে একটু ছোট একটি বাক্স, যার দেয়ালগুলোকে বৃত্তের ব্যাসার্ধের সমপরিমাণ ভেতরের দিকে চাপিয়ে আনা হয়েছে।
১৯৬৫ সালে জে. শায়ার ৯টি পর্যন্ত বৃত্তের সমাধান প্রকাশ করেন। তিনি জানান, ৫টি পর্যন্ত বৃত্তের সমাধান বের করা একদম সহজ। ৬টি বৃত্তের সমাধানের কৃতিত্ব তিনি দেন বেল ল্যাবসের রন গ্রাহামকে।
সমস্যাটিকে এভাবে বিন্দু দিয়ে চিন্তা করার একটা বড় সুবিধা হলো, এতে ধারণাগত সারল্য আসে। এই পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে ২০টি পর্যন্ত বিন্দুর জন্য সবচেয়ে সেরা প্যাটার্নগুলো নিচে দেখানো হলো। এখানের সবগুলো প্যাটার্নই গাণিতিকভাবে নিখুঁত প্রমাণিত। মজার ব্যাপার হলো, ১৭টি বিন্দুর জন্য দুটি আলাদা প্যাটার্ন আছে! আবার ১৩, ১৭ এবং ১৯টি বিন্দুর প্যাটার্নেও কিছু স্বাধীন বিন্দু আছে, যাদের জায়গা একেবারে নির্দিষ্ট নয়; নির্দিষ্ট একটা ছোট গণ্ডির ভেতর সেগুলো নড়াচড়া করতে পারে।
এবার আরেকটু প্যাঁচালো একটা সমস্যার কথা বলি। বর্গক্ষেত্র তো হলো, কিন্তু বৃত্তাকার কোনো জায়গার ভেতরে বৃত্ত বা বিন্দু সাজানোর উপায় কী? ১৯৬৩ সালে বি. এল. জে. ব্রাক্সমার পিএইচডি থিসিসে এ বিষয়ে প্রথম লেখেন। সেটি ছিল মূলত গাণিতিক বিশ্লেষণের একটি টেকনিক্যাল বিষয়। তবে সেই কাঠখোট্টা হিসাবের ভিড়ে তিনি ৮টি বিন্দুর জন্য একটি সেরা প্যাটার্নের ধারণা দিয়েছিলেন। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, বর্গক্ষেত্র এবং বৃত্তের ক্ষেত্রে প্রথমে ওই ৮টি বিন্দুর সমস্যাটিই সবার মনোযোগ কেড়েছিল!
পরে ব্রাক্সমা তাঁর সেই প্যাটার্নটি প্রমাণও করেছিলেন, কিন্তু কোনো কারণে সেটি আর প্রকাশ করেননি। বৃত্তের ভেতর বিন্দু সাজানোর এই সমস্যায় এখন পর্যন্ত ১১টি বা তারচেয়ে কম বিন্দুর নিখুঁত সমাধান জানা গেছে। ১২ থেকে ২০টি বিন্দুর জন্য সেরা প্যাটার্ন কী হতে পারে, তার কিছু সম্ভাব্য ধারণা দেওয়া হলেও সেগুলো পুরোপুরি প্রমাণ করা যায়নি। এখানেও অনেক ক্ষেত্রে একাধিক সমাধান আছে। যেমন, ৬টি বিন্দুর জন্য দুটি উপায় আছে। এক, ৫টি বিন্দু বৃত্তের সীমানায় থাকবে এবং ১টি বিন্দু থাকবে একদম কেন্দ্রে। দুই, সবগুলো বিন্দু মিলে একটি নিখুঁত ষড়ভুজ তৈরি করবে।
মজার ব্যাপার হলো, ১৭টি বিন্দুর জন্য দুটি আলাদা প্যাটার্ন আছে! আবার ১৩, ১৭ এবং ১৯টি বিন্দুর প্যাটার্নেও কিছু স্বাধীন বিন্দু আছে, যাদের জায়গা একেবারে নির্দিষ্ট নয়।
১৯টি বিন্দুর জন্য যে প্যাটার্নটির কথা ভাবা হয়েছে, তা দেখতে অসম্ভব সুন্দর এবং নিখুঁত প্রতিসম। নিচের ছবিটি দেখুন।
১১টি বিন্দুর প্রমাণ প্রথম দিয়েছিলেন সেই হ্যান্স মেলিসেন। তাঁর প্রমাণ করার পদ্ধতিটা ছিল বেশ দারুণ। তিনি প্রথমে মূল বৃত্তটাকে অদ্ভুত সব আকারের বেশ কয়েকটি ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করে নিয়েছিলেন। এরপর দূরত্বের হিসাব কষে প্রমাণ করেছিলেন, এর মধ্যে কিছু কিছু অঞ্চলে সর্বোচ্চ একটিমাত্র বিন্দু থাকতে পারে।
এভাবে একটু একটু করে তিনি পুরো বৃত্তটার ওপর গাণিতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন, ১১টি বিন্দুর ক্ষেত্রে অন্তত ৮টি বিন্দুকে অবশ্যই বৃত্তের সীমানার ওপর থাকতে হবে। পদ্ধতিটি বেশ সূক্ষ্ম হলেও এটি অনেক ক্ষেত্রেই দারুণ কাজ করে, বিশেষ করে শক্তিশালী কম্পিউটারের সাহায্য নিলে।
সমবাহু ত্রিভুজের ভেতর বৃত্ত সাজানোর বিষয়টা আরেকটু বেশি মজার। কারণ এর সীমানার সঙ্গে সেই ষড়ভুজাকার কাঠামোর দারুণ মিল আছে। যারা পুল খেলেন বা পুলের গেম খেলেন, তারা ব্যাপারটা ভালো বুঝবেন। খেলার শুরুতে বলগুলো যে কাঠের ফ্রেমে সাজানো হয়, সেটা কিন্তু একটা সমবাহু ত্রিভুজ। এর ভেতরে বলগুলো একদম নিখুঁত ষড়ভুজাকার প্যাটার্নে বসে যায়।
শুরুর দিকে গণিতবিদেরা শুধু সেই সংখ্যাগুলো নিয়েই কাজ করেছিলেন, যেগুলোকে ত্রিভুজ সংখ্যা বলা হয়। যেমন ১, ৩, ৬, ১০, ১৫ ইত্যাদি। এই সংখ্যাগুলোর একটা বিশেষ রূপ আছে—১ + ২ + ৩ + ... + n। এসব ক্ষেত্রে বৃত্তগুলোকে খুব সহজেই নিখুঁত প্যাটার্নে সাজানো যায়। ১৮৯২ সালে অ্যাক্সেল থু দেখান, অসীম সমতলে বৃত্ত সাজানোর জন্য ষড়ভুজাকার প্যাটার্নই সবচেয়ে সেরা।
১১টি বিন্দুর প্রমাণ প্রথম দিয়েছিলেন হ্যান্স মেলিসেন। তাঁর প্রমাণ করার পদ্ধতিটা ছিল বেশ দারুণ। তিনি প্রথমে মূল বৃত্তটাকে অদ্ভুত সব আকারের বেশ কয়েকটি ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করে নিয়েছিলেন।
তাই এটা ধরে নেওয়া খুব স্বাভাবিক ছিল যে, ত্রিভুজ সংখ্যার বিন্দুগুলোকে সমবাহু ত্রিভুজের ভেতর সাজালে সেটা ওই পুল বলের মতোই নিখুঁত হবে। অনুমানটি আসলেই সত্যি, কিন্তু এর গাণিতিক প্রমাণ বেশ গোলমেলে। মেলিসেন তাঁর থিসিসে এর গোছানো একটা প্রমাণ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ১২টি বা তার কম বিন্দুর জন্য সেরা প্যাটার্ন বের করে প্রমাণও করেছেন। পাশাপাশি ১৬, ১৭, ১৮, ১৯ এবং ২০টি বিন্দুর জন্য কিছু সম্ভাব্য ধারণাও দিয়েছেন।
পুরো বিষয়টার মধ্যে এমন একটা অকৃত্রিম সৌন্দর্য আছে, যা যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। তবে এই ধরনের সমস্যাগুলো দেখতে যতটা সহজ মনে হয়, আদতে এগুলো মোটেও ততটা সহজ নয়। একজন কাঠখোট্টা গণিতবিদের জন্য হয়তো এই ক্ষেত্রটি খুব একটা সুবিধার নয়। কিন্তু যাঁরা নিছক আনন্দের জন্য গণিত করেন, তাঁদের জন্য এখানে রয়েছে অসংখ্য দারুণ চ্যালেঞ্জ! যেমন: সম্ভাব্য ধারণাগুলো প্রমাণ করা, সেগুলোর ভুল বের করে নতুন কিছু আবিষ্কার করা, কিংবা আরও বেশি বিন্দুর জন্য সমাধান বের করা।
জায়গার আকৃতি বদলেও কিন্তু খেলাটা চালিয়ে নেওয়া যায়। যেমন, আয়তক্ষেত্র বা সমদ্বিবাহু সমকোণী ত্রিভুজের জন্য কিছু প্রমাণিত ফলাফল আছে। আবার ষড়ভুজ নিয়ে কাজ করতেও বেশ মজা লাগার কথা।
পুরো বিষয়টার মধ্যে এমন একটা অকৃত্রিম সৌন্দর্য আছে, যা যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। তবে এই ধরনের সমস্যাগুলো দেখতে যতটা সহজ মনে হয়, আদতে এগুলো মোটেও ততটা সহজ নয়।
এমনকি বাঁকা তলের ওপরও প্যাকিং সমস্যা নিয়ে ভাবা যায়। ১৯৩০ সালে ডাচ উদ্ভিদবিজ্ঞানী পি. এম. এল. টামস একটি গোলকের পৃষ্ঠে বৃত্ত সাজানোর সেরা উপায় কী, তা জানতে চেয়েছিলেন। টামসের সমস্যার একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে কাজ করেছেন মেলিসেন। তিনি পুরো গোলকের বদলে একটি অর্ধগোলক ব্যবহার করেছেন। এখানে ৬টি বা তার কম বিন্দুর জন্য নিখুঁত ফলাফল প্রমাণ করা গেছে, তবে ৭ থেকে ১৫টি বিন্দুর জন্য কেবল অনুমানই করা সম্ভব হয়েছে। আর যাদের আরও বড় কিছু করার শখ, তারা চাইলে ত্রিমাত্রিক জগতে গোলকের ভেতর গোলক সাজানোর সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাতে পারেন!
একদম শুরুতে বলেছিলাম, পদার্থবিদ্যাতেও এর দারুণ ব্যবহার আছে। ১৯৮৫ সালে এ. এ. বেরেজিন নেচার পত্রিকায় একটি ছোট গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। বিষয় ছিল, একটি গোল চাকতির ভেতর একই পরিমাণ বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত কণাগুলোর এমন অবস্থান, যেখানে তাদের মোট শক্তি সবচেয়ে কম থাকে। গাণিতিকভাবে এর সঙ্গে আমাদের বৃত্ত সাজানোর দারুণ মিল আছে। কারণ, একই ধরনের চার্জ একে অপরকে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ, তারা একে অপরের থেকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে।
তবে এই মিলটাকে আক্ষরিক অর্থে নিলে চলবে না। কারণ এখানে কণাগুলোর মাঝের দূরত্বের চেয়ে তাদের শক্তির ভারসাম্যটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কণাগুলো এমনভাবে থাকতে চায়, যাতে পুরো সিস্টেমের মোট শক্তি একদম কমে যায়।
১৯৩০ সালে ডাচ উদ্ভিদবিজ্ঞানী পি. এম. এল. টামস একটি গোলকের পৃষ্ঠে বৃত্ত সাজানোর সেরা উপায় কী, তা জানতে চেয়েছিলেন। টামসের সমস্যার একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে কাজ করেছেন মেলিসেন।
সেসময় সবার ধারণা ছিল, যেহেতু কণাগুলো একে অপরকে বিকর্ষণ করছে, তাই তারা একে অপরকে ধাক্কা দিয়ে একদম চাকতির কিনারে পাঠিয়ে দেবে। পদার্থবিদ্যার বিখ্যাত রেভারেন্ড আর্নশর উপপাদ্যও এই ধারণাকে সমর্থন করত। এই উপপাদ্য অনুযায়ী, কেবল স্থির তড়িৎ বল দিয়ে কোনো চার্জযুক্ত বস্তু কখনোই স্থিতিশীল রাখা যায়। তাই সাম্যবস্থা চাইলে সীমানায় কিছু শর্ত জুড়ে দিতেই হয়।
কিন্তু বেরেজিন যখন কম্পিউটারে হিসাব কষলেন, তখন দেখা গেল ১২ থেকে ৪০০টি চার্জের ক্ষেত্রে, সব চার্জ সীমানায় রাখার চেয়ে একটি চার্জ কেন্দ্রে এবং বাকিগুলো সীমানায় রাখলে মোট শক্তি কম হয়। পদার্থবিদ্যার সাধারণ ধারণার সঙ্গে বেরেজিনের এই গণিতের দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত পদার্থবিদ্যার সাহায্যেই মিটেছিল। তবে তার মানে এই নয় যে বেরেজিনের হিসাবে কোনো ভুল ছিল। আসল ব্যাপারটা হলো, বাস্তব ভৌত জগতে পুরোপুরি সীমাহীন পাতলা চাকতি বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।
গণিতের এই মডেলটিকে বাস্তবের সঙ্গে মেলাতে গেলে দুটো জিনিস হতে পারে। হয় এটি একটি সিলিন্ডারের ভেতরের সমান্তরাল চার্জের দ্বিমাত্রিক প্রস্থচ্ছেদ হবে, না হয় চাকতিটির খুব সামান্য হলেও একটু পুরুত্ব আছে। প্রথম ক্ষেত্রে, আসল শক্তির হিসাবটা বেরেজিনের হিসাব থেকে আলাদা হবে। কারণ তখন তড়িৎ বল দূরত্বের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক দূরত্বের হারে কমবে, ব্যস্তবর্গীয় নিয়মে নয়। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, কেন্দ্রে থাকা কণাটি আসলে চাকতির একদম নিখুঁত কেন্দ্রে থাকবে না; বরং সামান্য একটু সরে গিয়ে কাছের কোনো সীমানায় পৌঁছে যাবে!
বেরেজিন যখন কম্পিউটারে হিসাব কষলেন, তখন দেখা গেল ১২ থেকে ৪০০টি চার্জের ক্ষেত্রে, সব চার্জ সীমানায় রাখার চেয়ে একটি চার্জ কেন্দ্রে এবং বাকিগুলো সীমানায় রাখলে মোট শক্তি কম হয়।
ঠিক এভাবেই গণিত ও পদার্থবিদ্যার সাধারণ ধারণার মধ্যে একটা চমৎকার মীমাংসা হয়েছিল। তবে এই সমস্যাটি এখনো বিজ্ঞানীদের দারুণ ভাবায়। উদাহরণ হিসেবে সেই মেলিসেনের কথাই বলা যায়। তিনিই প্রথম গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন, বেরেজিনের সেই সংখ্যার হিসাবগুলো একদম নিখুঁত ছিল।
সুতরাং, অনেক প্রযুক্তিগত জটিলতা ও কঠিন হিসাব-নিকাশ থাকা সত্ত্বেও, এই ধরনের সুন্দর ও গোলমেলে প্রশ্নগুলো নিয়ে গণিতে এখন বেশ ভালোই অগ্রগতি হচ্ছে।
