মানুষ কেন ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘুরতে পছন্দ করে
ওপর থেকে কখনো বিশাল কোনো ভিড়ের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন? স্টেডিয়ামের গ্যালারি, মেলার মাঠ কিংবা ব্যস্ত রাস্তার মোড় থেকে? অনেক ওপর থেকে মানুষ দেখলে মনে হয়, তারা যেন আলাদা কোনো প্রাণসত্তা। যেন পিঁপড়ার বিশাল কোনো কলোনি, যারা নিজেদের অজান্তেই কোনো এক অদৃশ্য নিয়ম মেনে চলাফেরা করছে। দূর থেকে দেখলে মানুষের এই চলাফেরার মধ্যে বেশ জটিল কিন্তু সহজেই অনুমান করা যায়, এমন কিছু প্যাটার্ন চোখে পড়ে।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা মানুষের হাঁটার এই প্যাটার্ন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এক অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করেছেন। আপনি হয়তো নিজেও জানেন না, কিন্তু অবচেতনভাবেই আপনার হাঁটার একটি নির্দিষ্ট দিক রয়েছে! ইউনিভার্সিটি অব টোকিও এবং ইউনিভার্সিটি অব নাভারার একদল বিজ্ঞানী বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণ পেয়েছেন, মানুষ যখন ভিড়ের মধ্যে বা এলোমেলোভাবে হাঁটে, তখন তাদের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যায়। তারা অবচেতনভাবেই ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে বা বাঁ দিক ঘেঁষে ঘুরতে পছন্দ করে। কিন্তু কেন এমনটা হয়? এর পেছনের বিজ্ঞানটা আসলে কী? মজার ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীরা এখনো এর কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি!
অনেক ওপর থেকে মানুষ দেখলে মনে হয়, তারা যেন আলাদা কোনো প্রাণসত্তা। যেন পিঁপড়ার বিশাল কোনো কলোনি, যারা নিজেদের অজান্তেই কোনো এক অদৃশ্য নিয়ম মেনে চলাফেরা করছে।
যেভাবে চলল গবেষণা
মানুষের এই অদ্ভুত প্রবণতা সত্যিই আছে কি না, তা প্রমাণ করার জন্য গবেষকেরা দারুণ সব বুদ্ধিদীপ্ত পরীক্ষার আয়োজন করলেন। তাঁরা ঠিক করলেন, নানা বয়সের ও নানা দেশের মানুষকে আলাদা আলাদা পরিবেশে হাঁটিয়ে দেখবেন।
প্রথম পরীক্ষায় একটি খোলা মাঠে ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবককে ডাকা হলো। তাঁদের কাজ ছিল নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যের দিকে হেঁটে যাওয়া এবং কিছু সাধারণ কাজ করা। মাটি থেকে প্রায় ৩২ ফুট উঁচুতে বসানো একটি ক্যামেরার সাহায্যে তাঁদের হাঁটার এই গতিপথ রেকর্ড করা হয়। আরেকটি পরীক্ষায় স্পেনের ১০৭ জন কিশোর-কিশোরীকে বেছে নেওয়া হয়। তারা যখন স্কুলের মাঠে খেলছিল বা ঘোরাঘুরি করছিল, তখন ওপর থেকে ড্রোনের সাহায্যে তাদের ওপর নজরদারি চালানো হয়।
জাপানের গবেষকেরাও পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁরা জাপানি কলেজপড়ুয়াদের একটি ছোট, চেয়ারে ঠাসা শ্রেণিকক্ষে ঢুকিয়ে দিলেন। এরপর চলল তাদের চলাফেরার নিখুঁত পর্যবেক্ষণ। মানুষের এই অভ্যাসটি জন্মগত কি না, তা বোঝার জন্য জাপানের একটি নার্সারি স্কুলের ছোট ছোট শিশুদের ওপরও নজর রাখা হলো। আর একেবারে শেষ পরীক্ষায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হেঁটে চলা ২০৯ জন পথচারীর ব্যক্তিগত চলাফেরার গতিপথ নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রথম পরীক্ষায় একটি খোলা মাঠে ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবককে ডাকা হলো। তাঁদের কাজ ছিল নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যের দিকে হেঁটে যাওয়া এবং কিছু সাধারণ কাজ করা।
যখন এই বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করা হলো, তখন ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীরা অবাকই হলেন! টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস বিভাগের তৎকালীন প্রজেক্ট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ক্লডিও ফেলিসিয়ানি অবাক হয়ে জানালেন, ‘পরীক্ষাগুলোর ডেটা বিশ্লেষণ করার সময় আমার সহকর্মীরা হঠাৎ খেয়াল করলেন, ৩৩টি ট্রায়ালের মধ্যে ৩২টিতেই মানুষ যখন ঘুরছে, তখন তারা স্পষ্টতই ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘুরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে!’
ব্যাপারটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। কারণ, সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে, মানুষ যখন এলোমেলোভাবে হাঁটে, তখন যার যেদিকে সুবিধা বা প্রয়োজন, সে সেদিকেই ঘুরবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, সমান সুযোগ থাকলেও মানুষ অবচেতনভাবে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকেই ঘুরছে।
গবেষকেরা ভাবলেন, হয়তো ডানহাতি বা বাঁহাতি হওয়ার কারণে এমনটা হতে পারে। কিংবা হয়তো ছেলে বা মেয়েভেদে এই প্রবণতা আলাদা। এমনকি সংস্কৃতি বা দেশের প্রভাবও থাকতে পারে। কিন্তু না! সব বিষয় হিসাবের মধ্যে নেওয়ার পরও দেখা গেল ফলাফল একই। তবে এর মধ্যে দারুণ একটা ব্যাপার চোখে পড়েছে বিজ্ঞানীদের। বড়দের চেয়ে ছোট শিশুদের মধ্যে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘোরার প্রবণতা অনেক বেশি শক্তিশালী। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো এই প্রভাব কিছুটা দুর্বল হয়ে আসে।
গবেষকেরা ভাবলেন, হয়তো ডানহাতি বা বাঁহাতি হওয়ার কারণে এমনটা হতে পারে। কিংবা হয়তো ছেলে বা মেয়েভেদে এই প্রবণতা আলাদা। এমনকি সংস্কৃতি বা দেশের প্রভাবও থাকতে পারে। কিন্তু না!
ইতিহাসেও একই চিত্র
আপনি কি জানেন, মানুষের এই স্বভাবটি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে? অ্যাথলেটিকস ট্র্যাকের কথা একবার ভেবে দেখুন তো! দৌড়বিদরা সব সময় ট্র্যাকের বাঁ দিক ঘেঁষে বা ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে দৌড়ান। মনে করা হয়, প্রাচীন গ্রিসের অলিম্পিক কিংবা প্রাচীন রোমের রথচালকদের সময় থেকেই এই নিয়ম চলে আসছে। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, মাঝখানে একবার অ্যাথলেটদের জোর করে ঘড়ির কাঁটার দিকে বা ডান দিক ঘেঁষে দৌড়াতে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু দৌড়বিদরা তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন, এভাবে দৌড়াতে তাঁদের খুব অস্বস্তি হয় এবং ভারসাম্য রাখতে কষ্ট হয়!
দৌড়বিদরা সব সময় ট্র্যাকের বাঁ দিক ঘেঁষে বা ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে দৌড়ান। মনে করা হয়, প্রাচীন গ্রিসের অলিম্পিক কিংবা প্রাচীন রোমের রথচালকদের সময় থেকেই এই নিয়ম চলে আসছে।
ভুল ধারণাগুলোর অবসান
তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমাদের চোখে? গবেষকেরা সেই পরীক্ষাও করেছেন। তাঁরা মানুষের ডান বা বাঁ চোখ বেঁধে দিয়ে হাঁটতে বলেছেন। কিন্তু তাতেও ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসেনি; মানুষ সেই বাঁ দিকেই ঘুরেছে। অনেকে আবার প্রশ্ন তুলেছেন, এর পেছনে কি পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে তৈরি হওয়া পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের কোনো প্রভাব আছে? কিন্তু ক্লডিও ফেলিসিয়ানির মতে, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যপ্রমাণ অনুযায়ী এই সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
নেচার কমিউনিকেশনস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণাটি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে খুব ছোট বা সাধারণ মনে হতে পারে। কারণ, প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর হাঁটার মধ্যে সাধারণত এমন কোনো নির্দিষ্ট দিকের প্রতি পক্ষপাত দেখা যায় না। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের এই অদ্ভুত আচরণের মানে, আমাদের শারীরিক গঠন হয়তো এমন কোনো অসামঞ্জস্য লুকিয়ে আছে, যা এখনো আমাদের অজানা। হতে পারে আমাদের মস্তিষ্কের গঠন বা পায়ের পেশির অসামঞ্জস্য এর জন্য দায়ী। কে জানে, হয়তো আগামী দিনের কোনো বৃহৎ গবেষণায় উন্মোচিত হবে এই রহস্য। তবে আপাতত মানুষের এই অ্যান্টিক্লকওয়াইজ রহস্য বিজ্ঞানের এক অমীমাংসিত ধাঁধা হয়েই রইল!