সাইরেনের শব্দ আর ইলেকট্রনের দৌড়ঝাঁপ
রাস্তায় জ্যামে আটকে আছেন, এমন সময় দূর থেকে অ্যাম্বুলেন্স বা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির সাইরেন শুনতে পেলেন। গাড়িটা যত আপনার দিকে এগিয়ে আসে, খেয়াল করে দেখবেন শব্দের তীব্রতা বা পিচ তত চড়া হতে থাকে। আবার আপনাকে পার হয়ে যখন দূরে চলে যায়, তখন আওয়াজটা হঠাৎ কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে আসে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন এমন হয়? আমাদের খুব চেনা এই দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার পেছনেই লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের দারুণ কিছু সূত্র। শুধু এই সাইরেনের শব্দই নয়, আমরা যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আছি আর ধসে পড়ে যাচ্ছি না, কিংবা ঘরের ফ্যান-লাইট যেভাবে চলছে—তার সবকিছুর পেছনেই রয়েছে কিছু চমৎকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। চলুন, আজ সেসব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক।
তরঙ্গগুলো ছড়ানোর সময় দূরত্ব বেড়ে যায়, ফলে তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। এতে কম্পাঙ্ক কমে যায় এবং শব্দ মোটা শোনায়। শুধু শব্দ নয়, আলোর ক্ষেত্রেও কিন্তু ডপলার এফেক্ট খাটে!
ডপলার এফেক্ট
রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ দূর থেকে একটা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সাইরেন বাজাতে বাজাতে আপনার দিকে আসতে থাকলে খেয়াল করে দেখবেন, গাড়িটা যত কাছে আসে, সাইরেনের আওয়াজ তত তীক্ষ্ণ মনে হয়। আবার গাড়িটা যখন আপনাকে পার হয়ে দূরে চলে যায়, তখন আওয়াজটা কেমন যেন মোটা বা নিচু হয়ে আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলে ডপলার এফেক্ট।
১৮৪২ সালে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান ডপলার আলোর ক্ষেত্রে প্রথম এই ঘটনাটি খেয়াল করেন। শব্দ তো আসলে তরঙ্গের মতো ছড়ায়। শব্দের উৎস যখন আপনার দিকে এগিয়ে আসে, তখন পরের তরঙ্গটি আগেরটার চেয়ে একটু কম দূরত্ব পার করেই আপনার কানে পৌঁছায়। ফলে তরঙ্গগুলো খুব কাছাকাছি চলে আসে বা দলা পাকিয়ে যায়। এতে তরঙ্গের কম্পাঙ্ক বেড়ে যায়, আর আমাদের কাছে শব্দটা তীক্ষ্ণ শোনায়।
ঠিক উল্টো ব্যাপার ঘটে যখন গাড়িটি দূরে চলে যায়। তরঙ্গগুলো ছড়ানোর সময় দূরত্ব বেড়ে যায়, ফলে তারা একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। এতে কম্পাঙ্ক কমে যায় এবং শব্দ মোটা শোনায়।
মজার তথ্য হলো, শুধু শব্দ নয়, আলোর ক্ষেত্রেও কিন্তু ডপলার এফেক্ট খাটে! আলোর কম্পাঙ্ক বদলালে তার রঙ বদলে যায়। একটা সবুজ আলোর উৎস যদি রকেটের গতিতে আপনার দিকে ধেয়ে আসে, তবে সেটাকে কিছুটা নীলচে দেখাবে, আর তীব্র বেগে দূরে সরে গেলে দেখাবে লালচে!
শব্দের উৎস যখন আপনার দিকে এগিয়ে আসে, তখন পরের তরঙ্গটি আগেরটার চেয়ে একটু কম দূরত্ব পার করেই আপনার কানে পৌঁছায়। ফলে তরঙ্গগুলো খুব কাছাকাছি চলে আসে বা দলা পাকিয়ে যায়।
ইলেকট্রিক চার্জ
আলো আর শব্দের এই রহস্যময় জগতের বাইরে আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, তাদের অস্তিত্বের পেছনেও লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য জাদু, যার নাম ইলেকট্রিক চার্জ বা বৈদ্যুতিক আধান। ইলেকট্রন বা প্রোটনের মতো কণাগুলোর এই বিশেষ গুণের কারণেই তারা একে অপরকে ধাক্কা দেয় বা টেনে আনে।
আমরা জানি, চার্জ দুই রকমের—পজিটিভ আর নেগেটিভ। সমধর্মী চার্জ একে অপরকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়, আর বিপরীত ধর্মী চার্জ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে। চার্জ মাপার একক হলো কুলম্ব। একটি ইলেকট্রনের চার্জ কিন্তু খুবই কম, মাত্র মাইনাস ১.৬০২ × ১০-১৯ C। কিন্তু হিসাবের সুবিধার জন্য আমরা ইলেকট্রনের চার্জকে -১ এবং প্রোটনের চার্জকে +১ ধরি।
শুনলে অবাক হবেন, এই চার্জ না থাকলে পৃথিবী, ঘরবাড়ি, এমনকি আমি-আপনিও অস্তিত্বহীন হয়ে যেতাম! পরমাণুর ভেতরটা আসলে প্রায় পুরোটাই ফাঁকা। তাও যে একটা শক্ত টেবিল বা মাটির ওপর দিয়ে আমরা হেঁটে যাচ্ছি আর ভেতরে ধসে ঢুকে যাচ্ছি না, তার কারণ হলো আমাদের পায়ের পরমাণুর ইলেকট্রন আর মাটির পরমাণুর ইলেকট্রন একে অপরকে তীব্রভাবে বিকর্ষণ করছে। এছাড়া সূর্যের বায়ুমণ্ডলে থাকা চার্জিত কণাগুলোর কারণেই তৈরি হয় আলো আর শক্তি, যা আমাদের পৃথিবীকে রাখে উষ্ণ ও বাসযোগ্য।
চার্জ মাপার একক হলো কুলম্ব। একটি ইলেকট্রনের চার্জ কিন্তু খুবই কম, মাত্র মাইনাস ১.৬০২ × ১০-১৯ C। কিন্তু হিসাবের সুবিধার জন্য আমরা ইলেকট্রনের চার্জকে -১ এবং প্রোটনের চার্জকে +১ ধরি।
ইলেকট্রিক কারেন্ট
এই চার্জিত কণা বা ইলেকট্রনগুলো যখন অলস বসে না থেকে দল বেঁধে ছুটতে শুরু করে, তখন তাকেই আমরা বলি ইলেকট্রিক কারেন্ট বা বিদ্যুৎ প্রবাহ। একটা তামার তারের দুই মাথায় যখন ব্যাটারি জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সেখানে একটা ভোল্টেজ বা বিভব পার্থক্য তৈরি হয়। এই ভোল্টেজের ধাক্কায় তারের ভেতরে থাকা ইলেকট্রনগুলো ব্যাটারির পজিটিভ প্রান্তের দিকে ছুটতে শুরু করে। ব্যস, তৈরি হয়ে যায় কারেন্ট!
আমাদের বাসাবাড়িতে যে বিদ্যুৎ আসে, তা হলো অল্টারনেটিং কারেন্ট বা এসি কারেন্ট। এর মানে হলো, এই কারেন্টে ইলেকট্রনগুলো একমুখী চলে না, বরং সেকেন্ডে ৫০ বা ৬০ বার তাদের দিক পরিবর্তন করে।
কারেন্ট মাপার একক হলো অ্যাম্পিয়ার; প্রতি সেকেন্ডে ১ কুলম্ব চার্জ প্রবাহিত হলে তাকে বলে ১ অ্যাম্পিয়ার। তবে সব রাস্তা যেমন মসৃণ হয় না, তেমনি ইলেকট্রন চলাচলের রাস্তাও সব জায়গায় একরকম নয়। পরিবাহী পদার্থ কারেন্টকে যতটুকু বাধা দেয়, তাকেই বলে রেজিস্ট্যান্স বা রোধ, যার একক হলো ওহম। তামার বা রুপার মতো ধাতুর রেজিস্ট্যান্স খুব কম, তাই এরা দারুণ পরিবাহী। অন্যদিকে কাঠ বা প্লাস্টিকের রেজিস্ট্যান্স আকাশচুম্বী, তাই এদের ভেতর দিয়ে কারেন্ট একেবারেই যেতে পারে না।
তারের ভেতর কারেন্ট কতটুকু হবে, তা নির্ভর করে ভোল্টেজকে রেজিস্ট্যান্স দিয়ে ভাগ করলে যা পাওয়া যায় তার ওপর। গাণিতিক ভাষায়: I = V/R ।
এখানে, I হচ্ছে বিদ্যুৎ প্রবাহ, V বিভব এবং R হচ্ছে রোধ। আর এই ভোল্টেজ ও কারেন্ট গুণ করলে আমরা পাই ইলেকট্রিক্যাল পাওয়ার বা বিদ্যুৎ শক্তি, যা দিয়ে প্রতিদিন আমাদের ঘরের ফ্যান, লাইট আর গ্যাজেটগুলো সচল থাকে।