চুলায় এক হাঁড়ি দুধ বসিয়েছেন। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন হাঁড়ির দিকে, কখন দুধ ফুটবে। কিন্তু কী আশ্চর্য, আপনি যতক্ষণ তাকিয়ে আছেন, মনে হচ্ছে দুধ কিছুতেই ফুটছে না! অধৈর্য হয়ে যেই আপনি এক মুহূর্তের জন্য অন্যদিকে চোখ ঘুরিয়েছেন, অমনি দুধ ফুটে হাঁড়ি থেকে উপচে পড়তে শুরু করেছে!
ইংরেজিতে এ নিয়ে একটা খুব পুরোনো ও দারুণ প্রবাদই আছে—‘দ্য ওয়াচড পট নেভার বয়েলস’। মানে তাকিয়ে থাকলে হাঁড়ির পানি কখনো ফোটে না। যত দূর জানা যায়, ভিক্টোরিয়ান যুগের লেখিকা এলিজাবেথ গাসকেল ১৮৪৮ সালে তাঁর মেরি বার্টন উপন্যাসে এই বাক্যটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। যদিও এই প্রবাদের শেকড় হয়তো আরও অনেক পুরোনো।
সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আমরা জানি, এটি নিছকই মানুষের ধৈর্যের একটা পরীক্ষা এবং মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। তাকিয়ে থাকলে পানি দ্রুত বা দেরিতে ফোটার পেছনে কোনো বিজ্ঞান নেই! কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে যদি আমাদের সেই পুরোনো বন্ধু, মানে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক জেনো এসে আপনার পাশে দাঁড়ান? ওনার কাজই তো সময়-অসময় এখানে সেখানে গিয়ে যুক্তির বাগড়া দেওয়া! তিনি হয়তো মুচকি হেসে আপনার পিঠ চাপড়ে বলবেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম, স্থির দৃষ্টিতে দেখলে গতি থেমে যায়!’
যত দূর জানা যায়, ভিক্টোরিয়ান যুগের লেখিকা এলিজাবেথ গাসকেল ১৮৪৮ সালে তাঁর মেরি বার্টন উপন্যাসে দ্য ওয়াচড পট নেভার বয়েলস বাক্যটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন।
পাঠক, আগের পর্বে জেনোর সেই তীর প্যারাডক্সের কথা মনে আছে? ওই পর্ব না পড়লে এখান থেকে পড়ে দেখতে পারেন: জেনোর যে তীর আজও ভাবায় বিজ্ঞানীদের। এই প্যারাডক্সে বলা হয়েছে, ছুটে আসা তীরের দিকে তাকিয়ে একটা স্থির মুহূর্ত কল্পনা করলে তীরটিকে যেমন আকাশে স্থির মনে হয়, স্থির দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে যেকোনো গতিশীল বস্তুও তেমন থেমে যায়।
আপনি হয়তো ভাবছেন, আড়াই হাজার বছর আগের এক পাগলাটে দার্শনিকের যুক্তির সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের কী সম্পর্ক! পাঠক, এবার একটু নড়েচড়ে শক্ত হয়ে বসুন। কারণ বিজ্ঞানের সবচেয়ে আধুনিক, সবচেয়ে জটিল ও রহস্যময় শাখা কোয়ান্টাম মেকানিকসও ঠিক জেনোর এই কথাটাই বলছে!
আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী, গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক গাণিতিক ধারণা এই কোয়ান্টাম মেকানিকস। এটি এমন একটা তত্ত্ব, যা একই সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য বিখ্যাত।
দুই
কোয়ান্টাম মেকানিকস শব্দটা শুনলেই একটি ‘কঠিন’ শব্দ হয়তো মস্তিষ্কের কোনায় উঁকি দেয়। কিন্তু এই কোয়ান্টাম মেকানিকসই আমাদের এই মহাবিশ্বের অতিপারমাণবিক জগতের বিজ্ঞান (সঠিক পরিভাষায় উপপারমাণবিক)। শুধু মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা যায় এমন ছোট দুনিয়ার কথা বলছি না; বলছি অণু-পরমাণু, ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রনের মতো কল্পনাতীত ক্ষুদ্র কণাগুলোর কথা, যাদের দিয়ে এই গোটা মহাবিশ্ব তৈরি।
আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী, গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক গাণিতিক ধারণা এই কোয়ান্টাম মেকানিকস। মজার ব্যাপার হলো, এটি এমন একটা তত্ত্ব, যা একই সঙ্গে দুটি পরস্পরবিরোধী বৈশিষ্ট্যের জন্য বিখ্যাত। একদিকে, আমাদের চারপাশের চেনা জগৎ কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য এই তত্ত্ব এতই নিখুঁত ও জরুরি যে, গত শতকের প্রায় সব প্রযুক্তিগত বিপ্লব এর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, এই তত্ত্বের ভেতরের আসল অর্থ যে ঠিক কী, তা হয়তো আজ পর্যন্ত দুনিয়ার কোনো বিজ্ঞানীই শতভাগ নিশ্চিত করে বুঝতে পারেননি!
কোয়ান্টাম মেকানিকস না থাকলে সিলিকন চিপ বা লেজার রশ্মি উদ্ভাবণ করা সম্ভব হতো না; এমনকি আমাদের ঘরে ঘরে টেলিভিশন, ল্যাপটপ বা আপনার হাতের স্মার্টফোনটির অস্তিত্বও থাকত না।
তবে শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার করে নিই। কোয়ান্টাম মেকানিকস মোটেও কোনো গাঁজাখুরি, অযৌক্তিক বা ভুতুড়ে তত্ত্ব নয়। এটি অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত ও সুন্দর একটি যৌক্তিক কাঠামো, যা প্রকৃতির আচরণকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এই তত্ত্ব না থাকলে আমরা আধুনিক রসায়নের বিন্দুবিসর্গও বুঝতাম না।
এই তত্ত্ব না থাকলে সিলিকন চিপ বা লেজার রশ্মি উদ্ভাবণ করা সম্ভব হতো না; এমনকি আমাদের ঘরে ঘরে টেলিভিশন, ল্যাপটপ, মাইক্রোওয়েভ ওভেন বা আপনার হাতের স্মার্টফোনটির অস্তিত্বও থাকত না। পরমাণুরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে এই বিশাল পৃথিবী তৈরি করেছে, তার নিখুঁত হিসাব দেয় এই তত্ত্ব। আমরা নিজেরাও তো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন পরমাণুর সমন্বয়ে তৈরি এক জটিল সৃষ্টি, যারা কোয়ান্টাম মেকানিকসের নিয়ম মেনেই চলছে!
কোয়ান্টাম মেকানিকস অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত ও সুন্দর একটি যৌক্তিক কাঠামো, যা প্রকৃতির আচরণকে নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
তিন
১৯২০-এর দশকে আবিষ্কৃত এই কোয়ান্টাম তত্ত্বের নিয়মকানুনগুলো বড়ই অদ্ভুত। আমাদের চিরচেনা জগতের নিয়মকানুনের সঙ্গে এর কোনো মিলই নেই। স্যার আইজ্যাক নিউটনের চিরচেনা পৃথিবীতে আপনি যদি একটি ক্রিকেট বল আকাশে ছুড়ে মারেন, তবে বলের ওজন, বাতাসের গতি এবং আপনার ছুড়ে মারার শক্তি হিসাব করে বিজ্ঞান নিখুঁতভাবে বলে দিতে পারবে, ঠিক কয় সেকেন্ড পর বলটি মাঠের ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে পড়বে।
কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই! ওই জগৎটা চলে পুরোপুরি সম্ভাবনার ওপর। সেখানে কোনো কিছুই নিশ্চিত নয়, সবকিছুই যেন এক মায়াবী অনিশ্চয়তায় ঢাকা।
একটি তেজস্ক্রিয় পরমাণুর কথাই ধরা যাক। এই পরমাণুটিকে একা ছেড়ে দিলে ওটা যেকোনো সময় একটি কণা বিকিরণ করে ক্ষয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক কখন এই কাজটা করবে, তা পৃথিবীর কোনো সুপার কম্পিউটারের পক্ষেও আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। আমরা বড়জোর অর্ধায়ু নামের একটি হিসাব কষতে পারি।
পনি যদি একটা কয়েন এক হাজার বার টস করেন, তবে গাণিতিক সম্ভাবনা হলো প্রায় ৫০০ বার হেড এবং ৫০০ বার টেল পড়বে। আপনি যত বেশিবার টস করবেন, হিসাবটা তত নিখুঁত হবে।
বিষয়টা একটা উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরুন, একটা বিশাল ঘরে এক লাখ তেজস্ক্রিয় পরমাণু আছে। বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরমাণুগুলোর অর্ধায়ু এক ঘণ্টা। মানে, ঠিক এক ঘণ্টা পর ওই এক লাখ পরমাণুর অর্ধেক, অর্থাৎ ৫০ হাজার পরমাণু ক্ষয়ে যাবে। কিন্তু ওই এক লাখের মধ্যে ঠিক কোন ৫০ হাজার পরমাণু আগে ক্ষয়ে যাবে এবং ঠিক কোন পরমাণুটি সবার প্রথমে ভাঙবে, সেটা আপনি কোনো দিনও আগে থেকে বলতে পারবেন না! পরমাণুর সংখ্যা যত বেশি হবে, আমাদের এই গাণিতিক সম্ভাবনার হিসাব তত নিখুঁত হবে ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্ট পরমাণুর ক্ষেত্রে তা সব সময়ই অনিশ্চিত।
ব্যাপারটা অনেকটা কয়েন টস করার মতো। আপনি যদি একটা কয়েন এক হাজার বার টস করেন, তবে গাণিতিক সম্ভাবনা হলো প্রায় ৫০০ বার হেড এবং ৫০০ বার টেল পড়বে। আপনি যত বেশিবার টস করবেন, হিসাবটা তত নিখুঁত হবে। কিন্তু ঠিক পরের টসটাতেই হেড পড়বে নাকি টেল, তা কি আপনি নিশ্চিত করে বলতে পারবেন? মোটেই না।
কোয়ান্টাম জগতও ঠিক এমনই। বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব অসম্পূর্ণ বলে যে এমনটা হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। বরং পরমাণুটার নিজস্ব কোনো ঘড়ি নেই! পরমাণু নিজেই জানে না, সে কখন ক্ষয়ে যাবে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ইনডিটারমিনিজম বা চরম অনিশ্চয়তা।
পরমাণুগুলো যেন প্রচণ্ড লাজুক স্বভাবের। একা থাকলে সে দিব্যি নিজের খেয়ালে কাজ করে যায়, কিন্তু যেই আপনি তার দিকে নজরদারি শুরু করবেন, অমনি সে কাজ বন্ধ করে আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকবে!
চার
১৯৭৭ সাল। জার্নাল অব ম্যাথমেটিক্যাল ফিজিকস সাময়িকীতে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। টেক্সাস ইউনিভার্সিটির দুই পদার্থবিদ বৈদ্যনাথ মিশ্র এবং জর্জ সুদর্শন সেই পেপারে এমন এক অবিশ্বাস্য দাবি করলেন। সেটা শুনে পুরো বিজ্ঞান দুনিয়ার চোখ কপালে উঠল! পেপারের নাম ছিল—‘দ্য জেনো’স প্যারাডক্স ইন কোয়ান্টাম থিওরি’। মানে কোয়ান্টাম তত্ত্বে জেনোর প্যারাডক্স।
তাঁরা গাণিতিকভাবে দেখালেন, একটি তেজস্ক্রিয় পরমাণুকে যদি আপনি একনাগাড়ে খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন, তবে সেটি কখনোই ক্ষয়ে যাবে না!
একটু কল্পনা করুন তো ব্যাপারটা! ওই যে চা বানানোর সময় হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকার প্রবাদটা, সেটা পরমাণুর ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে যাচ্ছে! পরমাণুগুলো যেন প্রচণ্ড লাজুক স্বভাবের। একা থাকলে সে দিব্যি নিজের খেয়ালে কাজ করে যায়, কিন্তু যেই আপনি তার দিকে নজরদারি শুরু করবেন, অমনি সে কাজ বন্ধ করে আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকবে! আপনি তাকে কখনোই হাতেনাতে ক্ষয়ে যেতে দেখতে পারবেন না। মনে হবে যেন, পরমাণুটার নিজস্ব একটা সচেতনতা আছে। সে বুঝতে পারছে যে কেউ তাকে দেখছে!
কোয়ান্টাম পদার্থবিদেরা এখন আর বৈদ্যনাথ মিশ্র এবং জর্জ সুদর্শনের এই তত্ত্বকে প্যারাডক্স মনে করেন না। আজকাল বিজ্ঞানের ভাষায় একে কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্ট নামেই ডাকা হয়।
আপনার কাছে হয়তো পুরো ব্যাপারটাই পাগলামি মনে হচ্ছে। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতটাই তো এক আস্ত পাগলামির কারখানা! ড্যানিশ পদার্থবিদ নীলস বোর ১৯২০ সালে কোপেনহেগেনে একটি গবেষণাগার তৈরি করেছিলেন। সেখানে তখনকার যুগের সবচেয়ে বড় সব জিনিয়াসদের একত্রিত করেন তিনি। এদের মধ্যে ছিলেন ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, উলফগ্যাং পাউলি মতো বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দিনরাত ব্ল্যাকবোর্ডে চক ঘষে ঘষে পরমাণুর রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করতেন। সেই নীলস বোরের একটা বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘কোয়ান্টাম মেকানিকসের উপসংহারগুলো শুনে আপনি যদি চমকে না ওঠেন, তার মানে আপনি আসলে তত্ত্বটাই বোঝেননি!’
কোয়ান্টাম পদার্থবিদেরা এখন আর বৈদ্যনাথ মিশ্র এবং জর্জ সুদর্শনের এই তত্ত্বকে প্যারাডক্স মনে করেন না। আজকাল বিজ্ঞানের ভাষায় একে কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্ট নামেই ডাকা হয়। একজন কোয়ান্টাম পদার্থবিদকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি হয়তো ভারী চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে একগাদা গালভরা বৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করে বলবেন, ‘ধ্রুব পর্যবেক্ষণের ফলে পরমাণুর ওয়েভ ফাংশন বা তরঙ্গ-ফাংশন বারবার ভেঙে তার আদি অবস্থায় ফিরে যায়, তাই এটি ক্ষয়ে যাওয়ার সময় পায় না।’ একজন সাধারণ মানুষের কাছে এসব কথাবার্তা সম্পূর্ণ গ্রিক ভাষার মতো শোনালেও, বিজ্ঞানীরা কিন্তু ঠিকই জানেন তাঁরা কী নিয়ে কাজ করছেন।
ড্যানিশ পদার্থবিদ নীলস বোর ১৯২০ সালে কোপেনহেগেনে একটি গবেষণাগার তৈরি করেছিলেন। সেখানে তখনকার যুগের সবচেয়ে বড় সব জিনিয়াসদের একত্রিত করেন তিনি।
পাঁচ
একসময় যা কেবল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বা দার্শনিক ধাঁধা ছিল, ১৯৯০ সালে তা বাস্তবে প্রমাণিত হলো ল্যাবরেটরিতে!
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির বিশ্বখ্যাত ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরির একটা দারুণ নাম আছে—ডিভিশন অব টাইম অ্যান্ড ফ্রিকোয়েন্সি। এই বিভাগের কাজই হলো দুনিয়ার সবচেয়ে নিখুঁত সময় মাপা। এঁরা এমন সব পারমাণবিক ঘড়ি বানিয়েছেন, যা প্রতি সাড়ে তিন শ কোটি বছরে মাত্র এক সেকেন্ড এদিক-ওদিক হয়! সাড়ে তিন শ কোটি বছর মানে প্রায় আমাদের এই পৃথিবীর বয়সের কাছাকাছি একটা সময়!
এই ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী ওয়েন ইটানো এবং তাঁর দল একটি যুগান্তকারী পরীক্ষা চালালেন। তাঁরা শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের জালের ভেতর কয়েক হাজার পরমাণুকে আটকে ফেললেন। এরপর খুব সাবধানে সেগুলোর ওপর লেজার রশ্মি ফেলে একটানা পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করলেন, যাতে পরমাণুগুলো তাদের ভেতরের গোপনীয়তা ফাঁস করতে বাধ্য হয়।
অবিশ্বাস্যভাবে তাঁরা দেখলেন, সত্যিই জেনো ইফেক্ট কাজ করছে! একটানা কড়া নজরে রাখার ফলে পরমাণুগুলোর আচরণ পুরোপুরি বদলে গেছে। সেগুলো আর বিজ্ঞানীদের আগের হিসাব অনুযায়ী ক্ষয়ে যাচ্ছে না! নজরদারি তাদের আড়ষ্ট করে দিয়েছে!
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির বিশ্বখ্যাত ল্যাবরেটরি। এই ল্যাবরেটরির একটা দারুণ নাম আছে—ডিভিশন অব টাইম অ্যান্ড ফ্রিকোয়েন্সি।
সবচেয়ে বড় চমকটা বোধহয় এখনো বাকি। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি প্রমাণ পেয়েছেন, এর ঠিক উল্টো একটা ঘটনাও ঘটতে পারে! একে বলা হচ্ছে অ্যান্টি-জেনো ইফেক্ট। এর মানে হলো, যদি কোনো নির্দিষ্ট উপায়ে পরমাণুর দিকে নজর রাখেন বা বিশেষ কায়দায় খোঁচা দেন, তবে তা স্বাভাবিকের চেয়ে আরও দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে। ঠিক যেন চুলায় দুধ গরম করার সময় একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার কারণে দুধ আরও দ্রুত গরম হওয়ার মতো ব্যাপার!
এসব গবেষণা শুনতে কল্পকাহিনি মনে হলেও, একুশ শতকের সবচেয়ে যুগান্তকারী প্রযুক্তি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির মূলেই রয়েছে পরমাণুর এই অদ্ভুত আচরণগুলো। এই কম্পিউটারগুলো পরমাণুর এই জাদুকরি বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যবহার করে বর্তমানের সুপার কম্পিউটারের চেয়েও কোটি গুণ বেশি দক্ষতায় হিসাব-নিকাশ করতে পারবে।
আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের এলিয়া শহরে বসে জেনো হয়তো স্বপ্নেও ভাবেননি, তাঁর সেই পাগলাটে গতির ধাঁধাগুলো একদিন একুশ শতকের সবচেয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে এভাবে জড়িয়ে যাবে। তাঁর প্যারাডক্সগুলো যে নিছক যুক্তির খেলা ছিল না, বরং পরমাণুর অতি ক্ষুদ্র জগতে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির সবচেয়ে অদ্ভুত রহস্যেরই এক পূর্বাভাস ছিল, তা বুঝতে আমাদের লেগে গেল মাত্র আড়াই হাজার বছর!
