কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্ট
এক সময় মনে করা হতো, দর্শনের সঙ্গে পদার্থবিজ্ঞানের বড্ড আড়ি। বিশেষ করে দর্শনের অতি ভাববাদী কিংবা জটিল প্যারাডক্সগুলোকে পদার্থবিজ্ঞান সমর্থন করত না। অস্পষ্টতা, অপরিমাপযোগ্য ব্যাপারস্যাপার পদার্থবিজ্ঞানে চলত না বললেই চলে। বিশেষ করে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে। এখানে ‘মাপজোখ’ ব্যাপারটা বড্ড নিখুঁত। তাই হিসাব-নিকাশ করে যেকোনো পদার্থ বৈজ্ঞানিক সিস্টেমের ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব ছিল। ছিল বলি কেন, চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানে সেটা এখনো সম্ভব।
কিন্তু গত শতাব্দীর বিশের দশকে সব ওলট-পালট হয়ে যায়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা একের পর এক হাজির করে অনিশ্চয়তায় ভরা তত্ত্ব। সেসব তত্ত্ব আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানকে যেমন বিভ্রান্ত করে, তেমনি পরীক্ষা-নিরীক্ষাতেও ফেলে বড় প্রভাব; অর্থাৎ এ তত্ত্বগুলো ল্যাবরেটরিতেও অদ্ভুত ও অনিশ্চিত ফলাফল দিতে শুরু করে। তখন কোয়ান্টাম তত্ত্বের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খোদ আইনস্টাইনই এর বিরুদ্ধে সরব হন। দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে যায় কোয়ান্টাম বলবিদ্যার পক্ষে-বিপক্ষে। তৈরি হয় একের পর এক প্যারাডক্স বা বিভ্রম। সেসব বিভ্রমের ব্যাখ্যাও আসতে শুরু করে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার পক্ষের বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অদ্ভুত আইনগুলোর পরীক্ষামূলক প্রমাণ যখন আসতে শুরু করে, তখন প্রয়োজন হয় দার্শনিক ব্যাখ্যার। সেসব ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে নতুন নতুন বিভ্রমের জন্ম হয়, সেগুলোরও ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে। এভাবে গোটা এক শতাব্দী ধরে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মুকুটে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন বিভ্রমের পালক। ফলে নতুন নতুন ব্যাখ্যারও প্রয়োজন পড়ছে। তেমনই একটি বিভ্রম হলো কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্ট।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় জেনোর প্যারাডক্স প্রয়োগের কথা প্রথম ভাবেন আধুনিক কম্পিউটারের অন্যতম পুরোধা অ্যালান টুরিং ও কোয়ান্টাতত্ত্ববিদ জন ভন নিউম্যান। ১৯৫০-এর দশকে।
২.
কী এই জেনো ইফেক্ট? বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক জেনো ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই প্যারাডক্সের বরপুত্র। তাঁর বেশ কিছু প্যারাডক্স ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছে। এর মধ্যে অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের গল্পটা তো পরিণত হয়েছে ক্ল্যাসিক প্যারাডক্সে। তাঁর আরেকটি বিখ্যাত প্যারাডক্স হলো গতিশীল তিরের থেমে যাওয়া।
ধরা যাক, একটা তির ছুড়ছেন আপনি। কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে তিরটি কোনো একটা বিন্দুতে অবস্থান করে। ওই বিন্দুতে তিরের বেগ শূন্য। শুধু তির নয়, যেকোনো গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রেই এ বিভ্রম তৈরি হয়। তির হোক কিংবা দুরন্ত বেগে চলে একটা গাড়ি—কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট অবস্থানে তার গতি শূন্য। একটা বড় ‘সময়’ তৈরি হয় অজস্র মুহূর্তের সমন্বয়ে। তেমনই একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয় অজস্র বিন্দুর যোগফলে। স্থান ও কালের প্রতিটা বিন্দুতে যার গতি শূন্য, একটা বড় সময় পর দেখা যায়, সেই বস্তুই বেশ খানিকটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে। এই যে বৈপরীত্য, এর কারণেই তৈরি হয় প্যারাডক্স।
এ প্যারাডক্সের সমাধান লুকিয়ে আছে নিউটনের গতিসূত্রে, যা নিউটন করেছিলেন ইন্ট্রিগ্যাল ক্যালকুলাস ব্যবহার করে। যেখানে সময় ও স্থানকে অতিক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করা যায়। এরকম প্রতিটি অতিক্ষুদ্র ভাগে গতিশীল বস্তুর তাৎক্ষণিক বেগ থাকে, যা অশূন্য। নিউটনীয় গতিবিদ্যায় জেনোর এই প্যারাডক্সের সমাধান তো মেলে, কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যায়?
কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় জেনোর এই প্যারাডক্স প্রয়োগের কথা প্রথম ভাবেন আধুনিক কম্পিউটারের অন্যতম পুরোধা অ্যালান টুরিং ও কোয়ান্টাতত্ত্ববিদ জন ভন নিউম্যান। ১৯৫০-এর দশকে। তাঁদের সেই ধারণা অবশ্য অতটা পোক্ত ছিল। তবে ১৯৭৭ সালে ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী বৈদ্যনাথ মিশ্র ও মার্কিন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জর্জ সুদর্শন সফল হন। তাঁরা আটকে রাখা আয়ন, সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম বিট বা কোয়ান্টাম ক্যাভিটিতে আটকে রাখা পরমাণুসহ বহু কোয়ান্টাম সিস্টেমে এ ইফেক্ট প্রয়োগ করেন এবং সফল হন।
স্থান ও কালের প্রতিটা বিন্দুতে যার গতি শূন্য, একটা বড় সময় পর দেখা যায়, সেই বস্তুই বেশ খানিকটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে। এই যে বৈপরীত্য, এর কারণেই তৈরি হয় প্যারাডক্স।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, কী এই কোয়ান্টাম জেনো প্যারাডক্স?
কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বলে, জগতে কোনো বস্তুর গতি বা অবস্থান, এমনকি কণাদের চরিত্রও সুনির্দিষ্ট নয়। এর একটি ধর্ম পর্যবেক্ষণ করতে গেলে আরেকটি ধর্ম অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আর কণাদের এই অদ্ভুত চরিত্র ও ধর্ম ব্যাখ্যা করা হয় হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব ও শ্রোডিঙ্গারের ওয়েভ ফাংশনের মাধ্যমে। এ দুটি তত্ত্ব আসলে একই—দুই বিজ্ঞানী আলাদা আলাদাভাবে এটা আবিষ্কার করেছিলেন, এই যা।
অনিশ্চয়তা বা তরঙ্গ ফাংশনের তত্ত্ব অনুযায়ী, আপনি যখন কোনো বস্তুর কোনো একটা ধর্ম পর্যবেক্ষণ করবেন, তখন এর তরঙ্গ ফাংশন কলাপস করবে বা ভেঙে পড়বে। তখন বাকি সব ধর্ম অনিশ্চিত হয়ে যাবে। শুধু যে ধর্মটা আপনি পর্যবেক্ষণ করবেন, সেটাই কাজ করবে ঠিকঠাক। কথাটার মানে হলো, পরিমাপের আগে কণাটি সম্ভাব্য একাধিক অবস্থায় থাকলেও পরিমাপের ঠিক ওই মুহূর্ত কণাটি নিজেকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় প্রকাশ করবে। আপনি যে ধর্মটা পর্যবেক্ষণ করবেন, সেটাই হবে সুনির্দিষ্ট; অন্য ধর্মগুলো হয়ে পড়বে আরও অনিশ্চিত। ঠিক এ জায়গাতেই কোয়ান্টাম বিজ্ঞানীরা জেনোর আড়াই হাজার বছরের পুরোনো প্যারাডক্সটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন।
সেটা কীভাবে? ধরা যাক, কোনো একটা কণা গতিশীল। আপনি সেই কণার অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে চান; অর্থাৎ কোনো একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বিন্দুতে কণাটিকে আপনি দেখতে চান। সেভাবেই যন্ত্রপাতি সাজালেন।
অনিশ্চয়তা বা তরঙ্গ ফাংশনের তত্ত্ব অনুযায়ী, আপনি যখন কোনো বস্তুর কোনো একটা ধর্ম পর্যবেক্ষণ করবেন, তখন এর তরঙ্গ ফাংশন কলাপস করবে বা ভেঙে পড়বে।
যখন আপনি কণাটির অবস্থান জানার জন্য পরীক্ষা চালালেন, তখন কণাটির তরঙ্গ ফাংশন কলাপস করবে; অর্থাৎ অবস্থান ছাড়া বাকি সব ধর্ম অনিশ্চিত হয়ে যাবে। এর অর্থ, একটা নির্দিষ্ট সময়ে একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে কণাটিকে ‘স্থির অবস্থায়’ দেখতে পাবেন। বলা প্রয়োজন, ‘স্থির অবস্থায়’ মানে কণাটি গতি হারিয়ে থেমে যাবে না, বরং ওই মুহূর্তে তার একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান আপনি নির্ণয় করতে পারবেন। এটুকু হয়তো সমস্যা না; কিন্তু যদি আপনি পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যান, তাহলে কী হবে?
এখানেই জেনোর সেই প্যারাডক্স সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মতে, কোনো কণার একটা চরিত্র যদি আপনি দেখতে চান, সেই চরিত্রই দেখতে পাবেন, কিন্তু অন্য চরিত্রগুলো অনিশ্চিত হয়ে পড়বে; অর্থাৎ যখন কণাটাকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট বিন্দুতে দেখতে চান, কণাটা সেই বিন্দুতেই স্থির অবস্থায় দেখতে পাবেন। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়টাকে যদি আরেকটু বাড়িয়ে নেন; অর্থাৎ প্রথম মুহূর্তে আপনি স্থির দেখলেন, কিন্তু চোখ সরালেন না। তাহলে দ্বিতীয় মুহূর্তেও কী কণাটাকে সেখানে স্থির দেখবেন? কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়মানুযায়ী সেটাই হওয়ার কথা; অর্থাৎ আপনি যতক্ষণ না চোখ সরাচ্ছেন, কণাটা সেখানে স্থির হয়ে থাকছে। অথচ আপনি একটা গতিশীল কণা পর্যবেক্ষণ করছেন।
কথাটা বিজ্ঞানের ভাষায় এভাবে বলা হয়, ‘আপনি যদি বারবার বা ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে কণাটা সেই চরিত্রটাই ধরে রাখার চেষ্টা করে, অন্য কোনো চরিত্রে পরিবর্তিত হতে অনীহা দেখায়!’ অর্থাৎ কণাটা অন্য কোনো অবস্থায় পরিবর্তিত হলে চাইলেও আপনার পর্যবেক্ষণ সেই প্রক্রিয়াকে ধীরে করে দিতে, এমনকি সাময়িকভাবে থামিয়েও দিতে পারে। সরল বাংলায় বললে, নিউটনীয় গতিবিদ্যায় কণাটার স্থির হয়ে থাকার উপায় নেই, কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় সেটা সম্ভব। তাই তো কোয়ান্টাম মেকানিকসের জগৎটা এত অদ্ভুত!
কথাটা বিজ্ঞানের ভাষায় এভাবে বলা হয়, ‘আপনি যদি বারবার বা ঘন ঘন পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে কণাটা সেই চরিত্রটাই ধরে রাখার চেষ্টা করে, অন্য কোনো চরিত্রে পরিবর্তিত হতে অনীহা দেখায়!’
৩.
কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্ট বোঝার জন্য আরেকটু সহজ উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি ঘুমাচ্ছেন, একটা ফোন এল। ফোনে কথা সেরে যেই ঘুমাতে যাবেন, আবার মোবাইলে টুংটাং আওয়াজ। এবার কেউ মেসেঞ্জারে নক করেছেন। সেটা সেরে আবার যেই ঘুমাতে যাচ্ছেন, তখনই হয়তো হোয়াটসঅ্যাপে আরেকজন নক করলেন। এভাবে আপনার ঘুমাতে যাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আপনি যদি কোয়ান্টাম কণা হন, ঘুম যদি হয় আপনার একটা আচরণ; তাহলে ফোন, ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে নককারী বন্ধুরা হবেন পর্যবেক্ষক। এসব পর্যবেক্ষক বারবার পর্যবেক্ষণ করে আপনার ঘুমের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করছেন। এটাই আসলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় জেনো ইফেক্ট নামে পরিচিত।
আরেকটা উদহারণ দিই। ধরুন, আপনি কয়েন দিয়ে টস করছেন। টস করার আগে হেড ও টেল পড়ার সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি। কয়েন যখন ওপর থেকে মাটিতে পড়ছে, বারবার আপনি সেটা ধরে থামিয়ে কোনো এক মুহূর্তের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। এভাবে বারবার থামানোর ফলে হেড ও টেল পড়ার যে প্রক্রিয়া, সেটাকেই বিঘ্নিত করছেন আপনি। জেনো ইফেক্ট অনেকটা এমন।
জেনো ইফেক্ট নিছকই একটা প্যারাডক্স বা তত্ত্ব নয়। রীতিমতো পরীক্ষাগারে প্রমাণিত একটা ব্যাপার। আসলে শুরু থেকেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যা মাপজোখের ব্যাপারে একেবারে গোলমেলে; অর্থাৎ মেজারমেন্টের সমস্যা এখানে চিরকালই ছিল। জেনো ইফেক্ট সেটারই একটা জ্বলন্ত উদাহরণ। আপনি যখন কোনো কোয়ান্টাম কণার মাপজোখ করতে যাচ্ছেন, তখন সেই সিস্টেমের আচরণ বদলে যাচ্ছে।
আপনি যদি কোয়ান্টাম কণা হন, ঘুম যদি হয় আপনার একটা আচরণ; তাহলে ফোন, ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে নককারী বন্ধুরা হবেন পর্যবেক্ষক।
এ বিষয়ে জার্মানির আলেকজান্ডার ইউনিভার্সিটির পদার্থবিদ ড্যানিয়েল বুরগার্থ বলেন, কোয়ান্টাম মেকানিকসে মেজারমেন্ট বা মাপজোখের অর্থ শুধু সেখান থেকে তথ্য নেওয়া নয়; বরং সেই মাপজোখ পুরো সিস্টেমের ওপর একটা প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিওভানি ব্যারোন্তিনি জেনো ইফেক্ট পরীক্ষা করেছেন। তাঁর কাছে ব্যাপারটা অনেকটা পাত্রে পানি ফোটানোর মতো। চিরায়ত বলবিদ্যায় কোনো পাত্রে পানি রেখে সেটা চুলায় চাপালেই হয়। সেটা আপনি পর্যবেক্ষণ করেন বা না করেন, সেটা ফুটতেই থাকবে; কিন্তু এ ধরনের ঘটনা কোয়ান্টাম–জগতে ঘটবে না। আপনি পর্যবেক্ষণ না করা পর্যন্ত পাত্রের পানি ফুটতে শুরু করবে না; কিন্তু জেনো ইফেক্ট এ পর্যবেক্ষণকেই প্রভাবক হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। ব্যারোন্তিনি বলেন, ‘কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্টের মতো ঘটনা চিরায়ত বলবিদ্যায় ঘটা অসম্ভব; কিন্তু কোয়ান্টাম–জগতে এটা হামেশা ঘটে। এখানে পাত্রের পানিগুলো তখনই ফুটবে, যখন আপনি সেটা পর্যবেক্ষণ করবেন। ওরা যেন বোঝে, ওদের কেউ দেখছে।’
সাধারণ কম্পিউটারের মূল ভিত্তি বিট—এর মান ১ ও ০-এর ওপর ভিত্তি করে এগোয় কম্পিউটারের সব কাজ। এখানে ১ মানে বিদ্যুৎ–প্রবাহ চালু আর ০ মানে বিদ্যুৎ–প্রবাহ বন্ধ।
৪.
আইনস্টাইন সেকালে কোয়ান্টামের অদ্ভুত আইনগুলো মানতে পারেননি। তাই একের পর এক নিজের মতো ব্যাখ্যা দিয়ে গেছেন। তবে এ যুগের বিজ্ঞানীদের কেউ আইনস্টাইনের পথে হাঁটছেন না। কোয়ান্টামের অদ্ভুত নীতিগুলো মেনে নিয়েই এগোচ্ছেন তাঁরা। মাপজোখের এ বিভ্রান্তি মেনে নিয়ে সেটাকে বরং উন্নত প্রযুক্তিতে কাজে লাগাচ্ছেন হাতিয়ার হিসেবে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটারের কথাই ধরা যাক। সাধারণ কম্পিউটারের মূল ভিত্তি বিট—এর মান ১ ও ০-এর ওপর ভিত্তি করে এগোয় কম্পিউটারের সব কাজ। এখানে ১ মানে বিদ্যুৎ–প্রবাহ চালু আর ০ মানে বিদ্যুৎ–প্রবাহ বন্ধ। সাধারণত ট্রানজিস্টর নামের ক্ষুদ্র একধরনের সুইচের মাধ্যমে কম্পিউটারে বিটগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। কিউবিটের কার্যকারণ সাধারণ বিটের ঠিক উল্টো। বিট কোনো নির্দিষ্ট সময়ে ০ ও ১-এর যেকোনো একটি দশায় থাকতে পারে; কিন্তু কিউবিট একই সঙ্গে একাধিক দশার সুপারপজিশনে থাকে আর এটি নিয়ন্ত্রিত হয় কোয়ান্টাম কণাদের দ্বারা।
কোয়ান্টাম কণা, যেমন ইলেকট্রন, ফোটন—এমনকি পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে কিউবিট হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এদের বিভিন্ন ধর্ম, যেমন চার্জ, স্পিন, ভরবেগ, অবস্থান, কম্পাঙ্ক ইত্যাদি ধর্মকে একসঙ্গে সুপারপজিশনে রেখে কিউবিটের মান স্থির রাখা যায়। একে বলে কোহেরেন্স; কিন্তু মুশকিল হলো, কিউবিটের এই মান খুব বেশি সময় একসঙ্গে ধরে রাখা যায় না। কারণ, পারিপার্শ্বিক তাপ, চাপ, বায়ুমণ্ডল ইত্যাদির প্রভাবে কোয়ান্টাম কণারা ডিকোহের হয়ে যেতে পারে। এ জন্য কোয়ান্টাম কম্পিউটারকে দিয়ে ঠিকঠাক কাজ করাতে হলে পরমশূন্য তাপমাত্রার খুব কাছাকাছি পরিবেশে রাখতে হয়।
কোয়ান্টাম জেনো ইফেক্ট অবশ্য বিজ্ঞানীদের বিকল্প পথ দেখাচ্ছে। কোয়ান্টাম কণাদের ডিকোহেরেন্সে প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে জেনো ইফেক্ট ব্যবহার করতে শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। সুতরাং জেনো ইফেক্ট ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে বড় ধরনের প্রভাব রাখতে চলেছে, এটা বলাই যায়।