মাটির নিচের বিশাল যন্ত্রে কীসের সংকেত, ডার্ক ম্যাটার!

ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধানে এবার কি বিজ্ঞানীরা সত্যিই নতুন কিছু পেয়েছেন?ছবি: দ্য ইকোনোমিক টাইমস

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার মাটির বেশ গভীরে বসানো আছে এক বিশাল যন্ত্র। বছরের পর বছর ধরে শত শত পদার্থবিদ এই যন্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য খুঁটিয়ে দেখছেন। এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য, মহাবিশ্বের এমন এক অদৃশ্য পদার্থের ক্ষীণতম সংকেত খুঁজে বের করা, যা দেখা যায় না, ছোঁয়াও যায় না। আমরা একে ডার্ক ম্যাটার হিসেবেই চিনি। মহাবিশ্বের গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রগুলোর গতিবিধি এই ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় প্রভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয়।

ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধানে এবার হয়তো বিজ্ঞানীরা সত্যিই নতুন কিছু পেয়েছেন। ১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা দারুন এক খবর জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার স্যানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফ্যাসিলিটিতে রয়েছে এলজেড ডার্ক ম্যাটার এক্সপেরিমেন্ট। এই যন্ত্রের ডিটেক্টর অংশে সম্প্রতি একটি অস্বাভাবিক সংকেত ধরা পড়েছে।

তবে বিজ্ঞানীরা এখনই নিশ্চিত করে বলছেন না যে তাঁরা ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করে ফেলেছেন। বরং তাঁরা বলছেন, সংকেতটি বিজ্ঞানীদের চেনা কোনো কণা-প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ঠিকমতো মিলছে না।

ডার্ক ম্যাটার মহাবিশ্বের এমন এক অদৃশ্য পদার্থ, যা দেখা যায় না, ছোঁয়াও যায় না
ছবি: সংগৃহীত

এলজেড গবেষণা দলের মুখপাত্র রিচার্ড গেইটস্কেল বলেন, ‘এখন আমরা চাই, বিশ্বের অন্য বিজ্ঞানীরাও বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মতামত দিন।’ এতদিন ধরে নিজেরা কাজ করার পর তাঁরা মনে করছেন, এখনই এই অনুসন্ধানের ফল বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সেরা সময়।

গবেষণার ফল প্রথম জানানো হয় জাপানে আয়োজিত একটি কণা-জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান সম্মেলনে। এর কয়েক ঘণ্টা পর এলজেড দল তাদের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করে। এটি পিয়ার রিভিউর জন্য বিখ্যাত ফিজিক্যাল রিভিউ লেটার্স বিজ্ঞান সাময়িকীতে জমা দেওয়া হবে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা এখনই নিশ্চিত করে বলছেন না যে তাঁরা ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করে ফেলেছেন। বরং তাঁরা বলছেন, সংকেতটি বিজ্ঞানীদের চেনা কোনো কণা-প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে ঠিকমতো মিলছে না।

অদৃশ্য কণার খোঁজে

ডার্ক ম্যাটার কয়েক দশক ধরে খুঁজলেও তা এখনো বিজ্ঞানীদের কাছে অধরা। কারণ, এটি আলো ছড়ায় না, আলো শোষণ করে না, এমনকি আলো প্রতিফলিতও করে না। অথচ মহাবিশ্বে এর পরিমাণ বিপুল! বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার। এই ডার্ক ম্যাটার আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা জানতে পদার্থবিদদের আগ্রহের শেষ নেই। ডার্ক ম্যাটারের প্রকৃতি নিয়ে বিজ্ঞানীরা নানা রকম তত্ত্ব দিয়েছেন। এটি কেমন কণা দিয়ে তৈরি হতে পারে বা সাধারণ পদার্থের সঙ্গে কীভাবে বিক্রিয়া করতে পারে, এসব নিয়ে অনেক ধারণা তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি সম্ভাবনার নাম উইকলি ইন্টারঅ্যাকটিং ম্যাসিভ পার্টিকল। সংক্ষেপে একে বলা হয় উইম্প। ধারণা করা হয়, এই কণাগুলো পরমাণুর ভেতরের অংশের (যেমন প্রোটন বা নিউট্রন) তুলনায় বেশ ভারী। আমাদের চেনা দৃশ্যমান জগতের সঙ্গে এদের যোগাযোগ খুব দুর্বল।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, মহাবিশ্বের মোট পদার্থের প্রায় ৮৫ শতাংশই ডার্ক ম্যাটার
ছবি: নাসা

এরা মূলত মহাকর্ষ এবং অতি দুর্বল নিউক্লীয় বলের মাধ্যমেই অন্য পদার্থের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে তত্ত্ব অনুযায়ী, খুব বিরল ক্ষেত্রে একটি উইম্প কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। সেই সংঘর্ষে সামান্য পরিমাণ শক্তি তৈরি হওয়ার কথা। বিজ্ঞানীরা এখন সেই শক্তির ক্ষীণ সংকেতটিই ধরার চেষ্টা করছেন।

এই কণা খুঁজতে বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে নতুন নতুন ডিটেক্টর তৈরি করেছেন। এই ডিটেক্টরগুলো আগের চেয়ে আরও বড় এবং আরও সংবেদনশীল। দীর্ঘদিন ধরে এগুলোতে উইম্পের খোঁজ চলছে। প্রযুক্তি উন্নত হয়েছে, অনুসন্ধানও নিখুঁত হয়েছে। তবু ডার্ক ম্যাটার ধরা দেয়নি। এবার কি তবে সেই অপেক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে?

আরও পড়ুন
ধারণা করা হয়, এই উইকলি ইন্টারঅ্যাকটিং ম্যাসিভ পার্টিকলগুলো পরমাণুর ভেতরের অংশের তুলনায় বেশ ভারী। আমাদের চেনা দৃশ্যমান জগতের সঙ্গে এদের যোগাযোগ খুব দুর্বল।

মাটির নিচে কেন ডিটেক্টর

এলজেড ডিটেক্টরটি মূলত একটি বিশাল ট্যাংক। এতে সাত টনেরও বেশি তরল জেনন রয়েছে। কোনো কণা এই ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে জেনন পরমাণুর সঙ্গে বিক্রিয়া করলে সেখানে এক বিশেষ ধরনের আলোর ঝলক তৈরি হয়। একই সঙ্গে তৈরি হয় ইলেকট্রনের একটি প্রবাহ। এই দুই ধরনের সংকেত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, ঠিক কী ধরনের কণা ডিটেক্টরে ঢুকেছিল। শুধু তা-ই নয়, এর ভর কত হতে পারে এবং ডিটেক্টরের ঠিক কোন জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে, সেটাও জানা যায়।

এলজেড ডিটেক্টরটি মূলত একটি বিশাল ট্যাংক
ছবি: সানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফেসিলিটি

সমস্যা হলো, ডিটেক্টরে শুধু ডার্ক ম্যাটারের কণাই আসে না। আমাদের পরিচিত নানা কণাও সেখানে ঢুকে পড়ে এবং সংকেত তৈরি করে। তাই অন্য সব ঘটনার ভিড় থেকে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংকেতকে আলাদা করা ভীষণ কঠিন। এ কারণেই ডিটেক্টরটিকে মাটির প্রায় এক মাইল গভীরে রাখা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের গবেষক ও এলজেডের বিজ্ঞানী আলভিনে কামাহা এই কাজটিকে খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

আরও পড়ুন
কোনো কণা এই এলজেড ডিটেক্টর নামের ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে জেনন পরমাণুর সঙ্গে বিক্রিয়া করলে সেখানে এক বিশেষ ধরনের আলোর ঝলক তৈরি হয়। একই সঙ্গে তৈরি হয় ইলেকট্রনের একটি প্রবাহ।

পৃথিবীর ওপর প্রতিনিয়ত মহাকাশের নানা ধরনের বিকিরণ ছুটে আসে। সেগুলো ডিটেক্টরে পৌঁছালে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার কণা-প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। কিন্তু মাটির বিশাল স্তর এই বিকিরণের বেশির ভাগকেই আটকে দেয়। তা ছাড়া ডিটেক্টরের চারপাশে পানি রয়েছে। এটি নিউট্রন সাহায্য করে। কারণ, নিউট্রনের তৈরি সংকেত অনেক সময় ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংকেতের মতোই দেখতে হতে পারে। পাশাপাশি তরল জেননকেও খুব ভালোভাবে বিশুদ্ধ করা হয়। সামান্য তেজস্ক্রিয় দূষণ থাকলেও তা ডিটেক্টরে অপ্রয়োজনীয় কণা-প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছেন, যেখানে ডিটেক্টরে অপ্রয়োজনীয় কণা কম ঢুকবে। যেন এই শান্ত পরিবেশে উইম্পের ক্ষীণতম সংকেতও ঠিকমতো ধরা পড়ে।

আরও পড়ুন
ঘটনাটি যে সত্যিই ডার্ক ম্যাটারের সংকেত, এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। হিসাব অনুযায়ী, ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় বা ভুল সংকেত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৪০০টির মধ্যে একটি।

নতুন যা পাওয়া গেল

এলজেড ডিটেক্টর কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন ডজনখানেক কণা-প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করেছে। গবেষকেরা সেখান থেকে ২২০ দিনের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করেন। প্রথমে তাঁরা এমন সব ঘটনা বাদ দেন, যেগুলো উইম্পের তাত্ত্বিক মডেলের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে মেলে না। এভাবে আসলে কিছুই পাওয়া যায়নি। এরপর উইম্প কণার আরও জটিল বৈশিষ্ট্য ধরে তৈরি করা বিভিন্ন তত্ত্বও বিবেচনায় নেওয়া হয়। দেখা যায়, এত সব তথ্য-উপাত্ত ছেঁকে শেষ পর্যন্ত একটি মাত্র ঘটনা টিকে আছে!

ঘটনাটি ঘটেছিল ২০২৩ সালের ১৬ জুন। সেদিন একটি কণা এলজেড ডিটেক্টরের ভেতরে ঢুকে একটি জেনন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করেছিল। সেই সংঘর্ষের ফলে আলোর একটি ক্ষীণ ঝলক ও বৈদ্যুতিক চার্জের একটি প্রবাহ তৈরি হয়। ডিটেক্টর দুটি সংকেতই ধরে ফেলতে সক্ষম হয়। এই একটি ঘটনাই এখন বিজ্ঞানীদের চরম কৌতূহলী করে তুলেছে।

এলজেড ডিটেক্টর কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন ডজনখানেক কণা-প্রতিক্রিয়া রেকর্ড করেছে
ছবি: সানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফেসিলিটি

তবে এখানেও বড় একটি সতর্কতা আছে। ঘটনাটি যে সত্যিই ডার্ক ম্যাটারের সংকেত, এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। হিসাব অনুযায়ী, ঘটনাটি নিছক কাকতালীয় বা ভুল সংকেত হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৪০০টির মধ্যে একটি।

কণা পদার্থবিদ্যার ভাষায় এর নির্ভরযোগ্যতা প্রায় ‘৩-সিগমা’। মানে, এতে দুর্ঘটনাবশত বা এলোমেলো কোনো ভুল হওয়ার আশঙ্কা ৯৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ দূর করা সম্ভব হয়েছে। কোনো নতুন কণা বা নতুন ঘটনা আবিষ্কারের দাবি করতে বিজ্ঞানীরা সাধারণত ‘৫-সিগমা’ নির্ভরযোগ্যতা চান। তাই এখনই এটিকে নতুন কণা আবিষ্কারের দাবি বলা যাচ্ছে না। তবে এটিকে খুব আকর্ষণীয় একটি ইঙ্গিত হিসেবে ধরা যেতেই পারে।

আরও পড়ুন
একটি কণা এলজেড ডিটেক্টরের ভেতরে ঢুকে একটি জেনন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করেছিল। সেই সংঘর্ষের ফলে আলোর একটি ক্ষীণ ঝলক ও বৈদ্যুতিক চার্জের একটি প্রবাহ তৈরি হয়।

এলজেড দলের মুখপাত্র গেইটস্কেলও বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক। তাঁর মতে, ঘটনাটি সাধারণ পদার্থের এমন কোনো মিথস্ক্রিয়ার ফলও হতে পারে, যা বিজ্ঞানীরা এখনো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেননি। আরও নতুন তথ্য এলেই এই প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে। ডার্ক ম্যাটারের রহস্য আদৌ সমাধান হবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ, এলজেড ডিটেক্টর এখনো তার কাজ থামায়নি। সর্বশেষ গবেষণায় যে ২২০ দিনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল, এরপর থেকে ডিটেক্টরটি প্রায় চার গুণ বেশি ঘটনা রেকর্ড করেছে।

তাই গবেষকদের হাতে এখন আরও অনেক বেশি তথ্য আছে। সেই তথ্যের মধ্যে তাঁরা খুঁজবেন, একই ধরনের আরও কোনো সংকেত আছে কি না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু এলজেডই এই সংকেতের রহস্য সমাধানের চেষ্টা করছে না। ইতালি ও চীনে আরও দুটি গবেষণা দল তরল জেনন ব্যবহার করে ডার্ক ম্যাটারের অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। এই দুই দলের পরীক্ষায় একই ধরনের কোনো ঘটনা ধরা পড়বে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে অন্য পরীক্ষাগুলো হয়তো এলজেডের পাওয়া রহস্যময় সংকেতটি বুঝতে দারুণ সাহায্য করবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস

আরও পড়ুন