ডার্ক ম্যাটার ও কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে এক বৈপ্লবিক প্রস্তাবনা

মহাবিশ্বের বিশাল ক্যানভাসে আমরা যা কিছু দেখি, তা মোট ভরের মাত্র ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশই এক রহস্যময় অদৃশ্য জগৎ, যার প্রায় ২৭ শতাংশ জুড়ে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার। ডার্ক ম্যাটার আলো শোষণ বা প্রতিফলন করে না, কিন্তু এর বিপুল মহাকর্ষীয় টান গ্যালাক্সিলোকে অদৃশ্য সুতোর মতো একত্রে ধরে রাখে। এটি না থাকলে নক্ষত্রগুলো মহাশূন্যে ছিটকে পড়ত। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে একে উইম্পস বা উইকলি ইন্টারঅ্যাক্টিং ম্যাসিভ পার্টিকলসের মতো অজানা কোনো রহস্যময় কণা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু দশকের পর দশক চেষ্টা করেও ল্যাবরেটরিতে এর কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। এই অচলাবস্থার মাঝেই স্প্যানিশ বিজ্ঞানী এনরিক গাজতানাগা একটি চমকপ্রদ ও বৈপ্লবিক তত্ত্ব প্রস্তাব করেছেন। তাঁর মতে, ডার্ক ম্যাটার কোনো অজানা কণা নয়, বরং এটি আগের মহাবিশ্বের কৃষ্ণগহ্বরের অবশিষ্টাংশ।

ডার্ক ম্যাটার না থাকলে নক্ষত্রগুলো মহাশূন্যে ছিটকে পড়ত
ছবি: রালফ কাহলার/এসএলএসি ন্যাশনাল এক্সিলারেটর ল্যাবরেটরি/আমেরিকান মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি

গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণনগতি পর্যবেক্ষণ করে প্রথম ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বোঝা যায়। দেখা যায়, দৃশ্যমান ভরের তুলনায় গ্যালাক্সিগুলোর মহাকর্ষীয় টান অনেক বেশি শক্তিশালী। এই অতিরিক্ত টানের জোগান যে উপাদান দেয়, তাকেই আমরা ডার্ক ম্যাটার বলি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ডার্ক ম্যাটার আলো বা বিদ্যুৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণের সঙ্গে কোনো মিথস্ক্রিয়া করে না। এটি গ্যালাক্সিগুলোকে অদৃশ্য সুতোর মতো একত্রে ধরে রাখে। বিজ্ঞানীরা আগে ধারণা করতেন, এটি অজানা কোনো রহস্যময় কণা দিয়ে গঠিত; কিন্তু বাস্তবে ল্যাবরেটরিতে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন
গ্যালাক্সিগুলোর ঘূর্ণনগতি পর্যবেক্ষণ করে প্রথম ডার্ক ম্যাটারের অস্তিত্ব বোঝা যায়। দেখা যায়, দৃশ্যমান ভরের তুলনায় গ্যালাক্সিগুলোর মহাকর্ষীয় টান অনেক বেশি শক্তিশালী।

গাজতানাগার এই প্রস্তাবনাটি মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্বের প্রচলিত ধারণাকে একটি বিকল্প রূপ দেয়। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল একটি বিন্দু বা সিঙ্গুলারিটি থেকে। কিন্তু গাজতানাগা প্রস্তাব করেছেন বিগ বাউন্স মডেল। এই মডেল বলছে, বর্তমান মহাবিশ্ব শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়নি; বরং এর আগেও আরও একটি মহাবিশ্ব বিদ্যমান ছিল। সেই আগের মহাবিশ্ব সময়ের সঙ্গে সংকুচিত হতে হতে একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌঁছানোর পর আবার প্রসারিত হতে শুরু করে। রাবারের বল দেয়ালে ড্রপ খাওয়ার মতো এই ঘটনাকে বলা হয় বাউন্স।

সংকোচনের সেই ভয়াবহ পর্যায়ে আগের মহাবিশ্বের বিশাল নক্ষত্র ও পদার্থগুলো অত্যন্ত ঘন হয়ে বিপুলসংখ্যক কৃষ্ণগহ্বর তৈরি করেছিল। বর্তমান মহাবিশ্বের প্রসারণ শুরু হলে সেই কৃষ্ণগহ্বরগুলো মহাজাগতিক ধ্বংসাবশেষ বা রেলিক কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে থেকে যায়। এগুলো আকারে অতিক্ষুদ্র থেকে শুরু করে বিশাল বড় হতে পারে।

ডার্ক ম্যাটারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আলো শোষণ বা প্রতিফলন করে না, কিন্তু এর প্রচণ্ড মহাকর্ষীয় টান আছে। কৃষ্ণগহ্বরও ঠিক একই কাজ করে। গাজতানাগার মতে, কোটি কোটি রেলিক কৃষ্ণগহ্বরই সমষ্টিগতভাবে ডার্ক ম্যাটার হিসেবে আমাদের সামনে প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি একটি গাণিতিক সমস্যারও সমাধান করে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে এমন কিছু বিশাল ভরের গ্যালাক্সির খোঁজ পেয়েছে, যা প্রচলিত তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। গাজতানাগার তত্ত্ব বলছে, এগুলো আসলে পূর্ববর্তী মহাবিশ্ব থেকে আসা কৃষ্ণগহ্বর, যা মহাবিশ্বের শুরুতেই পর্যাপ্ত ভর সরবরাহ করে গ্যালাক্সি গঠনে সহায়তা করেছে। এই প্রকল্পটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের বড় একটি বাধা দূর করতে পারে। বিগ ব্যাং তত্ত্বে সিঙ্গুলারিটি বা অসীম ঘনত্বের যে গাণিতিক সমস্যা ছিল, বিগ বাউন্স মডেলে তার প্রয়োজন পড়ে না।

আরও পড়ুন
গাজতানাগার মতে, কোটি কোটি রেলিক কৃষ্ণগহ্বরই সমষ্টিগতভাবে ডার্ক ম্যাটার হিসেবে আমাদের সামনে প্রতীয়মান হচ্ছে। এটি একটি গাণিতিক সমস্যারও সমাধান করে।

অবশ্য আরেকটি প্রস্তাবনা বলছে, ডার্ক ম্যাটার আসলে আমাদের মহাবিশ্বের কোনো উপাদান নয়, বরং অন্য এক সমান্তরাল মহাবিশ্বের ধ্বংসাবশেষ থেকে আসা প্রাচীন কৃষ্ণগহ্বর। তবে এই প্রস্তাবনাটি একটু ভিন্ন। এর মূলে রয়েছে মহাবিশ্বের জন্মমুহূর্ত বা বিগ ব্যাংয়ের অতিদ্রুত সম্প্রসারণের কাল, যাকে বলা হয় কসমিক ইনফ্লেশন। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, এই সময়ে স্থান-কালের মধ্যে কোয়ান্টাম অস্থিরতার কারণে আমাদের মহাবিশ্বের পাশাপাশি আরও অনেক ছোট ছোট বুদবুদ মহাবিশ্ব তৈরি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

এই সমান্তরাল মহাবিশ্বগুলো পর্যাপ্ত শক্তি সঞ্চয় করতে না পেরে সংকুচিত হয়ে যায় এবং প্রচণ্ড ঘনত্বের বিন্দুতে পরিণত হয়। এই মৃত মহাবিশ্বগুলোই আদিম কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে আমাদের মহাবিশ্বে রয়ে গেছে। এই তত্ত্বটি শুধু ডার্ক ম্যাটারের রহস্যই সমাধান করে না, বরং এটি মাল্টিভার্সের ধারণাকেও পরোক্ষভাবে সমর্থন করে।

শিল্পীর কল্পনায় কসমিক ইনফ্লেশন ও পরবর্তী মহাবিশ্বের বিবর্তনের ছবি
ছবি: নিউ সায়েন্টিস্ট

আমাদের মহাবিশ্বের ভেতরে অন্য কোনো ব্যর্থ মহাবিশ্বের অবশিষ্টাংশ যদি কৃষ্ণগহ্বর হিসেবে বিদ্যমান থাকে, তবে তা প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের সৃষ্টি কোনো একক ঘটনা ছিল না, বরং এটি একটি বিশাল প্রক্রিয়ার অংশ। এই মডেলটি ব্যাখ্যা করে, আমাদের চারপাশের মহাকাশ আসলে অসংখ্য মৃত মহাবিশ্বের সমাধিভূমি হতে পারে, যা বর্তমানে ডার্ক ম্যাটার হিসেবে আমাদের মিল্কিওয়ে বা অন্যান্য গ্যালাক্সির কাঠামো ধরে রেখেছে।

তবে গাজতানাগার প্রস্তাবনাটি মহাবিশ্বের অনেক জটিল ধাঁধার উত্তর দিলেও গবেষণাটি আপাতত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গাণিতিক ও তাত্ত্বিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। পরীক্ষামূলক প্রমাণের অভাবই বর্তমানে এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আবিষ্কারগুলো এই তত্ত্বের পক্ষে জোরালো পরোক্ষ সমর্থন দিলেও কণা পদার্থবিজ্ঞানীরা এখনো হাল ছাড়েননি। তাঁরা মাটির নিচের অতিসংবেদনশীল ডিটেক্টরে ডার্ক ম্যাটারের কণা খুঁজেই চলেছেন।

আরও পড়ুন
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের মতে, এই সময়ে স্থান-কালের মধ্যে কোয়ান্টাম অস্থিরতার কারণে আমাদের মহাবিশ্বের পাশাপাশি আরও অনেক ছোট ছোট বুদবুদ মহাবিশ্ব তৈরি হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

বিজ্ঞানী মহলে গবেষণাটির বর্তমান ঐকমত্য হলো, একে এখনই ধ্রুব সত্য হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। এই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বিজ্ঞানীদের এখন দুটি প্রধান পরীক্ষামূলক প্রমাণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এক, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মাধ্যমে সরাসরি এই রেলিক কৃষ্ণগহ্বরগুলোর অস্তিত্ব শনাক্ত করা। এবং দুই, কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডের আদি মানচিত্রের সঙ্গে এই প্রস্তাবনার সামঞ্জস্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা।

আগামী দিনে যদি মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণে এই তত্ত্বটি প্রমাণিত হয়, তবে তা জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি শুধু ডার্ক ম্যাটারের রহস্যই ভেদ করবে না, বরং প্রথমবারের মতো আমরা বুঝতে পারবো যে মহাবিশ্ব কোনো একক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আদি-অন্তহীন এক মহাজাগতিক চক্রের অংশ।

ডার্ক ম্যাটার ও কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যকার এই সম্ভাব্য সম্পর্ক মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের মৌলিক ধারণাকে নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনে এসব নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানের জগতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। যদিও এসব এখনো গাণিতিক মডেল এবং তত্ত্বের পর্যায়ে রয়েছে, তবে ভবিষ্যতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই আদিম কৃষ্ণগহ্বরগুলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হতে পারে। এসবের কোনোটি যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে আমরা জানতে পারব যে আমাদের অস্তিত্বের নেপথ্যে থাকা অদৃশ্য শক্তিটি আসলে অন্য এক মহাবিশ্বের শেষ চিহ্ন। মহাবিশ্বের ইতিহাস ও এর জন্মরহস্য উন্মোচনে এই রেলিক কৃষ্ণগহ্বর তত্ত্ব আগামী দিনে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে।

লেখক: বিজ্ঞানবক্তা

সূত্র: ফিজিক্যাল রিভিউ ডি জার্নাল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি এবং সায়েন্স ডেইলি

আরও পড়ুন