কোয়ান্টাম জগৎ কি আসলেই অদৃশ্য

কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি অনিশ্চয়তা তত্ত্ব। তাই একে ঘিরে পদার্থবিজ্ঞানে অদ্ভুত সব নীতি রয়েছে। এসব নিয়ে মিথ বা প্রচলিত ভুল ধারণারও কোনো অভাব নেই। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের এমন নানা মিথ নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তায় নিয়মিত আলোচনা করা হবে। আজ রইল এই আয়োজনের দ্বিতীয় কিস্তি।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কারবার খুদে কণাদের নিয়ে। চাইলেই সেই জগৎ চাক্ষুষ করা যায় না। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিখুঁত কোনো ছবিও আঁকা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ভিজ্যুয়ালাইজেশন বলে, তা নাকি এখানে খাটে না! এমনকি এই জগতের কোনো স্পষ্ট ছবি কল্পনায় আঁকাও নাকি অসম্ভব—পদার্থবিজ্ঞানে এমন কথা বেশ চালু আছে।

তাই বলে কি এটাই ধ্রুব সত্য? কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জগৎ কি আমাদের কাছে সত্যিই সম্পূর্ণ অদৃশ্য?কোয়ান্টাম বলবিদ্যা মূলত হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব এবং শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশন মেনে চলে। এই দুই তত্ত্ব সম্ভাবনা ও সুপারপজিশনের ধারণা মেনে পদার্থবিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করে। আর এ কারণেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যা মানেই একটি বিমূর্ত গাণিতিক ধারণা, এমন মতটাই সবচেয়ে বেশি জোরালো।

কোয়ান্টাম জগৎটা আসলে কেমন, তা ভিজ্যুয়ালাইজ করা; অর্থাৎ এর একটি কাল্পনিক চিত্র তৈরি করা অত্যন্ত দুরূহ। এটি অধিকাংশ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীর মত। কিন্তু তাই বলে কোনো কোয়ান্টাম পরিঘটনা ভিজ্যুয়ালাইজ করা কি একদমই অসম্ভব?

একেবারেই অসম্ভব হলে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এত উন্নতি করাও অসম্ভব হতো। ধরুন, একটি পরমাণুর ভেতর ইলেকট্রন কীভাবে থাকে? কণা-তরঙ্গের মেঘের মতো। সেই মেঘটা দেখতে কেমন হতে পারে, তার কিন্তু একটি ছবি আছে। অনেকে বলতে পারেন, সেই ছবিই যে বাস্তব, তার তো কোনো প্রমাণ নেই। কথা সত্য, প্রমাণ নেই। কিন্তু আমরা তো প্রমাণ চাই না, আমরা ভিজ্যুয়ালাইজ বা কল্পনা করতে চাই। আর সেই কাজে আমরা সফল। তাই ইলেকট্রনের শক্তিস্তরগুলো কেমন হবে, তারও একটি কাল্পনিক ছবি আমরা আঁকতে পারি।

আরও পড়ুন
কোয়ান্টাম বলবিদ্যা মূলত হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব এবং শ্রোডিঙ্গারের তরঙ্গ ফাংশন মেনে চলে। এই দুই তত্ত্ব সম্ভাবনা ও সুপারপজিশনের ধারণা মেনে পদার্থবিজ্ঞানকে ব্যাখ্যা করে।

শুধু এটাই শেষ নয়, এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে। বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম বড় একটি কাজ। বিভিন্ন ধাপে কোয়ান্টাম কণাদের পরম শূন্য তাপমাত্রায় ঠান্ডা করে একেবারে নিশ্চল করে ফেলা হয় এই প্রক্রিয়ায়। এটি শুধু কোনো গাণিতিক তত্ত্ব নয়; বাস্তবেই বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য বিজ্ঞানীরা প্রথমে পরীক্ষার পরিকল্পনা করেছেন, তারপর লেজার রশ্মির ফাঁদ পেতে কণাদের ঠান্ডা করেছেন। এ বিষয়ে একটি কাল্পনিক ধারণা যদি বিজ্ঞানীদের মাথায় না থাকত, তাহলে এই পরীক্ষাই অসম্ভব হতো। অসম্ভব হতো বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন বসু এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত সেই বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট ধারণার প্রমাণ দেওয়াও। এই কথা কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রতিটি পরীক্ষার জন্যই সত্য।

দুটো ধাতব পাতের উপর কাজ করা ক্যাসিমির ইফেক্ট
ছবি: উইকিপিডিয়া

কাসিমির ইফেক্টের কথা ভাবুন, এটিও পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত। অনিশ্চয়তার তত্ত্ব অনুযায়ী, শূন্যস্থান মোটেও শূন্য নয়; শূন্যস্থানেও তরঙ্গের আকারে শক্তি লুকিয়ে থাকে। ১৯৪৮ সালে ডাচ পদার্থবিদ হেনড্রিক কাসিমির প্রথম এই তত্ত্বের ধারণা দেন। তিনি একটি পরীক্ষার প্রস্তাবও করেন। তিনি বলেন, দুটি চার্জহীন ধাতব পাতকে পরস্পরের খুব কাছাকাছি রাখতে হবে।

কিন্তু কতটা কাছে? যতটা কাছে রাখলে চুল পরিমাণ ফাঁকও না থাকে। ফলে পাত দুটির ভেতরের অংশের তুলনায় বাইরের অংশে শক্তিতরঙ্গ বেশি থাকে। বাইরের এই অতিরিক্ত তরঙ্গ পাত দুটিকে ভেতরের দিকে চাপ দেয়। ফলে পাত দুটি পরস্পরের আরও ঘনিষ্ঠ হয়। দেখে মনে হয়, পাত দুটি পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। এই ঘটনাকেই বলে কাসিমির ইফেক্ট।

আরও পড়ুন
অনিশ্চয়তার তত্ত্ব অনুযায়ী, শূন্যস্থান মোটেও শূন্য নয়; শূন্যস্থানেও তরঙ্গের আকারে শক্তি লুকিয়ে থাকে। ১৯৪৮ সালে ডাচ পদার্থবিদ হেনড্রিক কাসিমির প্রথম এই তত্ত্বের ধারণা দেন।

হেনড্রিক কাসিমির নিজে এই তত্ত্বের প্রমাণ দিয়ে যেতে পারেননি। বরং তিনি একটি থট এক্সপেরিমেন্ট বা মানস পরীক্ষার প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর সেই পরীক্ষার আংশিক প্রমাণ দেন মার্কিন পদার্থবিদ স্টিভ ল্যামোরক্স। ১৯৯৮ সালে আরেক মার্কিন পদার্থবিদ উমর মহিউদ্দিন একটি পরীক্ষা করে কাসিমির ইফেক্টের শতভাগ প্রমাণ দেন।

কোয়ান্টাম মেকানিকসে শক্তি ও কণাদের কাজকারবার অদৃশ্য হলেও এদের প্রভাব কল্পনা করা যায়। শুধু তা-ই নয়, ছবি এঁকে কিংবা গ্রাফচিত্রের মাধ্যমেও বিজ্ঞানের এই বুনিয়াদি তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা যায়। ফরাসি কোয়ান্টাম বিশেষজ্ঞ মারগুয়াক্স খলিলের মতে, ‘কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বুঝতে হলে কল্পনাশক্তির গুরুত্ব অসীম।’

তিনি মনে করেন, কোনো তত্ত্বের মানসিক ছবি তৈরি করতে পারলে সেটি বোঝা অনেক সহজ হয়। তবে তিনি কোয়ান্টাম শিক্ষার্থীদের সতর্ক করতেও ভোলেননি। তাঁর মতে, ‘কোয়ান্টাম জগতের যে ছবি আমরা কল্পনা করি, তা বাস্তবতার সঙ্গে শতভাগ মেলে না। কারণ, কোয়ান্টাম জগৎ পুরোপুরি ভিজ্যুয়ালাইজ করা অসম্ভব।’

তবে কোয়ান্টামে অদৃশ্যতার মিথ ভাঙতে কাজ করছেন একদল আন্তর্জাতিক গবেষক। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে গবেষণারত এসব বিজ্ঞানী ‘ফিজিকস রিইমাজিনড’ নামে একটি প্রজেক্ট চালু করেছেন। এ প্রজেক্টের লক্ষ্য কোয়ান্টাম মেকানিকসের ধারণাগুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা। এই প্রকল্পের অন্যতম গবেষক জ্যানেট র‍্যাফনার নানা ধরনের ডিজাইনের মাধ্যমে কোয়ান্টামের জটিল ধারণাগুলোকে সহজ করে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

আরও পড়ুন
ফরাসি কোয়ান্টাম বিশেষজ্ঞ মারগুয়াক্স খলিলের মতে, ‘কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান বুঝতে হলে কল্পনাশক্তির গুরুত্ব অসীম।’

এই প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা শুধু বই বা সমীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। তাঁরা কোয়ান্টাম তত্ত্ব বোঝাতে নানা সৃজনশীল পদ্ধতি ব্যবহার করেন। যেমন, তাঁরা গ্রাফিক নভেল তৈরি করছেন। গল্প ও গ্রাফিকসের মাধ্যমে কোয়ান্টামের জটিল বিষয়গুলো সেসব বইয়ে তুলে ধরা হচ্ছে। কখনো অরিগ্যামির মতো ভাঁজ করা কাগজে মডেল তৈরি করা হচ্ছে, আবার কখনো ধাতব বা প্লাস্টিকের ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশনের সাহায্যেও কোয়ান্টামের জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

কোয়ান্টামের জগৎটা অদৃশ্য, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তারপরও গ্রাফচিত্র, নানা ধরনের ত্রিমাত্রিক মডেল এবং মানস পরীক্ষার মাধ্যমে এটিকে ভিজ্যুয়ালাইজ করার চেষ্টা আগেও হয়েছে। আর দিন দিন সেটি আরও উন্নত হচ্ছে। তাই কোয়ান্টাম মেকানিকসের জগৎটাকে মোটা দাগে সম্পূর্ণ অদৃশ্য বলা চলে না।

সূত্র: ফিজিকস ডটঅর্গ

আরও পড়ুন