ডার্ক ম্যাটারের খোঁজে নতুন সংকেত, রহস্য কি এবার সমাধান হবে

ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তুকে বলা যায় মহাবিশ্বের অদৃশ্য আঠাছবি: সায়েন্স ডেইলি ডটকম

মহাবিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ পদার্থই এমন এক রহস্যময় পদার্থ দিয়ে তৈরি, যা আমরা দেখতে পাই না। আলো শোষণ বা বিকিরণ করে না বলে একে সরাসরি শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি। তবু মহাকর্ষের প্রভাবে এর অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে বারবার। এই অদৃশ্য পদার্থকেই বলা হয় ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তু। প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিজ্ঞানীরা এর প্রকৃতি জানার চেষ্টা করছেন। এবার কি তবে সেই অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটার মাটির প্রায় দেড় কিলোমিটার নিচে অবস্থিত একটি গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা অদ্ভুত একটি সংকেত পেয়েছেন। তাঁদের ধারণা, এই সংকেতটি ডার্ক ম্যাটারের কণা থেকে আসতে পারে। ২০২৩ সালের ১৬ জুন ঘটে যাওয়া একটি ক্ষুদ্র কণার সংঘর্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ঘটনাটি সাধারণ কোনো কণার মিথস্ক্রিয়া দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। তবে এখনই একে ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ বলা যাচ্ছে না। গবেষকেরা নিজেরাও এ বিষয়ে বেশ সতর্ক।

মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটার গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে
ছবি: নাসা

ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তুকে বলা যায় মহাবিশ্বের অদৃশ্য আঠা। মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে এটি গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ডার্ক ম্যাটার না থাকলে মহাবিশ্বের শুধু দৃশ্যমান পদার্থ দিয়ে গ্যালাক্সির বর্তমান কাঠামো তৈরি হওয়া ও টিকে থাকা কঠিন হতো। গ্যালাক্সির ঘূর্ণন, মহাকর্ষীয় লেন্সিংসহ নানা পর্যবেক্ষণ থেকে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, মহাবিশ্বে বিপুল পরিমাণ অদৃশ্য পদার্থ রয়েছে। কিন্তু সেই পদার্থ আসলে কী দিয়ে তৈরি, তা আজও অজানা।

আরও পড়ুন
ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্তবস্তুকে বলা যায় মহাবিশ্বের অদৃশ্য আঠা। মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে এটি গ্যালাক্সিগুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যেহেতু ডার্ক ম্যাটার সরাসরি দেখা যায় না, তাই বিজ্ঞানীরা সাধারণ পদার্থের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ব্যাপারটি অনেকটা দেয়ালে পড়া ছায়া দেখে সামনে কোনো বস্তু থাকার ধারণা পাওয়ার মতো! ঠিক একইভাবে সাধারণ পদার্থের কণার সঙ্গে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংঘর্ষের চিহ্ন খুঁজছেন তাঁরা।

এই খোঁজাখুঁজির কাজে বিজ্ঞানীদের অন্যতম আগ্রহের কেন্দ্র হলো উইম্প কণা। এই কণার পূর্ণ নাম উইকলি ইন্টারঅ্যাকটিং ম্যাসিভ পার্টিকেল। ধারণা করা হয়, এসব কণা তুলনামূলক ভারী হলেও সাধারণ পদার্থের সঙ্গে খুব দুর্বলভাবে মিথস্ক্রিয়া করে।

এলজেড ডিটেক্টরের মূল অংশে রয়েছে একটি ট্যাংক, ট্যাংকে রয়েছে তরল জেনন
ছবি: সানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফেসিলিটি

ফলে প্রতিনিয়ত অসংখ্য ডার্ক ম্যাটারের কণা আমাদের চারপাশ দিয়ে চলে গেলেও সেগুলোর বেশিরভাগই কোনো পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খায় না। খুবই বিরল কোনো মুহূর্তে হয়তো একটি উইম্প সাধারণ কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করতে পারে। বিজ্ঞানীরা সেই বিরল ঘটনাটিই ধরতে চাইছেন।

এই উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে লাক্স-জেপেলিন বা সংক্ষেপে এলজেড নামে বিশাল এক ডিটেক্টর। এই ডিটেক্টরের মূল অংশে রয়েছে একটি ট্যাংক, ট্যাংকে রয়েছে তরল জেনন। কোনো কণা এসে জেনন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করলে সেখানে ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি হয়। একই সঙ্গে কিছু ইলেকট্রনও বেরিয়ে আসে। সেগুলো ট্যাংকের ওপরের দিকে চলে গিয়ে আরেকটি আলোর ঝলক তৈরি করে। এই দুই ধরনের আলোর সংকেত বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেন, সেখানে ঠিক কী ধরনের কণার সংঘর্ষ ঘটেছে।

আরও পড়ুন
এলজেড নামে বিশাল এই ডিটেক্টরের মূল অংশে রয়েছে একটি ট্যাংক, ট্যাংকে রয়েছে তরল জেনন। কোনো কণা এসে জেনন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করলে সেখানে ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি হয়।

তবে কাজটি মোটেও সহজ নয়। সূর্য ও অন্যান্য মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা গামা রশ্মি ও নিউট্রনের মতো কণাও জেনন পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। ফলে ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য সংকেত এবং সাধারণ কণার সংকেত আলাদা করা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণেই এলজেড ডিটেক্টরটিকে মাটির প্রায় ৪ হাজার ৮৫০ ফুট নিচে একটি পুরোনো স্বর্ণের খনির ভেতর স্থাপন করা হয়েছে। মাটির ওপরের বিশাল পাথরের স্তর মহাকাশ থেকে আসা অনেক ধরনের বিকিরণ আটকে দেয়। এ ছাড়া ডিটেক্টরের চারপাশেও রয়েছে নানা স্তরের সুরক্ষা, যার মধ্যে বিশেষ উপাদান ও অত্যন্ত বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এমন একটি শান্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বাইরের কণার শব্দ বা প্রভাব যতটা সম্ভব কম থাকে।

এলজেড ডিটেক্টরের চারপাশে রয়েছে নানা স্তরের সুরক্ষা, যার মধ্যে বিশেষ উপাদান ও অত্যন্ত বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা হয়েছে
ছবি: সানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফেসিলিটি

২০২১ সালের ডিসেম্বরে এলজেডের বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর বিজ্ঞানীরা অসংখ্য আলোর ঝলক পরীক্ষা করে দেখেছেন। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া প্রতিটি সন্দেহজনক সংকেতই শেষ পর্যন্ত সাধারণ পদার্থের মিথস্ক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছিল।

আরও পড়ুন
এলজেড ডিটেক্টরটি মাটির প্রায় ৪ হাজার ৮৫০ ফুট নিচে একটি পুরোনো স্বর্ণের খনির ভেতর স্থাপন করা হয়েছে। মাটির ওপরের বিশাল পাথরের স্তর মহাকাশ থেকে আসা অনেক ধরনের বিকিরণ আটকে দেয়।

কিন্তু ২০২৩ সালের ১৬ জুনের ঘটনাটি ছিল একেবারেই আলাদা। সেদিন একটি কণা জেননের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে এমন একটি সংকেত তৈরি করে, যাকে সাধারণ পদার্থের কোনো পরিচিত মিথস্ক্রিয়া দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রথমে অবশ্য বিজ্ঞানীরা বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না। অনেক বিশ্লেষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পর গবেষক দলের মনে হয়েছে, তাঁরা হয়তো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজে পেয়েছেন!

এই ঘটনাটি যদি সত্যিই কোনো উইম্প কণার কারণে ঘটে থাকে, তবে সেই কণাটির ভর একটি প্রোটনের ভরের অন্তত ২০০ গুণ হতে পারে। সেটি প্রমাণিত হলে পদার্থবিজ্ঞানে বড় ধরনের যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। কারণ, মহাবিশ্বের মৌলিক কণা ও বলগুলোর সম্পর্ক ব্যাখ্যা করার বর্তমান যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল রয়েছে, তাতে ডার্ক ম্যাটারের কোনো কণার অস্তিত্ব নেই।

তবে মাত্র একটি ঘটনাকে ডার্ক ম্যাটারের কণা শনাক্ত হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। গবেষকদের মতে, এই ঘটনাটি নিছক কোনো সাধারণ কণার সংঘর্ষ হতে পারে। বিজ্ঞানের জগতে কোনো ঘটনাকে নিশ্চিত আবিষ্কার বলতে হলে তার পরিসংখ্যানগত নির্ভরযোগ্যতা ‘৫-সিগমা’ পর্যায়ে পৌঁছাতে হয়। অর্থাৎ, ভুল করে এমন ফলাফল পাওয়ার আশঙ্কা হতে হবে প্রায় ৩৫ লাখে ১টির মতো! বর্তমান ঘটনাটি সেই মানদণ্ড থেকে এখনো অনেক দূরে।

আরও পড়ুন
২০২৩ সালের ১৬ জুন একটি কণা জেননের নিউক্লিয়াসে আঘাত করে এমন একটি সংকেত তৈরি করে, যাকে সাধারণ পদার্থের কোনো পরিচিত মিথস্ক্রিয়া দিয়ে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় না।

তার ওপর ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শুধু যে উইম্পই আছে, তা কিন্তু নয়। অ্যাক্সিয়ন নামে কাল্পনিক কণাকেও ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য প্রার্থী ভাবা হয়। এমনকি মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকে তৈরি হওয়া অতি ক্ষুদ্র আদিম কৃষ্ণগহ্বরকেও এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক বিজ্ঞানী।

অ্যাক্সিয়ন নামে কাল্পনিক কণাকেও ডার্ক ম্যাটারের সম্ভাব্য প্রার্থী ভাবা হয়
ছবি: সাইটেক ডেইলি

তাই বিজ্ঞানীরা সত্যিই ডার্ক ম্যাটারের কণার দেখা পেয়েছেন কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ঘটনাটি নিঃসন্দেহে দারুণ কৌতূহল জাগানোর মতো। এলজেডে প্রতিদিনই তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও সংকেত পাওয়া গেলে এবং সেগুলোকে সাধারণ কোনো পদার্থের মিথস্ক্রিয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা না গেলে, উইম্পের পক্ষে প্রমাণ অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

আরও পড়ুন