আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা বনাম নিউটনের গতি সূত্র

আলবার্ট আইনস্টাইন ও আইজ্যাক নিউটনছবি: অরিন টার্নার / গডফ্রি নেলার

কোনো বস্তু যখন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়, পদার্থবিজ্ঞানে তাকে কিছু নির্দিষ্ট এককের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। আমরা যখন পথ চলি, তখন শুরুর বিন্দু থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত সোজাসুজি দূরত্বকে বলা হয় সরণ। কিন্তু শুধু কতটুকু গেলাম তা জানলেই চলে না, কোন দিকে গেলাম সেটিও বড় কথা। যখন গতির সঙ্গে দিক জুড়ে দেওয়া হয়, তখন তাকে আমরা বলি বেগ। আর এই বেগের পরিবর্তনের হারকেই বলা হয় ত্বরণ। অর্থাৎ, আপনি যখন সাইকেলের গতি বাড়াচ্ছেন বা কমাচ্ছেন, তখন সেখানে ত্বরণ কাজ করছে।

নিউটনের নিয়ম ও বিলিয়ার্ড বলের ভরবেগ

আমাদের চারপাশে চলা গাড়ি বা বিমান আলোর গতির চেয়ে অনেক ধীরে চলে। এসব যানবাহনের নড়াচড়া ব্যাখ্যা করার জন্য নিউটনের গতির সূত্রগুলোই যথেষ্ট। এখানে একটি মজার বিষয় হলো ভরবেগ। কোনো বস্তুর ভর ও বেগের গুণফলই হলো ভরবেগ। গাণিতিক ভাষায় P = mv। এখানে P মানে বস্তুর ভরবেগ, m মানে বস্তুর ভর এবং v মানে বস্তুর বেগ।

এখন একটা বিলিয়ার্ড টেবিলের কথা ভাবুন। একটি বল যখন অন্যটিকে ধাক্কা দেয়, তখন তাদের মধ্যে একটি সংরক্ষণশীল বিনিময় ঘটে। বাইরের কোনো প্রভাব না থাকলে, ধাক্কার আগে বল দুটির মোট যে ভরবেগ ছিল, ধাক্কার পরেও সেই মোট ভরবেগ একই থাকে।

বিলিয়ার্ড টেবিলে একটি বল যখন অন্যটিকে ধাক্কা দেয়, তখন তাদের মধ্যে একটি সংরক্ষণশীল বিনিময় ঘটে
ছবি: পাইরো ফোর-ডি / পিক্সাবে

আবার কোনো স্থির বস্তুকে নির্দিষ্ট বেগে সচল করতে যে পরিমাণ কাজ করতে হয়, সেটিই তার মাঝে শক্তি হিসেবে জমা থাকে। একে আমরা বলি গতিশক্তি। গাণিতিক ভাষায় K = 1/2mv2। এখানে K বলতে বোঝায় বস্তুর গতিশক্তি, m মানে বস্তুর ভর এবং v মানে বস্তুর বেগ। অর্থাৎ, আপনার গতি যদি দ্বিগুণ হয়, আপনার গতিশক্তি বেড়ে যাবে চার গুণ!

আরও পড়ুন
কোনো স্থির বস্তুকে নির্দিষ্ট বেগে সচল করতে যে পরিমাণ কাজ করতে হয়, সেটিই তার মাঝে শক্তি হিসেবে জমা থাকে। একে আমরা বলি গতিশক্তি। গাণিতিক ভাষায় K = 1/2mv2

নিউটনের গতির সূত্র

১৬৮৭ সাল। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মহাবিস্ফোরণ ঘটালেন আইজ্যাক নিউটন। তাঁর প্রিন্সিপিয়া গ্রন্থে তিনি গতির এমন তিনটি নিয়মের কথা বললেন, যা দিয়ে পৃথিবীর ধূলিকণা থেকে শুরু করে মহাশূন্যের বিশাল গ্রহের নড়াচড়া পর্যন্ত নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব।

প্রথম সূত্র: জড়তার গল্প

ধরুন, আপনি কোনো জায়গায় যাওয়ার জন্য বাসে উঠলেন। বাসের সিটে বসে থাকা অবস্থায় হুট করে বাস চলা শুরু করল এবং আপনি পেছনের দিকে হেলে পড়লেন। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কেন এমন হয়? এই ঘটনার জন্য দায়ী নিউটনের প্রথম সূত্র।

জড়তার কারণে বাসের সিটে বসে থাকা অবস্থায় বাস হুট করে চলা শুরু করলে আমরা পেছনের দিকে হেলে পড়ি
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

নিউটনের প্রথম সূত্র বলছে, বাইরে থেকে কোনো বল বা ধাক্কা না দিলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে, আর সচল বস্তু সমান গতিতে সোজা পথে চলতেই থাকবে। একে আমরা বলি জড়তা। কোনো বস্তু নিজের অবস্থা বদলাতে চায় না বলেই বাসের সিটে বসে থাকা অবস্থায় বাস হুট করে চলা শুরু করলে আমরা পেছনের দিকে হেলে পড়ি।

দ্বিতীয় সূত্র: বল, ভর ও ত্বরণ

নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রটি মূলত একটি গাণিতিক হিসাব। এটি বলছে, কোনো বস্তুর ওপর আপনি কতটুকু বল প্রয়োগ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে বস্তুটির ত্বরণ বা বেগের পরিবর্তন ঘটবে। তবে এখানে বড় বাধা হলো বস্তুটির ভর। একটি ভারী ট্রাককে ঠেলে সরাতে যতটুকু জোর লাগবে, একটি ছোট সাইকেল সরাতে তার চেয়ে অনেক কম বল দরকার। অর্থাৎ, ভর যত বেশি হবে, তাকে ত্বরান্বিত করতে তত বেশি বলের প্রয়োজন হবে। নিউটনের দ্বিতীয় সূত্রের গাণিতিক রূপটি হলো: F=ma। এখানে F মানে বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল, m মানে বস্তুর ভর এবং a মানে বস্তুর ত্বরণ।

আরও পড়ুন
নিউটনের প্রথম সূত্র বলছে, বাইরে থেকে কোনো বল বা ধাক্কা না দিলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে, আর সচল বস্তু সমান গতিতে সোজা পথে চলতেই থাকবে। একে আমরা বলি জড়তা।

তৃতীয় সূত্র: যেমন কাজ, তেমন ফল

এই সূত্রটি আমাদের অনেকেরই খুব প্রিয়। সূত্রটি হলো, প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। নৌকা থেকে যখন আপনি জেটিতে লাফ দেন, তখন আপনার পা নৌকাকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়, এটা ক্রিয়া। আর নৌকাও আপনাকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়, এটা প্রতিক্রিয়া। এই ধাক্কাধাক্কি একসঙ্গেই ঘটে। রকেট যখন মহাকাশে ওড়ে, তখন সে নিচের দিকে প্রচণ্ড বেগে গ্যাস বের করে দেয়। সেই গ্যাসের প্রতিক্রিয়া বলই রকেটকে ওপরের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়।

নিউটনের তৃতীয় সূত্রের উদাহরণ
ছবি: প্র্যাক্সি ল্যাবস

নিউটনের এই গতির সূত্রগুলোর সাহায্যেই গ্রহের নক্ষত্রের চারদিকে ঘোরার কারণ অনায়াসে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু বিজ্ঞানের এই সূত্রগুলো কি সবজান্তা? মোটেও না। কোনো বস্তু যখন আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ছুটতে শুরু করে কিংবা যেখানে মহাকর্ষ বল প্রচণ্ড শক্তিশালী, সেখানে নিউটনের এই সাধারণ সূত্রগুলো আর কাজ করে না। তখন আমাদের শরণাপন্ন হতে হয় আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা বা রিলেটিভিটি তত্ত্বের কাছে।

আরও পড়ুন
নৌকা থেকে যখন আপনি জেটিতে লাফ দেন, তখন আপনার পা নৌকাকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়, এটা ক্রিয়া। আর নৌকাও আপনাকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়, এটা প্রতিক্রিয়া।

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা

১৯০৫ সাল। এক তরুণ পেটেন্ট ক্লার্ক আলবার্ট আইনস্টাইন পদার্থবিজ্ঞানের পুরোনো সব খাতা উল্টেপাল্টে দিয়ে এক নতুন মহাজাগতিক ব্যাকরণ লিখে ফেললেন। এর নাম আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব বা স্পেশাল রিলেটিভিটি। এই তত্ত্ব বলছে, মহাবিশ্বে সময়ের গতি সবার জন্য এক নয়; কে কত গতিতে চলছেন, তার ওপরই নির্ভর করে সময়ের প্রবাহ। পরে আইনস্টাইন মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে তৈরি করেন আপেক্ষিকতার আরেকটি তত্ত্ব, জেনারেল রিলেটিভিটি বা সাধারণ আপেক্ষিকতা। একে সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্বও বলা হয়।

স্পেশাল রিলেটিভিটি

আইনস্টাইন দুটি মৌলিক সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে এই তত্ত্ব গড়েছিলেন। এক, আপনি যে বেগেই চলেন না কেন, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম সবার জন্য এক। দুই, শূন্যস্থানে আলোর গতি ধ্রুব; অর্থাৎ আলোর উৎসের বেগ যা-ই হোক, তার গতিবেগ সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটারই থাকবে।

স্পেশাল রিলেটিভিটির উদাহরণ
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

এই তত্ত্ব আমাদের প্রচলিত সময় ও স্থানের ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। ধরুন, একটি ট্রেন আলোর গতির কাছাকাছি বেগে চলছে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দর্শক দেখবেন, ট্রেনের ভেতরের ঘড়ি খুব ধীরে চলছে এবং ট্রেনের দৈর্ঘ্যও সংকুচিত হয়ে গেছে! কারণ এই তত্ত্ব অনুসারে, যখন কোনো বস্তু খুব দ্রুত চলে, তখন তার জন্য সময় ধীরে চলে।

রিলেটিভিটির আরেকটি কঠিন নিয়ম হলো, ভর আছে এমন কোনো বস্তুই শূন্যস্থানে আলোর গতির সমান বেগে চলতে পারবে না। কারণ, আলোর গতি স্পর্শ করতে হলে দরকার হবে অসীম শক্তির, যা বাস্তবে অসম্ভব।

আরও পড়ুন
ধরুন, একটি ট্রেন আলোর গতির কাছাকাছি বেগে চলছে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন দর্শক দেখবেন, ট্রেনের ভেতরের ঘড়ি খুব ধীরে চলছে এবং ট্রেনের দৈর্ঘ্যও সংকুচিত হয়ে গেছে!

জেনারেল রিলেটিভিটি

১৯১৫ সালে আইনস্টাইন তাঁর তত্ত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেন। আইজ্যাক নিউটন বলেছিলেন, মহাকর্ষ একধরনের দূরবর্তী আকর্ষণ। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না! মহাকর্ষ আসলে কোনো সাধারণ বল নয়, বরং এটি চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইমের জ্যামিতিক বক্রতা।

মহাকর্ষ আসলে চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইমের জ্যামিতিক বক্রতা
ছবি: বিবিসি

সহজ করে ভাবুন, একটি টানটান করা রাবার বা কাপড়ের চাদরের ওপর একটি ভারী লোহার বল রাখা হয়েছে। বলটির ভারে চাদরটি মাঝখানে দেবে যাবে। এবার একটি ছোট মার্বেল সেখানে ছেড়ে দিলে সেটি লোহার বলের আকর্ষণে নয়, বরং চাদরের বক্রতার কারণে সেদিকে ঘুরে ঘুরে পড়তে চাইবে। মহাবিশ্বে সূর্য বা বড় নক্ষত্রগুলো এভাবেই স্পেস-টাইম বা স্থান-কালের চাদরকে বাঁকিয়ে দেয়। গ্রহগুলো সেই বাঁকানো পথ ধরেই ঘুরতে থাকে।

আরও পড়ুন
আইজ্যাক নিউটন বলেছিলেন, মহাকর্ষ একধরনের দূরবর্তী আকর্ষণ। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, না! মহাকর্ষ আসলে কোনো সাধারণ বল নয়, বরং এটি চতুর্মাত্রিক স্পেস-টাইমের জ্যামিতিক বক্রতা।

আইনস্টাইন বনাম নিউটন: কে জিতলেন

আইনস্টাইনের তত্ত্বের শুদ্ধতা প্রমাণের জন্য একটি বড় পরীক্ষা ছিল আলোর পথ বেঁকে যাওয়া। নিউটনের তত্ত্ব অনুযায়ী সূর্যের টানে দূরবর্তী নক্ষত্রের আলো সামান্য বাঁকার কথা। কিন্তু আইনস্টাইন তাঁর জটিল গাণিতিক হিসাব কষে দেখালেন, নিউটনের হিসাবের চেয়েও আলো দ্বিগুণ পরিমাণ বাঁকবে।

১৯১৯ সালের সূর্যগ্রহণের সময় যখন চাঁদের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়ল, তখন বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী নক্ষত্রের আলোর বিচ্যুতি মেপে দেখলেন। আইনস্টাইনের ভবিষ্যৎবাণী একদম হুবহু ফলে গেল! সেই মুহূর্ত থেকেই আইনস্টাইন হয়ে উঠলেন বিজ্ঞানের মহাতারকা।

আপেক্ষিকতা আমাদের শেখায়, মহাবিশ্বে আমাদের দেখার চেয়েও বেশি রহস্যময়। সময় ও স্থান কোনো স্থির কিছু নয়, বরং এটি একটি মায়াবী চাদরের মতো, যা ভরের চাপে দুমড়েমুচড়ে যায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সায়েন্স ইন সেকেন্ডস বই অবলম্বনে

আরও পড়ুন