ইন্টারভেলের সময় একমাত্র আলাপ শোনা গেল হৈটি টৈটির আসন্ন অনুষ্ঠান নিয়ে। প্রথম সারিগুলোর বিদগ্ধজনদের মধ্যে এবার জীবনের লক্ষণ দেখা গেল। বহুপ্রতীক্ষিত মুহূর্তটা আগতপ্রায়, বেজে উঠল তুরিভেরি। সোনালি আর লাল রঙের চাপরাস পরা সার্কাসের লোক সব দাঁড়াল সারি দিয়ে। হাট করে টেনে খোলা হলো প্রবেশপথের পর্দা আর দর্শকদের উচ্ছ্বসিত হাততালির মধ্যে এগিয়ে এল হৈটি টৈটি—একটি প্রকাণ্ড হাতি, মাথায় সোনালি ফুল তোলা, ঝালর ও থুপি শোভিত একটি টুপি। তার সঙ্গে একটি ফ্রক কোট পরা বেঁটে লোক। ডানে-বাঁয়ে মাথা নুয়ে অভিবাদন করলে হাতিটি তারপর রঙ্গভূমির ঠিক মাঝখানটিতে এসে চুপ করে দাঁড়াল।

‘আফ্রিকান হাতি,’ গলা খাটো করে সহযোগীকে বললেন একজন পাকাচুলো প্রফেসর। ‘আমার বেশি ভালো লাগে ভারতীয় হাতি। তাদের আকার বেশি গোল। দেখলে বেশ একটা, মানে, সংস্কৃতিমান প্রাণী বলে মনে হয়। আফ্রিকান হাতি কেমন একটু বদখত, হাড় খোঁচা। এ রকম হাতি যখন শুঁড় বাড়িয়ে দেয়, তখন দেখায় যেন একটা শিকারি পাখি।’

হাতির পাশে দাঁড়িয়ে বেঁটে লোকটি গলাখাঁকারি দিয়ে শুরু করল, ‘ভদ্রমহিলা ও মহোদয়গণ, আমাদের বিখ্যাত হাতি হৈটি টৈটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। দেহের দৈর্ঘ্য সাড়ে ৪ মিটার। উঁচু সাড়ে ৩ মিটার। শুঁড়ের ডগা থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত ধরলে লম্বায় ৯ মিটার...?’ হৈটি টৈটি হঠাৎ তার শুঁড় বাড়িয়ে দিল লোকটার সামনে।

‘মাফ করবেন ভুল হয়েছে।’ লোকটা বললেন, ‘শুঁড় লম্বায় ২ মিটার আর লেজ প্রায় দেড় মিটার। তাই শুঁড়ের ডগা থেকে লেজের শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায় ৭ মিটার ৯০ সেন্টিমিটার। দিনে খায় ৩৬৫ কিলোগ্রাম সবজি আর ১৬ বালতি পানি।’

‘হাতির হিসাব দেখছি লোকটার চেয়ে বেশি সঠিক’, কে যেন বললেন। ‘লক্ষ করেছিলেন, ট্রেইনারের ভুলটা হাতি কীভাবে শুধরে দিল!’

জীববিদ্যার অধ্যাপক জিজ্ঞেস করলেন তাঁর সহযোগীকে। ‘নিতান্তই কাকতালীয়’, জবাব দিলেন অন্যজন।

‘দুনিয়ার সর্বকালের অত্যাশ্চর্য হাতি হৈটি টৈটি, ‘ট্রেইনার বলে চললেন এবং ‘সম্ভবত পশুজগতের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিভাধর। জার্মান ভাষা বোঝে সে...তা–ই না হইটি?’ হাতিকে উদ্দেশ করে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ভারিক্কি চালে মাথা নাড়ল হাতি। তুমুল করতালি উঠল দর্শকদের মধ্যে৷

‘যত বুজরুকি,’ বললেন প্রফেসর শমিৎ।

‘দাঁড়ান না, এরপরে দেখবেন,’ বললেন শতলৎস, ‘হৈটি টৈটি হিসাব করতে পারে, সংখ্যা চেনে...’

‘বক্তৃতা যথেষ্ট হয়েছে, এবার দেখাও!’ গ্যালারি থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল।

অবিচলিতভাবে ফ্রক কোট পরা লোকটি বলে চললেন, ‘সন্দেহ নিরসনের জন্য আমি দর্শকদের জনাকয়েককে এখানে আসার অনুরোধ করছি। তারা আপনাদের সাক্ষ্য দিতে পারবেন যে কোনো চালবাজি নেই এর মধ্যে।’

শমিৎ আর শতলৎস মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এগিয়ে গেলেন রঙ্গভূমির দিকে।

হৈটি টৈটি তার আশ্চর্য কৃতিত্ব দেখাতে শুরু করল। একটা সংখ্যা লেখা চৌকো কার্ডবোর্ডের একটা সুপ রইল তার সামনে, যোগ–বিয়োগ, গুণ–ভাগ করে তা থেকে বেছে বেছে নিখুঁত উত্তরটি তুলে ধরতে লাগল হাতি। প্রথমে দেওয়া হলো এককের অঙ্ক, তারপর দুই সংখ্যার, তারপর তিন সংখ্যার। একবারও ভুল না করে প্রতিটি অঙ্ক কষে দিল হাতি। ‘এবার কী বলবেন আপনি,’ জিজ্ঞেস করলেন শতলৎস।

‘বেশ, দেখা যাক সংখ্যা ও বোঝে কতটা,’ হার না মেনে বললেন শমিৎ। তারপর পকেট থেকে ঘড়ি বের করে সামনে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো তো দেখি হৈটি টৈটি, এখন কটা বেজেছে?’

একঝটকায় শুঁড় দিয়ে ঘড়িটা শমিতের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে চোখের কাছে দোলাল কিছুক্ষণ, তারপর অপ্রস্তুত মালিককে ঘড়িটি ফিরিয়ে দিয়ে কার্ডবোর্ডের সংখ্যাগুলো দিয়ে উত্তর খাড়া করল: ‘১০.২৫’।

শমিৎ তার ঘড়িটার দিকে চেয়ে হতভম্বের মতো কাঁধ ঝাঁকালেন, কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সময়ই বলেছে হাতিটা।

তারপর পড়ার পালা। ট্রেইনার হাতির সামনে রাখতে লাগল জীবজন্তুর বড় বড় ছবি। অন্য সব কার্ডবোর্ডে লেখা ছিল সিংহ, হাতি, বাঁদর। একেকটা ছবি দেখানো হয় হাতিকে আর শুঁড় দিয়ে সে জন্তুর নাম লেখা কার্ডবোর্ডটা দেখাতে লাগল হাতি। একবারও ভুল হলো না। ব্যাপারটা উল্টো করে পরীক্ষা করার চেষ্টা করলেন শমিৎ। প্রথমে লেখাটা দেখালেন, তারপর ছবিটা বের করতে বললেন। এতেও কোনো ভুল হলো না হাতির।

শেষ পর্যন্ত সব বর্ণমালাই সাজিয়ে ধরা হলো হৈটি টৈটির সামনে। এবার একেকটি অক্ষর নিয়ে শব্দ তৈরি করে সে প্রশ্নের জবাব দেবে।

‘কী নাম তোমার?’ জিজ্ঞেস করলেন শতলৎস।

‘এখন...হৈটি টৈটি ।’

‘এখন মানে?’ জিজ্ঞেস করলেন শমিৎ, ‘আগে কি অন্য নাম ছিল? কী নাম?’

‘সেপিয়েন্স,’১ জবাব দিল হাতি।

‘হোমো সেপিয়েন্স,২ বোধ হয়?’ হেসে বললেন শতলৎস।

‘সম্ভবত,’ হেঁয়ালিভরে জবাব দিল হাতি।

তারপর অক্ষর সাজিয়ে সাজিয়ে যে বাক্যটি গড়ল তা এই: ‘আজকের মতো এ–ই যথেষ্ট।’

ট্রেইনারের সব প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে হৈটি টৈটি চারদিকে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করে রঙ্গভূমি ছেড়ে চলে গেল।

ইন্টারভেলের সময় প্রফেসররা জুটলেন ধূমপানের ঘরে, ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে উত্তেজিত আলাপ শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে।

ঘরের এক কোণে তর্ক করছিলেন শমিৎ আর শতলৎস।

শমিৎ বলছিলেন, ‘মনে আছে, কয়েক বছর আগে হ্যানস নামের একটা ঘোড়া কী রকম চাঞ্চল্য জাগিয়েছিল? ঘোড়াটা যেকোনো সংখ্যার বর্গমূল বের করে দিতে পারত, নানা রকম অঙ্ক কষত। খুর ঠুকে ঠুকে উত্তর দিত। পরে ফাঁস হলো যে ব্যাপারটা আর কিছুই নয়। তার ট্রেইনার তাকে কতগুলো গোপন সংকেত দিত আর সেই অনুসারে পা ঠুকত সে। একটা চোখ না-ফোটা কুকুরের বাচ্চার চেয়ে বেশি কিছু অঙ্ক তার জানা ছিল না।’

‘সেটা মাত্র অনুমান,’ আপত্তি করলেন শতলৎস।

‘কিন্তু আপনার ঘড়ির মধ্যে তো আর খাবারের বাক্স ছিল না’, ব্যঙ্গভাবে বললেন শতলৎস, ‘অন্তত ঘটনাটার ব্যাখ্যা কী দেবেন?’

‘তা ছাড়া থর্নডাইক আর ইয়র্সের পরীক্ষাটা? প্রাণীদের মধ্যে যে স্বাভাবিক অ্যাসোসিয়েশন বোধ আছে, তারই তালিম দেওয়া। এক সারি বাক্সের সামনে দাঁড় করানো হলো জন্তুটাকে। এর একটি বাক্সে খাবার রাখা। ধরা যাক, সে বাক্সটা ডান দিক থেকে দ্বিতীয়। কোন বাক্সে খাবার আছে আন্দাজ করতে পারলেই সে বাক্সটা আপনা থেকে খুলে গিয়ে খাবার দেবে জন্তুটাকে। এভাবে জন্তুটার মধ্যে একটা বলা যেতে পারে নির্দিষ্ট অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয়ে যাবে, ডান দিক থেকে দ্বিতীয় বাক্স মানে খাবার। তারপর বাক্সের পরম্পরা বদলে নেওয়া যায়।’

‘কিন্তু আপনার ঘড়ির মধ্যে তো আর খাবারের বাক্স ছিল না’, ব্যঙ্গভাবে বললেন শতলৎস, ‘অন্তত ঘটনাটার ব্যাখ্যা কী দেবেন?’

‘কী আবার, আমার ঘড়ির মাথামুণ্ডু কিছুই হাতিটা বোঝেনি। একটা চকচকে গোল জিনিসকে সে কেবল তার চোখের সামনে ধরেছিল। কার্ডবোর্ডগুলোয় সে যখন সংখ্যা বাছছিল তখন স্পষ্টতই ট্রেইনারের কোনো একটা নির্দেশ মেনে চলছিল সে, যা আমরা ধরতে পারছিলাম না। এ সবই বুজরুকি, ট্রেইনার যখন তার দৈর্ঘ্যের হিসাবে ভুল করেছিল, তখন যে হাতি তাকে শুধরে দিল, এ সবই বুজরুকি। কনডিশন্ড রিফ্লেক্স, আর কিছু নয়।’

শতলৎস বললেন, ‘সার্কাস ম্যানেজারের কাছ থেকে অনুমতি পেয়েছি খেলা শেষ হওয়ার পরও আমার জনাকয়েক বন্ধু নিয়ে থেকে যাব কিছুক্ষণ। হৈটি টৈটির ওপর আরও কয়েকটা পরীক্ষা করার ইচ্ছা আছে। আশা করি আপনিও থাকবেন?’

‘অবশ্যই!’ বললেন শমিৎ।

২. অপমান সহ্য হয়নি

দর্শকেরা চলে গেল সবাই। কেবল রঙ্গভূমিটার ওপর একটি আলো বাদে নিভে গেল সব বড় বাতি। তখন ফের নিয়ে আসা হলো হৈটি টৈটিকে। শমিৎ দাবি করলেন, পরীক্ষার সময় ট্রেইনার যেন হাজির না থাকেন। বেঁটে লোকটি ততক্ষণে তার ফ্রক কোটটি খুলে এসেছেন, গায়ে একটি সোয়েটার। কোনো কথা না বলে কাঁধ ঝাঁকালেন তিনি।

‘কিছু মনে করবেন না...মানে মাফ করবেন, আপনার নামটা আমি জানি না।’ শুরু করলেন শমিৎ।

‘ইয়ুঙ্গ, ফ্রেদরিখ ইয়ুঙ্গ, আজ্ঞা করুন...’

‘রাগ করবেন না মিস্টার ইয়ুঙ্গ। মানে, পরীক্ষাটা আমরা এমনভাবে চালাতে চাই, যাতে কোনো রকম সন্দেহের অবকাশ না থাকে।’

‘বেশ চালান,’ জবাব দিলেন ট্রেইনার, ‘হাতিটাকে ফেরত নিয়ে যাওয়ার সময় হলে ডাকবেন আমায়।’ ট্রেইনার চলে গেলেন গেটের দিকে।

পরীক্ষা শুরু করলেন বিজ্ঞানীরা। মন দিয়ে কথা শুনল হাতিটা, প্রশ্নের জবাব দিল, কোনো ভুল না করে নানা রকম অঙ্ক কষল। যা দেখা গেল, তা একেবারে আশ্চর্য করার মতো। অমন চটপট জবাব, এ কোনো বুজরুকি, কোনো ট্রেনিংয়ের দোহাই পেড়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অসাধারণ বুদ্ধি, প্রায় মানুষের মতো একটা মননশক্তি যে হাতিটার আছে, তা মানতেই হয়। শমিৎ এতক্ষণে প্রায় আধা নিঃসন্দেহ হয়ে উঠেছিলেন, তাহলেও একগুঁয়েমি করে তর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এই অশেষ তর্ক শুনে শুনে হাতিটা স্পষ্টতই ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল। ঝট করে শুঁড় বাড়িয়ে সে শমিতের ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে ঘড়িটা তুলে নিয়ে দেখিয়ে দিল। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে। তারপর ঘড়িটি ফিরিয়ে দিয়ে তার ঘাড় ধরে রঙ্গভূমি থেকে তুলে নিয়ে গেল গেটের দিকে। ক্রোধে চেঁচাতে থাকলেন প্রফেসর, কিন্তু তার সহযোগীরা না হেসে পারলেন না। ইয়ুঙ্গ আস্তাবলের বারান্দা থেকে ছুটে এসে চেঁচিয়ে ধমক দিতে লাগলেন হাতিকে, কিন্তু হৈটি টৈটি স্রেফ উপেক্ষা করে গেল তাকে। শমিৎকে বারান্দায় নামিয়ে দিয়ে সে অর্থপূর্ণ চোখে তাকাল রঙ্গভূমির অন্যান্য বিজ্ঞানীর দিকে।

‘এখনই যাচ্ছি আমরা, ভাবনা নেই,’ হাতিটির উদ্দেশে বললেন শতলৎস, যেন হাতি নয় মানুষ, ‘কিছু মনে করবেন না।’

‘আস্তে, শয়তান কোথাকার,’ ধমক দিলেন ইয়ুঙ্গ, ‘কাজে মন নেই দেখছি। গুমর হয়েছে না। লিখতে-পড়তে পারিস, তাই গতর খাটানো কাজে রুচি নেই। ওসব চলবে না ভায়া।

এই বলে বিব্রতভাবে রঙ্গভূমি ত্যাগ করলেন শতলৎস, সেই সঙ্গে অন্য প্রফেসররাও।

ইয়ুঙ্গ বললেন, ‘বেশ করেছিস হইটি, অর্ধচন্দ্র দিয়ে ঠিকই করেছিস। এখনো অনেক কাজ আমাদের বাকি। হেই! ইয়োহান, ফ্রিদরিখ, ভিলহেম, কোথায় সব?’

জনাকয়েক লোক এসে রঙ্গভূমিটা পরিষ্কার করতে শুরু করলেন। বালু বিছানো জায়গাটা ফের সমান করে দিলেন তারা, প্যাসেজ ধোয়াপাকলা করে খুঁটি, মই, আংটা—সব তুলে নিয়ে গেলেন। আর সাজসজ্জাগুলো নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে ইয়ুঙ্গকে সাহায্য করছিল হাতিটা। কিন্তু কাজে কেমন যেন তার মন লাগছিল না। কেন জানি বিরক্ত হয়েছিল সে, অথবা রাত্রে এমন অনভ্যস্ত সময়ে দ্বিতীয় আরেক দফা অনুষ্ঠানে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল হয়তো। ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে মাথা নেড়ে একটা ডেকোরেশনে সে এমনভাবে টান মারল যে সেটা ভেঙে গেল।

‘আস্তে, শয়তান কোথাকার,’ ধমক দিলেন ইয়ুঙ্গ, ‘কাজে মন নেই দেখছি। গুমর হয়েছে না। লিখতে-পড়তে পারিস, তাই গতর খাটানো কাজে রুচি নেই। ওসব চলবে না ভায়া। এটা তোর ধর্মশালা পাসনি। সার্কাসের সব লোককেই খাটতে হয়। দ্যাখ না এনরিখ ফেরিকে। ঘোড়সওয়ার হিসেবে ওর নাম দুনিয়াজোড়া। কিন্তু যখন খেলা দেখাচ্ছে না, তখন চাপরাস পরে সহিসদের সঙ্গে তাকেও দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বালু সমান করায় তাকেও হাত লাগাতে হয়...’

কথাটা সত্যি। হৈটি টৈটিও তা জানত। কিন্তু এনরিখ ফেরির দৃষ্টান্তে তার মন গলল না। ফের ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে সে রঙ্গভূমি ছেড়ে গেটের দিকে যাওয়ার উপক্রম করল।

‘সে কী, পালানো হচ্ছে বটে’, হঠাৎ চটে উঠলেন ইয়ুঙ্গ, ‘দাঁড়া বলছি।’ একটা ঝাড়ু তুলে নিয়ে ছুটে গেলেন হাতিটার দিকে, তারপর ঝাড়ুর বাঁটটা দিয়ে বাড়ি মারলেন হাতির মুটকো পাছার ওপর। আগে হাতিটাকে মারেননি কখনো। হাতিটাও অবশ্য কখনো এমন অবাধ্যতা করেনি। ঝাড়ু মারার সঙ্গে সঙ্গে হাতিটা এমন ডাক ছাড়ল যে ইয়ুঙ্গ পেট চেপে ধরে গুড়ি মেরে এমনভাবে বসে পড়লেন মেঝের ওপর, যেন শব্দ শুনে পেটের মধ্যে গুলিয়ে উঠেছে তার। হাতিটা তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে জাপটে ধরে তাকে কয়েকবার কুকুরের বাচ্চার মতো লোফালুফি করল শূন্যে। শেষ পর্যন্ত মাটির ওপর নামিয়ে দিয়ে ঝাড়ুর হাতলটা দিয়ে বালুর ওপর লিখল:

‘মারার স্পর্ধা কোরো না কখনো! আমি জন্তু নই, মানুষ!’

তারপর ঝাড়ু ফেলে এগিয়ে গেল প্রবেশপথের দিকে। ঘোড়ার আস্তাবলগুলো পেরিয়ে পৌঁছাল প্রধান ফটকে। সেখানে তার প্রকাণ্ড দেহটা ভর দিয়ে চাপ দিল কাঁধ দিয়ে। মড়মড়িয়ে উঠে এই বিপুল চাপে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ল ফটক। ছাড়া পেয়ে এগিয়ে গেল হাতি...

***

ভয়ানক অস্থির একটা রাত কাটাতে হলো সার্কাস ম্যানেজার লুদভিগ স্ত্রমকে। যে–ই একটু তন্দ্রা এসেছে, এমনি শোবার ঘরের দরজায় সন্তর্পণে টোকা দিল আরদালি। বলল, ইয়ুঙ্গ দেখা করতে এসেছে জরুরি দরকারে। সার্কাসের লোকজন খুবই তালিম পাওয়া মানুষ। স্ত্রম বুঝলেন, এত রাতে তার ঘুমে ব্যাঘাত করতে যখন এসেছে, তখন নিশ্চয় গুরুতর কিছু একটা ঘটেছে। ড্রেসিং গাউনটা চাপিয়ে চটি পায়ে তাকে উঠে আসতে হলো বসার ছোট ঘরটায়। জিজ্ঞেস করলেন:

‘কী ব্যাপার ইয়ুঙ্গ?’

‘ভয়ানক বিপদ হের স্ত্রম। হৈটি টৈটি পাগলা হয়ে গেছে!’ চোখ বড় বড় করে অসহায়ভাবে হাত নাড়লেন ইয়ুঙ্গ।

‘আর আপনি নিজে...বহাল তবিয়তে আছেন তো ইয়ুঙ্গ?’ জিজ্ঞেস করলেন স্ত্রম।

‘বিশ্বাস করছেন না?’ ক্ষুব্ধ হলেন ইয়ুঙ্গ ‘মোটেও মদ খাইনি, মাথাও ঠিক আছে আমার। আমায় বিশ্বাস না হলে ইয়োহান, ফ্রিদরিখ, ভিলহেমকে জিজ্ঞেস করুন। তারা স্বচক্ষে দেখেছে। হাতিটা আমার হাত থেকে ঝাড়ু কেড়ে নিয়ে মাটির ওপর লিখল, ‘আমি জন্তু নই, মানুষ।’ তারপর ষোলোবার তার গম্বুজ পর্যন্ত আমায় ছুড়ে লোফালুফি করল। তারপর ঘোড়ার আস্তাবল পেরিয়ে ফটক ভেঙে পালাল।’

‘সেকি! পালাল! হৈটি টৈটি পালিয়েছে! আরে সেই কথাটা আগে বলতে হয় আহাম্মক। এক্ষুনি ওকে ধরে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে, নইলে সর্বনাশ বাধিয়ে বসবে।’

স্ত্রমের মনশ্চক্ষে ভেসে উঠল জরিমানার পুলিশি নোটিশ, খেত নষ্টের জন্য খামারিদের ক্ষতিপূরণ দাবি করা লম্বা লম্বা ফর্দ; হাতিটা যা কিছু ক্ষতি করবে, তা মেটানোর জন্য মস্ত একটা টাকার আদালতি সমন।

‘সার্কাসে আজ কার ডিউটি? পুলিশকে জানানো হয়েছে? হাতি ধরার কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?’

ইয়ুঙ্গ বলল, ‘আমার ডিউটি, যা সম্ভব সব করেছি। পুলিশকে জানাইনি। এমনিতেই তারা জানবে। হৈটি টৈটির পিছু ধাওয়া করে কাকুতি–মিনতি করেছি তাকে ফেরার জন্য। ব্যারন, কাউন্ট, জেনারেলিসিমো, কতভাবেই না তাকে সম্বোধন করলাম। বললাম, “ফিরে আসুন হজুর, ফিরে আসুন। মাপ করে দিন এবার। চিনতে পারিনি আপনাকে। সার্কাসে খুব অন্ধকার, হাতি বলে ভুল করে বসেছিলাম।” কিন্তু হাতিটা আমার দিকে একবার কটাক্ষে চেয়ে তাচ্ছিল্যভরে শুঁড় দিয়ে বাতাস ছাড়তেই থাকে। ইয়োহান আর ভিলহেম মোটরসাইকেল করে তার পিছু নেয়। উন্তার দেন লিন্দেনে পৌঁছে তিয়েরগার্তেন ধরে বরাবর পৌঁছায় শার্লোতেনবুর্গরিশপসে, তারপর সেখান থেকে গ্রুনভাল্‌দ বনের দিকে। এখন সে হাফেলে গোসল করছে।’

‘অন্যের চেয়ে হাতিটা আপনাকেই ভালো জানে ইয়ুঙ্গ। আপনি বরং ওর কাছে গিয়ে আদর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে দেখুন।’

এ সময় টেলিফোন বেজে উঠল। স্ত্রম রিসিভার তুলে নিলেন।

‘হ্যালো!..হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমিই, জেনেছি...ধন্যবাদ...যা করার আমরা করেছি...ফায়ার ব্রিগেড? ভরসা নেই...বরং ওকে না চটানোই ভালো।’

রিসিভার নামিয়ে স্ত্রম বললেন, ‘পুলিশ। বলছিল ফায়ার ব্রিগেড ডাকবে, হোসপাইপ থেকে জল চালিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে আসবে হাতিটাকে। কিন্তু হৈটি টৈটির ব্যাপারে খুব সাবধানে এগোনো দরকার।’

‘পাগলাকে খ্যাপানো উচিত নয়,’ মন্তব্য করলেন ইয়ুঙ্গ।

‘অন্যের চেয়ে হাতিটা আপনাকেই ভালো জানে ইয়ুঙ্গ। আপনি বরং ওর কাছে গিয়ে আদর করে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে দেখুন।’

‘চেষ্টা করব নিশ্চয়...না হয় হিল্ডেনবার্গ বলেই সম্বোধন করব ওকে, কী বলেন?’ ইয়ুঙ্গ চলে গেলেন। স্ত্রমের সারা রাত কাটল টেলিফোন শুনে আর টেলিফোনে নির্দেশ দিয়ে। কিছুটা সময় শিখির দ্বীপের কাছে গোসল করে কাটায় হাতিটা, তারপর পাশের একটা সবজির খেতে চড়াও হয়ে সব বাঁধাকপি আর গাজর খেয়ে শেষ করে, তারপর আরেকটা ফলের বাগানে আপেল খেয়ে এগিয়ে যায় ফ্রিদেনসদর্ফ বনের দিকে।

কোনো রিপোর্টেই এমন খবর শোনা গেল না যে হাতিটা লোকের কোনো ক্ষতি করেছে বা ইচ্ছাকৃত অনিষ্ট করেছে। মোটের ওপর ব্যবহার খারাপ নয়। সাবধানে সে ঘাসে পা না দিয়ে বাগানের পায়ে চলা পথেই গেছে, যথাসম্ভব সড়ক আর বড় রাস্তা দিয়েই হেঁটেছে। কেবল খিদের জ্বালাতেই সে বাগানের সবজি আর ফলে শুঁড় বাড়িয়েছিল। সে ক্ষেত্রেও খুবই বিবেচনা দেখিয়েছে: সবজির ভুঁইয়ের ওপর যথাসম্ভব পা দেয়নি, বাঁধাকপি যা খেয়েছে, সেটা বেশ সুশৃঙ্খলভাবে, সারি বরাবর; ফল গাছের ডালপালা কিছু ভাঙেনি।

সকাল ছয়টায় দ্বিতীয়বার এসে দেখা দিলেন ইয়ুঙ্গ। চেহারাটা ক্লান্ত, ধূলিধূসর, মুখ ঘামে নোংরা, পোশাক ভেজা।

‘কী খবর ইয়ুঙ্গ?’

‘একই রকম। কোনো অনুনয়-বিনয়ই শুনতে চায় না হৈটি টৈটি। এমনকি “হের প্রেসিডেন্ট” বলেও ডেকেছিলাম, কিন্তু খেপে উঠে আমায় ছুড়ে ফেলে জলের মধ্যে। দেখা যাচ্ছে হামবড়া রোগ লোকেদের মধ্যে যে রূপ নেয়, হাতির বেলায় তা অন্য রকম। তাই যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।’

কোনো রকম খেতাব–টেতাব না জুড়ে এবার বললাম, ‘বোধ হয় ভাবছেন আপনি আফ্রিকায় আছেন? কিন্তু এটা তো আফ্রিকা নয়, এ হলো ৫২.৫ উ. অক্ষাংশ। অবশ্য এখন আগস্ট মাস, অনেক ফলমূল–শাকসবজি মিলবে। কিন্তু যখন শীত আসবে, তখন কী হবে? কী খাবেন তখন? ছাগলের মতো তো গাছের বাকল খেয়ে থাকতে পারবেন না। মনে রাখবেন, আপনার পূর্বপুরুষেরা, ম্যামাথরা একদিন এই ইউরোপেই বাস করত বটে, কিন্তু ঠান্ডায় তারা সবাই মারা গেছে। তাই সার্কাসে, আপন ঘরে ফিরে আসাই ভালো নয় কি? সেখানে আপনার ঘর মিলবে, গরমে থাকবেন, কাপড়চোপড় পাবেন। মন দিয়ে শুনল হৈটি টৈটি, খানিকক্ষণ কী ভাবল, কিন্তু...শেষকালে শুঁড়ে করে জল ছাড়তে লাগল আমার ওপর। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দু-দুবার স্নান! ব্যস, যথেষ্ট! খুব বিশ্রী একটা সর্দি না ধরলে আশ্চর্যই বলতে হবে...’

৩. যুদ্ধ ঘোষণা

নৈতিক প্রতিক্রিয়ার সব চেষ্টাই বিফল হলো। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ব্যবস্থা অবলম্বনেই সায় দিতে হলো শমিৎকে। একদল ফায়ারম্যানকে পাঠানো হলো বনে। পুলিশের নেতৃত্বে তারা হাতির ১০ মিটার কাছাকাছি এগিয়ে একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করল; তারপর হোসপাইপ থেকে জোরালো একটা জলের তোড় ছাড়া হলো হাতির দিকে। এই স্নানটা বেশ ভালোই লাগল হাতির, সানন্দে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে সে জলের দিকে এপাশ–ওপাশ ফিরিয়ে স্নান করতে লাগল। এরপর ১০টা হোসপাইপ এক করে একটা একক ধারা করে চালানো হলো সোজাসুজি হাতির চোখের দিকে। এটা তার একেবারে পছন্দ হলো না। ডাক ছেড়ে সে এমন রুখে এগিয়ে গেল ফায়ারম্যানদের দিকে যে তারা ভয় পেয়ে হোস ফেলে দৌড় মারল। মুহূর্তের মধ্যে হোস খসে উল্টে পড়ল ফায়ার ইঞ্জিন।

‘ঠিক ১০ ঘণ্টা সময় দিতে পারি আপনাকে,’ জবাব দিলেন পুলিশকর্তা, ‘এক ঘণ্টার মধ্যে গোটা বন ঘিরে ফেলা হবে। দরকার হলে পুলিশের সাহায্যে সৈন্যবাহিনীকেও তলব করব।’

সেই মুহূর্ত থেকে খেসারতের যে বিল স্ত্রমের শোধ করার কথা, তা দ্রুত চড়তে লাগল। পুরোপুরি চটে উঠল হাতিটা। যুদ্ধ ঘোষণা হয়ে গেল লোকেদের সঙ্গে হাতির এবং এ যুদ্ধে যে মানুষের পক্ষে বেশ মহার্ঘ্যই হবে, সেটা দেখাতে সে কসুর করল না। ফায়ার ব্রিগেডের গোটা কয়েক গাড়ি সে জলে ফেলে দিল; ফরেস্টারের গুমটিটাকে ভেঙে ফেলল, একজন পুলিশকে ধরে ছুড়ে দিল গাছের ওপর। আগে সে সতর্কতা দেখিয়েছিল, কিন্তু এখন সে যা অনিষ্ট করতে শুরু করল, তার আর সীমা–পরিসীমা রইল না। তাহলেও এই ধ্বংসের মধ্যেও একটা অদ্ভুত বিবেচনার সেই লক্ষণগুলো কিন্তু বাদ যায়নি; একটা সাধারণ হাতি খেপে গেলে যা ক্ষতি করতে পারে, তার চেয়েও অনেক বেশি ক্ষতি করা সম্ভব ছিল তার।

ফ্রিদেনসদর্ফ বনের এ ঘটনার রিপোর্ট পুলিশকর্তার কানে যেতেই তিনি হুকুম দিলেন, রাইফেলধারী বিরাট একদল পুলিশ যাক, বন ঘেরাও করে মেরে ফেলা হোক হাতিটাকে। স্ত্রম একেবারে হতাশ হয়ে উঠলেন, এমন হাতি আর কখনো যে তিনি পাবেন, এ আশা করা যায় না। ক্ষতি যা করেছে হাতিটা, তার জন্য মোটা টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারটা তিনি ভেতরে–ভেতরে মেনে নিয়েছিলেন। হৈটি টৈটির সংবিৎ যদি একবার ফেরে, তাহলে সে টাকা সে পুরোপুরি সুদসহ ফিরিয়ে দেবে। পুলিশ কর্তার কাছে আদেশ মুলতবি রাখার জন্য তাই অনুরোধ জানালেন তিনি, আশা করছিলেন, কোনোক্রমে হয়তো একগুঁয়ে হাতিটাকে বাগে আনা যাবে।

‘ঠিক ১০ ঘণ্টা সময় দিতে পারি আপনাকে,’ জবাব দিলেন পুলিশকর্তা, ‘এক ঘণ্টার মধ্যে গোটা বন ঘিরে ফেলা হবে। দরকার হলে পুলিশের সাহায্যে সৈন্যবাহিনীকেও তলব করব।’

একটা জরুরি বৈঠক ডাকলেন স্ত্রম। তাতে যোগ দিলেন সার্কাসের প্রায় সব লোকই। চিড়িয়াখানার ম্যানেজার ও তার সহকারীরাও হাজির রইলেন। বৈঠকের পাঁচ ঘণ্টা বাদে বনজুড়ে পাতা হলো গোপন খাদ আর ফাঁদ। ফাঁদগুলো এমনভাবে পাতা হয়েছিল যে সাধারণ যেকোনো হাতি তাতে ধরা পড়ত। কিন্তু হৈটি টৈটি নয়। বেড়াগুলো ঘুরে গেল সে, গুপ্ত খাদের ওপর থেকে ক্যামোফ্লেজ টেনে খসিয়ে দিল, যেসব তক্তার সঙ্গে গাছের মাথায় বড় বড় কাঠের গুড়ির গোপন যোগাযোগ ছিল, তাতে মোটেও পা দিল না। এ রকম একটা গুড়ি হাতির মাথায় পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সে বেহুঁশ হয়ে পড়ে যেত।

সময়ের মেয়াদটা শেষ হয়ে আসছিল। জোরালো বাহিনী দিয়ে ক্রমেই ছোট করে আনা হচ্ছিল কর্ডনটাকে। গাছের গুঁড়ির ফাঁক দিয়ে হাতির প্রকাণ্ড দেহটাকে দেখা যাচ্ছিল একটা লেকের পাশে, সশস্ত্র পুলিশ ক্রমে এগিয়ে গেল সেদিকে। শুঁড়ে করে জল নিয়ে ফোয়ারার মতো সে জল পিঠের ওপর ছাড়ছিল হাতিটা...

‘রেডি!’ খাটো গলায় কমান্ড দিলেন অফিসার। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ফায়ার!’

একঝাঁক গুলি ছুটে গেল, গোটা বনে প্রতিধ্বনি বাজল তার। মাথা নাড়া দিল হাতিটা, রক্ত পড়ছিল মাথা থেকে। তারপর ছুটে গেল পুলিশের দিকে। তারা গুলি করেই চলেছে, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ না করে ছুটতেই থাকল হাতিটা। পুলিশদের নিশানা খারাপ ছিল, তা নয়। তবে হাতির অঙ্গসংস্থান সম্বন্ধে কিছু জানত না তারা; হাতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা তার মস্তিষ্ক আর হার্ট। সেখানে গুলি লাগেনি। আতঙ্কে, যন্ত্রণায় সজোরে ডাক ছেড়ে হাতিটা তার শুঁড়টা একবার বাড়িয়ে দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে নিল: শুঁড় তার অতি জরুরি একটা অঙ্গ, না থাকলে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু ঘটবে তার। তাই শুঁড় সে ব্যবহার করে কেবল চূড়ান্ত ক্ষেত্রে, আত্মরক্ষা বা আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে। মাথা নিচু করে হৈটি টৈটি তার প্রকাণ্ড দাঁত দুটিকে শত্রুর দিকে ভয়ংকর দুটি শাবলের মতো বাগিয়ে ধরল। একেকটা দাঁত লম্বায় আড়াই মিটার, ওজনে ৫০ কিলোগ্রাম। তবু শৃঙ্খলা মেনে দাঁড়িয়ে ছিল লোকগুলো। জায়গা না ছেড়ে অবিরাম গুলি চালিয়ে যেতে থাকল তারা।

তবু কর্ডন ভেঙে ফেলল হাতিটা। বেড়া গড়িয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেল। পিছু ধাওয়ার ব্যবস্থা হলো, কিন্তু ধরা তো দূরের কথা অনুসরণ করাও সহজ ছিল না। পুলিশ স্কোয়াডকে যেতে হচ্ছিল রাস্তা ধরে, কিন্তু হাতিটা আর কোনো বাছবিচার করছিল না, খেত, বাগান, মাঠ, বন ভেঙে ছুটছিল সে।

চলবে...

লেখক পরিচিতি: রুশ কল্পবিজ্ঞান লেখক আলেক্সান্দার বেলায়েভের জন্ম ১৮৮৪ সালে। পড়াশোনা করেছেন আইন বিষয়ে। কিন্তু বিজ্ঞানপ্রযুক্তি বিষয়ে ভীষণ আগ্রহী ছিলেন। তাঁর লেখা অ্যামফিবিয়ান ম্যান বা উভচর মানুষ সর্বকালের অন্যতম সেরা ও মানবিক কল্পবিজ্ঞান। হৈটি টৈটি তাঁর অন্যতম সেরা বিজ্ঞান কল্প গল্প। ১৯৪২ সালে মারা যান বেলায়েভ।