সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হলো নাসার রোমান স্পেস টেলিস্কোপ

৩০ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯এ থেকে ফ্যালকন হেভি রকেটে চেপে মহাকাশের পথে রওনা দিয়েছে এই অত্যাধুনিক নভোযানটিছবি: নাসা

দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পালা ফুরাল। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মহাশূন্যের অজানা রহস্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল নাসার সর্বাধুনিক ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। ৩০ আগস্ট, রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯এ থেকে ফ্যালকন হেভি রকেটে চেপে গভীর মহাকাশের পথে রওনা দিয়েছে এই অত্যাধুনিক নভোযানটি। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২৬ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ২৬ মিনিট) এটি উৎক্ষেপণ করা হয়।

আমাদের গ্যালাক্সির গ্রহ-নক্ষত্র থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের দূরতম প্রান্তের লুকিয়ে থাকা সবচেয়ে রহস্যময় শক্তিগুলোকে মানুষের চোখের সামনে তুলে আনতেই রোমান টেলিস্কোপের এই মহাজাগতিক যাত্রা। হাবল ও জেমস ওয়েবের পর নাসার এই নতুন টেলিস্কোপ মহাবিশ্ব নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা পাল্টে দিতে পারে।

স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২৬ মিনিটে রোমান টেলিস্কোপ উৎক্ষেপণ করা হয়
ছবি: নাসা

রোমান টেলিস্কোপ কিন্তু পৃথিবীর খুব কাছাকাছি ঘোরাফেরা করবে না। এটি সোজা চলে যাবে পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরের এক বিশেষ গন্তব্যে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় এই জায়গাটির নাম সেকেন্ড সান-আর্থ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট। সংক্ষেপে একে বলা হয় L2।

আরও পড়ুন
মহাবিশ্বের ছবি তোলার সময় পৃথিবী কখনোই রোমান টেলিস্কোপের বিশাল লেন্সের সামনে আড়াল হয়ে দাঁড়াবে না। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও এই সেকেন্ড সান-আর্থ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

কিন্তু জায়গাটি কেন এত বিশেষ?

কারণ, এখানে সূর্য এবং পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টান এমনভাবে একে অপরকে কাটাকাটি করে যে, কোনো মহাকাশযান সেখানে গেলে স্থির হয়ে ভাসতে পারে। সহজ কথায়, এটি হলো মহাকাশের একটি চমৎকার পার্কিং স্পট! এই জায়গায় পার্ক করে থাকলে টেলিস্কোপটি পৃথিবীর সঙ্গে সব সময় নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখতে পারবে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মহাবিশ্বের ছবি তোলার সময় পৃথিবী কখনোই এর বিশাল লেন্সের সামনে আড়াল হয়ে দাঁড়াবে না। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপও কিন্তু এই L2 পয়েন্টেই অবস্থান করছে।

রোমান টেলিস্কোপের প্রাথমিক মিশনটি চলবে পাঁচ বছর। হাবল এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এটি মহাবিশ্বের এমন কিছু দিক উন্মোচন করবে, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি। এর প্রধান কাজগুলোর একটি হলো ডার্ক এনার্জি এবং ডার্ক ম্যাটারের আসল চরিত্র খুঁজে বের করা।

রোমান টেলিস্কোপের প্রাথমিক মিশনটি চলবে পাঁচ বছর
ছবি: নাসা

বিষয়টা একটু সহজ করে বলি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ডার্ক এনার্জি হলো সেই রহস্যময় শক্তি, যা আমাদের মহাবিশ্বকে ক্রমাগত প্রসারিত করছে। কিন্তু এই শক্তির আসলে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা আজও এক বিরাট রহস্য। অন্যদিকে, ডার্ক ম্যাটার হলো একধরনের মহাজাগতিক আঠা, যা গ্যালাক্সিকে একসঙ্গে ধরে রেখেছে। এই আঠা না থাকলে গ্যালাক্সির গ্রহ-নক্ষত্র সব ছিটকে মহাশূন্যে হারিয়ে যেত। কিন্তু এই আঠার অস্তিত্ব আজও সরাসরি প্রমাণ করা যায়নি। রোমান টেলিস্কোপ এবার সেই অদেখা আঠা ও শক্তির ছবি তোলার চেষ্টা করবে।

আরও পড়ুন
রোমান টেলিস্কোপের প্রাথমিক মিশনটি চলবে পাঁচ বছর। হাবল এবং জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এটি মহাবিশ্বের এমন কিছু দিক উন্মোচন করবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

২৯ আগস্ট শনিবার উৎক্ষেপণের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে রোমানের সিনিয়র প্রজেক্ট সায়েন্টিস্ট জুলি ম্যাকএনারি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বলেছেন, ‘রোমান এমন কিছু অসাধারণ জরিপ চালাতে প্রস্তুত, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় বিশাল প্রভাব ফেলবে। আমরা অন্যান্য নক্ষত্রের চারপাশের গ্রহগুলোর একটি বৈপ্লবিক শুমারি করব। এমনকি, মহাবিশ্ব নিয়ে আমাদের বর্তমান যে স্ট্যান্ডার্ড মডেলটি আছে, রোমানের তথ্যে সেটি ভুলও প্রমাণিত হতে পারে! তখন হয়তো আমরা মহাবিশ্বের আসল সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব।’

রোমান টেলিস্কোপ মহাকাশে যে বিশাল জরিপ চালাবে, তা শেষ হতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে। এর পরিধি এতই বিশাল যে, তা কল্পনা করাও কঠিন। জুলি ম্যাকএনারির দেওয়া একটা উদাহরণ শুনলে বিষয়টা বুঝতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘রোমানের সবচেয়ে বড় জরিপ থেকে পাওয়া শুধু একটি সিগেল ছবি যদি আপনি পুরোপুরি দেখতে চান, তবে আপনার ৫ লাখেরও বেশি ফোর-কে (4K) রেজ্যুলেশনের টিভি লাগবে!’

রোমান টেলিস্কোপ মহাকাশে যে বিশাল জরিপ চালাবে, তা শেষ হতে কমপক্ষে এক বছর সময় লাগবে
ছবি: নাসা

হাবল টেলিস্কোপ যেখানে আকাশের খুব ছোট্ট একটা অংশের নিখুঁত ছবি তোলে, সেখানে রোমানের দেখার পরিধি হাবলের চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ বড়! অর্থাৎ, হাবল ১০০টি ছবি তুলে আকাশের যেটুকু জায়গা কাভার করে, রোমান মাত্র একটি ছবিতেই সেই পুরো জায়গাটার সমান নিখুঁত ছবি তুলে ফেলবে।

আরও পড়ুন
জুলি ম্যাকএনারি বলেন, ‘রোমানের সবচেয়ে বড় জরিপ থেকে পাওয়া শুধু একটি সিগেল ছবি যদি আপনি পুরোপুরি দেখতে চান, তবে আপনার ৫ লাখেরও বেশি ফোর-কে রেজ্যুলেশনের টিভি লাগবে!’

রোমানের ভেতরে করোনাগ্রাফ নামে চমৎকার একটি বিশেষ যন্ত্র বসানো আছে। এটি মূলত একটি অত্যাধুনিক আলোর পর্দা হিসেবে কাজ করে।

ধরুন, আপনি আকাশে কোনো পাখির ছবি তুলতে চাইছেন, কিন্তু ঠিক পাখির পেছনেই সূর্য জ্বলজ্বল করছে। তখন সূর্যের আলোয় আপনার চোখ বা ক্যামেরার লেন্স ধাঁধিয়ে যাবে। পাখিটা খুঁজতেই এই করোনাগ্রাফের সাহায্য নেওয়া হয়। এটি নক্ষত্রের তীব্র আলোকে ঢেকে তার চারপাশে ঘুরতে থাকা অনুজ্জ্বল এক্সোপ্ল্যানেটকে দৃশ্যমান করে তুলবে।

নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির রোমান করোনাগ্রাফ ইন্সট্রুমেন্ট সায়েন্টিস্ট ভেনেসা বেইলি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, যেসব গ্রহ তাদের নক্ষত্রের চেয়ে ১০ কোটি গুণ বেশি অনুজ্জ্বল, রোমানের এই করোনাগ্রাফ দিয়ে আমরা সেগুলোকেও খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারব।’

আরও পড়ুন
নাসা জানিয়েছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে রোমানের তোলা প্রথম ছবিগুলো আমাদের হাতে এসে পৌঁছাবে।

টেলিস্কোপটি তো আজ রওনা দিল, কিন্তু এর ছবি দেখার জন্য আমাদের বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরের L2 পয়েন্টে পৌঁছানোর পর এর প্রতিটি যন্ত্রাংশ ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা পরীক্ষা করে পুরোপুরি চালু করতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। নাসা জানিয়েছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে রোমানের তোলা প্রথম ছবিগুলো আমাদের হাতে এসে পৌঁছাবে।

তবে জুলি ম্যাকএনারির মতে, রোমানের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আবিষ্কারগুলো হয়তো হবে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। কে জানে, মহাশূন্যের এই ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর হয়তো এমন কিছু লুকিয়ে আছে, যা আমাদের চেনা বিজ্ঞানের সংজ্ঞাই পাল্টে দেবে!

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান ও নাসা

আরও পড়ুন