আগামী ১০ বছরের মধ্যে কি নাসা চাঁদের বুকে বসতি গড়তে পারবে

শিল্পীর কল্পনায় চাঁদের পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রকেটে উঠছেন দুই নভোচারীছবি: গেটি ইমেজ

নাসার নতুন পরিকল্পনা শুনলে আপনি চমকে যাবেন। নাসা এবং স্পেসএক্সের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন শুধু চাঁদে ঘুরে আসার কথাই ভাবছে না, সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার ছক কষছে। হ্যাঁ, মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনা আপাতত বাদ দিয়ে চাঁদের দিকেই সবার নজর।

গত ২৪ মার্চ নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান চাঁদে মানুষের একটি স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির নতুন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন। তাঁর মতে, পৃথিবীর বাইরে মানবতার এই নতুন বাড়ির নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের দিকেই শুরু হয়ে যেতে পারে। এর ঠিক এক মাস আগে স্পেসএক্সের সিইও ইলন মাস্কও মঙ্গলে যাওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে আগামী ১০ বছরের মধ্যে চাঁদে একটি স্থায়ী ঘাটি গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এই স্বপ্নের কতটা কাছাকাছি আছে নাসা ও স্পেসএক্স?

আরও পড়ুন
নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যানের মতে, পৃথিবীর বাইরে মানবতার এই নতুন বাড়ির নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের দিকেই শুরু হয়ে যেতে পারে।

স্বপ্ন বনাম বাস্তবতা

শুনতে খুব রোমাঞ্চকর লাগছে, তাই না? কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদে বসতি স্থাপন করাটা মোটেই ব্যাগ গুছিয়ে রকেটে চড়ে বসার মতো সহজ কোনো কাজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড ইউনিভার্সিটি এবং নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের গবেষক ক্যাটলিন অ্যারেনস বলেন, ‘আমার মনে হয় না আমরা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত।’ তাঁর মতে, সাধারণ মানুষের কাছে এক দশক অনেক লম্বা সময় মনে হলেও, একজন বিজ্ঞানীর কাছে এটি চোখের পলক ফেলার মতোই দ্রুত!

গবেষক অ্যারেনস জানিয়েছেন, রোভার বা গাড়ি যখন চাঁদের বুকে চলে, তখন তড়িৎযুক্ত ধুলার কণাগুলো সামনে যা পায় তার গায়েই আঠার মতো আটকে যায়
ছবি: নাসা

ক্যাটলিন অ্যারেনসের কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। কারণ, চাঁদের পরিবেশ খুবই বৈরী। সেখানে ক্ষুরের মতো ধারালো এবং বিদ্যুতায়িত ধুলাবালি রয়েছে। চাঁদের মাটিতে শুধু হাঁটলেই ধুলার মেঘ উড়ে যায়। গবেষক অ্যারেনস জানিয়েছেন, রোভার বা গাড়ি যখন চাঁদের বুকে চলে, তখন তড়িৎযুক্ত ধুলার কণাগুলো শূন্যে ভাসতে থাকে এবং সামনে যা পায় তার গায়েই আঠার মতো আটকে যায়। এই বিদ্যুতায়িত ধুলাবালি মানুষের থাকার জায়গার শ্বাস-প্রশ্বাসের ছিদ্র আটকে দিতে পারে, স্পেসস্যুট আঁচড়ে নষ্ট করতে পারে এবং সোলার প্যানেলের ওপর জমে গিয়ে সেগুলোকে অতিরিক্ত গরম করে ভেঙে ফেলতে পারে। এর আগে মঙ্গলে পাঠানো কয়েকটি রোভারের ধ্বংসের কারণ ছিল এই ধুলার জ্যাম!

আরও পড়ুন
গবেষক অ্যারেনস জানিয়েছেন, রোভার বা গাড়ি যখন চাঁদের বুকে চলে, তখন তড়িৎযুক্ত ধুলার কণাগুলো শূন্যে ভাসতে থাকে এবং সামনে যা পায় তার গায়েই আঠার মতো আটকে যায়।

অদৃশ্য ঘাতক মহাজাগতিক বিকিরণ

পৃথিবীর মতো চাঁদে কোনো বায়ুমণ্ডলের ঢাল নেই। তাই সেখানে বসবাসকারীদের প্রতিনিয়ত আলোর বেগে ধেয়ে আসা মহাজাগতিক বিকিরণের শিকার হতে হবে। সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটির অ্যারোস্পেস মেডিসিনের গবেষক ইমানুয়েল উরকিয়েটা বলেন, ‘মহাকাশের যেকোনো জায়গায় মহাজাগতিক বিকিরণ সব সময় থাকে এবং একে ঠেকানো অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন।’

এই বিকিরণের কারণে ক্যানসারের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু রেডিয়েশনের প্রভাব শরীরে ফুটে উঠতে অনেক সময় লাগে। তাই চাঁদে মানুষ নামার কয়েক দশক পর হয়তো জানা যাবে, এই ঝুঁকি ঠিক কতটা ভয়ানক। উরকিয়েটার মতে, মহাকাশে যাওয়া প্রতিটি মানুষই একেকজন পরীক্ষার গিনিপিগ হবেন!

চাঁদে বাসস্থান তৈরির জন্য নাসার পরিকল্পনা
ছবি: নাসা

বাড়ি বানানোর চ্যালেঞ্জ

এই ভয়ংকর বিপদগুলো থেকে বাঁচতে চাঁদে খুব মজবুত বাড়িঘর বানাতে হবে। লোহা বা কাঁচের গম্বুজ, মাটির নিচের বাসস্থান কিংবা চাঁদের মাটি দিয়ে থ্রিডি প্রিন্ট করা বাড়ি—এই সব কিছুই বিজ্ঞানীদের চিন্তায় আছে। কিন্তু ক্যাটলিন অ্যারেনস মনে করেন, আমরা এখনো নির্মাণের পরিকল্পনা করার জন্য প্রস্তুত নই। বিকিরণ থেকে বাঁচার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হতে পারে মাটির নিচে থাকা। কিন্তু চাঁদের বুকে কীভাবে গর্ত খুঁড়তে হবে, বিজ্ঞানীদের তা এখনো জানা নেই।

আরও পড়ুন
গবেষক ইমানুয়েল উরকিয়েটা বলেন, ‘মহাকাশের যেকোনো জায়গায় মহাজাগতিক বিকিরণ সব সময় থাকে এবং একে ঠেকানো অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন।’

মধ্যাকর্ষণের অভাব ও শারীরিক সংকট

পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের মধ্যাকর্ষণ বল মাত্র ছয় ভাগের এক ভাগ। এটি মানবদেহের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। আগের মহাকাশ ভ্রমণগুলো থেকে বিজ্ঞানীরা জেনেছেন, পৃথিবীর অভিকর্ষ না থাকলে আমাদের হাড় ও পেশি ক্ষয়ে যেতে থাকে। এটি ঠেকাতে প্রচুর ব্যায়াম করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীরা ভারী ট্রেডমিলে দৌড়ান। কিন্তু উরকিয়েটা জানান, চাঁদে এত ভারী যন্ত্র নিয়ে যাওয়া মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নভোচারীরা ভারী ট্রেডমিলে দৌড়ান
ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

মধ্যাকর্ষণ কম থাকার কারণে আমাদের শরীরের তরল পদার্থের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে মারাত্মক বিপদ ঘটতে পারে। পৃথিবীতে অভিকর্ষের টানের কারণে আমাদের শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ রক্ত সব সময় পায়ে থাকে। কিন্তু চাঁদে এই তরল শরীরের ওপরের অংশে চলে আসবে। শরীর তখন এই ভারসাম্য ঠিক করতে গিয়ে রক্ত কমিয়ে ফেলবে। ফলে চোখের পেছনে তরল জমে ফুলে যাওয়া বা ঘাড়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার মতো প্রাণঘাতী সমস্যা হতে পারে। শূন্য অভিকর্ষের তুলনায় চাঁদের এই আংশিক অভিকর্ষ কতটা ক্ষতিকর, তা মানুষ সেখানে কিছুদিন না থাকলে নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না।

আরও পড়ুন
পৃথিবীতে অভিকর্ষের টানের কারণে আমাদের শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ রক্ত সব সময় পায়ে থাকে। কিন্তু চাঁদে এই তরল শরীরের ওপরের অংশে চলে আসবে।

আশার আলো

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ২০২৮ সালের মধ্যেই নাসার আর্টেমিস মিশনের মাধ্যমে চাঁদের বুকে মানুষ আবার ফিরে যাবে এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বেশি তথ্য সংগ্রহ করবে। কিন্তু অ্যারেনস মনে করেন, মাস্ক এবং আইজ্যাকম্যানের পরিকল্পনার চেয়ে এই যাত্রা অনেক ধীরগতির হবে। কারণ, বসতি স্থাপনের জন্য বিজ্ঞানীরা চাঁদের বরফের ওপর নির্ভর করছেন, অথচ এর কোনো নমুনা এখনো সংগ্রহ করা যায়নি।

চাঁদের এই বরফ থেকে খাওয়ার পানি, রকেটের জ্বালানি এবং বিরল ধাতু পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সরাসরি ভৌত নমুনা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত এটি কতটা কাজে আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অ্যারেনস বলেন, ‘আমরা শুধু জানি, এটি ঠান্ডা। পাশাপাশি আমরা মোটামুটি জানি, এই বরফ এখন কোথায় আছে।’

মুন ভিলেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জিউসেপ রেইবাল্ডি সতর্ক করে বলেছেন, আমাদের খুব সাবধান থাকতে হবে, যাতে আমরা এমন কিছু বিক্রি না করি যা আমাদের কাছে নেই। তিনি আরও বলেন, চাঁদের বরফে আমরা কী পাব, তার ওপর নির্ভর করবে এটি ক্যালিফোর্নিয়ার গোল্ড রাশের মতো বিশাল কোনো খনি শহর হবে, নাকি অ্যান্টার্কটিকার মতো কেবল গুটি কয়েক বিজ্ঞানীর গবেষণার জায়গা হবে।

চাঁদ আমাদের হাতের মুঠোয় আসতে আর কত দিন লাগবে, তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে সেই রোমাঞ্চকর দিনের জন্য বিজ্ঞানীদের এই অক্লান্ত প্রস্তুতি সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

লেখক: শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, শশিকর, মাদারীপুর

সূত্র: লাইভ সায়েন্স

আরও পড়ুন