অ্যালিয়েন অ্যাটাক - ৭

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের গোপন ইউএফও ফাইলগুলো প্রকাশ করেছে। এরপর থেকেই সারা বিশ্বে নতুন করে শুরু হয়েছে জল্পনাকল্পনা। এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কি আসলেই একা? নাকি ভিনগ্রহে লুকিয়ে আছে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী? যদি সত্যিই তাদের অস্তিত্ব থাকে, তারা যদি হলিউড মুভির মতো হঠাৎ পৃথিবী আক্রমণ করে, তাহলে কী হবে? বিজ্ঞান কী বলে? সত্যিই কি ভিনগ্রহের প্রাণীরা আমাদের জন্য হুমকি হতে পারে?

এসব কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফিলিপ প্লেইট তাঁর ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড বইয়ে। সূক্ষ্ম রসিকতা ও নিখাদ বিজ্ঞানের দারুণ মিশেলে লেখা রোমাঞ্চকর এই বইয়ের কয়েকটি অধ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। ভিনগ্রহীদের আক্রমণ নিয়ে লেখা এই অধ্যায়টি অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ। আজ পড়ুন ষষ্ঠ অধ্যায়ের সপ্তম পর্ব।

তারা কোথায়

১৯৫০-এর দশকের শুরুর দিকের কথা। কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী এনরিকো ফার্মি। কথায় কথায় উঠে এল ফ্লাইং সসার দেখার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো। আন্তঃনক্ষত্র ভ্রমণ নিয়েও আলোচনা হলো। মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী কি আসলেই এক নক্ষত্র থেকে আরেক নক্ষত্রে যেতে পারবে? আলোচনার বিষয় যখন ভিনগ্রহী প্রাণীর দিকে মোড় নিল, তখন ফার্মি খুব সহজ একটা প্রশ্ন করে বসলেন, ‘ওরা কোথায়?’

প্রশ্নটা খুব সাধারণ মনে হলেও এর পেছনের গল্পটা বেশ গভীর। মূল ধারণাটা হলো, এত দিনে আমাদের গ্যালাক্সিতে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণের অস্তিত্ব হয়তো আমাদের খুঁজে পাওয়ার কথা ছিল, অথবা তাদেরই আমাদের এখানে বেড়াতে আসার কথা ছিল। কিন্তু এর কোনোটিই যখন ঘটেনি, তখন ভিনগ্রহীরা আসলে কোথায় আছে; এমন প্রশ্ন জাগাটা খুবই স্বাভাবিক।

ধরে নিই, ভিনগ্রহীরা যদি আমাদের দরজায় কড়া নাড়তে আসে, তবে তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশটাও নিশ্চয়ই আমাদের মতোই হতে হবে। যেমন, সূর্যের মতো একটি নক্ষত্র, পৃথিবীর মতো একটি গ্রহ, কোটি কোটি বছর ধরে প্রাণের বিকাশ ও বিবর্তন, প্রযুক্তির আবিষ্কার এবং সবশেষে এক নক্ষত্র থেকে আরেক নক্ষত্রে ভ্রমণের ক্ষমতা। কিন্তু এই সব কিছু একসঙ্গে ঘটার সম্ভাবনা আসলে কতটা?

মূল ধারণাটা হলো, এত দিনে আমাদের গ্যালাক্সিতে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণের অস্তিত্ব হয়তো আমাদের খুঁজে পাওয়ার কথা ছিল, অথবা তাদেরই আমাদের এখানে বেড়াতে আসার কথা ছিল।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা ড্রেক সমীকরণের সাহায্য নিতে পারি। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক ড্রেকের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। উন্নত প্রাণের জন্য কী কী শর্ত প্রয়োজন, তা এই সমীকরণে সাজানো হয়েছে এবং সেগুলোর ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু, তা হিসাব করা হয়েছে। আপনি যদি সমীকরণের সবগুলো শর্ত ঠিকঠাকমতো পূরণ করেন, তবে ফলাফল হিসেবে আমাদের গ্যালাক্সিতে থাকা উন্নত সভ্যতার একটি সংখ্যা পাবেন। এখানে উন্নত বলতে বোঝানো হয়েছে যারা মহাকাশে বেতার সংকেত পাঠাতে পারে। কারণ এভাবেই আমরা তাদের অস্তিত্বের কথা জানতে পারব।

উদাহরণ হিসেবে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কথাই ধরা যাক। এতে প্রায় ২০ হাজার কোটি নক্ষত্র আছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ নক্ষত্র আমাদের সূর্যের মতো; অর্থাৎ ভর, আকার এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে এরা সূর্যের কাছাকাছি। তার মানে আমাদের হাতে এমন ২ হাজার কোটি নক্ষত্র আছে। অন্য নক্ষত্রদের চারপাশে কীভাবে গ্রহ তৈরি হয়, তা আমরা সবেমাত্র জানতে শুরু করেছি। সূর্যের মতো অন্য কোনো নক্ষত্রের চারপাশে ঘোরা প্রথম গ্রহটি আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। তবে আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, সূর্যের মতো নক্ষত্রগুলোর চারপাশে গ্রহ থাকার সম্ভাবনা বেশ ভালোই।

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিরতে প্রায় ২০ হাজার কোটি নক্ষত্র আছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ নক্ষত্র আমাদের সূর্যের মতো; অর্থাৎ ভর, আকার এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে এরা সূর্যের কাছাকাছি।

তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, অন্য কোনো নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহ থাকার সম্ভাবনা একেবারেই হাস্যকর রকমের কম, ধরা যাক মাত্র ১ শতাংশ; তবুও হিসাব করলে দেখা যায়, এমন কয়েক কোটি নক্ষত্র আছে যাদের নিজস্ব গ্রহ রয়েছে। এবার যদি ধরি, এই গ্রহগুলোর মধ্যে পৃথিবীর মতো হওয়ার সম্ভাবনাও খুবই কম, আবারও ধরা যাক, মাত্র ১ শতাংশ; তাহলেও কিন্তু লাখ লাখ পৃথিবীর মতো গ্রহ পাওয়ার কথা! আপনি চাইলে এই সম্ভাবনা নিয়ে খেলাটা নিজেই খেলে দেখতে পারেন।

অনুমান করতে পারেন, কতগুলো গ্রহে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ আছে, কতগুলোতে সত্যিই প্রাণ আছে, আবার কতগুলোতে এমন প্রাণ আছে যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। এই চেইনের প্রতিটি ধাপ পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাবনা কিছুটা কমে আসে। কিন্তু এই হিসাবের সবচেয়ে হতাশাজনক ফলটিও বলে, এই বিশাল গ্যালাক্সিতে আমাদের মোটেও একা হওয়ার কথা নয়। মহাকাশে ঠিক কতগুলো ভিনগ্রহী সভ্যতা থাকতে পারে, তার অনুমান একেকজনের কাছে একেক রকম। এই সংখ্যা আক্ষরিক অর্থেই শূন্য থেকে শুরু করে লাখ লাখ পর্যন্ত হতে পারে।

এবার যদি ধরি, এই গ্রহগুলোর মধ্যে পৃথিবীর মতো হওয়ার সম্ভাবনাও খুবই কম, আবারও ধরা যাক, মাত্র ১ শতাংশ; তাহলেও কিন্তু লাখ লাখ পৃথিবীর মতো গ্রহ পাওয়ার কথা!

আমরা কি সত্যিই একা?

অবশ্য এই হিসাব খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। সবচেয়ে কম অনুমানের ফলাফলটাও বেশ ভয়ংকর। হতে পারে, হয়তো সত্যিই হতে পারে যে, আমরা এই মহাবিশ্বে একেবারেই একা! এই বিশাল গ্যালাক্সিতে, ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ঘন-আলোকবর্ষের এই অনন্ত শূন্যতায় আমাদের গ্রহটিই হয়তো প্রথম, যেখানে এমন কোনো প্রাণী আছে যারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবতে পারে। এই সম্ভাবনাটা একই সঙ্গে আমাদের অহংকার চূর্ণ করে দেয় এবং মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। আর হয়তো এটাই সত্যি।

আরেকটি সম্ভাবনা হতে পারে। হয়তো মহাবিশ্বে সাধারণ প্রাণের ছড়াছড়ি আছে, কিন্তু উন্নত প্রাণের সংখ্যা খুব বিরল। এ বিষয়ে অনেক বইপত্র লেখা হয়েছে এবং সেখানে বেশ চমকপ্রদ কিছু যুক্তিও আছে। হয়তো প্রাণ বিবর্তিত হতে হতে একটা নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে তারা শুধু নিজেদের নিয়েই মগ্ন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি নিয়ে তাদের হয়তো কোনো মাথাব্যথাই থাকে না। ভিনগ্রহীদের মনস্তত্ত্ব আসলে খুব জটিল একটা বিষয়, তাই এর গভীরে না যাওয়াই ভালো। আশা করি, এতদূর পর্যন্ত পড়ে আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন, ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসাবে সভ্যতা ধ্বংস করার মতো মহাজাগতিক দুর্যোগগুলো বেশ ঘন ঘনই ঘটে। এমনও তো হতে পারে, প্রতিটি সভ্যতাই হয়তো মহাকাশ ভ্রমণের উন্নত প্রযুক্তি আবিষ্কার করার আগেই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।

হয়তো প্রাণ যখন বিবর্তিত হতে হতে একটা নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছায়, তখন তারা শুধু নিজেদের নিয়েই মগ্ন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি নিয়ে তাদের হয়তো কোনো মাথাব্যথাই থাকে না।

তবে সত্যি বলতে, আমার কাছে এটা খুব বেশি যুক্তিসংগত উত্তর বলে মনে হয় না। পৃথিবীতে আঘাত হানতে সক্ষম ধ্বংসাত্মক গ্রহাণুগুলোকে থামিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি আমরা ইতিমধ্যে আবিষ্কার করেছি। আমরা জানি, কীভাবে সৌরঝড় থেকে নিজেদের রক্ষা করতে হয়। আমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান এখন এতটা উন্নত যে, আশপাশে কোন নক্ষত্রগুলো বিস্ফোরিত হতে পারে তা আমরা আগেই চিহ্নিত করতে পারি। যদি দেখি কোনো নক্ষত্রের সময় ফুরিয়ে আসছে, তাহলে আমরা সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়ার ব্যবস্থাও করতে পারব। এই অগ্রগতিগুলো কিন্তু খুব সম্প্রতি হয়েছে। পৃথিবীতে যতদিন ধরে প্রাণ টিকে আছে, তার তুলনায় এই সময়টা চোখের পলক ফেলার চেয়েও কম। তাই এটা কল্পনা করা আমার কাছে প্রায় অসম্ভব মনে হয় যে, কোনো সভ্যতা মহাকাশ নিয়ে গবেষণা করার মতো এতটা বুদ্ধিমান হবে, অথচ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মতো উন্নত প্রযুক্তি তাদের থাকবে না!

চলবে…

ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে

টীকা

১. এনরিকো ফার্মির এই বিখ্যাত প্রশ্নটিই বিজ্ঞান জগতে ফার্মি প্যারাডক্স নামে পরিচিত। মহাবিশ্বের আকার ও বয়স বিবেচনায় ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল, কিন্তু আজ পর্যন্ত তাদের কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই আপাত বিরোধিতাই হলো ফার্মি প্যারাডক্স।

২. যদিও আকাশজুড়ে মাঝেমধ্যেই অদ্ভুত আলো বা ফ্লাইং সসার দেখার খবর পাওয়া যায়, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো ভিনগ্রহীদের পৃথিবীতে আসার কোনো অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাননি।

৩. মহাকাশে বুদ্ধিমান প্রাণের এত অভাব দেখে অনেক বিজ্ঞানী রেয়ার আর্থ হাইপোথিসিসের কথা বলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রাণের উন্মেষ ও মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর পরিবর্তনের পেছনে অনেকগুলো কাকতালীয় ও জটিল ঘটনা একসঙ্গে কাজ করেছে। এগুলো মহাবিশ্বের অন্য কোথাও ঘটার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

৪. বড় গ্রহাণু পৃথিবীতে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা এখন নেই বললেই চলে। কারণ বিজ্ঞানীরা সবসময় গ্রহাণুগুলোর দিকে সতর্ক নজর রাখেন। কোনো গ্রহাণু পৃথিবীর জন্য হুমকি হয়ে এলে সেটাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি এখন বিজ্ঞানীদের কাছে আছে। ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে এমন একটি মিশন পরিচালনা করে নাসা। নাম ছিল ডার্ট মিশন। মানে ডাবল অ্যাস্টেরয়েড রিডাকশন টেস্ট। এ মিশনের মাধ্যমে গ্রহাণুকে আঘাত করে কক্ষপথ থেকে কিছুটা সরিয়ে দেওয়া হয়। তাই ভয়ের কোনো কারণ নেই।