আমরা জানতে চাই, জার্মানিতে থাকা একজন মানুষ কীভাবে মহাকাশের মতো জটিল বিষয়ের মধ্যে এমন উষ্ণ ভাষা খুঁজে পেলেন? বাংলা ভাষাতেই কেন ভিডিও করা শুরু করলেন?
আমিনুল হক: যাত্রাটা শুরু হয়েছিল জার্মানির মাঠে-ঘাটে হেঁটে হেঁটে কবিতার ছন্দে প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে। কখনো ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরের সূর্য, কখনো সন্ধ্যাতারা কিংবা রাতের চাঁদ নিয়ে কথা বলতাম। তারপর মনে হলো, মহাকাশের আরও গভীরে যাওয়া দরকার। কারণ ক্ষুদ্র এক মানুষের অস্তিত্বের ক্ষুদ্রতা এবং গোটা জগতের বিশালত্ব—এই দুই বিপরীত সত্য পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই সংযোগটা মানুষকে বোঝানো খুব জরুরি, যেন সে নিজেকে নতুনভাবে চিনতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই মহাকাশের গভীর বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে কাজ শুরু করি। বাংলা ভাষায় কাজ করার পেছনে প্রেরণা ছিল জীবনানন্দ দাশের কবিতা। প্রকৃতি দেখাতে গেলে তাঁর কবিতার মতো ভাষা ছাড়া সম্ভব ছিল না।
ছোটবেলার কোনো ঘটনা কি মহাকাশ নিয়ে আগ্রহের সূচনা ঘটিয়েছিল? আপনার জীবনে এমন কোনো মুহূর্ত ছিল কি, যেটা আপনাকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে শিখিয়েছে?
আমিনুল হক: ছোটবেলায় গরমের রাতে প্রায়ই বাইরে পাটি বিছিয়ে শুয়ে তারা গুনতাম। চাঁদের দিকে তাকিয়ে নানা কল্পনা করতাম। বিশেষ করে চাঁদের বুড়ির কাহিনি আমি সত্যি ভেবে অনেক ভাবনায় মগ্ন হয়ে যেতাম। হঠাৎ নক্ষত্রের ছুটে যাওয়া কিংবা অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়া আমাকে দারুণ ভাবাত।
বাহ! দারুণ। আপনার ছোটবেলা কোথায় কেটেছে?
আমিনুল হক: আমার জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার সদর থানার অদূরে একটা গ্রামে। চার ভাইবোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। শৈশব কেটেছে সেই গ্রামের প্রকৃতির সঙ্গে মিলেমিশে। সেই সঙ্গে খুব ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার উৎসাহ ছিল আমার। গ্রামের মেলা থেকে দুই টাকা দামের ছোট ছোট গল্পের বই নিয়ে আসতাম। তারপর সারা রাত কাটিয়ে দিতাম সেগুলো পড়ে। হারিয়ে যেতাম এক অজানা গল্পের জগতে। এরপর বড় হয়ে জেলা পাবলিক লাইব্রেরির সদস্য হয়ে যাই। সেখানেই বইয়ের মাধ্যমে মহাকাশ নামে এক ভিন্ন জগতে প্রবেশ করার সুযোগ হয়। এ নিয়ে যত বই পেয়েছি, সব পড়ে ফেলেছি। বলতে গেলে ওই পরিবেশই আমার মহাকাশ নিয়ে ভাবনার ভিত তৈরি করেছে।
আপনি কি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন? আপনার একাডেমিক পটভূমি কতটা সাহায্য করেছে?
আমিনুল হক: না, আমি স্কুলে ব্যবসায় শিক্ষা নিয়ে পড়েছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতক শেষ করে ২০১৭ সালে জার্মানিতে এসে কগনিটিভ সায়েন্স পড়েছি। অস্তিত্বের যেসব প্রশ্ন থেকে মহাকাশ বিষয়ে আগ্রহ জন্মেছে, তা এসেছে দর্শনের দিক থেকে। জগৎ কী? জীবন কী?—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দূর মহাকাশকে জানা জরুরি হয়ে পড়ে। তবে জার্মানিতে এসে শুরুতে ভাষাগত ও আবহাওয়া সংক্রান্ত কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে এখানকার জীবনযাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিই। ধীরে ধীরে প্রচণ্ড শীত ও বরফের ভেতর প্রকৃতির এক ভিন্ন রূপের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি।
আপনার প্রতিটি ভিডিওতে যে গভীরতা দেখি, তার পেছনের প্রস্তুতি কেমন হয়? তথ্যসূত্র, গবেষণা, চিত্রনির্মাণ সমন্বয় কীভাবে করেন?
আমিনুল হক: আমি মহাকাশ নিয়ে প্রচুর বই পড়েছি। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় জামাল নজরুল ইসলাম, আলী ইমাম, আবদুল্লাহ আল মুতী প্রমুখ লেখকের বই পড়ে একটা সাধারণ জ্ঞান তৈরি হয়েছে। বিদেশি লেখকদের মধ্যে স্টিফেন হকিং, কার্ল সাগান, ব্রায়ান গ্রিন, মিচিও কাকুর লেখা নিয়মিত পড়ি। তাঁদের বইগুলো আমার চিন্তাকে প্রসারিত করেছে। কার্ল সাগানের কসমস এবং হকিংয়ের আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম আমার বিশেষ প্রিয়। ভিডিও বানাতে গেলে নির্দিষ্ট টপিক বেছে নিয়ে গুগল ও অন্যান্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। এখন এআই টুলস ব্যবহার করায় গবেষণা বা রিসার্চ আরও সহজ হয়েছে। স্ক্রিপ্ট লেখার পর আমার ছোট্ট স্টুডিওতে গ্রিন স্ক্রিনে শুট করি, নিজেই এডিট করি এবং ফেসবুক-ইউটিউবে আপলোড করি।
অনলাইনে তো অনেক ভুল তথ্য ঘোরে। আপনি সত্য-মিথ্যা যাচাই করেন কীভাবে?
আমিনুল হক: প্রতিটি তথ্য কয়েকটি সূত্র থেকে যাচাই করি। চেষ্টা করি বড় কোনো ভুল যেন না আসে। কারণ জটিল বিষয়গুলোকে সহজ করে উপস্থাপন করতে গিয়ে ভুল করার ভয় সবসময়ই থাকে।
দর্শকেরা কোন ধরনের কনটেন্টে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ দেখায়?
আমিনুল হক: মহাকাশ বিষয়ে মানুষের এত আগ্রহ আমি আগে বুঝিনি। গ্রহ-নক্ষত্রের বিশালত্ব, দূরত্ব, বয়স—এসব মিলে মানুষ এক আশ্চর্য কল্পনার জগতে হারিয়ে যায়। ব্ল্যাকহোল, টাইম ট্রাভেল, এলিয়েন ইত্যাদি বিষয়ে অনেক প্রশ্ন আসে।
সবচেয়ে অদ্ভুত প্রশ্ন কোনটি পেয়েছেন দর্শকের কাছ থেকে?
আমিনুল হক: এলিয়েন! মানুষ খুব জানতে চায় এত এত গ্রহ-উপগ্রহ, নক্ষত্র-গ্যালাক্সির ভেতরে আমাদের মতো প্রাণী কোথাও আছে কি না। থাকলে দেখতে কেমন? তাদের জীবন ও সমাজ কেমন?
এলিয়েনদের অস্তিত্ব নিয়ে আপনার ভাবনা কী?
আমিনুল হক: বলা হয় পৃথিবীর সব সৈকতের বালুকণা একত্র করলে যতসংখ্যক কণা হবে, তার থেকেও বেশি নক্ষত্র আছে মহাবিশ্বে। ফলে এলিয়েনের অস্তিত্ব খুবই স্বাভাবিক অনুমান।
আপনি বলছিলেন, আপনার একটি ভিডিও কোটির বেশি ভিউ হয়েছে? সেই ভিডিওটি কী ছিল?
আমিনুল হক: সেই ভিডিওটির শিরোনাম ছিল ‘মহাবিশ্ব এবং আমাদের অস্তিত্ব’। সেখানে আমি পায়ের নিচের ক্ষুদ্র ধূলিকণা থেকে শুরু করে চারপাশের জগত, মানুষ, মাথার ওপরের আকাশ, আকাশভরা নক্ষত্র, তারপর গ্যালাক্সি, মহাবিশ্বের শুরু, বিগ ব্যাং, আমাদের সৌরজগতের গঠন এবং এ সবকিছুর সঙ্গে আমাদের অস্তিত্বের সংযোগটা কোথায়, সেটা জীবনানন্দ দাশের একটা কবিতার ভেতর দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। ভিডিওটি ছিল প্রায় ৮ মিনিটের। ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছিল। ফেসবুকে প্রায় ২ কোটির বেশি মানুষ দেখেছে। বর্তমানে ফেসবুকে আমার সাত লাখের বেশি ফলোয়ার এবং ইউটিউবে প্রায় দশ হাজার সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। ফেসবুকের মাধ্যমেই আমার বেশি পরিচিতি তৈরি হয়।
আপনি যদি একজন নভোচারী হতে পারতেন, কোথায় যেতেন?
আমিনুল হক: চাঁদে! চাঁদ আমার খুব প্রিয়। চাঁদনি রাতে প্রায়ই ঘর ছেড়ে জার্মানির গ্রামের রাস্তায় হাঁটতে বের হই। এই চাঁদকে কেন্দ্র করেই আমার উপন্যাস নীল নক্ষত্রের নিচে-এর প্রধান চরিত্র গড়ে উঠেছে। কিছু কবিতাও লিখেছি, শিগগিরই সে নিয়ে বই আসবে।
আপনি কি বিশ্বাস করেন, একদিন মানুষ মঙ্গলে গিয়ে ঘর বানাবে?
আমিনুল হক: প্রযুক্তির গতিবিধি দেখে মনে হয়, আমরা বেঁচে থাকতেই সেটা দেখে যেতে পারব।
বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে মহাকাশ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে হয়?
আমিনুল হক: আমি যতগুলো বিষয় নিয়ে ভিডিও করেছি, তার মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ মহাকাশ নিয়ে। তরুণদের মাঝে মহাকাশ জানার এক প্রবল তৃষ্ণা আছে। অনেকেই বারবার অনুরোধ করেন আরও বেশি করে মহাকাশ নিয়ে ভিডিও বানাতে।
আপনার ভিডিও কি তাদের প্রভাবিত করছে?
আমিনুল: অনেকেই মেসেজ করে জানান, আমার ভিডিও দেখার পর তাঁরা রাতে ঘুমাতে পারেন না, আকাশের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে ভাবেন। নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়। অনেকেই বলেন, সৃষ্টিকর্তার প্রতি তাদের বিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে।
মহাকাশচর্চা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য আপনি কী স্বপ্ন দেখেন?
আমিনুল হক: আমি মহাকাশের বিশালতা ও অস্তিত্বের দার্শনিক প্রশ্নগুলোকে সহজ ভাষায় বইয়ের মাধ্যমে তুলে ধরতে চাই। ভিডিওর মাধ্যমেও একই কাজ করছি। শিশুদেরও যেন এই জটিল বিষয় সহজে বোঝানো যায়, এই ভাবনায় আমি বই লিখছি। মহাবিশ্ব এবং আমাদের অস্তিত্ব নামে একটি বই আসছে আগামী মেলায়।
যারা ভবিষ্যতে মহাকাশ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
আমিনুল হক: মহাকাশ নিয়ে সহজ ভাষায় ভিডিও বানালেও একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। আমি তার বাস্তব প্রমাণ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের নামে একটি ইনস্টিটিউট আছে, যেখানে শরীফ মাহমুদ সিদ্দিকী ভাই দারুণ কাজ করছেন। বিদেশেও অনেক সুযোগ রয়েছে।
ভবিষ্যতে আপনি কী নিয়ে কাজ করতে চান?
আমিনুল হক: চেষ্টা করছি এমন একটি ইউটিউব চ্যানেল গড়ার, যেখানে মহাবিশ্বকে দর্শন ও সাহিত্যের আলোকে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা যাবে। মানুষ সেখানে নিজের অস্তিত্বও এক নতুন মাত্রায় চিনতে পারবে।
আপনি যদি টাইম মেশিনে চড়ে অতীতে যেতে পারতেন, কোন বিজ্ঞানীর সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন?
আমিনুল হক: নিউটন! একনাগাড়ে এত মনোযোগ দিয়ে এত জটিল বিষয়ে কীভাবে সাধনা করেছেন—এটা বিস্ময়কর।
আপনার কি আর কিছু বলার আছে?
আমিনুল হক: এই বিশাল জগৎকে অনুভব করার ভেতর এক আলাদা স্বাদ আছে, যেটা অন্য কোনো উপায়ে পাওয়া যায় না। মহাকাশ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি প্রতিনিয়ত সেই স্বাদ পাই এবং দর্শকদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে দিতে চাই। আমার ভিডিও ও বই—দুটোই সে প্রয়াস।
কথা বলে ভালো লাগল। আপনার এই সাক্ষাৎকার পড়ে তরুণেরা উৎসাহিত হবে। আপনাকে ধন্যবাদ।
আমিনুল হক: আপনাকে ও বিজ্ঞানচিন্তাকেও ধন্যবাদ।