হার্ডডিস্কে একটি মুভি জমা রাখতে কতগুলো পরমাণু লাগে
রিল এবং ভিডিও ক্যাসেটে মুভি দেখার যুগ তো সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই হয়তো সেসব প্রযুক্তির কথা জানেও না। এখন মুভি দেখা মানেই কম্পিউটার মাউস কিংবা রিমোট কন্ট্রোলে মাত্র কয়েকটা ক্লিক। ব্যস! মুহূর্তেই ল্যাপটপ বা স্মার্ট টিভি পর্দায় ভেসে ওঠে কাঙ্খিত কোনো মুভি দৃশ্য!
এটাই এখন আমাদের সবার কাছে স্বাভাবিক। সে কারণেই মুভিকে এখন আর আমরা হয়তো ফিল্মের রিল বা ভিডিও ক্যাসেটের মতো বস্তুগত বা ভৌত কিছু ভাবি না। কারণ কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে শত শত মুভি জমা রাখলেও পিসি বা ল্যাপটপের ওজন বাড়ে না! কিন্তু যেকোনো মুভি বা ছবি মানেই তথ্য। আর সেসব দৃশ্য পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্য সেই সেসব তথ্যকে কোনো না কোনো মাধ্যমে ভৌত পরিবর্তনের মাধ্যমে জমা রাখতে হয়। মুভির কোনো রঙিন দৃশ্যের তথ্য স্ক্রিনের রঙিন বিন্দু বা পিক্সেলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমাদের চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলতে হয়।
ধরা যাক, আমরা যদি একটা মুভি কাগজে জমা রাখতে চাই। তাহলে কী হতো?
সেক্ষেত্রে খালি জায়গার পরিবর্তন বোঝাতে আমাদের কাগজটিকে রঙিন করতে হতো। আর কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভে ছোট ছোট চুম্বকীয় বা ম্যাগনেটিক নেইলের দিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তথ্য জমা রাখা হয়। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে, আমরা ঠিক কতগুলো ম্যাগনেটিক নেইলের দিক পরিবর্তন করি? আর একটি পুরো মুভি জমা রাখতে আমরা ভৌতভাবে ঠিক কতগুলো পরমাণু পরিবর্তন করি?
যেকোনো মুভি বা ছবি মানেই তথ্য। আর সেসব দৃশ্য পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্য সেই সেসব তথ্যকে কোনো না কোনো মাধ্যমে ভৌত পরিবর্তনের মাধ্যমে জমা রাখতে হয়।
ধরা যাক, আমরা টম ক্রুজের একটি মুভি কাগজে জমা রাখছি। কোনো ছবিকে আমাদের চোখে ভিডিওর মতো চলমান বা গতিশীল রাখতে এক ধরনের গতির বিভ্রম তৈরি করতে হয়। সে জন্য প্রতি সেকেন্ডে আমাদের চোখের সামনে প্রায় ৩০টি এ৪ (A4) সাইজের ফটোগ্রাফিক কাগজ সরাতে হবে। ছবির একটি ভৌত অনুক্রম বা সিকোয়েন্স হিসেবে সিনেমা জমা রাখার এই পদ্ধতিতেই চলচ্চিত্রের শুরুর দিনগুলোতে সিনেমার যাত্রা শুরু হয়েছিল। নির্বাক যুগের সেই রিলগুলো সাধারণত কিছুটা ধীরগতিতে চলত—প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৬ থেকে ২৪ ফ্রেম।
এবার একটা গাণিতিক হিসেব করা যাক। এ৪ সাইজের একটি কাগজের ওজন সাধারণত প্রায় ৫ গ্রাম। এতে আনুমানিক প্রায় ১০২৩টি পরমাণু থাকে। অর্থাৎ ১-এর পিঠে ২৩টি শূন্য। সেটা প্রায় একশ বিলিয়ন ট্রিলিয়নের সমান।
একটি ২ ঘণ্টার মুভি চালানোর জন্য, প্রতি সেকেন্ডে ৩০টি কাগজ হিসেবে প্রয়োজন হবে মোট প্রায় ২১৬,০০০টি কাগজ। প্রতিটি কাগজের ওজন ৫ গ্রাম হিসেবে ২১৬,০০০টি কাগজের ওজন হবে এক টনেরও বেশি। কিন্তু একটি মাত্র মুভি রাখার জন্য এক টন কাগজ কোনোভাবেই সুবিধাজনক নয়। মুভিটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে চাইলে আস্ত একটা ট্রাক লাগবে।
আর এই সবগুলো কাগজের পরমাণুর সংখ্যা হিসেব করলে পাওয়া যাবে প্রায় ১০২৯টি। ১০২৯টি পরমাণুর মতো একটি সংখ্যা যদি আপনার মাথায় চট করে না ঢোকে, তাহলে তার কারণ হলো সংখ্যাটি অনেক বড়। আসলে এত বড় পরিমাণ সম্পর্কে সাধারণত আমাদের ধারণা খুব একটা স্পষ্ট নয়।
এ৪ সাইজের একটি কাগজের ওজন সাধারণত প্রায় ৫ গ্রাম। এতে আনুমানিক প্রায় ১০২৩টি পরমাণু থাকে। অর্থাৎ ১-এর পিঠে ২৩টি শূন্য। সেটা প্রায় একশ বিলিয়ন ট্রিলিয়নের সমান।
তবে হার্ডডিস্ক বা পেনড্রাইভের মতো মুভি জমা রাখার আধুনিক প্রযুক্তিগুলো এই সংখ্যাটিকে বিস্ময়করভাবে কমিয়ে আনতে পারে। আমরা এখন কম্পিউটারে শুধু সিনেমাই জমা রাখি না, বরং খুব সহজেই তা আদান-প্রদানও করতে পারি। তার জন্য কোনো ট্রাকের প্রয়োজনও হয় না। কিন্তু যে জিনিসটি রাখতে প্রায় এক টন কাগজ লাগত, সেটি কীভাবে এমনভাবে জমা ও স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে যেন তার কোনো ওজনই নেই?
এটাই আসলে আধুনিক প্রযুক্তির ম্যাজিক। ডিজিটাল মাধ্যমে যেকোন তথ্যকে সংরক্ষণ করা হয় বাইনারি পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে। অর্থাৎ ১ এবং ০। আপনি যখন কোনো কিছু লেখেন, গান শোনেন বা মুভি দেখেন, তখন কম্পিউটার ভেতরের সিস্টেমে সেটিকে প্রথমে সংখ্যায় রূপান্তর করে। যেমন ইংরেজি বড় হাতের A অক্ষরটিকে কম্পিউটার চেনে ৬৫ সংখ্যা হিসেবে। কম্পিউটার আমাদের বাংলা ‘ক’ অক্ষরটিকে চেনে ২৪৫৫ সংখ্যাটি দিয়ে। এরপর সেই সংখ্যাটিকে রূপান্তর করা হয় ১ এবং ০-এর কম্বিনেশনে। যেমন আমাদের দশমিক পদ্ধতির ৬৫ সংখ্যাটি বাইনারি পদ্ধতিতে হয়ে যায় 01000001। অন্যদিকে ২৪৫৫ সংখ্যাটি বাইনারি পদ্ধতিতে হয়ে যায়: 100110010101।
একইভাবে ল্যাপটপের পর্দায় বিভিন্ন রংও আসলে এই বাইনারি পদ্ধতির খেলা। পর্দায় একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কোনো একটি নির্দিষ্ট রঙ দেখানোর তথ্য স্টোরেজে তিনটি রঙের (লাল, নীল এবং সবুজ) সংমিশ্রণ হিসেবে জমা থাকে। স্টোরেজ সিস্টেমটি এই প্রতিটি রঙ, তাদের উজ্জ্বলতা এবং সেগুলো কোন অবস্থানে দেখানো হবে, তা জমা রাখতে ০ এবং ১-এর একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে। আমরা যখন কোনো মুভি দেখতে চাই, তখন সফটওয়্যার এই তথ্যগুলো ব্যবহার করে এবং ০ ও ১-গুলোকে আমাদের স্ক্রিনে রঙিন বিন্দু হিসেবে ফুটিয়ে তোলে, যা একত্রে মিলে একটি সুসংগত ছবি তৈরি করে।
যখন আমাদের হার্ড ডিস্ক ড্রাইভে তথ্য জমা রাখার প্রয়োজন হয়, তখন এই দলের দিকগুলো পরিবর্তন করা হয়, আর যখন আমরা তথ্য মুছে ফেলি, তখনো একইভাবে এগুলোর পরিবর্তন ঘটে।
যেমন, লাল রঙকে প্রকাশ করা হয় 1111 1111 0000 0000 0000 0000 সংখ্যা দিয়ে। সবুজ রঙের ক্ষেত্রে ১-গুলো থাকবে মাঝখানে। অর্থাৎ 0000 0000 1111 1111 0000 0000। আর নীল রঙের বেলায় সেগুলো থাকবে শেষে, অর্থাৎ 0000 0000 0000 0000 1111 1111। এই তিনটি রঙের সংমিশ্রণে যেকোনো রঙ তৈরি করা সম্ভব, যেখানে আমরা কোন রঙটি কতটুকু চাই তা বোঝাতে বিভিন্ন অবস্থানে ১ এবং ০ বসানো হয়।
এই তিনটি রঙ যেভাবে পুরো বর্ণালী তৈরি করে তা অনেকটা নতুন রঙ পাওয়ার জন্য জলরঙ মেশানোর মতো। তবে এখানে একটি তফাত আছে! যেমন, কম্পিউটার স্ক্রিনে লাল এবং সবুজ মেশালে আমরা পাব হলুদ রঙ। কিন্তু কোনো ড্রয়িং শিক্ষক হয়তো এতে আপত্তি জানাতে পারেন। এই পার্থক্যের কারণ হলো স্ক্রিন নিজে আলো ছড়ায় (অ্যাডিটিভ বা সংযোজক রঙ)। অন্যদিকে কাগজ কেবল আলো প্রতিফলিত করে (সাবট্রাক্টিভ বা বিয়োজক রঙ)।
তাহলে হার্ডডিস্ক ড্রাইভ কীভাবে এই শূন্য এবং একগুলোকে জমা রাখে? সেখানে কী ধরনের ভৌত পরিবর্তন ঘটে?
আসলে হার্ডডিস্ক ড্রাইভে চুম্বকীয় পদার্থের একটি আস্তরণ বা ফিল্ম থাকে যা ছোট ছোট দানা দিয়ে গঠিত। প্রতিটি দানা প্রায় ১০ ন্যানোমিটার চওড়া (এক ন্যানোমিটার হলো এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগ)। হার্ডডিস্কের ভেতরে থাকা এই কোটি কোটি ক্ষুদ্র চুম্বকীয় অংশকে বিদ্যুতের সাহায্যে চার্জ করে এগুলোর দিক বদলে দেওয়া হয়। একদিকের মুখকে বলা হয় ১, আর উল্টো দিকের মুখকে বলা হয় ০। যখন আমাদের হার্ড ডিস্ক ড্রাইভে তথ্য জমা রাখার প্রয়োজন হয়, তখন এই দলের দিকগুলো পরিবর্তন করা হয়, আর যখন আমরা তথ্য মুছে ফেলি, তখনো একইভাবে এগুলোর পরিবর্তন ঘটে।
হার্ডডিস্কের ভেতরে থাকা এই কোটি কোটি ক্ষুদ্র চুম্বকীয় অংশকে বিদ্যুতের সাহায্যে চার্জ করে এগুলোর দিক বদলে দেওয়া হয়। একদিকের মুখকে বলা হয় ১, আর উল্টো দিকের মুখকে বলা হয় ০।
এই গোলাকার দানাগুলো হার্ড ড্রাইভের রিডারের কাছে চৌম্বকীয় পদার্থের তৈরি ছোট ছোট পেরেকের (ম্যাগনেটিক নেইল) মতো। রিডারটা যদি ওপরের দিকে মুখ করে থাকা অনেকগুলো পেরেক শনাক্ত করে, তাহলে সেটি সেগুলোকে ১ হিসেবে ধরে নেয়। একইভাবে নিচের দিকে মুখ করে থাকা অংশগুলোকে ০ হিসেবে ধরে নেয়।
এই চুম্বকীয় দানাগুলো ড্রাইভে সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো থাকে, যা ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বিটের প্রতিনিধিত্ব করে। এমন ৮টি বিট মিলে তৈরি হয় একটি বাইট।
ধরা যাক, আমাদের কাছে একটি সিনেমা আছে যা ২ গিগাবাইট স্টোরেজ দখল করে। এর মানে এটি ২ বিলিয়ন বাইট বা ১৬ বিলিয়ন বিট ব্যবহার করছে। হিসেবে দেখা গেছে, একটি মাত্র বিট জমা রাখতে হার্ডডিস্ক ড্রাইভের প্রায় দশ লাখ পরমাণুর প্রয়োজন হয়। কাজেই একটি ২ গিগাবাইটের মুভি বা ১৬ বিলিয়ন বিট একটি ড্রাইভে জমা রাখতে প্রায় ১৬ কোয়াড্রিলিয়ন পরমাণু (১৬ হাজার ট্রিলিয়ন, ১.৬ × ১০১৬) লাগে। এটি একটি বিশাল সংখ্যা হলেও কাগজের তুলনায় এটি অনেক অনেক ছোট।
সহজ বাংলায় বলতে গেলে, এক ফোঁটা পানিতে পরমাণুর সংখ্যা হলো প্রায় ৫ সেক্সটিলিয়ন বা ৫ হাজার বিলিয়ন ট্রিলিয়ন! সে তুলনায় ২ গিগাবাইট মুভির জন্য প্রয়োজনীয় পরমাণুর সংখ্যা অনেক অনেক কম।
সেটা কতটা ক্ষুদ্র?
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, ল্যাবরেটরির একটি সাধারণ ড্রপার থেকে পড়া মাত্র ১ ফোঁটা পানিতে (যা প্রায় ০.০৫ মিলিলিটার) পরমাণুর সংখ্যা থাকে আনুমানিক: ৫,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বা ৫ × ১০২১টি। সহজ বাংলায় বলতে গেলে, এক ফোঁটা পানিতে পরমাণুর সংখ্যা হলো প্রায় ৫ সেক্সটিলিয়ন বা ৫ হাজার বিলিয়ন ট্রিলিয়ন!
সে তুলনায় ২ গিগাবাইট মুভির জন্য প্রয়োজনীয় পরমাণুর সংখ্যা অনেক অনেক কম। তা এতই কম যে ওই পরিমাণ পরমাণু দিয়ে এক ফোঁটা পানিও হয় না।
সে কারণেই যে মুভিটি কাগজে রাখতে গেলে একটা আস্ত ট্রাকে করে বহন করতে হতো, সেটিই আপনার ল্যাপটপে প্রায় কোনো ওজন ছাড়াই রয়ে যায়।
