কোষের ভেতরের খুদে কাঁচি ও এক অদৃশ্য টহলদার

বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় বড় আবিষ্কারের শুরুটা হয় খুব ছোট, অদ্ভুত বা অপ্রত্যাশিত কোনো ভুল থেকে। আরএনএ ইন্টারফেরেন্স বা আরএনএআই (RNAi)-এর গল্পটাও ঠিক তেমন। এটি কোনো সুপরিকল্পিত মিশন ছিল না; বরং কিছু অদ্ভুত পরীক্ষা, কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি আর গবেষকদের দীর্ঘ ধৈর্যের ফসল। আজ আমরা একে কোষের জিন বন্ধ করার এক জাদুকরী অস্ত্র হিসেবে জানি।

কোষের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট বার্তা বহনের কাজ করে মেসেঞ্জার আরএনএছবি: জন ইনেস সেন্টার

একটি ভুল এবং সাদা পেটুনিয়া

আজকের আধুনিক জিনতত্ত্বের যুগে আমরা জানি, কোষের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট বার্তা বহনের কাজ করে এমআরএনএ (mRNA) বা মেসেঞ্জার আরএনএ। আরএনএআই হলো এমন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোষ নিজেই তার নির্দিষ্ট কোনো এমআরএনএ-কে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। ফলে সেই আরএনএ থেকে যে প্রোটিনটি তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা আর তৈরি হতে পারে না। কিন্তু এই সহজ সত্যটুকু বুঝতে বিজ্ঞানীদের লেগে গিয়েছিল বহু বছর।

১৯৯০ সালের দিকে কিছু বিজ্ঞানী পেটুনিয়া ফুলের রঙ নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তারা চেয়েছিলেন ফুলের বেগুনি রঙ আরও গাঢ় করতে। এজন্য তাঁরা ভাবলেন, যে জিন রঙ তৈরি করে, সেটির কপি সংখ্যা বাড়িয়ে দিলে হয়তো রঙ আরও গাঢ় হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই জিন গাছে ঢোকানো হলো। কিন্তু ফলাফল দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলেন। ফুল গাঢ় বেগুনি হওয়ার বদলে সাদা হয়ে গেল! কিছু ফুলে আবার অদ্ভুত দাগ দেখা গেল—আংশিক বেগুনি, আংশিক সাদা।

পেটুনিয়া ফুলে অতিরিক্ত রঙের জিন যোগ করার পর কো-সাপপ্রেশনে সাদা হয়ে যাওয়া।

গাঢ় বেগুনি হওয়ার বদলে ল্যাবের টবগুলোতে যখন একের পর এক ধবধবে সাদা ফুল ফুটতে শুরু করল, বিজ্ঞানীরা তখনো জানতেন না যে এই একটি ব্যর্থতা আসলে জীববিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম এক মহাবিস্ময়ের দরজা খুলে দিতে চলেছে।

আরও পড়ুন
আরএনএআই হলো এমন একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোষ নিজেই তার নির্দিষ্ট কোনো এমআরএনএ-কে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।

পরে পরীক্ষা করে দেখা গেল, শুধু নতুন ঢোকানো জিনই নয়, গাছের নিজের জিনও কম কাজ করছে। অর্থাৎ জিন বাড়ানোর চেষ্টা করতে গিয়ে উল্টো পুরো সিস্টেমটাই কম সক্রিয় হয়ে গেছে। তখন এটাকে কো-সাপপ্রেশন বলা হয়েছিল। আরও সহজ ভাষায়, এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো কোষে একটি বহিরাগত জিনের উপস্থিতি নিজের অনুরূপ কোনো জিনকে নিষ্ক্রিয় বা দমিয়ে দেয়, যার ফলে ওই জিনের প্রকাশ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আসলে কী ঘটছিল, তা তখনও পরিষ্কার ছিল না।

পরে ছত্রাক ও অন্য কিছু জীবেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেল। কোনো জিনের অতিরিক্ত কপি যোগ করলে সেই জিনের কাজ কমে যাচ্ছিল। তখন গবেষকেরা বুঝতে পারলেন, এটি আলাদা আলাদা ঘটনা নয়। নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু সেটি কী?

পেটুনিয়া ফুলে যে কো-সাপপ্রেশন দেখা গিয়েছিল, সেটি প্রথমে ছিল এক অদ্ভুত পরীক্ষাগত ব্যর্থতা। কিন্তু পরে ধীরে ধীরে বোঝা গেল, এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি উদ্ভিদের এক প্রাচীন ও সুসংগঠিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ। উদ্ভিদ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বিবর্তনের পথে একটি সূক্ষ্ম আরএনএ-নির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা পরে আমাদের কাছে আরএনএ ইন্টারফেরেন্স নামে পরিচিত হয়।

আরও পড়ুন
কো-সাপপ্রেশন এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো কোষে একটি বহিরাগত জিনের উপস্থিতি নিজের অনুরূপ কোনো জিনকে নিষ্ক্রিয় বা দমিয়ে দেয়, যার ফলে ওই জিনের প্রকাশ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়।

ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ: কোষের ভেতরের অনুপ্রবেশকারী

অধিকাংশ উদ্ভিদ ভাইরাস তাদের প্রতিলিপি তৈরির সময় ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ (dsRNA) তৈরি করে। স্বাভাবিক কোষে আরএনএ সাধারণত একক-স্তরবিশিষ্ট হয়। তাই কোষের জন্য দ্বিস্তর আরএনএ একটি অস্বাভাবিক সংকেত। এটি যেন কোষের কাছে একটি সতর্কবার্তা—এখানে কিছু অচেনা জিনিস প্রবেশ করেছে।

এই অস্বাভাবিক গঠন শনাক্ত করার জন্য কোষে বিশেষ প্রোটিন ব্যবস্থা রয়েছে। ডিএস আরএনএ কোষে প্রবেশ করামাত্র সেটিকে কেটে ছোট ছোট অংশে ভেঙে ফেলা হয়। এই ক্ষুদ্র আরএনএ টুকরোগুলো এরপর ভাইরাসের নিজস্ব আরএনএ-কে খুঁজে বের করে এবং ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এটি শুধু একটি রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি একটি লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা। ভাইরাস যতই নিজের কপি তৈরি করার চেষ্টা করুক, কোষ তার আরএনএ চিনে সেটিকে ভেঙে দেয়। ফলে ভাইরাসের বিস্তার থেমে যায় বা ধীর হয়ে পড়ে। এভাবে জিন সাইলেন্সিং উদ্ভিদের জন্য এক ধরনের প্রতিরক্ষা ঢাল হিসেবে কাজ করে।

একক আরএনএ তেমন কাজ করেনি, কিন্তু ডিএস আরএনএ প্রায় সম্পূর্ণভাবে লক্ষ্য জিনকে বন্ধ করে দেয়। এই পরীক্ষা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগে অ্যান্টিসেন্স আরএনএ প্রযুক্তি নিয়ে বহু বিভ্রান্তি ছিল।

আবার পেটুনিয়ার ঘটনাটিতে ফিরে আসা যাক। বিজ্ঞানীরা যখন রঙের জিনের অতিরিক্ত কপি ঢোকালেন, তখন উদ্ভিদের কোষ সেই অতিরিক্ত আরএনএ-কে স্বাভাবিক বলে চিনতে পারেনি। সম্ভবত সেই জিনের অতিরিক্ত প্রকাশের ফলে এমন আরএনএ গঠন তৈরি হয়েছিল, যা ভাইরাস সংক্রমণের সময় দেখা ডিএস আরএনএ-এর মতো। কোষ সেটিকে বিপজ্জনক সংকেত হিসেবে ধরে নেয় এবং পুরো সংশ্লিষ্ট আরএনএ-কেই নষ্ট করে ফেলে। যার ফলাফল হিসেবে শুধু নতুন জিন নয়, গাছের নিজস্ব রঙ উৎপাদনকারী জিনও নীরব হয়ে যায়। আর এর প্রতিক্রিয়াতেই ফুল সাদা হয়ে ওঠে। 

আরও পড়ুন
ভাইরাস যতই নিজের কপি তৈরি করার চেষ্টা করুক, কোষ তার আরএনএ চিনে সেটিকে ভেঙে দেয়। ফলে ভাইরাসের বিস্তার থেমে যায় বা ধীর হয়ে পড়ে।

কৃমির পরীক্ষা এবং দুই বিজ্ঞানীর নোবেল জয়

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে সি-এলিগ্যান্স (Caenorhabditis elegans) নামের ছোট একটি কৃমিতে জিন নিয়ে পরীক্ষা হচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা অ্যান্টিসেন্স আরএনএ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জিনের কাজ কমানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো, শুধু অ্যান্টিসেন্স আরএনএ নয়, সেন্স আরএনএ ব্যবহার করলেও একই ফল পাওয়া যাচ্ছিল। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কন্ট্রোল পরীক্ষাতেও জিনের কাজ কমে যাচ্ছিল।

এই অদ্ভুত ফলাফল গবেষকদের ভাবতে বাধ্য করল। তাহলে কি একটা একক আরএনএ দিয়ে আসলে কিছু হয় না? বরং দুইটা আরএনএ একসঙ্গে লেগে যে জোড়া (ডাবল) আরএনএ তৈরি করে, সেটাই কি জিন বন্ধ করার আসল কারণ?

বাঁ থেকে অ্যান্ড্রু ফায়ার ও ক্রেইগ মেলো
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

অ্যান্ড্রু ফায়ার ও ক্রেইগ মেলো এই প্রশ্নটিকে গভীরভাবে গুরুত্ব দিয়ে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা কৃমির ওপর আলাদাভাবে সেন্স আরএনএ, অ্যান্টিসেন্স আরএনএ এবং দুটিকে একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করা ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ ব্যবহার করে পরীক্ষা চালান। ফলাফল ছিল একেবারে পরিষ্কার ও নিঃসন্দেহ—ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ নির্দিষ্ট জিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে সক্ষম, অথচ একক আরএনএ ততটা কার্যকর নয়।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা অ্যান্টিসেন্স আরএনএ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট জিনের কাজ কমানোর চেষ্টা করছিলেন। সমস্যা হলো, শুধু অ্যান্টিসেন্স আরএনএ নয়, সেন্স আরএনএ ব্যবহার করলেও একই ফল পাওয়া যাচ্ছিল।

১৯৯৮ সালে সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত অ্যান্ড্রু ফায়ার ও ক্রেইগ মেলোর গবেষণাপত্রটি প্রথমে মনে হচ্ছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় তাঁরা দেখিয়েছিলেন, ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ যদি কৃমি সি-এলিগ্যান্স-এর দেহে প্রবেশ করানো হয়, তবে সেটি নির্দিষ্ট জিনের কার্যকারিতা শক্তভাবে কমিয়ে দিতে পারে। শুধু তাই নয়, এই প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট, যেখানে অন্য কোনো জিন প্রভাবিত হয়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অল্প পরিমাণ ডিএস আরএনএ দিয়েও শক্তিশালী জিন সাইলেন্সিং সম্ভব হয়েছিল।

সি-এলিগ্যান্স এর গঠন যা আরএনএআই আবিষ্কারে ব্যাবহার করা হয়েছিল

তাঁদের পরীক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল জিন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ফলাফল থেকে দেখা গেল, একক আরএনএ তেমন কাজ করেনি, কিন্তু ডিএস আরএনএ প্রায় সম্পূর্ণভাবে লক্ষ্য জিনকে বন্ধ করে দেয়। একবার এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর গবেষকেরা বুঝতে পারলেন, এতদিন যে বিচ্ছিন্ন অদ্ভুত ফলাফল দেখা যাচ্ছিল—উদ্ভিদে কো-সাপপ্রেশন কিংবা ছত্রাকের জিন সাইলেন্সিং—এসবই আসলে একই প্রক্রিয়ার প্রকাশ। গবেষণাটি প্রকাশের পর বৈজ্ঞানিক সমাজে ধীরে ধীরে উপলব্ধি জন্ম নেয় যে এটি কেবল একটি নতুন কৌশল নয়, বরং এটি কোষের একটি মৌলিক জৈব প্রক্রিয়া। ২০০৬ সালে অ্যান্ড্রু ফায়ার ও ক্রেইগ মেলো তাঁদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

আরও পড়ুন
ডাইসারকে আপনি ছোট একটি কাঁচি হিসেবে ভাবতে পারেন। এটি সেই ডাবল আরএনএ-কে বড় অবস্থায় রাখে না, বরং সেটিকে ছোট ছোট টুকরোয় কেটে ফেলে।

কোষের ভেতরের কাঁচি এবং টহলদার দল

ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ কোষে ঢোকার পর ঠিক কী হয়? বিষয়টি আসলে খুব জটিল নয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুবই সুন্দরভাবে সাজানো একটা গঠন। একবার ভেবে দেখুন, কোষের ভেতর যেন একটি বড় ওয়ার্কশপ। এখানে এমআরএনএ হলো সেই কাগজ, যার নির্দেশ দেখে প্রোটিন তৈরি হয়। এখন যদি কোনো কারণে এমন একটি আরএনএ ঢুকে পড়ে, যেটি দুই স্তরবিশিষ্ট, তখন কোষ সেটিকে ‘অস্বাভাবিক সংকেত’ হিসেবে ধরে নেয়।

কোষের ভেতরে তখন একটি বিশেষ প্রোটিন এগিয়ে আসে, যার নাম ডাইসার
ছবি: উইকিপিডিয়া

কোষের ভেতরে তখন একটি বিশেষ প্রোটিন এগিয়ে আসে, যার নাম ডাইসার (Dicer)। ডাইসারকে আপনি ছোট একটি কাঁচি হিসেবে ভাবতে পারেন। এটি সেই ডাবল আরএনএ-কে বড় অবস্থায় রাখে না, বরং সেটিকে ছোট ছোট টুকরোয় কেটে ফেলে। প্রতিটি টুকরো খুব ছোট—মাত্র ২১–২৩ নিউক্লিওটাইডের মতো। এই ছোট টুকরোগুলোই পরে সাইআরএনএ (siRNA) নামে পরিচিত হয়।

আরও পড়ুন
এমআরএনএ হলো সেই কাগজ, যার নির্দেশ দেখে প্রোটিন তৈরি হয়। যদি কোনো কারণে এমন একটি আরএনএ ঢুকে পড়ে, যেটি দুই স্তরবিশিষ্ট, তখন কোষ সেটিকে অস্বাভাবিক সংকেত হিসেবে ধরে নেয়।
আরএনএআই-এর ধাপসমূহ। ডিএস আরএনএ থেকে সাইআরএনএ তৈরি, রিস্ক (RISC) এর মাধ্যমে এমআরএনএ কাটা।

এখন এই ছোট আরএনএ টুকরোগুলো নিজেরা কিছু করতে পারে না। তারা এক ধরনের প্রোটিন কমপ্লেক্সের সঙ্গে যুক্ত হয়, যার নাম রিস্ক (RISC)। রিস্ক-কে আপনি এমন একটি টহলদার দলের মতো ভাবতে পারেন, যারা কোষের ভেতরে ঘুরে বেড়ায় এবং নির্দিষ্ট বার্তা খুঁজে বের করে। সাইআরএনএ এই দলে যুক্ত হওয়ার পর, তার দুই দিকের একটি অংশ বাদ পড়ে যায়, আর অন্য অংশটি থেকে যায় গাইড হিসেবে। এটি কোষের ভেতরে এমন কোনো এমআরএনএ খুঁজতে থাকে, যার অক্ষরের সঙ্গে তার মিল আছে।

যখন মিল পাওয়া যায়, তখন রিস্ক সেই এমআরএনএ-কে ধরে ফেলে। আর দলের ভেতরে থাকা একটি বিশেষ প্রোটিন আর্গোনাট ২ (Argonaute 2) সেই এমআরএনএ-কে কেটে টুকরো করে দেয়। একবার কাটা হয়ে গেলে সেই এমআরএনএ আর কাজ করতে পারে না। ফলে তার থেকে আর প্রোটিন তৈরি হয় না। যেন চিঠি পৌঁছানোর আগেই সেটি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে!

আরও পড়ুন
আগে জিনের কাজ বোঝার জন্য গবেষকদের ভরসা ছিল মিউটেশন কিংবা নকআউট মডেলের ওপর, যা ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল। আরএনএআই এসে সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নমনীয় করে তোলে।

ল্যাবের টেবিল থেকে চিকিৎসার নতুন দিগন্ত

শুরুর দিকে মনে করা হয়েছিল, আরএনএআই হয়তো কেবল উদ্ভিদ ও কৃমির মতো সরল জীবেই কার্যকর। কারণ স্তন্যপায়ী কোষে দীর্ঘ ডাবল-স্ট্র্যান্ডেড আরএনএ প্রবেশ করালে সাধারণত শক্তিশালী ইমিউন রেসপন্স দেখা যায়। কিন্তু পরে যখন দীর্ঘ আরএনএ-এর বদলে কৃত্রিমভাবে তৈরি ছোট সাইআরএনএ ব্যবহার করা হলো, তখন দেখা গেল স্তন্যপায়ী কোষেও নির্দিষ্ট জিনের এমআরএনএ কার্যকরভাবে কমিয়ে দেওয়া সম্ভব।

আরএনএআই-এর আবিষ্কার শুধু একটি নতুন আণবিক প্রক্রিয়া বোঝার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি জীববিজ্ঞানের চিন্তাধারাকেই বদলে দিয়েছে। আগে জিনের কাজ বোঝার জন্য গবেষকদের ভরসা ছিল মিউটেশন কিংবা নকআউট মডেলের ওপর, যা ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল। আরএনএআই এসে সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নমনীয় করে তোলে। বিশেষ করে ফাংশনাল বা কার্যকরী জিনোমিক্স গবেষণায় আরএনএআই এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে। মানব জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন হওয়ার পর আরএনএআই ভিত্তিক স্ক্রিনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা একসঙ্গে অসংখ্য জিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে পেরেছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও আরএনএআই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। এতদিন পর্যন্ত বেশিরভাগ ওষুধ তৈরি হতো তৈরি হয়ে যাওয়া প্রোটিনকে লক্ষ্য করে। কিন্তু আরএনএআই প্রোটিন তৈরি হওয়ার আগেই তার নির্দেশনাটিকে থামিয়ে দেয়। যদিও শুরুতে ডেলিভারি ও স্থায়িত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছিল, কারণ শরীর আরএনএ-কে খুব দ্রুত ভেঙে ফেলে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে সাইআরএনএ-কে একটি সুরক্ষিত চর্বিযুক্ত বুদবুদের আবরণ বা লিপিড ন্যানোপার্টিকল (LNP)-এর ভেতর ঢুকিয়ে কোষে পৌঁছানোর উপায় বের করেন।

আরও পড়ুন
মানব জিনোম সিকোয়েন্স সম্পন্ন হওয়ার পর আরএনএআই ভিত্তিক স্ক্রিনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা একসঙ্গে অসংখ্য জিনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে পেরেছেন।

বর্তমানে বিরল জিনগত রোগ, ক্যান্সার এবং লিভারের নানাবিধ জটিল রোগের চিকিৎসায় আরএনএআই ভিত্তিক ওষুধ ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। কৃষিক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পোকামাকড় বা ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আরএনএআই ভিত্তিক কৌশল ফসলের সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে।

সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়েছে আমাদের জিন নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে মৌলিক ধারণায়। কোষ শুধু বাইরের আরএনএ-র বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে না, নিজের ভেতরেও একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে—যাকে বলে মাইক্রো আরএনএ (miRNA)। মাইক্রো আরএনএ আমাদের ডিএনএ থেকেই তৈরি হয় এবং কোষের ভেতরে জিনের প্রকাশ নিয়ন্ত্রণে ভলিউম বোতামের মতো কাজ করে।

পেটুনিয়া ফুলের এক অস্বাভাবিক পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু হওয়া এই গল্পটি আজ প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃতির কোনো ভুলই আসলে বৃথা যায় না। বড় বড় আবিষ্কার সব সময় বিশাল বা জাঁকজমকপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; কখনো কখনো তা জন্ম নেয় খুব সাধারণ ল্যাবের টবে ফুটে থাকা এক সাদা ফুলের রহস্য থেকে।

লেখক: পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সেল; নেচার; সায়েন্স; নোবেলপ্রাইজ ডট ওআরজি

আরও পড়ুন