অনুসন্ধিৎসু হতে হবে—তাহমিদ আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, আইসিডিডিআরবি

বিশ্বমঞ্চে প্রশংসিত বিজ্ঞানী এবং আইসিডিডিআরবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল বিজ্ঞানচিন্তা। অপুষ্টির সঙ্গে মেধার বিকাশ, নিজের গবেষণার বৈপ্লবিক দিক, তরুণদের জন্য পরামর্শ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। তাঁর সেই খোলামেলা ও অনুপ্রেরণাদায়ক কথোপকথনের চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো। বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন পার্থ শঙ্কর সাহা

বিজ্ঞানচিন্তা:

এশিয়ান সায়েন্টিস্ট–এ প্রকাশিত এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় নিজের নাম দেখে কেমন লাগছে?

তাহমিদ আহমেদ: আমার অবশ্যই ভালো লাগারই কথা। এর পাশাপাশি এটা বড় রকমের একটা দায়িত্ব বা বোঝার মতো চলে আসে। দায়িত্বটা হচ্ছে, আমি যেহেতু স্বাস্থ্য, অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ—এগুলো নিয়ে কাজ করি; এগুলোর বোঝা বাংলাদেশে তো বটেই, পুরো পৃথিবীতে অনেক বেশি। যখন কোনো স্বীকৃতি পাই, তখন মনে হয়, আসলে তেমন কিছুই করিনি। আরও কত যে কিছু করার আছে! তার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে, আমার তো বয়স অনেক হয়ে গেছে, এখন যারা তরুণ, যদি আরও চেষ্টা করে, তাদের কাজের সক্ষমতা বাড়ানো যায়।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার গবেষণা সম্পর্কে বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের সহজভাবে বলুন।

আইসিডিডিআরবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ
ছবি: খালেদ সরকার

তাহমিদ আহমেদ: প্রথমত হচ্ছে, আমি যদি অপুষ্টির কথাই বলি, তাহলে আমি বললাম যে বোঝাটা কী রকম? এটা জরুরি এই কারণে যে অপুষ্টিতে যারা ভোগে, তাদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, যারা বেঁচে থাকে, তাদের মধ্যে রোগবালাই বেশি হয়। রোগ হলে সেই রোগে ভোগে বেশি। আমরা যে গবেষণা করেছি, সেটা ঢাকায় হয়েছে এবং পৃথিবীতে এটা অনন্য। এই গবেষণার মাধ্যমে আমরা দেখেছি, যে শিশুরা অপুষ্টিতে ভোগে, সেই শিশুদের মস্তিষ্ক উন্নত হয় না।

মস্তিষ্কের ভেতরে আমাদের কোষ থাকে, আর থাকে এক কোষ থেকে আরেক কোষের মধ্যে ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যার। এক কোষ আরেক কোষের সঙ্গে কথা বলে। আমরা দেখেছি, এই যে তারগুলো বা ওয়্যারগুলো, এগুলো তীব্র অপুষ্টিতে যারা ভোগে, তাদের কম থাকে। অর্থাৎ একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ হয়। এর ফলে মেধার বিকাশ হয় কম। যে শিশুটা অপুষ্টিতে ভুগছে, সে যদি বড় হয়, তখন তার মেধা হবে কম।

আমাদের জাতীয় অর্থনীতি বলেন, জাতীয় উন্নয়ন বলেন—সবকিছুর ওপর এটা একটা বিরাট রকমের বোঝা। এটা শুধু জানলেই হবে না। আমি তো জানলাম, বোঝা কতটা বেশি এবং এর প্রভাবটা কী মানুষের মস্তিষ্কের ওপর। এখন বের করতে হবে, কীভাবে এটাকে সহজভাবে চিকিৎসা করা যায়। চিকিৎসাটা হতে হবে একদম মাঠপর্যায়ে, বাড়িঘরে। কারণ, এত বেশি শিশু যে এদের হাসপাতালে আনা যাবেও না, আনার প্রয়োজনও নেই।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার এই গবেষণা বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের সম্ভাবনা বা সুফল বয়ে আনতে পারে?

ড. তাহমিদ আহমেদ
ছবি: খালেদ সরকার

তাহমিদ আহমেদ: এই গবেষণা বাংলাদেশকে দুইভাবে উপকৃত করবে। একটা হচ্ছে সরাসরি। এখন এ মুহূর্তে এসব ক্ষেত্রে আমাদের কোনো চিকিৎসা নেই। কাজেই আমাদের যে চিকিৎসা আমরা উদ্ভাবন করলাম, সেটা হয়তো তাদের সাহায্য করবে। শুধু শিশুরা নয়, নারীদেরও সাহায্য করবে; বিশেষ করে যে নারীরা এখন গর্ভাবস্থায় আছেন এবং যাঁরা অপুষ্টির শিকার। পরোক্ষভাবে কী? সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে এই গবেষণার খবর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

সারা পৃথিবী জানছে যে বাংলাদেশের মতো দেশে এ ধরনের ভালো গবেষণা হচ্ছে। তারা কিন্তু এই গবেষণার ফলাফল নিজেরাও ব্যবহার করছে। যেমন ধরুন ওরস্যালাইন। এই আবিষ্কার বাংলাদেশের উপহার। বাংলাদেশ থেকে এটা যাওয়ার পর এখন সারা পৃথিবী—আমেরিকার মতো দেশ, জাপান, ইংল্যান্ড—সব জায়গায় তারা ওরস্যালাইন ব্যবহার করে। এটাই বিজ্ঞান গবেষণা।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

তাহমিদ আহমেদ: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ১ নম্বর তো আমি বললাম—যারা তরুণ গবেষক, তাদের কীভাবে আরও বেশি রকমভাবে আমরা সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারি, সেই কাজ করে যাব। সেটা আমরা করছিও। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, সরকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে কাজ করা, সরকারকে সহযোগিতা করা। সরকারের অনেক সময় সম্পদ থাকে, কিন্তু সরকারকে বলে দিতে হয় যে এই জায়গায় জোর দেওয়া জরুরি। সরকার তো গবেষক না, গবেষক হিসেবে আমরা বলতে পারব যে এই সম্পদ এই জায়গায় ব্যবহার করলে হয়তো ভালো হয়।

আরেকটা জিনিস তো অবশ্যই—যেহেতু আইসিডিডিআরবিতে ইতিমধ্যে ৪০ বছর সময় কাটিয়ে ফেলেছি, এটা প্রায় ঘরের মতোই। কাজেই আর যে কয় বছর আছি, একটু দেখব যাতে আইসিডিডিআরবি আরও ভালো অবস্থায় থাকে, আরও যেন ভালো কাজ করতে পারে এবং আরও যেন নতুন নতুন উদ্ভাবন আমরা উপহার দিতে পারি বাংলাদেশকে এবং বিশ্বকে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

ভবিষ্যতে কেউ বিজ্ঞানী হতে চাইলে তাকে কী করতে হবে? অথবা কেউ আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে গবেষণা করতে চাইলে তাকে কী করতে হবে?

তাহমিদ আহমেদ: পড়াশোনা করতে হবে আর অনুসন্ধিৎসু হতে হবে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ হলে ভালো। ধরুন, আমরা বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও শিশু হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করি। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলে সবচেয়ে ভালো হয়। এ ছাড়া অনেকে ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে উপদেশ চায়, আমি সাধ্যমতো সহযোগিতা করি যে তুমি এই এই জিনিসগুলো করতে পারো বা এই লাইন ধরতে পারো। তবে আমাদের আইসিডিডিআরবিতে কাজ করতে হলে এটা অনেক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়। আমাদের যেসব পদ খালি আছে, সেগুলোর তথ্য আমাদের ওয়েবসাইটে দেওয়া থাকে। ওয়েবসাইট দেখে আবেদন করা যেতে পারে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

বিজ্ঞানচিন্তার বেশির ভাগ পাঠক কিশোর ও তরুণ। তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন।

আইসিডিডিআরবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ
ছবি: খালেদ সরকার

তাহমিদ আহমেদ: যারা তরুণ, এখনো ছাত্র অবস্থায় আছে, তাদের প্রথম কাজ হচ্ছে পড়াশোনাটা ভালোভাবে করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় ভালো করতে হবে। দ্বিতীয় বিষয় হলো, তাকে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে চিন্তা করতে হবে—স্বাস্থ্যগত ও সামাজিক। অনুসন্ধিৎসু হতে হবে। যেমন ডেঙ্গু হচ্ছে, কেন হচ্ছে? কী করা যায়? তারপর তাকে ক্যারিয়ার চিন্তা করতে হবে। একদম প্রাথমিক পর্যায়ে যেকোনো একটা প্রজেক্টে বা যেকোনো একটা প্রতিষ্ঠানে তাকে জয়েন করতে হবে। এভাবে তাকে এগোতে হবে। প্রথমেই পড়াশোনা শেষ করা, তারপর কিছু গবেষণার অভিজ্ঞতা নেওয়া। তারপর সে চিন্তা করবে আরও উচ্চতর ডিগ্রি নেবে কি না। এখন আমি একটা জিনিস দেখি যে ছেলেমেয়েরা ইউনিভার্সিটি পাস করার আগেই চিন্তা করে কীভাবে পিএইচডি করবে। পিএইচডি কিন্তু আরেকটু পরের ব্যাপার। পিএইচডি করার আগে তাকে কিন্তু অভিজ্ঞতা নিতে হবে। এই অভিজ্ঞতা খুব দরকার।

বিজ্ঞান গবেষণা করতে হলে একটা জিনিস অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে—সেটা হলো ধৈর্য রাখতে হবে। আর ধরে নিতে হবে যে নিজেকে অনেক সময় দিতে হবে।

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন