সম্প্রতি একাধিক পদ্ধতির সমন্বয়ে হাবল ধ্রুবকের মান নির্ণয় করে পদ্ধতিগুলোর মধ্যে মানের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি দেখিয়েছেন আপনারা। বিষয়টি আমাদের কিশোর ও তরুণ পাঠকদের জন্য সহজ করে বলুন। এই গবেষণাটা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা-ও সহজ করে বলুন।
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: হাবল ধ্রুবকের মানের অসামঞ্জস্য নিয়ে কথা বলার জন্য একটু বিস্তারিত বলে নেওয়া ভালো। আমাদের মহাবিশ্বের যে মডেল বেশির ভাগ জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্রহণ করেছেন, তা বিগ ব্যাং তত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিগ ব্যাং তত্ত্বের তিনটি ভিত্তি আছে, মহাবিশ্বের প্রসারণ, পটভূমি বিকিরণ ও হালকা মৌলের প্রাচুর্য। এ তিনটি ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হলে আমরা বিগ ব্যাং মডেলকে সঠিক বলে মেনে নিতে পারি। এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় আর তৃতীয় ভিত্তি দুটি সুপ্রতিষ্ঠিত হলেও মহাবিশ্বের প্রসারণের হার, যেটি হাবল ধ্রুবক হিসেবে পরিচিত, তা এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিগ ব্যাং তত্ত্বের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল পটভূমি বিকিরণ আবিষ্কার। অনেকটা কাকতালীয়ভাবে আবিষ্কৃত হলেও তত্ত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের নির্ভুলতার অনন্য নিদর্শন এই পটভূমি বিকিরণ। আদি এই বিকিরণকে বর্তমান মহাবিশ্বের একটি সূক্ষ্ম নকশা হিসেবেও ধরা যায়। ২০১৮ সালে পটভূমি বিকিরণের সবশেষ মানচিত্র তৈরি করে প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইট। এই মানচিত্র থেকে হাবল ধ্রুবকের মান নির্ধারণ করা হয় ৬৭ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক।
অন্যদিকে গ্যালাক্সিদের দূরত্ব আর ছুটে চলার বেগ থেকে সরাসরি হাবল ধ্রুবকের মান নির্ধারণ করা হয় ৬৯-৭৪ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। এসব গণনার অনিশ্চয়তা প্রায় ১ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেকের কাছাকাছি, অর্থাৎ প্রায় নির্ভুল। এখন প্রশ্ন হলো, মহাবিশ্বের প্রসারণের মান বিভিন্ন পদ্ধতিতে আলাদা হয় কেন? হাবল ধ্রুবকের মানের এই তারতম্য বিগ ব্যাং তত্ত্বের একটা বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেই হাবল ধ্রুবকের মানের অসামঞ্জ্যস্য নিয়ে গবেষণা করা জরুরি। আমাদের গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল এই তারতম্যের সম্ভাব্য কারণ খুঁজে বের করা।
প্রায় ১০০ বছর আগে এই ধ্রুবকের মান প্রথম নির্ধারণ করেন এডউইন হাবল। তবে সে সময় প্রযুক্তি এখনকার মতো উন্নত ছিল না। ফলে হাবলের নির্ধারিত মান ছিল বেশ ত্রুটিপূর্ণ। হাবলের নির্ধারণ করা মান ছিল ৫০০ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। এই মান অনুযায়ী মহাবিশ্বের বয়স পৃথিবীর বয়স থেকে অনেক কমে যায়। সময়ের সঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ব্যাপক উন্নতি হয়। স্থাপিত হয় বড় আকারের টেলিস্কোপ। সিসিডি ক্যামেরা, স্পেক্ট্রোস্কোপ ও কম্পিউটার ব্যাবহার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের অনেক গভীরে অনুসন্ধান করতে পারছিলেন।
কিন্তু তখনো হাবল ধ্রুবকের মান ছিল ৫০-১০০ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেকের মধ্যে। এ কারণে মহাবিশ্বের বয়স ঠিকভাবে বলা যচ্ছিল না। হাবল ধ্রুবকের মান ১০০ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক হলে মহাবিশ্বের বয়স হয় প্রায় সাড়ে ছয় বিলিয়ন বছর। কিন্তু মহাকাশে অনেক গুচ্ছ নক্ষত্র আছে, যেগুলোর বয়স আরও বেশি। তাই সঠিকভাবে হাবল ধ্রুবকের মান নির্ধারণের জন্য মহাকাশে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পাঠানো হয়। গঠন করা হয় হাবল কি-প্রজেক্ট। আর এ প্রজেক্ট থেকে হাবল ধ্রুবকের মান নির্ধারণ করা হয় ৭২ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। এই মানের অনিশ্চয়তা প্রায় ৭ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। অর্থাৎ মানটি প্রায় ১০ শতাংশ সঠিক। হাবল ধ্রুবকের মান যাতে আরও এক–দশমাংশ সঠিক হয়, সে জন্য বিজ্ঞানীদের দুটি দল আলাদা পদ্ধতিতে কাজ করছিল।
একটি দল সেফিড ভেরিয়েবল নক্ষত্র, অন্যটি টিআরজিবি নক্ষত্র ব্যবহার করে দূরবর্তী সুপারনোভাদের দূরত্ব ক্যালিব্রেট করার জন্য। সেফিড দলের মান ৭৪ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেকের কাছে আর টিআরজিবি দলের মান ৬৯ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। যেহেতু দুই দল দাবি করছে যে তাদের গণনা সঠিক, তাই আমাদের গবেষণায় আমরা ঠিক করেছিলাম যে এই দুই পদ্ধতির মধ্যে কোনো পদ্ধতিগত পার্থক্য আছে কি না।
আমরা আমাদের কোলাবরেশন কার্নেগি সুপারনোভা প্রজেক্ট থেকে পাওয়া সুপারনোভার উপাত্ত ব্যবহার করে এবং দুই ধরনের ক্যালিব্রেটর একসঙ্গে ব্যবহার করে হাবল ধ্রুবকের যে মান পাই, তা হলো প্রায় ৭২-৭৪ কিলোমিটার/সেকেন্ড/মেগাপারসেক। আমরা আরও একটি ব্যাপার খেয়াল করেছি, দৃশ্যমান আর অবলোহিত—এই দুই আলোর হাবল ধ্রুবকের মানের পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য কেন হচ্ছে, তা আমরা এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।
তাই সংক্ষেপে বলতে গেলে, হাবল ধ্রুবকের সঠিক মান এখনো অনিশ্চিত। আর এই অনিশ্চয়তা বিগ ব্যাং তত্ত্ব বা ল্যাম্বডা-সিডিএম কসমোলজিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলেছে। বিভিন্ন কসমোলজিক্যাল মডেল প্রস্তাব করা হচ্ছে যেগুলো ল্যাম্বডা-সিডিএম কসমোলজিকে চ্যালেঞ্জ করছে। তাই আমাদের মহাবিশ্বের সঠিক মডেল নির্ধারণ করার জন্য হাবল ধ্রুবকের মান সঠিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আগামী দিনে আরও অনেক নতুন তথ্য আমাদের হাতে আসবে। আর তখন হয়তো হাবল ধ্রুবকের জটিলতা দূর হতে পারে অথবা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণার আমূল পরিবর্তন হবে।
আপনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনায় রয়েছেন। পড়ানোর পাশাপাশি জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে কাজ করছেন। জ্যোতির্বিদ হওয়ার আগ্রহ কেমন করে এল? কখন ঠিক করলেন জ্যোতির্বিদ হবেন?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ছোটবেলায়। এই আগ্রহ তৈরির ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল আমার বোন সৈয়দা হাসনে আরা বানীর। আমি অবশ্য প্রথমে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হতে চাইনি, পদার্থবিদ হতে চেয়েছিলাম। আগ্রহ ছিল পরমাণুর গভীরে কী হচ্ছে, তা নিয়ে। তবে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ক্যাডেট কলেজ থেকে বাসায় ফিরে এলে হঠাৎ একদিন স্টিফেন হকিংয়ের কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বইটি হাতে আসে।
এই বই আমাকে বিশ্বতত্ত্ব বা কসমোলজি বিষয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ তৈরি করতে সাহায্য করে। কাছাকাছি সময়ে সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকায় কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বা পটভূমি বিকিরণ নিয়ে একটি প্রবন্ধ বের হয়। তখন আমি বুঝতে পারি, পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সামগ্রিক কাঠামো জানা যেতে পারে। আর এই উপলব্ধি একটা মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছিল।
একই সময়ে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি গ্রুপের সঙ্গে পরিচিত হই। এখানে এসে আবদুল জব্বার রচিত তারা পরিচিতি আর খগোল পরিচয় বই দুটি পেয়ে পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিজ্ঞানের দিকে আগ্রহ তৈরি হয়। তবে পেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী হব, এটা ঠিক করেছি স্নাতক পর্যায়ের লেখাপড়া শেষ করে।
আপনার জ্যোতির্বিদ হওয়ার পেছনে কোনো বিশেষ ঘটনা আছে কি?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: পেশা হিসেবে জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার একটা ঘটনা আছে। আমি বুয়েটের স্নাতক পড়ালেখা শেষ করে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তি হই, সঙ্গে চাকরি খুঁজতে থাকি। একদিন বুয়েট থেকে বাসায় ফিরছি, এমন সময় দীপেন ভট্টাচার্য আমাকে ফোন করেন এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘শুভ, তুমি এখন কী করছ?’ বললাম চাকরি খুঁজছি। তখন তিনি আমাকে মনে করিয়ে দিলেন, আমার জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার কথা এবং এ বিষয়ে আমি কী করছি। তখন আমি কোনো সদুত্তর দিতে পারলাম না। বাসায় ফিরে ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চতর পড়ালেখা করতে বিদেশে যেতে হবে। দীপেনদার সেই ফোনকলটাই আমার প্রাতিষ্ঠানিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী হওয়ার সংকল্প দৃঢ় করেছে।
আপনার গবেষণা থেকেও দেখা যাচ্ছে, আমাদের মডেলগুলোতে কিছু সমস্যা বা অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ ছাড়া ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি, প্ল্যাঙ্ক সময়ের আগের অবস্থা, সিঙ্গুলারিটিসহ অনেক কিছুই আমাদের অজানা। অবস্থাটা আসলে কেমন, কতটা জানি আমরা?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: মহাবিশ্বের যে মডেল এত দিন সবচেয়ে সফল হয়েছে, তা হলো ল্যাম্বডা-সিডিএম। এখানে ল্যাম্বডা হলো ডার্ক এনার্জি। মনে করা হয়, মহাবিশ্বের ত্বরিত প্রসারণের জন্য দায়ী এই ডার্ক এনার্জি, আর সিডিএম হলো কোল্ড ডার্ক ম্যাটার। তবে কোল্ড বলতে ঠিক ঠান্ডা না বুঝিয়ে বলা হয় আলোর চেয়ে অনেক কম গতির পদার্থ। আর ডার্ক দিয়ে অন্ধকার না বুঝিয়ে অজানা বোঝানো হয়। যেহেতু আমরা এদের স্বরূপ জানি না, তাই অনেক ধারণা বা তত্ত্ব বিভিন্ন গবেষণাপত্রে আসছে।
প্রথমে আসি ডার্ক ম্যাটার প্রসঙ্গে। গ্যালাক্সিদের ঘূর্ণনগতির অস্বাভাবিকতা থেকে প্রথম ডার্ক ম্যাটারের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যেহেতু ডার্ক ম্যাটার থেকে কোনো তড়িৎ–চুম্বকীয় বিকিরণ পাওয়া যায় না, তাই এর মহাকর্ষীয় উপস্থিতি ব্যাখ্যার জন্য নানা ধরনের পদার্থের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে উইম্পস, এক্সিয়ন বা আদি ব্ল্যাক হোলের কথা বলব। আবার অনেকে আমাদের জানা নিউটনীয় মহাকর্ষের বিপরীতে ভিন্ন ধরনের মহাকর্ষ প্রস্তাব করছেন। অনেকে বলছেন, বিগ ব্যাংয়ের অনেক পরে আরেকটি বিশেষ কোনো মাধ্যমে ডার্ক ম্যাটার তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে কোনোটারই সন্ধান মেলেনি।
ডার্ক এনার্জি ডার্ক ম্যাটারের মতোই কাকতালীয়ভাবে আবিষ্কৃত হয়। আমরা ভেবেছি, সময়ের সঙ্গে প্রসারণের হার কমে আসবে। কিন্তু আমরা দেখলাম, সময়ের সঙ্গে প্রসারণের হার বেড়েই যাচ্ছে। অর্থাৎ মহাবিশ্ব ত্বরিত গতিতে চলছে। একটা অদৃশ্য শক্তি এই ত্বরণের জন্য দায়ী, যা আমরা জানি না। বর্তমান মহাবিশ্বের যে মডেল আমাদের কাছে আছে, এটা ল্যাম্বডা-সিডিএম নামে পরিচিত। সেখানে ডার্ক এনার্জিকে সময়ের সঙ্গে অপরিবর্তনীয়দের নেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গ্যালাক্সি সার্ভে থেকে আভাস পাওয়া যাচ্ছে, ডার্ক এনার্জি হয়তো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল।
আবার অন্য একটি দল টাইমস্কেপ কসমোলজি নামে ল্যাম্বডা-সিডিএমের বিপরীতে একটি মডেল প্রকাশ করেছেন, যেখানে মহাবিশ্বের ত্বরিত সম্প্রসারণের জন্য ডার্ক এনার্জি দরকার নেই। ইতিপূর্বে আলোচিত হাবল ধ্রুবকের মানের অসংগতিও ল্যাম্বডা-সিডিএম কসমোলজিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্ল্যাঙ্ক সময়ের আগে কী ঘটেছে, আর সিঙ্গুলারিটি কেমন—এগুলো জানার মতো তত্ত্ব আমাদের কাছে এ মুহূর্তে নেই। এর জন্য দরকার প্রকৃতির চারটি শক্তিকে একীভূত করা।
আপনার কি মনে হয়, আমরা কখনো সবকিছুর তত্ত্ব—থিওরি অব এভরিথিং খুঁজে পাব?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আমাদের জানতে হবে, সবকিছু কী? আজ যেটা সবকিছু, কাল সেটা সবকিছু না–ও হতে পারে।
বর্তমান সময়ের থিওরি অব এভরিথিং হলো প্রকৃতির চারটি শক্তিকে একীভূত করা। তত্ত্বীয়ভাবে এটা সম্ভব হলেও এর পরীক্ষামূলক যাচাইয়ের জন্য দরকার অতি উচ্চশক্তির কণা গবেষণাগার। তত্ত্বের দিক থেকে থিওরি অব এভরিথিংয়ের জন্য অতি ক্ষুদ্র জগতের সঙ্গে অতি বড় জগতের সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে। অর্থাৎ কোয়ান্টাম মেকানিকসের সঙ্গে জেনারেল রিলেটিভিটি এক করে একটি তত্ত্ব আমাদের লাগবে। এরপর সেই তত্ত্বের পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেখাতে হবে। কিছু তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো তত্ত্ব যাচাই করা যায়নি। তাই আমাদের হয়তো আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
সব ক্ষেত্রেই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ হচ্ছে। পর্যবেক্ষণমূলক জ্যোতির্বিদ্যা ও কসমোলজি গবেষণাতেও এর প্রয়োগ হচ্ছে। এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন? এর ফলে গবেষকদের কাজে কী ধরনের বদল এসেছে বা আসতে পারে?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: প্রধানত তিনভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ হচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং কসমোলজিতে। ট্রানজিয়েন্ট ঘটনা চিহ্নিত করা, গ্যালাক্সিদের গঠনগত শ্রেণিবিভাগ আর কসমোলজিক্যাল মডেল নির্বাচন। ট্রানজিয়েন্ট ঘটনার একটা উদাহরণ হলো সুপারনোভা বিস্ফোরণ। এখন কোনো ট্রানজিয়েন্ট ঘটনা শনাক্ত করার পর, এটা সুপারনোভা না অন্য কোনো কিছু, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হলে এর বর্ণালি প্রয়োজন। কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানে কোনো কিছুর ছবি তোলার চেয়ে বর্ণালি গ্রহণ করা বেশ সময় এবং ব্যয়সাপেক্ষ। তাই ট্রানজিয়েন্ট ঘটনার লাইট-কার্ভ বা সময়ের সঙ্গে উজ্জ্বলতার পরিবর্তন থেকে তাকে শনাক্ত করতে পারাটা অনেক জরুরি। এর জন্য মেশিন-লার্নিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনেক প্রয়োগ হচ্ছে। এ রকম একটি উদাহরণ হলো কসমোস্ট্যাটিস্টিকস ইনিশিয়েটিভ (https://cosmostatistics-initiative.org/projects/)। কিছুদিন পর রুবিন মানমন্দিরের লিগেসি সার্ভে অব স্পেস অ্যান্ড টাইম (https://www.lsst.org/) প্রকল্প শুরু হলে, প্রতি রাতে অসংখ্য ট্রানজিয়েন্ট ঘটনার সন্ধান পাওয়া যাবে।
আর তাই এদের দ্রুত শনাক্ত করে পরবর্তী পর্যবেক্ষণের জন্য নির্বাচন করতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকল্প নেই। এ ছাড়া তথ্য থেকে প্যাটার্ন খুঁজে বের করতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। আবার অনেক দূরবর্তী গ্যালাক্সির আকৃতি নিকটবর্তী গ্যালাক্সিদের মতো এত পরিষ্কার নয়। তাই এদের গঠনগত শ্রেণিবিভাগ করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবজেক্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যালগরিদম দরকার হয়। সবশেষে আসে কসমোলজিক্যাল মডেল নির্বাচন। এর মূলে রয়েছে বেইজিয়ান ইনফারেন্সর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের সঙ্গে তত্ত্বের তুলনা করে একটি সঠিক মডেল নির্বাচন করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখানে অনেক কাজে আসে।
আপনার কি মনে হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যে হারে বুদ্ধিমান হয়ে উঠছে, এটি সত্যি সত্যি কখনো সভ্যতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে? এ বিষয়ে আমাদের কী করণীয়?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ, আবার কঠিন। প্রথমে সহজটা বলি। নামেই বোঝা যাচ্ছে, আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলছি। অর্থাৎ আমরা যেভাবে চাইব, এআই আমাদের সে রকম ফল দেবে। ফলে আমরাই এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারব। কঠিন উত্তরটা হলো, এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিবর্তন কেমন হবে, আমরা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছি না। মানে, সভ্যতার কতখানি সে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, এটা এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। আমরা চ্যাটজিপিটি বা জেমিনি দিয়ে অনেক কাজ সহজেই করতে পারছি। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদেরকেই প্রাথমিক কমান্ডটা দিতে হচ্ছে। মনে রাখতে হবে, যন্ত্র ততটুকুই করতে পারবে, যতটুকু আমরা বলে দেব।
বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থীই জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যায় আগ্রহী। তাঁদের কীভাবে এগোনো উচিত? তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান অনেকটা কাছাকাছি হলেও একটা কার্যকর পার্থক্য আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান মূলত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ নিয়ে কাজ করে, আর জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানের কাজ হলো মহাকাশে যা ঘটছে, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়া। অনেকেই পেশাগতভাবে এই দুই কাজেই যুক্ত, অনেকে আবার পুরোপুরি জ্যোতির্বিজ্ঞানী না হয়ে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী। তাই যার যেটায় বেশি আগ্রহ, তার সেভাবে এগোনো ভালো। সব ক্ষেত্রেই গণিত, পদার্থবিজ্ঞান আর কম্পিউটার—এই তিন বিষয় জানা প্রয়োজন। এখন আর মানমন্দিরে গিয়ে দুরবিনে চোখ লাগিয়ে কাজ করতে হয় না। দূরে বসে কম্পিউটারে সব কাজ
হয়। আর তাই কম্পিউটারের দক্ষতা, ডেটা সায়েন্সে আগ্রহ, এগুলো দরকার হয়। বাংলাদেশে স্নাতক পর্যায়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়ার এখন একটা বড় সুযোগ হয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে (আইইউবি)। এখানে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক কোর্সে ভর্তি হয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানে স্পেলাইজেশনের সুযোগ আছে (https://cassa.site/minor/)। এ রকম একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করার জন্য আমি খান আসাদ ও আইইউবিকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।
আইইউবিতে সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকসের (কাসা) একজন সদস্য আপনি। ওদের এ উদ্যোগ কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: আইইউবির সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোনমি, স্পেস সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিকস (কাসা) বাংলাদেশের জন্য একটি মাইলফলক। আমাদের দেশে অনেক দিন ধরেই জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব ছিল। তাই সবাইকেই দেশের বাইরে যেতে হয় জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে শিক্ষালাভ করতে। আগের প্রশ্নের উত্তরে বলেছি, আইইউবিতে এখন জ্যোতির্বিজ্ঞানে স্নাতক পর্যায়ে পড়ালেখা করা যায়। কাসা তৈরির মূল উদ্দেশ্য হলো গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করা। আইইউবিতে যাঁরা জ্যোতির্বিজ্ঞান পড়বেন, তাঁরা গবেষণার অভিজ্ঞতাও অর্জন করবেন।
আমরা এই সেন্টারকে একটি আন্তবিভাগীয় সেন্টার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছি। এর ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডেটা সায়েন্স এবং অপটিকস বিষয়েও গবেষণা করা যাবে। কাসা প্রতিষ্ঠার জন্য খান আসাদ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমরা কয়েকজন সদস্য এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান থেকে অংশগ্রহণ করছি। আমাদের লক্ষ্য জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণা শুরু করা। এ ছাড়া কাসার মাধ্যমে আমরা একটি গবেষণাধর্মী মানমন্দির প্রতিষ্ঠার জন্যও কাজ করছি।
বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য কোন জিনিসটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন?
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: বিজ্ঞানী হওয়ার জন্য যে জিনিসটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো কৌতূহল বজায় রাখা। কারণ, বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তন সঙ্গে নিয়ে নতুন নতুন তথ্য আর পদ্ধতি প্রয়োগ করে অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়াই বিজ্ঞান। একমাত্র কৌতূহলী মন থাকলেই এটা সম্ভব। একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তথ্য আর তত্ত্ব—এই দুইয়ের পারস্পরিকতা রক্ষা করার চেষ্টা করা।
বিজ্ঞানচিন্তার বেশির ভাগ পাঠক কিশোর ও তরুণ। তাঁদের জন্য কিছু বলুন।
সৈয়দ আশরাফ উদ্দিন: তোমাদের জন্য প্রথম যে কথাটা বলতে চাই, জীবন গঠনের সময় তিনটি প্রশ্নের উত্তর জেনে নাও। কী কাজ করতে চাও, কোথায় বসে ও কাদের নিয়ে। এই তিন প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে জীবনের লক্ষ্য অর্জনের পথ বেশ সহজ হয়। আর কী কাজ করতে চাও, তা যদি নির্ধারণ করতে না পারো, তাহলে জাপানের ইকিগাই পদ্ধতির সাহায্য নিতে পারো। তোমরা যেহেতু আগামী প্রজন্ম, আমাদের কাজ যেখানে থামবে, তোমরা সেখান থেকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।