যেভাবে পেলাম ক্যানসার চিকিৎসায় এমআরএনএ ভ্যাকসিন

যাঁরা বায়োমেডিকেল জগতের খবর রাখেন, তাঁরা হয়তো ইতিমধ্যে জেনে গেছেন, মার্ক ও মডার্না যৌথভাবে জানিয়েছে, তাদের ‘ইন্টারপাথ-০০১’ নামের ফেজ থ্রি বা তৃতীয় ধাপের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি সফল হয়েছে।

সেই গল্পে যাওয়ার আগে একটু জেনে নিই, অনেকেরই ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ পর্যন্ত সফল হয়ে ওঠে না। কারণ, এটি প্রায়ই অতি ক্ষুদ্র পরিসরে শরীরে থেকে যায় এবং বারবার ফিরে আসে। অস্ত্রোপচার বা সার্জারির পর যাঁদের ক্যানসার ফিরে আসে, তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রথম দুই বছরের মধ্যে ফেরে। এই ফিরে আসা ক্যানসারের বেশির ভাগই ঠেকানো যায় না; বরং বেশ ভয়ংকরভাবে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

ক্যানসার ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে বাজারে অনেক ওষুধ আছে। বিভিন্ন ক্যানসারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ওষুধ। এর মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর ও বহুল ব্যবহৃত একটি ওষুধের নাম পেমব্রোলিজুমাব। এটি একধরনের প্রোটিন বা মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি। এটি মূলত একটি ইমিউনোথেরাপি বা ইমিউন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর, যা আমাদের শরীরের টি-সেল-এর গায়ে থাকা ‘পিডি-১’ নামে একটি রিসেপ্টরকে বন্ধ করে দিয়ে টি-সেলগুলোকে সক্রিয় করে রাখে। কিন্তু ক্যানসার কোষগুলো খুব ধূর্ত প্রকৃতির। সাধারণ কোষের মতো যেন টি-সেলগুলো তাদের আক্রমণ না করে, সে জন্য তারা নিজেদের চারদিকে একধরনের  প্রোটিন তৈরি করে। সেই প্রোটিন পিডি-১ প্রোটিনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে, যাতে সক্রিয় টি-সেলগুলোর আক্রমণ থেকে বাঁচা যায়।

আরও পড়ুন
পেমব্রোলিজুমাব একটি ইমিউনোথেরাপি বা ইমিউন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর, যা শরীরের টি-সেল-এর গায়ে থাকা ‘পিডি-১’ নামে একটি রিসেপ্টরকে বন্ধ করে দিয়ে টি-সেলগুলোকে সক্রিয় করে রাখে।

পেমব্রোলিজুমাব ও এ ধরনের ইমিউনোথেরাপিগুলো ওই প্রোটিনের সঙ্গে পিডি-১ প্রোটিনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়, যাতে টি-সেলগুলো ক্যানসার কোষগুলোকে চিনতে পারে এবং ধ্বংস করে দেয়।

কিন্তু টি-সেলগুলো এমনিতেই আমাদের ক্যানসার কোষগুলোকে সহজে চিনতে পারে না। এ জন্য আমাদের শরীরে আগে থেকেই এমন কিছু অ্যান্টিজেনের টি-সেল থাকতে হবে, যারা ওই টিউমারটাকে শত্রু বলে চিনতে পারবে। অন্যদিকে সবার ক্যানসারের কারণ এক রকম হলেও সোমাটিক মিউটেশনের কারণে তা শরীরে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা দেয়। এমন কিছু মিউটেশন থাকে, যা একজনের থেকে অন্যজনের পুরোপুরি আলাদা। ঠিক এই ভিন্নতার কারণে প্রচলিত এসব থেরাপি সবার জন্য একই রকম কার্যকারিতা দেখাতে পারে না।

তাহলে উপায় কী? একটি উপায় হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ক্যানসার কোষগুলোকে ধরে ধরে চেনানোর ব্যবস্থা করা। ক্যানসারে যেসব মিউটেশন থেকে যে অস্বাভাবিক প্রোটিনের টুকরো তৈরি হয়, তাদের বলে নিওঅ্যান্টিজেন। ‘নিও’ মানে নতুন, কারণ এই টুকরোগুলো আমাদের স্বাভাবিক শরীরে কোনো দিনই ছিল না। ডানা-ফারবার নামে বিখ্যাত এক ক্যানসার গবেষণাকেন্দ্রের গবেষক প্যাট্রিক অট ও ক্যাথরিন উর দল ২০১৭ সালে নেচার বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, নিওঅ্যান্টিজেনকে লক্ষ্য করে বানানো ভ্যাকসিন দিয়ে ৬ জন রোগীর মধ্যে ৪ জনের ক্যানসার ২৫ মাসেও আর ফিরে আসেনি। আর যে দুজনের ফিরেছিল, তাঁদের অ্যান্টি-পিডি-১ দেওয়ার পর টিউমার পুরোপুরি নিরাময় হয়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন
সবার ক্যানসারের কারণ এক রকম হলেও সোমাটিক মিউটেশনের কারণে তা শরীরে ভিন্ন ভিন্নভাবে দেখা দেয়। এমন কিছু মিউটেশন থাকে, যা একজনের থেকে অন্যজনের পুরোপুরি আলাদা।

একই সংখ্যায় বায়োএনটেক নামে এক বায়োটেক কোম্পানির গবেষকেরা একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে ১৩ জন মেলানোমা রোগীর প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে আরএনএ ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছিল। সেই ভ্যাকসিন দেওয়ার পর তাঁদের ক্যানসারের মেটাস্ট্যাসিস বা ছড়িয়ে পড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। এই দলটি এবং তাদের ক্যানসার ভ্যাকসিনের ওই প্ল্যাটফর্মটিই পরে আমাদের জন্য কোভিড ভ্যাকসিন নিয়ে এসেছিল। তাঁরা দেখিয়েছিলেন, আমাদের শরীরে ওষুধ হিসেবে কোনো প্রোটিনের কোডিং সিকোয়েন্স বা এমআরএনএ দিলেই শরীর নিজেই সেখান থেকে প্রোটিন তৈরি করে ফেলতে পারে।

অসুবিধা হচ্ছে, শুধু এই কোড দিলেই যে শরীর প্রোটিন বানিয়ে ফেলবে, তা কিন্তু এত সহজ নয়। আমাদের শরীরের জন্মগত রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা বাইরের যেকোনো সিঙ্গেল-স্ট্র্যান্ডেড বা আনমডিফায়েড আরএনএকে দ্রুত ধরে ফেলতে পারে এবং প্যাটার্ন রিকগনিশন রিসেপ্টরের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। অথবা অতিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায়। এতে হয়তো ওষুধটি নষ্ট হয়ে যায়, অথবা আমাদের শরীরে অনিয়ন্ত্রিত প্রদাহ দেখা দেয়। একে বলে সাইটোকাইন স্টর্ম। কিন্তু কোভিডের সময় সিউডোইউরিডিন মডিফিকেশন ও লিপিড ন্যানোপার্টিকল বা এলএনপি প্রযুক্তি এসে জানান দিল, আমরা কোনো বড় রকম ইমিউনোজেনিক প্রতিক্রিয়া ছাড়াই এই কোডটি শরীরে দিয়ে দিতে পারি।

আরও পড়ুন
কীনোট-৬০৩ নামে সেই প্রথম মানব ট্রায়ালে ছিলেন মাত্র ১৬ জন রোগী। তাঁদের মধ্যে ৪ জন ফুসফুসের আর ১২ জন মেলানোমা ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন।

এবার ফিরে আসি মার্ক ও মডার্নার ইন্টারপাথ-০০১ নামে ফেজ থ্রি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটির কথায়। বায়োইনফরমেটিকস দিয়ে অনুমিত নিওঅ্যান্টিজেনের সংকেত বা এমআরএনএ কোডগুলো নিয়ে প্রথমে ল্যাবে ‘ইন ভিট্রো ট্রান্সক্রিপশন’-এর মাধ্যমে সেগুলোর সিন্থেসিস বা সংশ্লেষণ করা হয় এবং এরপর সেগুলো শরীরে ঢোকানো হয়। শরীরে ঢোকানোর পর ডেনড্রাইটিক কোষের মতো প্রফেশনাল অ্যান্টিজেন প্রেজেন্টিং কোষগুলো সেই এমআরএনএ পড়ে ওই প্রোটিনের টুকরোগুলো তৈরি করে এবং এমএইচসি প্রোটিনের মাধ্যমে ইমিউন সিস্টেমের সামনে হাজির করে। উদ্দেশ্য একটাই, আমাদের সাইটোটক্সিক টি-সেলগুলোকে শিখিয়ে দেওয়া যে ঠিক কোন নির্দিষ্ট মলিকিউলার প্রোফাইলের কোষগুলো তার শত্রু। এই কাজ করতে পারলেই মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে কাজ করতে পারবে।

কথাটা শুনতে বেশ সহজ মনে হলেও এটি যে সত্যিই মানুষের শরীরে ঘটে, তা প্রমাণ করতেই আলাদা একটি ট্রায়াল লেগেছিল। ‘কীনোট-৬০৩’ নামে সেই প্রথম মানব ট্রায়ালে ছিলেন মাত্র ১৬ জন রোগী। তাঁদের মধ্যে ৪ জন ফুসফুসের আর ১২ জন মেলানোমা ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। দেখা গেল, এমআরএনএভিত্তিক এই ওষুধ একা দিলেই শরীরে টি-সেল রেসপন্স তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ যেসব নিওঅ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে শরীরে আগে কোনো প্রতিক্রিয়াই ছিল না, সেগুলোর বিরুদ্ধেও নতুন টি-সেল জন্ম নিচ্ছে। আর যেগুলোর বিরুদ্ধে আগে থেকে দুর্বল প্রতিক্রিয়া ছিল, সেগুলো আরও শক্তিশালী হচ্ছে। এর সঙ্গে যদি পেমব্রোলিজুমাব বা মার্ক কোম্পানির কিট্রুডাও একসঙ্গে দেওয়া হয়, তবে সেই প্রতিক্রিয়া শরীরে অনেক দিন থাকে এবং টি-সেলের সংখ্যাও বেড়ে যায়। ট্রায়ালটি ছোট হলেও এটি ছিল এই প্রক্রিয়ার মেকানিজম বা কার্যপদ্ধতির একটি।

আরও পড়ুন
শ্বেতাঙ্গ বা ককেশীয়দের মতো যাঁদের মেলানিন কম থাকে, তাঁদের মধ্যে মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসার একটি সাধারণ অসুখ। ক্যানসারের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ধরনগুলোর মধ্যে এটি একটি।

এবার আসি সেই বড় ট্রায়ালের কথায়। এটা অনেকটা থ্রিলারের মতো গল্প। প্রতিটি রোগীর আলাদা আলাদা মিউটেশনকে লক্ষ্য করে, চৌত্রিশ রকম পর্যন্ত এক্সোম সিকোয়েন্সড মিউটেশন দিয়ে বানানো হয়েছিল একটি পার্সোনালাইজড বা ব্যক্তিনির্দিষ্ট এমআরএনএ ওষুধ, যার নাম দেওয়া হয়েছে ইনটিসমেরান অটোজিন। আগের নাম এমআরএনএ-৪১৫৭ বা ভি৯৪০। ক্যানসার চিকিৎসার ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে ব্যক্তিনির্দিষ্ট নিওঅ্যান্টিজেন থেরাপি কিংবা এমআরএনএভিত্তিক থেরাপি দিয়ে কোনো ক্যানসারের চিকিৎসা ফেজ থ্রি বা তৃতীয় পর্যায় পর্যন্ত গিয়ে সফল হলো।

আমাদের ত্বকের ওপরিভাগে থাকা মেলানিন পিগমেন্ট আমাদের সূর্যের অতিবেগুনি বা ইউভি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়। তাই শ্বেতাঙ্গ বা ককেশীয়দের মতো যাঁদের মেলানিন কম থাকে, তাঁদের মধ্যে মেলানোমা বা ত্বকের ক্যানসার একটি সাধারণ অসুখ। ক্যানসারের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ধরনগুলোর মধ্যে এটি একটি। তবে মেলানোমা যে এই প্রযুক্তির প্রথম পরীক্ষাক্ষেত্র হলো, তার পেছনে আরেকটি বায়োলজিক্যাল বা জৈবিক কারণ আছে এবং সেটি মনে রাখাও জরুরি। ওই অতিবেগুনি রশ্মির জেনোটক্সিক ড্যামেজের কারণেই মেলানোমায় টিউমার মিউটেশনাল বার্ডেন বা মিউটেশনের সংখ্যা সব ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে বেশির দিকে থাকে। বেশি মিউটেশন মানে বেশি নিওঅ্যান্টিজেন, আর বেশি নিওঅ্যান্টিজেন মানে হলো ইমিউন সিস্টেমকে দেখানোর মতো বেশি ইমিউনোজেনিক লক্ষ্যবস্তু। অর্থাৎ মেলানোমা হলো এই প্রযুক্তির জন্য সবচেয়ে উপযোগী অসুখ।

আরও পড়ুন
অতিবেগুনি রশ্মির জেনোটক্সিক ড্যামেজের কারণেই মেলানোমায় টিউমার মিউটেশনাল বার্ডেন বা মিউটেশনের সংখ্যা সব ক্যানসারের মধ্যে সবচেয়ে বেশির দিকে থাকে।

এরপর ২০২৬ সালে জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজিতে এই ট্রায়ালের পাঁচ বছরের ফলোআপ প্রতিবেদন বেরোল। ডেটা কাটঅফ ছিল ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর এবং মিডিয়ান ফলোআপ ছিল ৬০.৩ মাস। দেখা গেল, ক্যানসার ফিরে আসা বা মৃত্যুর ঝুঁকি ৪৯ শতাংশ কমেছে। এর হ্যাজার্ড রেশিও ০.৫১০ এবং কনফিডেন্স ইন্টারভাল ০.২৯৪ থেকে ০.৮৮৭। আর মেটাস্ট্যাসিস বা ছড়িয়ে পড়া এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমেছে ৫৯ শতাংশ, যার হ্যাজার্ড রেশিও ০.৪১১ ও কনফিডেন্স ইন্টারভাল ০.২০০ থেকে ০.৮৪৩।

এই দুটি সংখ্যাই যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক এবং রোগীদের পাঁচ বছর ধরে টিকে থাকাটা তার চেয়েও ভালো খবর। তবে ১৫৭ জনের ট্রায়াল সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো স্ট্যাটিস্টিক্যাল পাওয়ার বা পরিসংখ্যানগত ক্ষমতা রাখত না। এখানে জেনে রাখা ভালো, ক্যানসার দেরিতে ফিরে আসা আর বেশি দিন বেঁচে থাকা বায়োলজিক্যালি একই জিনিস নয়। ক্যানসার গবেষণার ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যেখানে রিকারেন্স বা রোগ ফিরে আসা বিলম্বিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওভারঅল লংগেভিটি বা সামগ্রিক আয়ু বাড়েনি।

আরও পড়ুন
২০২৬ সালে জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজিতে এই ট্রায়ালের পাঁচ বছরের ফলোআপ প্রতিবেদন বেরোল। ডেটা কাটঅফ ছিল ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর এবং মিডিয়ান ফলোআপ ছিল ৬০.৩ মাস।

এরপর এল সেই ফেজ থ্রি ট্রায়ালের রেজাল্ট। এবার ১ হাজার ১৩৭ জন ক্যানসার রোগীকে নেওয়া হয়েছিল। এই ট্রায়ালে এমন সব রোগীদের নেওয়া হয়েছিল, যাঁদের টিউমার অস্ত্রোপচারে পুরোপুরি কেটে ফেলা হয়েছিল এবং যাঁদের ক্যানসার ছিল স্টেজ ২বি থেকে স্টেজ ৪ পর্যন্ত। একদলকে দেওয়া হলো সেই এমআরএনএ কোড ইনটিসমেরান এবং কিট্রুডা, আর অন্য দলকে দেওয়া হলো শুধু কিট্রুডা। চিকিৎসা চলেছে প্রায় এক বছর, বা ক্যানসার ফিরে আসা পর্যন্ত। এর মূল মাপকাঠি বা প্রাইমারি এন্ডপয়েন্ট ছিল রিকারেন্স-ফ্রি সারভাইভাল বা আরএফএস। অর্থাৎ ক্যানসার ফিরে আসা কিংবা যেকোনো কারণে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সময়। কোম্পানি জানিয়েছে, সেই মাপকাঠি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

এখানেই সবচেয়ে জরুরি কথাটি বলা দরকার। কোম্পানি কিন্তু একটি সংখ্যা প্রকাশ করেনি। এটি কতটা ভালো, ঠিক কত শতাংশ ঝুঁকি কমেছে, হ্যাজার্ড রেশিও কত, কনফিডেন্স ইন্টারভাল কী, সাবগ্রুপে কী দেখা গেছে বা ওভারঅল সারভাইভালের কী হাল—সেসবের কিছুই তাদের বিবৃতিতে নেই। বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসম্মেলনে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা হবে।

আরও পড়ুন
ফেজ থ্রি ট্রায়ালে এমন সব রোগীদের নেওয়া হয়েছিল, যাঁদের টিউমার অস্ত্রোপচারে পুরোপুরি কেটে ফেলা হয়েছিল এবং যাঁদের ক্যানসার ছিল স্টেজ ২বি থেকে স্টেজ ৪ পর্যন্ত।

অর্থাৎ এই মুহূর্তে যা আছে তা হলো শুধু কোম্পানির নিজস্ব প্রেস রিলিজ; এর কোনো পিয়ার-রিভিউ করা গবেষণাপত্র নেই, কোনো স্বাধীন সায়েন্টিফিক ভ্যালিডেশন বা বৈজ্ঞানিক যাচাই-বাছাইও নেই। আর মনে রাখা দরকার, স্ট্যাটিস্টিক্যালি সিগনিফিকেন্ট আর ক্লিনিক্যালি মিনিংফুল এক কথা নয়। ট্রায়াল যত বড় হয়, তত ছোট বা নগণ্য পার্থক্যও পরিসংখ্যানগতভাবে সিগনিফিকেন্ট হয়ে যেতে পারে। এটি ঠিক কতটা সিগনিফিকেন্ট, তা আসল বৈজ্ঞানিক ডেটা না দেখে বলার কোনো উপায় নেই।

মার্ক ও মডার্না তাদের ইন্টারপাথ কর্মসূচির অধীন এখন একাধিক ফেজ টু ও ফেজ থ্রি ট্রায়াল চালাচ্ছে, যেখানে মেলানোমা ছাড়াও ফুসফুস, মূত্রথলি ও কিডনির ক্যানসার এবং ফেজ ওয়ান পর্যায়ে অগ্ন্যাশয় ও পাকস্থলীর ক্যানসার রয়েছে। সেসব ট্রায়ালের ফলাফল না আসা পর্যন্ত বোঝা যাবে না যে এটি কেবল মেলানোমার একক সাফল্য, নাকি সত্যিই ক্যানসার চিকিৎসার একটি সার্বজনীন নতুন পদ্ধতির শুরু। আর আসল পরীক্ষাটি হবে সেসব ক্যানসারে, যাদের বলা হয় ইমিউনোলজিক্যালি কোল্ড টিউমার; যেখানে নন-সিনোনিমাস মিউটেশন বেশ কম থাকে আর সাইটোটক্সিক টি-সেল ভেতরে ঢুকতেই পারে না। এর সবচেয়ে কঠিন উদাহরণ হলো অগ্ন্যাশয় বা প্যানক্রিয়াটিক ক্যানসার, যা ৮৮ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রেই মারণঘাতী।

আরও পড়ুন
ট্রায়াল যত বড় হয়, তত ছোট বা নগণ্য পার্থক্যও পরিসংখ্যানগতভাবে সিগনিফিকেন্ট হয়ে যেতে পারে। এটি ঠিক কতটা সিগনিফিকেন্ট, তা আসল বৈজ্ঞানিক ডেটা না দেখে বলার কোনো উপায় নেই।

আপাতত, আমরা এই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতেই আশা রাখি; তবে মূল ক্লিনিক্যাল সংখ্যাগুলো দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে। ২০১৭ সালে এটি ছিল মাত্র ১৩ জন আর ৬ জন রোগীর ওপর করা একটি প্রুফ অব কনসেপ্ট। ২০২৬ সালে এসে এটি ১ হাজারের বেশি রোগীর র‍্যান্ডোমাইজড ফেজ থ্রি ট্রায়ালে পজিটিভ ফল দেখিয়েছে। ওই যে বললাম থ্রিলিং, এর কারণ হলো এই ওষুধের প্রোডাকশন খরচ, নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিং, লিপিড সেফটি, সব রকম ক্যানসারের হেটেরোজেনিটি ইত্যাদি হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে যাবে হয়তো এ শতকের মাঝামাঝি কিংবা আরও আগেই।

লেখক: পিএইচডি পোস্টডক্টরাল ফেলো ও ফ্লেয়ার ফেলো, এন্ডোক্রাইন সোসাইটি, ইউএসএ হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিন, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র

আরও পড়ুন