বিরল রোগ এসএমএ কী, এর ওষুধ কি পাওয়া যায়

মানুষের শরীরে প্রতিনিয়ত প্রোটিন তৈরি হয়। প্রোটিন হলো রাসায়নিক অণু। আকারে বড় অণু। শরীরে বহু ধরনের প্রোটিন তৈরি হয়। একেক প্রোটিনের আকার একেক ধরনের। আবার একেক প্রোটিনের কাজ বা ফাংশনও আলাদা আলাদা। আপনি নিশ্চয়ই ইনসুলিনের নাম শুনেছেন। ইনসুলিন আসলে এক ধরনের প্রোটিন। তেমনি শরীরে একটা প্রোটিন আছে, যেটার নাম সারভাইভাল অব মোটর নিউরন। এই প্রোটিন পরোক্ষভাবে আমাদের পেশি সঞ্চালনে সাহায্য করে। হাঁটতে, দৌড়াতে, কথা বলতে, নিঃশ্বাস নিতে—আমাদের পেশির সঞ্চালন হয়। সুতরাং কারো শরীরে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণের এসএমএন প্রোটিন তৈরি না হয়, তাহলে তাদের হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে সমস্যা হয়। অন্যান্য পেশি সঞ্চালনে সমস্যা হয়। এমনকি নিঃশ্বাস নিতেও সমস্যা হতে পারে।

শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে এসএমএন প্রোটিন তৈরি না হওয়ার কারণে, ওপরে উল্লেখিত লক্ষণ দেখা দিলে, এই রোগটিকে আমরা বলি স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি বা এসএমএ। লক্ষণ শুরু হওয়ার বয়স এবং শিশুটি কতটুকু সক্ষমতা অর্জন করতে পারে—এই দুইয়ের ভিত্তিতে রোগটিকে চার-পাঁচটা টাইপে ভাগ করা হয়েছে। যেমন, টাইপ-১ এসএমএ হলো ছয় মাসের কম বয়সী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে; এই শিশুরা কখনো একা বসতে পারে না। টাইপ-২ হলো ৬-১৮ মাসের বাচ্চাদের; এরা বসতে পারে, কিন্তু একা দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারে না।

আরও পড়ুন
কারো শরীরে যদি পর্যাপ্ত পরিমাণের এসএমএন প্রোটিন তৈরি না হয়, তাহলে তাদের হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে সমস্যা হয়। অন্যান্য পেশি সঞ্চালনে সমস্যা হয়। এমনকি নিঃশ্বাস নিতেও সমস্যা হতে পারে।

এসএমএ একটি জিনগত রোগ। আমরা কথায় কথায় অনেক সময় বলি বংশগত সমস্যা! এটা দ্বারা বুঝানো হয়, বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদী, নানা-নানী অর্থাৎ বংশের কারো যদি কোনো রোগ থেকে থাকে কিংবা রোগ হওয়ার কারণ লুকায়িত (সুপ্ত) থাকে, তাহলে বংশ পরম্পরায় সে রোগ কেউ পেতে পারে।

জিনগত রোগ নিয়ে কথা বলতে গেলে কয়েকটা শব্দ উচ্চারণ করতেই হয়। মানুষের শরীরের কোষের ভিতর থাকে নিউক্লিয়াস এবং তার ভিতর থাকে ডিএনএ। এই লেখায় আপনি জিন এবং ডিএনএ, এই দুটো শব্দকে একই মনে করতে পারেন। জিনগত রোগ বংশপরম্পরায় প্রবাহের দুইটা ধরন আছে। কিছু জিনগত রোগের জন্য শুধুমাত্র মা কিংবা বাবার যে কোনো একজনের ত্রুটিপূর্ণ বা পরিবর্তিত জিন সন্তানের শরীরে প্রবাহিত হলেই রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। আবার কিছু কিছু জিনগত রোগের ক্ষেত্রে মা এবং বাবা উভয়েরই ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের শরীরে যেতে হয়। এসএমএ দ্বিতীয় ধরনের রোগ। অর্থাৎ যারা এসএমএ রোগী, তাদের মা-বাবার শরীরে রোগের কোনো লক্ষণ থাকে না; তাঁরা কেবল বাহক। কিন্তু মা এবং বাবা দুজনের জিনেই যদি একই ত্রুটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে, তাহলে তাঁদের প্রতিটি সন্তানের ক্ষেত্রে রোগ নিয়ে জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে চার ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ ২৫ শতাংশ।

আরও পড়ুন
কিছু জিনগত রোগের জন্য শুধুমাত্র মা কিংবা বাবার যে কোনো একজনের ত্রুটিপূর্ণ বা পরিবর্তিত জিন সন্তানের শরীরে প্রবাহিত হলেই রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

জিন মিউটেশন বিষয়টা একটু সহজ করে বলি। মনে করেন আপনি যুদ্ধ করছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদেরকে বার্তা বা মেসেজ দেয়া হয় কোড ব্যবহার করে। যেন শত্রুরা সেই মেসেজ থেকে কিছু না বুঝে। মনে করুন, আপনি একটা কোড পাঠাবেন, যেটা পড়তে এমন–CGATGAAGTCGA; এই কোড দ্বারা বুঝানো হয়, তোমরা এগিয়ে যাও এবং শত্রুদের ফায়ার করো। কিন্তু ঠিক অনুরূপ একটি কোড (হুবহু একই না) হলো এমন: CGATGAAGTCGT; এবং এই কোড দ্বারা বুঝানো হয় তোমরা যেখানে আছো, সেখানেই থাকো। শত্রুরা তোমাদের খুব কাছে।

একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন, দ্বিতীয় কোডটিতে শেষের একটা অক্ষর বদলে গেছে—A-এর জায়গায় T। মাত্র একটা অক্ষর, কিন্তু এতে দুইটা কোড বদলে গেল। মানুষের শরীরের কোষে এরকম একটা বিষয় ঘটে। শরীরের কোষে ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরি হয়। আর আরএনএ থেকে তৈরি হয় প্রোটিন। এখন ডিএনএকে আপনি এমন কোডের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। ওপরে, কোডের সামান্য হেরফেরের কারণে যেমন পুরো মেসেজটাই বদলে গেলো, ঠিক তেমনি কোষের ডিএনএর কোডে একটু হেরফের হলেই প্রোটিনের গঠনে সমস্যা হয়।

আরও পড়ুন
যাদের এসএমএ রোগটি আছে, তাদের ক্ষেত্রে এসএমএন প্রোটিন তৈরির মূল জিন—যার নাম SMN1—হয় পুরোপুরি অনুপস্থিত, নয়তো মিউটেশনের কারণে অকেজো।

একটু ধীর গতিতে পড়লে, বিষয়টা মোটেও জটিল মনে হবে না। এই পর্যন্ত আপনি যখন পড়েছেন, তার মানে হলো জীববিজ্ঞানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় আপনি শিখে গেছেন। আপাতত এতটুকু পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, মানুষের শরীরে কোষের ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরি হয়। এবং আরএনএর মাধ্যমে তৈরি হয় প্রোটিন।

ডিএনএতে মিউটেশন হলে, সেটা আরএনএতেও দেখা দেয়। আর আরএনএতে সেই ভুল থেকে গেলে সঠিক প্রোটিনটা তৈরি হয় না। কিংবা কার্যকর বা ফাংশনাল প্রোটিন তৈরি হয় না। যাদের এসএমএ রোগটি আছে, তাদের ক্ষেত্রে এসএমএন প্রোটিন তৈরির মূল জিন—যার নাম SMN1 (সারভাইবাল অব মোটর নিউরন ১)—হয় পুরোপুরি অনুপস্থিত, নয়তো মিউটেশনের কারণে অকেজো। ফলে কার্যকর এসএমএন প্রোটিন পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি হয় না। এখন আরএনএর কোডে যে গোলমাল দেখা যায়, সেটা বস্তুত ডিএনএর কোডের গোলমালের কারণেই হয়। কারণ, ডিএনএ থেকে আরএনএ তৈরি হয়। অর্থাৎ ডিএনএতে যদি কোনো পরিবর্তন থাকে, সেটা মূলত আরএনএ এবং প্রোটিন পর্যন্ত গড়ায়। কোথাকার পানি কোথায় এসে পড়লো, বিষয়টা এমনই!

আপনারা যারা খুব মনোযোগ দিয়ে এ পর্যন্ত পড়েছেন, তারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, আচ্ছা, ডিএনএর কোডে যদি পরিবর্তন থেকে থাকে, তাহলে সেটা শুধরে দিলেই তো হলো। আপনাকে অভিনন্দন, এত সুন্দর ভাবনার জন্য। আপনি বস্তুত একজন বিজ্ঞানীর মতোই ভেবেছেন।

আরও পড়ুন
ডিএনএতে মিউটেশন হলে, সেটা আরএনএতেও দেখা দেয়। আর আরএনএতে সেই ভুল থেকে গেলে সঠিক প্রোটিনটা তৈরি হয় না। কিংবা কার্যকর বা ফাংশনাল প্রোটিন তৈরি হয় না।

ডিএনএকে শুধরে দেয়া একটু জটিল। তবে এখানে সৌভাগ্যের একটা বিষয় আছে। প্রকৃতি মানুষকে এসএমএন প্রোটিন তৈরির জন্য একটা বাড়তি জিন দিয়েছে, যার নাম SMN2। SMN1 আর SMN2—এই দুই জিন প্রায় হুবহু এক, তবে একেবারে এক না। ছোট্ট একটা পার্থক্যের কারণে SMN2 জিন থেকে যে আরএনএ তৈরি হয়, কোষ সেটাকে জোড়া লাগানোর সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ টুকরো—এক্সন-৭—বাদ পড়ে যায়। ফলে যে প্রোটিনটা তৈরি হয় সেটা খাটো এবং দুর্বল, শরীরে বেশিক্ষণ টেকে না। অর্থাৎ ব্যাকআপ জিনটা আছে, কিন্তু সে ঠিকমতো কাজ করছে না।

বিজ্ঞানীরা তো বসে থাকে না। এসএমএ রোগের জন্য একটা ওষুধ আছে, যেটার নাম রিসডিপ্লাম। রিসডিপ্লাম ঠিক এই জায়গাটাতেই কাজ করে। ওষুধটি SMN2 জিনের আরএনএর সাথে বাইন্ড করে, বন্ধনযুক্ত হয়, এবং কোষকে বাধ্য করে যেন এক্সন-৭ টুকরোটা বাদ না পড়ে (চিত্র দেখুন)। ফলে ওই ব্যাকআপ জিন থেকেই পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর এসএমএন প্রোটিন তৈরির পরিমাণ কিছুটা বাড়ে। ফলে এসএমএ রোগী কিছুটা স্বস্তি পায়, শান্তি পায়। একটা বিষয় লক্ষ্য করুন—ওষুধটি ডিএনএকে শুধরায় না। শরীরের ভিতরে থাকা একটা অকেজো ব্যাকআপ কপিকে সে চালু করে দেয় মাত্র। ওষুধ আবিষ্কারের সৌন্দর্য এখানেই।

রিসডিপ্লামের মুড অব একশন
ছবি: লেখক

রিসডিপ্লাম আবিষ্কারের শুরুটা হয়েছে আমেরিকার একটি বায়োটেক প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানটির নাম পিটিসি থেরাপিউটিকস। সে প্রতিষ্ঠানে আমার দীর্ঘদিন ড্রাগ ডিসকভারি টিমে গবেষণার সুযোগ হয়েছিলো। আমি যেহেতু একজন মেডিসিনাল কেমিস্ট, ফলে গবেষণার জন্য ল্যাবরেটরিতে রিসডিপ্লাম তৈরিও করেছি। এই প্রকল্পে শুরুর দিক থেকেই পিটিসির সহযোগী ছিলো সুইজারল্যান্ডের ওষুধ প্রতিষ্ঠান রোশ (Roche) এবং মার্কিন এসএমএ ফাউন্ডেশন। পরবর্তীতে রোশ ওষুধটির ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট ও বাজারজাতকরণের দায়িত্ব নেয়।

আরও পড়ুন
রিসডিপ্লাম আবিষ্কারের শুরুটা হয়েছে আমেরিকার একটি বায়োটেক প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানটির নাম পিটিসি থেরাপিউটিকস। সে প্রতিষ্ঠানে আমার দীর্ঘদিন ড্রাগ ডিসকভারি টিমে গবেষণার সুযোগ হয়েছিলো।

জিনগত অনেক রোগকে আমরা বিরল বলে থাকি। অর্থাৎ সচরাচর সবার হয় না বলেই বিরল শব্দটা ব্যবহার করা হয়। সুতরাং এসএমএ হলো একটা বিরল জিনগত রোগ। বিরল রোগ অনেক আছে। যেমন ডুশেন মাসকুলার ডিসট্রফি, হান্টিংটনস ডিজিজ, সিসটিক ফাইব্রোসিস ইত্যাদি। আমি দীর্ঘদিন হান্টিংটনস ডিজিজের ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমাদের টিমের আবিষ্কৃত একটি ওষুধ, যেটা ভটোপ্লাম নামে পরিচিত, সেটার ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

একটা রোগ বিরল, কিন্তু বিরল রোগের সংখ্যা কয়েক হাজার। সব মিলিয়ে হিসাব করলে যেকোনো জনগোষ্ঠীর শতকরা কয়েকজন কোনো একটি বিরল রোগে আক্রান্ত থাকেন। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সেই হিসাব কয়েক লাখে থামে না, কয়েক মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়ায়।

সৃষ্টিকর্তা মানুষকে রোগ দিয়েছেন। আবার মানুষের ভিতর মেধাও দিয়েছেন সেই রোগের বিরুদ্ধে ওষুধ আবিষ্কারের। ওষুধ তৈরি করার। আবার ডাক্তারদের বিদ্যা দিয়েছেন, যেন রোগীর রোগের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সঠিক ওষুধ সেবনের পরামর্শ দেন। রোগীর জন্য ওষুধ হলো একটা বিষয়। কিন্তু রোগীর সঙ্গে আশার কথা বলা, রোগীর মনে শক্তি দেয়া, রোগীর মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা; এগুলো কিন্তু কম শক্তিশালী ওষুধ নয়। মানুষকে সাহস দেয়া, মানুষের মনে আশার সঞ্চার করা, এগুলো তো আশীর্বাদ কিংবা দোয়ার মতোই।

আরও পড়ুন
আমি দীর্ঘদিন হান্টিংটনস ডিজিজের ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমাদের টিমের আবিষ্কৃত একটি ওষুধ, যেটা ভটোপ্লাম নামে পরিচিত, সেটার ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

বিরল রোগের ওষুধের দাম অনেক। দাম বেশি হওয়ার কারণ হলো, যেসব প্রতিষ্ঠান গবেষণা করে এই ওষুধ আবিষ্কার করে, তাদেরকে আবিষ্কারের জন্য অনেক টাকা খরচ করতে হয়। উন্নত দেশে যেহেতু মেডিক্যাল ইন্সুরেন্স এই খরচ বা ব্যয় বহন করে, ফলে রোগীর পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ কম পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে এসব ওষুধের দাম অনেক বেশি। ফলে বাংলাদেশে বিরল রোগের ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণা এবং ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। এজন্য সরকার এগিয়ে আসলে এসব রোগী এবং রোগীর পরিবারের মুখে হাসি ফুটানো সম্ভব। আমি স্বপ্ন দেখি, দেশের সরকার বিরল রোগের ওষুধ আবিষ্কারের ও উন্নয়নের উদ্যোগ নেবে এবং সে উদ্যোগে আমরা আমাদের অভিজ্ঞতাকে, জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে দেশের রোগীদের জীবনকে কিছুটা সহজ করতে পারবো। বাংলাদেশের রোগী ও তাদের পরিবারদের চাওয়াও সেটাই।

লেখক: ড্রাগ ডিসকভারি সায়েন্টিস্ট, সেন্টার ফর কেমিক্যাল বায়োলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিকস, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো, যুক্তরাষ্ট্র

সূত্র:

১.  J. Med. Chem. 2018, 61, 11021–11036; https://doi.org/10.1021/acs.jmedchem.8b01291

২. Science, 2014, 345, 6197, 624–625; https://doi.org/10.1126/science.1258444

৩. Nat Chem Biol., 2019, 15, 1191–1198; https://doi.org/10.1038/s41589-019-0384-5

আরও পড়ুন