আগস্ট মাস সাধারণত প্রকাশনা জগত কিছুটা নীরব থাকে, কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্ট মাস সায়েন্স ফিকশন প্রেমীদের জন্য দারুণ কিছু চমক নিয়ে এসেছে। গ্যালাক্সি, ভয়ংকর সামুদ্রিক দানবসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব বইয়ে। চলুন, আগস্ট মাসে প্রকাশিত শীর্ষ সায়েন্স ফিকশন বইগুলোর ব্যাপারে সংক্ষেপে জেনে নিই।
রিচার্ড সোয়ান মূলত তাঁর এপিক ফ্যান্টাসি ও গা ছমছমে কল্পবিজ্ঞানের জন্য পরিচিত। আগস্টে প্রকাশিত তাঁর নতুন বই দ্য ইনফিনিট স্টেট পাঠকদের নিয়ে যায় এক বিশাল, স্বৈরাচারী সাম্রাজ্যের পটভূমিতে। সায়েন্স ফিকশনের মোড়কে এটি মূলত রাজনীতি, ক্ষমতা এবং সমাজব্যবস্থার এক দারুণ বিশ্লেষণ।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ক্যাথরিন ফুলার। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন। এই অগাধ সম্পদ তাঁকে এক অভাবনীয় সুযোগ এনে দেয়। তিনি চাইলে আস্ত একটি গ্রহ কিনে নিতে পারেন এবং সেখানে নিজের মনের মতো একটি উন্নত সমাজ গড়তে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই গ্যালাকটিক সাম্রাজ্য কি তাঁকে সেখানে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে দেবে?
বইটির পরতে পরতে জর্জ অরওয়েলের বিখ্যাত নাইনটিন এইটি-ফোর এবং ফিলিপ কে ডিকের দ্য ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসেল বইয়ের দারুণ আবহ পাওয়া যায়। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আটকে পড়া এক নারীর নিজস্ব ইউটোপিয়া গড়ার এই লড়াই পাঠকদের শেষ পাতা পর্যন্ত আটকে রাখবে।
দ্য ইনফিনিট স্টেট
লেখক: রিচার্ড সোয়ান
প্রকাশক: গোলানজ
পৃষ্ঠা: ৪১৬
দাম: ২৩ ইউরো
দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞান কল্পকাহিনি লেখকদের মধ্যে কিম বো-ইয়ং এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর গল্পগুলোতে মানবতা, প্রকৃতি এবং ভয়াবহ সংকটের এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক রূপ ফুটে ওঠে। আ প্লেগড সি বইটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ছুটিতে পড়ার মতো দারুণ একটি থ্রিলার সায়েন্স ফিকশন এটি।
গল্পের প্রধান চরিত্র মু-ইয়ং একজন বডিগার্ড। সে তার ভাইজিকে নিয়ে কোরিয়ার এক বিচ্ছিন্ন উপকূলীয় গ্রামের দিকে রওনা দেয়। পথিমধ্যে সে জানতে পারে, ওই অঞ্চলে এক ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। সব বিপদ উপেক্ষা করে সে সেখানে পৌঁছায়। কিন্তু ভূমিকম্পটি কেবল ধ্বংসযজ্ঞই চালায়নি, মাটির নিচ থেকে এক প্রাচীন প্লেগ বা মহামারিকেও মুক্ত করে দিয়েছে।
এই মহামারিতে আক্রান্ত হলে মানুষ একধরনের মাছের মতো দানবে পরিণত হয়। সংক্রমণ ঠেকাতে পুরো গ্রামটি লকডাউন করে দেওয়া হয়। মু-ইয়ং আটকে পড়ে সেই মৃত্যুফাঁদে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ ও বেঁচে থাকার এক রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের গল্প এটি।
আ প্লেগড সি
লেখক: কিম বো-ইয়ং
অনুবাদ: সোফি বোম্যান
প্রকাশক: হনফর্ড স্টার
পৃষ্ঠা: ১৫৬
দাম: ১৩.৯৯ ইউরো
টিম প্র্যাট স্পেস অপেরা ঘরানার পাঠকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। তাঁর নতুন এই বইটিতে স্পেস অপেরার বিশাল ক্যানভাসের সঙ্গে তিনি খুব সুন্দরভাবে খানিকটা রোমান্স মিশিয়ে দিয়েছেন। এটি এমন এক গল্প, যেখানে মহাজাগতিক সংকটের পাশাপাশি সাধারণ মানবিক সম্পর্কগুলোও সমান গুরুত্ব পেয়েছে।
কাহিনির নায়ক গ্লেন একজন সাধারণ গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী। কিন্তু তাঁর প্রেমিকা ভিভি মোটেও সাধারণ কেউ নন, তিনি পেশায় একজন গুপ্তচর! মহাকাশের বুক চিরে ধেয়ে আসা একটি বিশাল ধূমকেতুকে থামানোর দায়িত্ব পড়ে ভিভির কাঁধে। কিন্তু মিশন শুরু হতেই ভিভি বুঝতে পারেন, পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি জটিল।
ধূমকেতু থামানোর পাশাপাশি তাঁকে এমন একটি চুরি যাওয়া রত্ন খুঁজে বের করতে হবে, যার ভেতরে পুরো মহাবিশ্ব ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা লুকিয়ে আছে। মহাকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলা গ্লেন ও ভিভির এই রোমাঞ্চকর অভিযান সায়েন্স ফিকশন প্রেমীদের দারুণ আনন্দ দেবে।
দ্য জুয়েল অ্যান্ড দ্য কমেট
লেখক: টিম প্র্যাট
প্রকাশক: অ্যাংরি রোবট
পৃষ্ঠা: ৪০০
দাম: ৯.৯৯ ইউরো
পৃথিবী ধ্বংসের পর বেঁচে যাওয়া গুটিকয়েক মানুষের গল্প নিয়ে যুগে যুগে অনেক চমৎকার সায়েন্স ফিকশন লেখা হয়েছে। সি. এ. ফ্লেচার তাঁর নতুন বইয়ে ঠিক সেই ঘরানাকেই এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছেন। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক পি. ডি. জেমসের দ্য চিলড্রেন অব মেন-এর একটা ছায়া এই বইয়ে পাওয়া যায়।
গল্পের পটভূমি এমন এক ভবিষ্যৎ পৃথিবীর, যেখানে মানবজাতি তাদের প্রজননক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ, পৃথিবীতে আর কোনো নতুন শিশুর জন্ম হচ্ছে না। এই ঘটনার ঠিক ২০০ বছর পরের দৃশ্যপটে গল্প শুরু হয়। পৃথিবী প্রায় জনশূন্য, মানবসভ্যতা বিলুপ্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে।
এই প্রায়-শূন্য পৃথিবীতে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে অদম্য দুই চরিত্র—মাউস এবং ক্যাট। বিস্তীর্ণ শূন্যতায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, পুরনো সভ্যতার স্মৃতি হাতড়ানো এবং মানুষের টিকে থাকার অদম্য ইচ্ছার এক দারুণ মনস্তাত্ত্বিক দলিল হয়ে উঠেছে ফ্লেচারের এই উপন্যাস।
দ্য টু অব আস অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ওয়ার্ল্ড
লেখক: সি. এ. ফ্লেচার
প্রকাশক: অরবিট
পৃষ্ঠা: ৪০০
দাম: ২৩ ইউরো
বইটির নাম দেখেই বোঝা যায়, গল্পে দারুণ একধরনের হিউমার লুকিয়ে আছে। আন্দ্রেয়া হেয়ারস্টন সায়েন্স ফিকশনের সঙ্গে মার্ডার মিস্ট্রি দারুণভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন। পুরো ঘটনাটি ঘটছে মাল্টিভার্স মহাবিশ্বের পটভূমিতে!
গল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ উনা নামে একটি সেন্ট বারডুডল। এটি এক প্রজাতির কুকুর। উনা এবং তার মালকিন জাজু তাদের এলাকার এক বিখ্যাত তারকার মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে নামে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, উনা কোনো সাধারণ কুকুর নয়; সে এক ডাইমেনশন থেকে আরেক ডাইমেনশনে অনায়াসে ভ্রমণ করতে পারে!
উনা জানে আসল খুনি কে, কিন্তু সেটা সে প্রকাশ করবে কীভাবে? প্রকাশকের মতে, এই বইটিতে পাঠক মাল্টিভার্সের দারুণ সব ধাঁধা এবং ভিনগ্রহের ট্রিকস্টারদের দেখা পাবেন, যা গল্পটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
দ্য রিডেম্পশন সেন্টার ইজ ক্লোজড অন সানডেজ
লেখক: আন্দ্রেয়া হেয়ারস্টন
প্রকাশক: টর বুকস
পৃষ্ঠা: ৪১৬
দাম: ২২ ইউরো
নিকোল ব্রুকসের এই উপন্যাসকে প্রথাগত সায়েন্স ফিকশনের চেয়ে বরং ন্যাচারাল থ্রিলার বা সারভাইভাল ড্রামা বলাই বেশি মানানসই। তবে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রকৃতির রোষানলকে উপজীব্য করে লেখা এই গল্পে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার দারুণ এক ছাপ রয়েছে।
গল্পের সময়কাল মাত্র ৬ ঘণ্টা। এক শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা আঘাত হানে রেভেনের বসতবাড়িতে। নিমেষেই সব তলিয়ে যেতে থাকে। প্রাণ বাঁচাতে রেভেন তাঁর সন্তান, সৎ মা এবং পোষা কুকুরকে নিয়ে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নেন। পানি ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু উদ্ধারের কোনো নামগন্ধ নেই।
মাত্র ৬ ঘণ্টার এই চরম উৎকণ্ঠা, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষের অসহায়ত্ব এবং বেঁচে থাকার মরিয়া চেষ্টাকে লেখিকা এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, পড়ার সময় পাঠকের নিজেরই দমবন্ধ হয়ে আসতে পারে।
নো হায়ার গ্রাউন্ড
লেখক: নিকোল ব্রুকস
প্রকাশক: ব্ল্যাকস্টোন পাবলিশিং
পৃষ্ঠা: ২৮৮
দাম: ২৯.৯৯ ডলার
যাঁরা সায়েন্স ফিকশনের সঙ্গে গা শিউরে ওঠা হরর বা ভয়ংকর গল্পের মিশ্রণ ভালোবাসেন, ডব্লিউ. এইচ. চিজমারের দেম তাঁদের জন্য এক নিখুঁত উপহার। প্রকাশক একে পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক হরর সারভাইভাল নভেল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
গল্পের শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি অতিগোপন সরকারি প্রজেক্ট দিয়ে। বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল মহাবিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে কোনো পদার্থ টেলিপোর্ট করা। কিন্তু প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ে তারা মহাবিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে এমন কিছু প্রাণীকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে, যা চরম ভয়ংকর। সবচেয়ে হাস্যকর ও ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সেই অজানা প্রাণীকে একটি সাধারণ ট্রাকে করে ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল! ট্রাকটি নিউ ইংল্যান্ডের এক হাইওয়েতে উল্টে যায় এবং সেই ভিনগ্রহের দানব মুক্ত হয়ে যায়।
এর ঠিক তিন বছর পরের দৃশ্যপটে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল এখন এক মৃত্যুপুরী। সেখানে একাকী এক মানুষ সেই অজানা আতঙ্কের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণান্তকর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
দেম
লেখক: ডব্লিউ. এইচ. চিজমার
প্রকাশক: গ্যালারি বুকস
পৃষ্ঠা: ২৭২
দাম: ২৮ ডলার
টাইম ট্রাভেল নিয়ে লেখা জোডি টেলরের স্মলহোপ অ্যান্ড পেনিরয়্যাল সিরিজের দারুণ এক সংযোজন আ ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার। ইতিহাস, টাইম ট্রাভেল ও ব্রিটিশ রসবোধের এক দারুণ প্যাকেজ এই বইটি।
আগের বইয়ে প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসার পর লেডি অ্যামেলিয়া স্মলহোপ এবার একটু শান্তিতে ছুটি কাটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময়ভ্রমণকারীদের জীবনে কি আর সে সুযোগ সহজে মেলে?
অ্যামেলিয়া এবং তাঁর সঙ্গী পেনিরয়্যালকে এবার এমন এক গুপ্ত ঘাতক টার্গেট করে, যে কিনা পেনিরয়্যালের অন্ধকার অতীত সম্পর্কে সব জানে। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের গোলকধাঁধায় নিজেদের বাঁচানোর পাশাপাশি ইতিহাসের ভারসাম্য রক্ষা করার এই মজার অভিযান সায়েন্স ফিকশন পাঠকদের নিরাশ করবে না।
আ ফ্যামিলি অ্যাফেয়ার
লেখক: জোডি টেলর
প্রকাশক: হেডলাইন বুকস পাবলিশিং
পৃষ্ঠা: ৪৩২
দাম: ২০ ইউরো