ধাতু ও খনিজের মধ্যে পার্থক্য কী, সোনা ধাতু নাকি খনিজ

সোনা কি ধাতু, নাকি খনিজ? আপনার গাড়ির ইস্পাত কেন ধাতু হলেও খনিজ নয়? আবার হীরা খনিজ হয়েও কেন ধাতু হতে পারল না? রসায়ন ও ভূতত্ত্বের এই দারুণ বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্ব কীভাবে আমাদের চিরচেনা বস্তুর পরিচয় বদলে দেয়, তার চমৎকার এবং চমকপ্রদ উত্তর জানতে পড়ুন…

প্রাকৃতিক সোনা কেন কখনো শতভাগ খাঁটি হয় না?ছবি: পেক্সেলস

জাদুঘরের কাচের বাক্সে রাখা চকচকে সোনার টুকরোর পাশে ছোট্ট পরিচিতি কার্ডে লেখা থাকে খনিজ। আবার কোনো জুয়েলারির দোকানে গেলে সেই একই হলুদ বস্তুকে স্যাকরারা বলেন মূল্যবান ধাতু। বস্তু একই, কিন্তু তকমা দুটি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দুটি কথাই পুরোপুরি সত্যি!

বিভ্রান্তিটা শুধু স্বর্ণতে আটকে নেই। আমাদের রোজকার জীবনে ব্যবহৃত গাড়ির বডি তৈরি হয় ইস্পাত দিয়ে। ইস্পাতকে সবাই ধাতু বললেও কেউ কিন্তু খনিজ বলে না। তামার তার একটি ধাতু। আবার খাবার লবণের একটি দানাও খনিজ। হীরাও একটি খনিজ। তাহলে কোন শব্দটি কখন সঠিক?

সত্যি বলতে, ধাতু ও খনিজ কোনো প্রতিযোগী শব্দ নয়। এরা বিজ্ঞানের দুটি সম্পূর্ণ আলাদা শাখার শব্দ এবং এরা দুটি আলাদা প্রশ্নের উত্তর দেয়। প্রশ্ন দুটি বুঝতে পারলেই পুরো ব্যাপারটা আপনার কাছে পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। চলুন, একে একে এদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক।

আরও পড়ুন
আমাদের রোজকার জীবনে ব্যবহৃত গাড়ির বডি তৈরি হয় ইস্পাত দিয়ে। ইস্পাতকে সবাই ধাতু বললেও কেউ কিন্তু খনিজ বলে না। তামার তার একটি ধাতু। আবার খাবার লবণের একটি দানাও খনিজ।

কোন জিনিস কোনো বস্তুকে ধাতু বানায়

হাতের কাছের একটি চামচ নিন। এতে একটু টোকা দিন। একটা পেপারক্লিপ বাঁকানোর চেষ্টাও করতে পারেন। অথবা আলোতে একটা কয়েনের চকচকে ভাব খেয়াল করুন। আপনি যা যা দেখলেন, তার সবকিছুর পেছনে রয়েছে ধাতুর ভেতরের একটি বিশেষ ম্যাজিক।

বেশিরভাগ পদার্থের ভেতরেই প্রতিটি পরমাণু তাদের নিজস্ব ইলেকট্রনগুলোকে খুব শক্ত করে ধরে রাখে। ইলেকট্রন হলো পরমাণুর চারপাশে ঘুরতে থাকা অতি ক্ষুদ্র চার্জযুক্ত কণা। কিন্তু ধাতু এখানে একটা অদ্ভুত কাজ করে। এর পরমাণুগুলো তাদের বাইরের স্তরের ইলেকট্রনগুলোকে মুক্ত করে দেয়। এই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো পুরো বস্তুর ভেতরে এমনভাবে ভেসে বেড়ায়, ঠিক যেন নুড়িপাথরের ভেতর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। রসায়নবিদরা ধাতুকে কল্পনা করেন ইলেকট্রনের সমুদ্রে ভাসমান ধনাত্মক আয়নের সারি হিসেবে। পরমাণুগুলো এই সমুদ্রে ধনাত্মক পিণ্ড হিসেবে বসে থাকে, আর মুক্ত ইলেকট্রনগুলো তাদের মাঝখান দিয়ে স্রোতের মতো বয়ে চলে।

আরও পড়ুন
বেশিরভাগ পদার্থের ভেতরেই প্রতিটি পরমাণু তাদের নিজস্ব ইলেকট্রনগুলোকে খুব শক্ত করে ধরে রাখে। ইলেকট্রন হলো পরমাণুর চারপাশে ঘুরতে থাকা অতি ক্ষুদ্র চার্জযুক্ত কণা।

এই একটি চিত্রই বুঝিয়ে দেয়, কেন ধাতু এমন আচরণ করে। ইলেকট্রনগুলো মুক্ত থাকার কারণেই তারা প্রবাহিত হতে পারে। তামার তারের এক প্রান্তে ইলেকট্রন ঠেলা দিলে, সেগুলো অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যায়। এই প্রবাহটাই হলো বিদ্যুৎ। আবার ধাতুকে হাতুড়ি দিয়ে পেটালে ওই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো কুশনের মতো কাজ করে। তারা পরমাণুগুলোর মাঝখানে পিছলে যায়, তাই ধাতু ভেঙে বা ফেটে না গিয়ে কেবল কিছুটা টোল খায়। আলো পড়লে এই ইলেকট্রনগুলোই আলোকে সরাসরি ফিরিয়ে দেয়, যে কারণে ধাতুর পৃষ্ঠ এত চকচকে হয়।

তাহলে মূল বিষয়টা হলো, ধাতু কোনো বস্তুর উৎপত্তিস্থল নয়। এটি হলো পরমাণুগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে আঠার মতো লেগে আছে, তার একটি পদ্ধতি। ধাতু হলো রসায়নের উত্তর; এটি বস্তুর গঠনতন্ত্র, এর জন্মস্থান নয়। এমনকি বস্তুটি কঠিন অবস্থায় আছে কি না, তার ওপরও এটি নির্ভর করে না। গলে যাওয়া বা গ্যাসে পরিণত হওয়া ধাতুও ধাতু-ই থাকে।

আরও পড়ুন
তামার তারের এক প্রান্তে ইলেকট্রন ঠেলা দিলে, সেগুলো অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে যায়। এই প্রবাহটাই হলো বিদ্যুৎ। আবার ধাতুকে হাতুড়ি দিয়ে পেটালে ওই মুক্ত ইলেকট্রনগুলো কুশনের মতো কাজ করে।

কোন জিনিস কোনো বস্তুকে খনিজ বানায়

এবার আসা যাক দ্বিতীয়টিতে। এটি রসায়নের আলচনা নয়, বরং ভূতত্ত্ব। একজন ভূতত্ত্ববিদ প্রথমেই জানতে চান না যে পাথরটি কী দিয়ে তৈরি। তিনি জানতে চান এটি কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে গঠিত হয়েছে। কোনো পদার্থকে খনিজ হতে হলে তাকে পাঁচটি শর্ত মানতে হবে।

১. প্রাকৃতিক: এটি মানুষের কোনো সাহায্য ছাড়াই প্রকৃতিতে নিজে নিজে তৈরি হতে হবে। ইস্পাত মানুষের তৈরি পদার্থ, তাই এটি খনিজ নয়।

২. অজৈব: এটি উদ্ভিদ বা প্রাণীর মতো কোনো জীবন্ত জিনিস থেকে তৈরি হওয়া চলবে না।

৩. কঠিন পদার্থ: তরল বা গ্যাসীয় পদার্থ এই তালিকায় পড়বে না। তবে একটি বিখ্যাত তরল ব্যতিক্রম রয়েছে, যা নিয়ে পরে কথা হবে।

৪. রাসায়নিক গঠন: একে যেখান থেকেই খুঁড়ে বের করা হোক না কেন, নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে এর উপাদানগুলো সব সময় একই থাকবে।

৫. সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো পরমাণু: এর পরমাণুগুলো একটি সুশৃঙ্খল ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাঠামোতে সাজানো থাকবে, যা মূলত স্ফটিক বা ক্রিস্টাল তৈরি করে।

কোয়ার্টজ পাথর এই প্রতিটি শর্ত নিখুঁতভাবে পূরণ করে। খাবার লবণ এবং হীরাও এই সবগুলো শর্ত মেনে চলে। এবার খেয়াল করে দেখুন, এই তালিকায় বিদ্যুৎ পরিবাহিতা, চকচকে ভাব বা বাঁকানোর কোনো উল্লেখ নেই! একটি খনিজ সংজ্ঞায়িত হয় তার জন্ম ও ভেতরের শৃঙ্খলার মাধ্যমে, টোকা দিলে সেটি কেমন আচরণ করবে তার মাধ্যমে নয়। খনিজ হলো ভূতত্ত্বের উত্তর।

আরও পড়ুন
একটি বস্তু একই সঙ্গে ধাতু ও খনিজ দুটোই হতে পারে। আবার এটি ধাতু হতে পারে কিন্তু খনিজ নয়। আবার খনিজ হতে পারে কিন্তু ধাতু নয়। অথবা প্লাস্টিক, কাঠ বা কাচের মতো কোনোটিই না হতে পারে।

দুটি সংজ্ঞা কেন একে অপরের সঙ্গে মেলে না

ঠিক এখানেই আমরা হোঁচট খাই। শব্দ দুটি আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি জিনিস পরিমাপ করে। ধাতু জানতে চায়, পরমাণুগুলো কীভাবে জোড়া লেগে আছে। আবার খনিজ জানতে চায়, বস্তুটি কি প্রাকৃতিক এবং এর পরমাণুগুলো কি সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো? প্রশ্ন দুটি যেহেতু আলাদা, তাই কোনো বস্তু একটির শর্ত, বা দুটিরই শর্ত পূরণ করতে পারে, আবার কোনোটিই না-ও করতে পারে।

এর মানে হলো, আপনার সামনে এখন দুটি নয়, চারটি বাক্স রয়েছে। একটি বস্তু একই সঙ্গে ধাতু ও খনিজ দুটোই হতে পারে। আবার এটি ধাতু হতে পারে কিন্তু খনিজ নয়। আবার খনিজ হতে পারে কিন্তু ধাতু নয়। অথবা প্লাস্টিক, কাঠ বা কাচের মতো কোনোটিই না হতে পারে। স্বর্ণের টুকরো আর ইস্পাতের বিম দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বাক্সে পড়ে। ঠিক এ কারণেই জাদুঘর এবং স্যাকরা, উভয়ের কথাই সত্যি।

আরও পড়ুন
যত বেশি রুপা মিশতে থাকে, সোনা তত সাদাটে হয়। গয়না তৈরির সময় স্যাকরারা ইচ্ছা করেই এতে আরও কিছু ধাতু মেশান, যে কারণে হাতের আংটির সোনা খুব কমই খাঁটি সোনা হয়।

সোনা কি ধাতু নাকি খনিজ

সোনার হিসাবটা খুব সহজ, কারণ এটি ধাতুও, আবার খনিজও। মাটি খুঁড়ে সোনার টুকরো বের করলে সেটি আগে থেকেই ধাতু হিসেবেই থাকে। এর জন্য কোনো চুল্লি বা কারখানার দরকার নেই। ভূতত্ত্ববিদরা একে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘নেটিভ গোল্ড হলো একটি মৌলিক পদার্থ এবং একটি খনিজ।’ নেটিভ ভূতত্ত্ববিদদের ব্যবহৃত একটি শব্দ। এর মানে এমন ধাতু যা মাটিতে সরাসরি ধাতু হিসেবেই পাওয়া যায়, অন্য কোনো যৌগের সঙ্গে আটকে থাকে না।

সোনা খনিজের সবগুলো শর্তও দারুণভাবে পূরণ করে। এটি প্রাকৃতিক, অজৈব, কঠিন, নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠনযুক্ত এবং এর পরমাণুগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো। তাই নেটিভ গোল্ডের একটি টুকরো একই সঙ্গে একটি নিখুঁত খনিজ এবং একটি নিখুঁত ধাতু। তামা এবং রুপাও একই ম্যাজিক দেখায়। প্রধান নেটিভ ধাতুগুলো হলো সোনা, রুপা, তামা এবং প্ল্যাটিনাম। যেখানেই এগুলো খাঁটি অবস্থায় পাওয়া যায়, সেখানেই এরা একই সঙ্গে ধাতু ও খনিজ।

অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন থাকে, প্রাকৃতিক সোনা কেন কখনো শতভাগ খাঁটি হয় না? কারণ, মাটির নিচে সোনা প্রায় সব সময়ই সামান্য রুপার সঙ্গে মিশে থাকে। এই মিশ্রণ সোনার রংও বদলে দেয়। যত বেশি রুপা মিশতে থাকে, সোনা তত সাদাটে হয়। গয়না তৈরির সময় স্যাকরারা ইচ্ছা করেই এতে আরও কিছু ধাতু মেশান, যে কারণে হাতের আংটির সোনা খুব কমই খাঁটি সোনা হয়।

আরও পড়ুন
সোনা প্রাকৃতিক, অজৈব, কঠিন, নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠনযুক্ত এবং এর পরমাণুগুলো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো। তাই নেটিভ গোল্ডের একটি টুকরো একই সঙ্গে একটি নিখুঁত খনিজ এবং একটি নিখুঁত ধাতু।

ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল কি খনিজ

এখানেই অনেকে ধোঁকায় পড়েন। ইস্পাত দিয়ে আমরা আধুনিক পৃথিবী গড়ে তুলেছি, অথচ এটি আদৌ কোনো খনিজ নয়! এটি খনিজ হওয়ার প্রথম শর্তেই বাদ পড়ে যায়। কারণ এটি প্রাকৃতিক নয়। মানুষ লোহা ও সামান্য কার্বন মিশিয়ে কারখানার বিশাল চুল্লিতে ইস্পাত তৈরি করে। তাই ইস্পাত মানুষের তৈরি একটি পদার্থ, খনিজ নয়। পৃথিবীর কোনো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া আপনাকে আস্ত একটি ইস্পাতের বিম উপহার দেবে না। কোমল পানীয়ের ক্যানের অ্যালুমিনিয়াম বা ভাস্কর্যের ব্রোঞ্জের গল্পও একই। এগুলো সবই ধাতু, একটিও খনিজ নয়।

আরেকটি চমৎকার উদাহরণ হলো ধাতব কাচ। এটি একটি সত্যিকারের ধাতু, যার মধ্যে মুক্ত ইলেকট্রন সবই আছে। কিন্তু একে এত দ্রুত ঠান্ডা করা হয় যে, এর পরমাণুগুলো ক্রিস্টালের মতো সুশৃঙ্খলভাবে না বসে এলোমেলো কাচের মতো জমে যায়। তাই প্রকৃতিতে পাওয়া গেলেও এটি খনিজের ওই সুশৃঙ্খল পরমাণুর শর্তে আটকে যেত। মেটালিক গ্লাস প্রমাণ করে, স্ফটিক বা ক্রিস্টালের পরীক্ষাটি কেবল খনিজের জন্যই, ধাতুর জন্য এটি মোটেই বাধ্যতামূলক নয়।

আরও পড়ুন
ইস্পাত খনিজ হওয়ার প্রথম শর্তেই বাদ পড়ে যায়। কারণ এটি প্রাকৃতিক নয়। মানুষ লোহা ও সামান্য কার্বন মিশিয়ে কারখানার বিশাল চুল্লিতে ইস্পাত তৈরি করে। তাই ইস্পাত মানুষের তৈরি একটি পদার্থ।

হীরা কি ধাতু

পুরো বিষয়টা এবার উল্টে দেওয়া যাক। হীরা খনিজের ওই পাঁচটি শর্ত অনায়াসে পার হয়ে যায়। এটি প্রাকৃতিক, অজৈব, কঠিন, নির্দিষ্ট গঠনযুক্ত এবং এর পরমাণুগুলো প্রকৃতির অন্যতম নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল প্যাটার্নে সাজানো। হীরা পুরোপুরি কার্বন দিয়ে তৈরি একটি প্রাকৃতিক খনিজ। ভূতত্ত্ববিদদের স্কেলে এটি প্রকৃতির সবচেয়ে কঠিন খনিজ।

কিন্তু হীরা কোনোভাবেই ধাতু নয়। এর কার্বন পরমাণুগুলো একে অপরের সঙ্গে খুব শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। প্রতিটি পরমাণু তার আশেপাশের চারটি পরমাণুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। এখানে কিছুই মুক্ত নয়। কোনো ইলেকট্রনের সমুদ্র নেই, তাই প্রবাহিত হওয়ার মতোও কেউ নেই। এ কারণেই হীরা বিদ্যুৎ পরিবহন করে না, বাঁকানো যায় না এবং টোকা দিলে টোল না খেয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। একই কারণে এটি ধাতুর মতো চকচকে না হয়ে স্বচ্ছ হয়। হীরা একটি খনিজ এবং অধাতু।

আরও পড়ুন
হীরার কার্বন পরমাণুগুলো একে অপরের সঙ্গে খুব শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। প্রতিটি পরমাণু তার আশেপাশের চারটি পরমাণুকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। এখানে কিছুই মুক্ত নয়।

বেশিরভাগ ধাতুই খনিজের ভেতর লুকিয়ে থাকে

রোজকার জীবনে ছোঁয়া প্রায় কোনো ধাতুই সরাসরি ধাতু হিসেবে প্রকৃতিতে ছিল না। এরা অন্য কোনো খনিজের ভেতরে লুকিয়ে ছিল। আটকে ছিল অন্য কিছুর সঙ্গে। আমাদের কষ্ট করে সেখান থেকে এদের বের করে আনতে হয়েছে।

গাড়ি, ফ্রিজ বা রান্নাঘরের ছুরিতে থাকা লোহার কথা ভাবুন। লোহা প্রায় কখনোই প্রকৃতিতে খাঁটি ধাতু হিসেবে পাওয়া যায় না; উল্কাপিণ্ড ছাড়া। এটি হেমাটাইটের মতো লালচে খনিজের ভেতরে অক্সিজেন ও লোহার যৌগ হিসেবে ঘাপটি মেরে থাকে। এই ধাতুকে মুক্ত করতে কারখানার চুল্লিতে কার্বনের সঙ্গে প্রচুর তাপে পোড়াতে হয়। কার্বন তখন অক্সিজেনকে ছিনিয়ে নেয় এবং পেছনে পড়ে থাকে গলিত লোহা। লোহার গলনাঙ্ক ১৫৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, তাই কাজটা মোটেও সহজ নয়।

অ্যালুমিনিয়ামও একই লুকোচুরি খেলে। এটি বক্সাইট নামের একটি পাথরে (অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড) লুকিয়ে থাকে। প্রকৃতিতে কখনো চকচকে শিট হিসেবে পড়ে থাকে না। পুরোনো পেরেকের গায়ে ধরা মরচে হলো এই প্রক্রিয়ার ঠিক উল্টো যাত্রা। লোহা আবার অক্সাইডে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ কারণেই মরচে ধরা লোহা আগের মতো বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে না। তাই ধাতু ও খনিজের মধ্যে সম্পর্কটা হলো, খনিজ থেকেই ধাতুর জন্ম।

আরও পড়ুন
লোহা হেমাটাইটের মতো লালচে খনিজের ভেতরে অক্সিজেন ও লোহার যৌগ হিসেবে ঘাপটি মেরে থাকে। এই ধাতুটিকে মুক্ত করতে কারখানার চুল্লিতে কার্বনের সঙ্গে প্রচুর তাপে পোড়াতে হয়।

ধাতু কি পাথর

দুটোই যেহেতু মাটি থেকে আসে, তাই প্রশ্নটা যৌক্তিক। ভূতত্ত্বের কাছে এর খুব স্পষ্ট একটি উত্তর আছে এবং এটি তৃতীয় আরেকটি শব্দকে সামনে নিয়ে আসে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা পাথর বা শিলার সংজ্ঞায় বলে, ‘পাথর হলো এক বা একাধিক খনিজের সমষ্টি।’ খনিজকে যদি রান্নার উপকরণ ধরেন, তবে পাথর হলো রান্না করা শেষ খাবার। চুনাপাথর হলো এমন একটি পাথর যা শুধু একটি খনিজ (ক্যালসাইট) দিয়ে তৈরি। এমনকি হিমবাহকেও এক প্রকার পাথর বলা যায়, যা বরফ নামের একটি খনিজ দিয়ে তৈরি!

তাহলে ধাতু আসলে কী? এটি প্রাকৃতিক নয় এবং এটি অনেকগুলো খনিজের দানা দিয়েও তৈরি নয়। এটি একটি পরিশোধিত পদার্থ। অন্যদিকে খাঁটি সোনার টুকরো হলো নিজেই একটি খনিজ, অর্থাৎ এটি নিজেই রান্নার উপকরণ।

এবার কল্পনা করুন, সাদা কোয়ার্টজ পাথরের স্তূপে সোনা আটকে আছে। ওই পুরো স্তূপটি একটি পাথর, কারণ এটি সোনা এবং কোয়ার্টজ খনিজকে একসঙ্গে আটকে রেখেছে। ঠিক এখানেই আকরিক শব্দটি তার জায়গা করে নেয়। আকরিক হলো এমন একটি পাথর, যার মধ্যে এত বেশি পরিমাণে ধাতুযুক্ত খনিজ থাকে যে সেখান থেকে বাণিজ্যিকভাবে ধাতু বের করে আনা লাভজনক। কারখানার বিশাল চুল্লিগুলোতে লোহার আকরিক (সাধারণত হেমাটাইট বা ম্যাগনেটাইট) দেওয়া হয়। চেইনটা তাহলে এমন: পাথর খনিজকে ধরে রাখে, আর খনিজ ধাতুকে ধরে রাখে। ধাতু হলো একেবারে শেষের অংশ, এটি কোনো পাথর নয়।

আরও পড়ুন
ধাতু প্রাকৃতিক নয় এবং এটি অনেকগুলো খনিজের দানা দিয়েও তৈরি নয়। এটি একটি পরিশোধিত পদার্থ। অন্যদিকে খাঁটি সোনার টুকরো হলো নিজেই একটি খনিজ, অর্থাৎ এটি নিজেই রান্নার উপকরণ।

ধাতু কি প্রাকৃতিক নাকি মানুষের তৈরি

উত্তর, দুটোই। এটা নির্ভর করছে আপনি কোন ধাতুটি ধরে আছেন তার ওপর। সোনা, রুপা, তামা এবং প্ল্যাটিনাম মাটি থেকেই ধাতু হিসেবে পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে ইস্পাত, ব্রোঞ্জ বা অ্যালুমিনিয়ামের ক্যান মানুষের তৈরি, কারখানায় আকরিক থেকে পরিশোধন করে বানানো। বেশিরভাগ ধাতুই এই দুয়ের মাঝামাঝি থাকে। এদের মৌলিক উপাদানটি প্রাকৃতিক ঠিকই, কিন্তু চকচকে ধাতুর রূপ পেতে একটি কারখানার প্রয়োজন হয়।

আবার এমন কিছু ধাতু আছে, যা সরাসরি আকাশ থেকে পড়ে! পৃথিবীর পাথরে খাঁটি লোহা পাওয়া বিরল, কিন্তু কিছু উল্কাপিণ্ড সরাসরি লোহা ও নিকেলের পিণ্ড হিসেবেই পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে। পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে বড় উল্কাপিণ্ড নামিবিয়ার হোবা, যা লোহা ও নিকেলের সংকর এবং এর ওজন প্রায় ৬০ টন! লোহার উল্কাপিণ্ডের ভেতরে ক্যামাসাইট নামের একটি খনিজ থাকে, যা মূলত লোহার সঙ্গে ৫-৭ শতাংশ নিকেল মেশানো একটি সংকর ধাতু। এর সঙ্গে প্রায়ই টিনাইট নামের আরেকটি খনিজ যুক্ত থাকে।

আরও পড়ুন
আবার এমন কিছু ধাতু আছে, যা সরাসরি আকাশ থেকে পড়ে! পৃথিবীর পাথরে খাঁটি লোহা পাওয়া বিরল, কিন্তু কিছু উল্কাপিণ্ড সরাসরি লোহা ও নিকেলের পিণ্ড হিসেবেই পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে।

পৃথিবীর বাইরে তৈরি হলেও এগুলো কি খনিজ? হ্যাঁ, অবশ্যই। ইন্টারন্যাশনাল মিনারেলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের নিয়ম অনুযায়ী, উল্কাপিণ্ড এবং চাঁদের পাথরের প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে খনিজ হিসেবেই ধরা হয়। কারণ এদের তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াটিও ভূতাত্ত্বিক। তাই উল্কাপিণ্ডের লোহার টুকরো একই সঙ্গে ধাতু এবং খনিজ, ঠিক খাঁটি সোনার মতো। এভাবেই নিকেল খনিজের ক্লাবে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

আরও একটি অদ্ভুত ব্যতিক্রম আছে। পারদ বা মার্কারি এমন একটি ধাতু যা সাধারণ তাপমাত্রায় তরল থাকে এবং মাইনাস ৩৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগে জমে না। ভূতত্ত্বের নিয়মে তরল পানি খনিজ নয়, কিন্তু বরফ খনিজ। অথচ পারদকে খনিজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যদিও এটি পৃথিবীতে স্ফটিক হিসেবে তৈরি হয় না! এটিকে একা পাওয়া যায় না বললেই চলে, তবে সিন্নাবার নামে পারদ সালফাইড আকরিকে তরল বিন্দু হিসেবে পাওয়া যায়। সব নিয়মেই তো কিছু ব্যতিক্রম থাকে, আর ভূতত্ত্বের এই ব্যতিক্রমটি একটু বেশিই তরল!

আরও পড়ুন
পারদ বা মার্কারি এমন একটি ধাতু যা সাধারণ তাপমাত্রায় তরল থাকে এবং মাইনাস ৩৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগে জমে না। ভূতত্ত্বের নিয়মে তরল পানি খনিজ নয়, কিন্তু বরফ খনিজ।

ধাতু নাকি খনিজ, সহজে মনে রাখার উপায়

মাত্র দুটি প্রশ্ন, এরপর আর কখনোই আপনার প্যাঁচ লাগবে না। প্রথমটি: এর পরমাণুগুলো কীভাবে জোড়া লেগে আছে? যদি তারা মুক্ত ইলেকট্রনের সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়, যার ফলে বস্তুটি বিদ্যুৎ পরিবহন করে, চকচক করে এবং বাঁকানো যায়, তবে এটি ধাতু। এটি রসায়নের বিষয়, বস্তুটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি নাকি কারখানায়, তা নিয়ে এর কোনো মাথাব্যথা নেই।

দ্বিতীয়টি: এটি কি প্রাকৃতিক, কঠিন পদার্থ এবং নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন মেনে সুশৃঙ্খল পরমাণু দিয়ে তৈরি? যদি উত্তর হ্যাঁ হয়, তবে এটি খনিজ। এটি ভূতত্ত্বের বিষয়, বস্তুটি বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে কি না, তা নিয়ে এর কিছু যায়-আসে না।

যেকোনো বস্তুর ওপর এই দুটি প্রশ্ন ছুড়ে দিন। সোনার টুকরো দুটি প্রশ্নেরই ইতিবাচক উত্তর দেয়, তাই এটি ধাতু ও খনিজ দুটোই। ইস্পাতের বিম শুধু প্রথমটির শর্ত মানে, তাই এটি ধাতু হলেও খনিজ নয়। হীরা শুধু দ্বিতীয়টির শর্ত মানে, তাই এটি খনিজ কিন্তু ধাতু নয়। জাদুঘরের পরিচিতি কার্ড এবং স্যাকরারা উভয়ই সঠিক!

সূত্র: সায়েন্স এবিসি

আরও পড়ুন