ভবিষ্যতের মানুষ কি আমাদের ভাষা বুঝতে পারবে

মানুষ সবসময় চেয়েছে তার অস্তিত্বের প্রমাণ ভবিষ্যতের কাছে পৌঁছে দিতে। কিন্তু কাজটা করা মোটেও সহজ নয়। ১০ হাজার বছর পরের মানুষ কি আমাদের বার্তা বুঝতে পারবে? নাকি কোনো কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আমাদের ইতিহাস?

ছবি: ফেদেরিকো ত্রামোন্তে

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিবিষয়ক সাংবাদিক অ্যাডাম রজার্সের দাদি মারা গেছেন। তাঁর দাদীর বার্কলের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টটা পরিষ্কারের দায়িত্ব পড়ে তাঁর কাঁধে। দরজা খুলতেই থমকে যান। এ তো অ্যাপার্টমেন্ট নয়, বইয়ের জঞ্জাল! দেয়াল থেকে দেয়াল, মেঝে থেকে ছাদ; সব জায়গায় শুধু বই আর বই। বসার জন্য দুটি চেয়ার, ছোট্ট রান্নাঘর ও বিছানার জায়গাটাই শুধু ফাঁকা। বাকি সব জায়গায় বইয়ের স্তূপ।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে চরম বিশৃঙ্খলা। কিন্তু একটু ভালো করে তাকাতেই ভুল ভাঙে। তাঁর দাদি শুধু শ্রমিক নেতা ছিলেন না, তিনি বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরি সায়েন্স পড়াতেন। পাঁচটা ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন। তাঁর এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও ছিল অদ্ভুত এক শৃঙ্খলা। প্রতিটি তাক নির্দিষ্ট বিষয় অনুযায়ী সাজানো, প্রতিটি বই সাজানো লেখকের নাম অনুযায়ী।

বইগুলো ঘাঁটতে গিয়ে অ্যাডাম আবিষ্কার করলেন আরেক রহস্য। কিছু বইয়ের ভেতর ভাঁজ করে রাখা আছে পুরোনো সব ম্যাগাজিন। নিউ ইয়র্কার, লন্ডন রিভিউ অব বুকস, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের পাতাগুলো এমনভাবে ভাঁজ করা, যাতে নির্দিষ্ট কোনো আর্টিকেলে চোখ পড়ে। সেই আর্টিকেলটা অবশ্যই ওই বইয়ের বিষয়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক। আরও ভেতরে গিয়ে পেলেন হাতে লেখা চিরকুটে ভরা অসংখ্য ক্লিপিং। দাদির প্যাঁচানো হাতের লেখায় সেখানে টুকে রাখা আছে বিষয়বস্তু ও সূত্র।

এটা শুধু একটা লাইব্রেরি ছিল না। দার্শনিক মেরি ক্যারুদার্স একে বলেন স্মৃতির স্থাপত্য। দাদির পুরো ঘরটাই ছিল তাঁর মস্তিষ্কের এক মানচিত্র। ফরাসি দার্শনিক জ্যাক দেরিদা বলেছিলেন, ‘আর্কাইভ বা সংগ্রহশালা হলো ভবিষ্যতের কাছে প্রতিশ্রুতির মতো।’ কিন্তু সব প্রতিশ্রুতি কি পূরণ হয়? জীবনের শেষদিকে দাদির সেই ক্ষুরধার মস্তিষ্ক আর আগের মতো কাজ করত না। তিনি নিজেই তাঁর সাজানো সাম্রাজ্যের ভাষা বুঝতে পারতেন না। ইনফরমেশন থিওরি বলে, কোনো বার্তা সফল হতে হলে প্রেরক ও প্রাপককে এর ভাষা ও সময় সম্পর্কে একমত হতে হয়। এখানে প্রাপক ছিলেন তাঁর দাদি নিজেই, কিন্তু সময়ের নিয়মে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁর এই বিশাল সংগ্রহের আসল বার্তাটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন
ইনফরমেশন থিওরি বলে, কোনো বার্তা সফল হতে হলে প্রেরক ও প্রাপককে এর ভাষা ও সময় সম্পর্কে একমত হতে হয়।

দুই

অতীত থেকে বর্তমান বা বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে বার্তা পাঠানো মোটেও সহজ কাজ নয়। আমরা অতীতের দিকে তাকালে শুধু  সেটুকুই দেখতে পাই, যা প্রকৃতি বা কোনো সংগ্রহশালা দয়া করে টিকিয়ে রেখেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লম্বোস গুহায় পাওয়া ৭৩ হাজার বছর আগের এক টুকরো পাথরের কথাই ধরুন। তাতে লাল রং দিয়ে আঁকা কিছু ত্রিভুজ। কে এঁকেছিল? কেন এঁকেছিল? এটা কি কোনো পাহাড়ের ছবি? নাকি সিল মাছ শিকারের হিসাব? নাকি কোনো আদিম মানুষ অলস দুপুরে বসে বসে খামাখা দাগ কেটেছিল? আমরা কোনোদিন জানতে পারব না। যে মানুষটা এটা এঁকেছিল, তার হয়তো অনেক কিছু বলার ছিল, কিন্তু ভবিষ্যতের আমরা তার ভাষা বুঝলাম না।

দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লম্বোস গুহায় পাওয়া ৭৩ হাজার বছর আগের এক টুকরো পাথর
ছবি: ক্রেগ ফস্টার / বার্গেন বিশ্ববিদ্যালয়

প্রাচীন গ্রিস বা রোমের ইতিহাস আমরা যা জানি, তার বেশির ভাগই আরবের আব্বাসীয় খিলাফতের পণ্ডিতদের কল্যাণে। তাঁরা আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি থেকে স্ক্রলগুলো উদ্ধার করে অনুবাদ করেছিলেন বলেই আমরা সক্রেটিস বা প্লেটোকে চিনি। কিন্তু কত হাজার স্ক্রল হারিয়ে গেছে? ব্যাবিলনের এক তামা ব্যবসায়ী ইয়া-নাসিরকে আমরা চিনি শুধু মাটির ফলকে লেখা তাঁর ব্যবসার অভিযোগপত্রের কারণে। অথচ তাঁর সমসাময়িক কত বড় বড় রাজা-মহারাজার নাম ধুলোয় মিশে গেছে!

আরও পড়ুন
প্রাচীন গ্রিস বা রোমের ইতিহাস আমরা যা জানি, তার বেশির ভাগই আরবের আব্বাসীয় খিলাফতের পণ্ডিতদের কল্যাণে। তাঁরা আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি থেকে স্ক্রলগুলো উদ্ধার করে অনুবাদ করেছিলেন।

ভবিষ্যতের জন্য বার্তা রেখে যাওয়ার সবচেয়ে করুণ উদাহরণ দেখা যায় জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে। সেখানে ৬০০ বছর ধরে মানুষ শত শত সুনামি পাথর বসিয়েছে। একেকটা পাথর যেন একেকটা সতর্কবাণী। আনেয়োশি গ্রামের একটা পাথরে লেখা আছে ১৮০০ সালের বন্যার কথা। সতর্ক করা হয়েছে, এর নিচে যেন কেউ বাড়ি না বানায়। আরেকটা পাথরে লেখা, সুনামি হলে নোকোরিয়া বা বেঁচে যাওয়াদের উপত্যকায় পালিয়ে যাও। কিন্তু মানুষ কি সেই পাথরের ভাষা বুঝেছিল? ২০১১ সালের তোহুকু ভূমিকম্প ও সুনামিতে ১৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। ওই একই উপকূলে, ওই পাথরগুলোর নিচেই তারা ঘর বানিয়েছিল। অতীতের বার্তা তাদের বাঁচাতে পারেনি।

২০১১ সালের তোহুকু ভূমিকম্প ও সুনামিতে ১৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়
ছবি: ক্যাথরিন মুলার, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস

তবে সব বার্তা ব্যর্থ হয় না। ১৮৫০ সালে জেমস ফ্রান্সিস নামে এক প্রকৌশলী আমেরিকার লোয়েল শহরে একটি বাঁধ বানিয়েছিলেন। স্থানীয়রা একে বলত ফ্রান্সিসের বোকামি। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, মেরিম্যাক নদী একদিন এই শহর ভাসিয়ে দেবে। তাই তিনি বিশাল এক গেট তৈরি করে লোহার শিকল দিয়ে ঝুলিয়ে রাখলেন। গেটটা এত ভারী ছিল যে, নামানোর কোনো যন্ত্র ছিল না। ১৮৫২ সালে সত্যি সত্যি বন্যা এল। এক শ্রমিক হাতুড়ি দিয়ে শিকল কেটে গেট ফেলে শহর বাঁচাল। ফ্রান্সিস নায়ক বনে গেলেন।

গল্প এখানেই শেষ নয়। ১৯৩৬ সালে এল আরও বড় বন্যা। তখন আর ফ্রান্সিস বেঁচে নেই। কিন্তু শহরের মানুষের মনে ছিল সেই বিশাল গেটের কথা। তারা দৌড়ে গেল গেটহাউসে। কিন্তু চাবি নেই! দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখল একটা হাতুড়ি ঝুলছে। তার ওপরে লেখা, ‘হাতুড়ি নাও। পিনে আঘাত করো।’ মানুষ ঠিক তা-ই করল। শিকল ছিঁড়ে গেট পড়ল। শহর আবার বাঁচল। ফ্রান্সিস ভবিষ্যতের মানুষের জন্য যে বার্তা রেখে গিয়েছিলেন, তা সফল হয়েছিল।

আরও পড়ুন
১৮৫০ সালে জেমস ফ্রান্সিস নামে এক প্রকৌশলী আমেরিকার লোয়েল শহরে একটি বাঁধ বানিয়েছিলেন। স্থানীয়রা একে বলত ফ্রান্সিসের বোকামি।

তিন

ভবিষ্যতের কাছে বার্তা পাঠানোর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টটি মানুষ করেছে পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে। ১৯৭৭ সালে নাসা মহাকাশে পাঠায় দুটি মহাকাশযান, ভয়েজার ১ এবং ভয়েজার ২। এই যানগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল সৌরজগৎ নিয়ে গবেষণা। কিন্তু বিজ্ঞানী কার্ল সাগান ও তাঁর দল একে বানিয়ে ফেললেন অনন্ত নক্ষত্রবীথির উদ্দেশে পাঠানো এক বার্তা।

উভয় মহাকাশযানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ১২ ইঞ্চির একটি সোনালি রেকর্ড। এটি তামার তৈরি, কিন্তু মহাকাশের বিরূপ পরিবেশে কোটি বছর টিকে থাকার জন্য এর ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। কোনো দিন ভিনগ্রহের কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী যদি এটি খুঁজে পায়, তাহলে তারা এই সোনালি রেকর্ডের মাধ্যমে জানতে পারবে বিংশ শতাব্দীর পৃথিবীর কথা।

ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ডের প্রচ্ছদ
ছবি: উইকিপিডিয়া

কী আছে এই রেকর্ডে? এতে এনকোড করা আছে পৃথিবীর ১১৫টি ছবি, সমুদ্রের গর্জন, পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ এবং নীল তিমির গান। আছে মোৎসার্ট, বাখ ও বিটোফেনের সুর থেকে শুরু করে রক এন রোলের রাজা চাক বেরির গান ‘জনি বি. গুড’। ৫৫টি ভাষায় রেকর্ড করা হয়েছে সম্ভাষণ। এমনকি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের একটি বার্তাও এতে খোদাই করা আছে।

পাশাপাশি এতে রেকর্ড করা আছে কার্ল সাগানের স্ত্রী অ্যান ড্রুয়ানের মস্তিষ্কের তরঙ্গ। রেকর্ড করার সময় তিনি ভাবছিলেন পৃথিবীর ইতিহাস, সভ্যতার সংকট এবং ভালোবাসার অনুভূতির কথা। ফলে কোনো এলিয়েন যদি এটি ডিকোড করতে পারে, তবে তারা শুধু তথ্য পাবে না, হয়তো মানুষের ভালোবাসার স্পন্দনও অনুভব করতে পারবে। রেকর্ডটির ওপরের কাভারে খোদাই করা আছে এটি বাজানোর বৈজ্ঞানিক নির্দেশাবলি। বর্তমানে ভয়েজার ১ সৌরজগৎ পেরিয়ে আন্তঃনক্ষত্র স্থান বা ইন্টারস্টেলার স্পেসে পাড়ি জমিয়েছে। এটি এখন পর্যন্ত মানুষের পাঠানো সবচেয়ে দূরের বার্তা, হয়তো কোটি বছর পরও টিকে থাকবে।

আরও পড়ুন
উভয় মহাকাশযানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ১২ ইঞ্চির একটি সোনালি রেকর্ড। এটি তামার তৈরি, কিন্তু মহাকাশের বিরূপ পরিবেশে কোটি বছর টিকে থাকার জন্য এর ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।

চার

১৯৯৬ সালে সান ফ্রান্সিসকোতে একদল প্রযুক্তিপ্রেমী ভবিষ্যতের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। একটি ইন্টারনেট আর্কাইভ। এর প্রতিষ্ঠাতা ব্রুস্টার কাহলে দেখলেন, ডিজিটাল তথ্য কাগজের চেয়েও দ্রুত নষ্ট হয়। হার্ড ড্রাইভ ক্র্যাশ করে, ফ্লপি ডিস্ক নষ্ট হয়, এবং এক ক্লিকেই ডিলিট হয়ে যায় হাজার বছরের ইতিহাস। তাই তিনি চাইলেন সব কিছু সেভ করে রাখতে। ওয়েবসাইটের পর ওয়েবসাইট জমা হতে লাগল তাঁর আর্কাইভে।

অন্যটি লং নাও ফাউন্ডেশন। এদের দর্শন ছিল ভিন্ন। এরা সব কিছু সেভ করতে চায় না, কিন্তু যা সেভ করবে তা যেন হাজার বছর টেকে, তা নিশ্চিত করতে চায়। তাদের প্রতিষ্ঠাতা স্টুয়ার্ট ব্র্যান্ড এমন সব মাধ্যম খুঁজছিলেন, যা এসব তথ্য হাজার বছর টিকিয়ে রাখতে পারে। তারা একটি বিশাল ঘড়ি বানাচ্ছে, যা ১০ হাজার বছর চলবে। কিন্তু তাদের আরও চমকপ্রদ প্রজেক্টের নাম রোজেটা প্রজেক্ট।

লং নাও ফাউন্ডেশন একটি বিশাল ঘড়ি বানাচ্ছে, যা ১০ হাজার বছর চলবে
ছবি: লাইব্রেরি অব দ্য সায়েন্স মিউজিয়াম লন্ডন

ডিজিটাল দুনিয়ার বিপদ এখন আমরা টের পাচ্ছি। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক দশক আগের এক-তৃতীয়াংশ ওয়েবপেজ এখন আর খোলে না। সিডি বা ডিভিডি ১০০ বছর টেকার কথা থাকলেও লেজার রটের কারণে তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গবেষক জিওফ বোকার বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় জিনিস জমিয়ে রাখলে আসল জিনিসটাই হারিয়ে যায়। ভালো আর্কাইভিস্টের কাজ হলো প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারা।’

আরও পড়ুন
ইন্টারনেট আর্কাইভের প্রতিষ্ঠাতা ব্রুস্টার কাহলে দেখলেন, ডিজিটাল তথ্য কাগজের চেয়েও দ্রুত নষ্ট হয়। হার্ড ড্রাইভ ক্র্যাশ করে, ফ্লপি ডিস্ক নষ্ট হয়, এবং এক ক্লিকেই ডিলিট হয়ে যায় হাজার বছরের ইতিহাস।

শুধু তথ্য বা সংস্কৃতি নয়, মানুষ ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছে প্রাণের স্পন্দনও। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ নরওয়ের সভালবার্ড দ্বীপে অবস্থিত গ্লোবাল সিড ভল্ট। উত্তর মেরু থেকে মাত্র ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরে, জনমানবহীন এক বরফশীতল পাহাড়ের ১৫০ মিটার গভীরে এই ভল্টটি তৈরি করা হয়েছে। ২০০৮ সালে চালু হওয়া এই সংরক্ষণাগারকে বলা হয় ডুমসডে ভল্ট।

ডুমসডে ভল্ট
ছবি: নর্ডজেন

এর উদ্দেশ্য, পৃথিবীজুড়ে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি কোনো ফসল হারিয়ে যায়, তবে এখান থেকে তার বীজ নিয়ে পুনরায় চাষাবাদ শুরু করা যাবে। একে বলা হয় ব্যাকআপের ব্যাকআপ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জিন ব্যাংকগুলোতে যেসব বীজ সংরক্ষিত আছে, তার এক কপি এখানে জমা থাকে। তাপমাত্রা থাকে সবসময় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমনকি বিদ্যুৎ চলে গেলেও প্রাকৃতিকভাবেই এখানকার স্থায়ী বরফ বীজগুলোকে শত শত বছর অক্ষত রাখবে।

বর্তমানে এখানে প্রায় ১৩ লাখেরও বেশি ভিন্ন ভিন্ন ফসলের বীজ সংরক্ষিত আছে। এর কার্যকারিতা প্রমাণ হয়েছে ২০১৫ সালে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে আলেপ্পোর জিন ব্যাংক ধ্বংস হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সভালবার্ড ভল্ট থেকে বীজ নিয়েছিলেন। অর্থাৎ, ভবিষ্যতের জন্য জমানো এই আমানত ইতিমধ্যেই বর্তমানকে বাঁচাতে শুরু করেছে। এটি এমন এক বার্তা, যা কোনো কাগজে লেখা নেই, বরং সুপ্ত আছে প্রতিটি বীজের ভ্রূণে।

আরও পড়ুন
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জিন ব্যাংকগুলোতে যেসব বীজ সংরক্ষিত আছে, তার এক কপি ডুমসডে ভল্টে জমা থাকে। তাপমাত্রা থাকে সবসময় মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

পাঁচ

লং নাও ফাউন্ডেশন কথা আগেই বলেছি। তারা সবার আগে ভাষা সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিল। কারণ ভাষা হারিয়ে গেলে সব জ্ঞানই অর্থহীন। কিন্তু কোথায় রাখবে ভাষা? কাগজ বা সিডি তো টিকবে না। পাথর বা সিরামিক ভেঙে যেতে পারে। তাই তারা বেছে নিল নিকেল। সিলিকন ডিস্কে তথ্য খোদাই করে নিকেলের প্রলেপ দেওয়া হলো।

এই ডিস্কে এমন কোনো ডিজিটাল কোড নেই, যা পড়তে মাইক্রোস্কোপ লাগবে। তারা এমনভাবে তথ্য রেখেছে, যা মানুষের খালি চোখেই পড়া যায়। নেপোলিয়নের সৈন্যরা যখন রোজেটা স্টোন পেয়েছিল, তারা দেখেই বুঝেছিল এটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ১০০০ বছর পর কেউ যদি একটা সিডি পায়, সে হয়তো ওটা গলায় ঝুলিয়ে ঘুরবে! তারা কীভাবে বুঝবে যে এটা আমাদের জন্য অতীতের মানুষেরা রেখে গেছে?

রোজেটা স্টোন
ছবি: বিঙ্কস / লিংকন স্মিথ / ফ্লিকার

২০২৪ সালে লং নাও-এর এই লাইব্রেরি একটি রকেটে করে চাঁদে পাঠানো হয়েছে। সেখানে আছে ৭ হাজার ভাষার নমুনা, পুরো উইকিপিডিয়া, হাজার হাজার বই, এমনকি জাদুকর ডেভিড কপারফিল্ডের জাদুর গোপন রহস্যও! চাঁদের আবহাওয়াহীন পরিবেশে এটি অনন্তকাল টিকে থাকবে।

অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন প্রকৃতির সবচেয়ে সেরা স্টোরেজ মিডিয়াম ডিএনএর কথা। এক গ্রাম ডিএনএতে লাখ লাখ টেরাবাইট তথ্য রাখা সম্ভব। আমরা নিজেরাই তো আসলে একেকটা জীবন্ত আর্কাইভ। আমাদের ডিএনএতে লেখা আছে পৃথিবীর ইতিহাসের প্রতিটি লড়াইয়ের গল্প। সমস্যা হলো, এই ভাষা পড়ার বা লেখার প্রযুক্তি এখনো খুব একটা সহজলভ্য বা নিখুঁত নয়।

এক গ্রাম ডিএনএতে লাখ লাখ টেরাবাইট তথ্য রাখা সম্ভব
ছবি: মিডিয়াম

ভবিষ্যতের জন্য কোনো বার্তা রেখে যাওয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মেটাডেটা। অর্থাৎ, বার্তাটি কীভাবে পড়তে হবে, তার নির্দেশনা। ধরুন, আমরা মাটির গভীরে পারমাণবিক বর্জ্য পুঁতে রাখলাম। ১০ হাজার বছর পর যারা আসবে, তাদের কীভাবে বোঝাব যে এই জায়গাটা বিপজ্জনক? এখানে খুঁড়ো না? ৯০-এর দশকে স্যান্ডিয়া ল্যাবরেটরিজ প্রস্তাব দিয়েছিল, ওখানে ভয়ংকর সব কার্টুন রাখতে এবং বড় বড় করে লিখে রাখতে, ‘এটা কোনো সম্মানের জায়গা নয়...এখানে কোনো গুপ্তধন নেই...’। কিন্তু আপনি যদি কোনো বাক্সের গায়ে লিখে দেন—খুলো না, বিপদ আছে—তবে চোর সবার আগে ওটাই খুলবে। সে ভাববে ভেতরে নিশ্চয়ই সোনা আছে!

আরও পড়ুন
২০২৪ সালে লং নাও-এর লাইব্রেরি একটি রকেটে করে চাঁদে পাঠানো হয়েছে। সেখানে আছে ৭ হাজার ভাষার নমুনা, পুরো উইকিপিডিয়া এবং হাজার হাজার বই।

ছয়

এবার ফিরে আসি অ্যাডামের দাদির সেই লাইব্রেরিতে। ওই বইগুলোর স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তাঁর মাথায় এল, দাদির শেষ বার্তাটা আসলে নিজের জন্য ছিল না, ছিল অ্যাডামের জন্য। তিনি দেখলেন, দাদি যেভাবে তথ্য সাজাতেন, অ্যাডামও অবচেতনভাবে ঠিক সেভাবেই আর্কাইভ সাজিয়েছে। তিনি চিৎকার করে স্ত্রীকে বললেন, ‘ওহ! এ জন্যই আমি এমন করি!’

স্ত্রী ধুলো মুছতে মুছতে বলেছিল, ‘এতদিনে বুঝলে?’

ভবিষ্যতের জন্য পাঠানো হাজারো বার্তার মতো এই বার্তাটিও হয়তো পথ হারিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঠিকই তার প্রাপককে খুঁজে পেয়েছে। দাদির লাইব্রেরি থেকে নিজের জন্য কিছু বই বেছে নিলেন অ্যাডাম। এখন ভাবছেন, এগুলো তাঁর শেলফের কোথায় সাজিয়ে রাখবেন।

সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের অ্যাডাম রজার্সের ‘হাউ টু সেন্ড আ ম্যাসেজ টু ফিউচার সিভিলাইজেশন’ অবলম্বনে

আরও পড়ুন