৩৫০ বছরের গাণিতিক ধাঁধা মাত্র ১১ দিনে সমাধান করল এআই
১৬৩৭ সাল। ফ্রান্সের এক শৌখিন গণিতবিদ আরেক প্রাচীন গ্রিক গণিতবিদ ডায়োফ্যান্টাসের অ্যারিথমেটিকা বইটি পড়ছিলেন। তিনি পেশায় একজন বিচারকও বটে। পড়তে পড়তে বইয়ের পাতার একেবারে কোনায় তিনি একটি ছোট্ট নোট লিখলেন। সেখানে একটি সমীকরণের কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করলেন, ‘আমি এই সমীকরণের সত্যিকারের চমৎকার একটি প্রমাণ পেয়েছি, কিন্তু বইয়ের মার্জিনে জায়গা এতই কম যে সেটা আর বিস্তারিত লিখতে পারলাম না।’
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রসিকতা হয়তো এটাই! মার্জিনে জায়গা না থাকার ওই একটা নির্দোষ অজুহাতের কারণে পৃথিবীর বাঘা বাঘা গণিতবিদদের পরের সাড়ে তিন শ বছর এর সমাধান করতে ঘাম ছুটে গিয়েছিল। শত শত বছর ধরে কত মানুষের জীবন-যৌবন কেটে গেছে ওই এক লাইনের প্রমাণের খোঁজে!
যে মানুষটি এই রসিকতা করেছিলেন, তাঁর নাম পিয়েরে দ্য ফার্মা। তাঁর দেওয়া ছোট্ট সমস্যাটি আমাদের কাছে পরিচিত ফার্মার শেষ উপপাদ্য নামে। ফার্মার সেই উপপাদ্য প্রমাণ করা হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন শ বছর পর। আর আজ?
এআই এজেন্টের সেই প্রমাণ বের করতে লেগেছে মাত্র ১১ দিন!
ফার্মা তাঁর বইয়ের মার্জিনে লিখেছিলেন, এই বর্গের জায়গায়, মানে পাওয়ার ২-এর জায়গায় যদি ২-এর চেয়ে বড় যেকোনো পূর্ণসংখ্যা বসানো হয়, তবে সমীকরণটি আর কখনো মিলবে না।
ফার্মার শেষ উপপাদ্যে কী ছিল
স্কুলে পিথাগোরাসের উপপাদ্য নিশ্চয়ই পড়েছেন? ওই যে, সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র—অতিভুজের বর্গ = অপর দুই বাহুর বর্গের যোগফল। সূত্র আকারে লিখলে হবে এমন: a2 + b2 = c2। মানে, এমন কিছু পূর্ণসংখ্যা আছে, যাদের দুটির বর্গের যোগফল তৃতীয়টির বর্গের সমান। যেমন: ৩, ৪ এবং ৫। দেখুন, ৩২ + ৪২ = ৫২। অর্থাৎ, ৯ + ১৬ = ২৫ বা ২৫ = ২৫। গণিতের ভাষায় এগুলোকে বলা হয় পিথাগোরিয়ান ট্রিপল।
ফার্মা তাঁর বইয়ের মার্জিনে লিখেছিলেন, এই বর্গের জায়গায়, মানে পাওয়ার ২-এর জায়গায় যদি ২-এর চেয়ে বড় যেকোনো পূর্ণসংখ্যা বসানো হয়, তবে সমীকরণটি আর কখনো মিলবে না। অর্থাৎ, an + bn = cn সমীকরণে n-এর মান যদি ২-এর চেয়ে বড় কোনো পূর্ণসংখ্যা হয়, তবে a, b এবং c-এর এমন কোনো পূর্ণসংখ্যার মানই আপনি খুঁজে পাবেন না, যা দিয়ে এই সমীকরণটি মেলানো যায়।
শুনতে তো একেবারে ডালভাত মনে হচ্ছে, তাই না? ফার্মা নিজেও তো বলেছিলেন প্রমাণটা সোজা, শুধু মার্জিনে জায়গা নেই! কিন্তু এই ডালভাত প্রমাণ করতে গিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গণিতবিদদের দাঁত ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এই অমীমাংসিত ধাঁধাটিই ইতিহাসে ফার্মার শেষ উপপাদ্য নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এর পেছনে সময় দেন অনেক বিখ্যাত গণিতবিদ। কিন্তু প্রায় সবাই ব্যর্থ হন।
an + bn = cn সমীকরণে n-এর মান যদি ২-এর চেয়ে বড় কোনো পূর্ণসংখ্যা হয়, তবে a, b এবং c-এর এমন কোনো পূর্ণসংখ্যার মানই আপনি খুঁজে পাবেন না, যা দিয়ে এই সমীকরণটি মেলানো যায়।
অ্যান্ড্রু ওয়াইলসের ৭ বছরের গোপন সাধনা
শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যায়, কিন্তু ফার্মার শেষ উপপাদ্য আর কেউ প্রমাণ করতে পারেন না। অবশেষে দৃশ্যপটে আসেন ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যান্ড্রু ওয়াইলস। ছোটবেলায় লাইব্রেরিতে এই ধাঁধার কথা পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে তিনি নিজের বাড়ির চিলেকোঠায় লোকচক্ষুর আড়ালে একাকী গবেষণা শুরু করেন। টানা সাত বছর তিনি বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু এই একটি সমীকরণ নিয়ে মেতে ছিলেন।
১৯৯৩ সালে তিনি যখন ঘোষণা দিলেন যে তিনি ফার্মার উপপাদ্য প্রমাণ করে ফেলেছেন, পুরো বিশ্বে যেন বোমা ফাটল! কিন্তু গণিতের দুনিয়া বড়ই নির্মম। প্রমাণ মানেই নিখুঁত লজিকের পর লজিক সাজিয়ে তৈরি করা এক বিশাল ইমারত।
ওয়াইলসের ১০০ পৃষ্ঠার সেই প্রমাণ পরীক্ষা করতে গিয়ে অন্য গণিতবিদেরা প্রমাণের মাঝখানে ছোট্ট একটা ভুল ধরে বসলেন। ওই এক ভুলের কারণে পুরো প্রমাণটাই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার জোগাড় হলো।
অন্য কেউ হলে হয়তো হাল ছেড়ে দিতেন। কিন্তু ওয়াইলস হাল ছাড়লেন না। নিজের সহযোগী রিচার্ড টেইলরকে সঙ্গে নিয়ে আরও এক বছর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ১৯৯৪ সালে তিনি সেই ভুল শুধরে ফেললেন। ১৯৯৫ সালে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হলো ফার্মার শেষ উপপাদ্য। অবশেষে মানুষ জয় করল ৩৫০ বছরের সেই অভিশাপ।
১৯৮৬ সালে ওয়াইলস নিজের বাড়ির চিলেকোঠায় লোকচক্ষুর আড়ালে একাকী গবেষণা শুরু করেন। টানা সাত বছর তিনি বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু এই সমীকরণ নিয়ে মেতে ছিলেন।
মানুষের যেখানে শেষ, এআইয়ের সেখানে শুরু
ভাবতে পারেন, মানুষ যখন ১৯৯৫ সালে এটা প্রমাণ করেই ফেলেছে, তাহলে এখন আবার এআইয়ের দরকার পড়ল কেন? আসলে মানুষ মাত্রই ভুল। ওয়াইলস যে প্রমাণ করেছেন, তাতে কোনো ভুল আছে কিনা, তা যাচাইয়ের জন্যই এই পরীক্ষা। ওয়াইলস নিজেই তো একবার ভুল করেছিলেন। তা ছাড়া ওয়াইলসের ১০০ পৃষ্ঠার দীর্ঘ যুক্তির প্রমাণটি এতই জটিল যে, পৃথিবীর খুব কম মানুষই তা পড়ে পুরোপুরি বুঝতে পারেন। তাই ওয়াইলসের প্রমাণের মাঝে আসলেই আর কোনো সূক্ষ্ম ফাঁক আছে কিনা, তা যাচাই করতেই এআইয়ের সাহায্যে আবার ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করা হলো।
বিষয়টাকে একটু অন্যভাবেও ভাবতে পারেন। এই প্রমাণের সাহায্যে এআইয়ের সক্ষমতাও প্রমাণ করা যাবে। এআই এজেন্ট আসলে ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করতে পারে কিনা, তাও বোঝা গেল।
এআই এজেন্টের সাহায্যে এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে গাণিতিক উপপাদ্যকে কম্পিউটার কোডে রূপান্তর করে। খাতা-কলমের অঙ্ককে যদি আপনি মেশিনের ভাষায়, বিশেষ করে ‘লীন’ নামে একটি প্রোগ্রামিং ভাষায় রূপান্তরিত করতে পারেন, তবে কম্পিউটার লজিকের পর লজিক মেলাতে মেলাতে কোনো মানুষের আবেগ বা ক্লান্তি ছাড়াই বলে দিতে পারবে এতে কোনো ভুল আছে কি না।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের গণিতবিদ কেভিন বাজার্ড ঠিক এই কাজটিই শুরু করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল আগামী পাঁচ বছর ধরে অ্যান্ড্রু ওয়াইলস ও টেইলরের সেই ১০০ পৃষ্ঠার প্রমাণটিকে ‘লীন’ ভাষায় কোড করে পুরোপুরি ফরম্যালাইজ করা, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রমাণকে ভিত্তি করে আরও গবেষণা করা যায়। এর জন্য তিনি এআই বিশেষজ্ঞ এবং গণিতবিদদের নিয়ে একটি বড় সম্মেলনও করেছিলেন।
ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যান্ড্রু ওয়াইলসের প্রমাণের মাঝে আসলেই আর কোনো সূক্ষ্ম ফাঁক আছে কিনা, তা যাচাই করতেই এআইয়ের সাহায্যে আবার ফার্মার শেষ উপপাদ্য প্রমাণ করা হলো।
ক্লডের ১১ দিনের মহাকাব্য
বাজার্ডের সেই পাঁচ বছরের পরিকল্পনাকে রীতিমতো জাদুঘরে পাঠিয়ে দিল অ্যানথ্রপিক নামে এআই কোম্পানি। কোম্পানিটি জানাল, তাদের এআই মডেল ক্লড টানা ১১ দিন ধরে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে ফার্মার শেষ উপপাদ্যের ফরম্যালাইজেশনের কাজ শেষ করে ফেলেছে! যেখানে আগে ম্যাথলিব নামে সেন্ট্রাল ডেটাবেজে সারা পৃথিবীর গণিতবিদদের বহু বছরের পরিশ্রমে মাত্র ২০ লাখ লাইনের ফরম্যালাইজড ম্যাথ জমা ছিল, সেখানে ক্লড একা এই একটি প্রমাণের জন্যই লিখেছে ১ কোটি ৩০ লাখ লাইনের লীন কোড!
এর জন্য ক্লডকে প্রায় ২৯ হাজার ৫০০টি ছোট ছোট মধ্যবর্তী উপপাদ্য ধাপে ধাপে প্রমাণ করতে হয়েছে। এটি শুধু ম্যাথলিবের আগের সব কাজের পাঁচ গুণেরও বেশি নয়, বরং লীন ভাষায় লেখা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গাণিতিক প্রমাণ।
সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ব্যাপার হলো, এই কাজটা কোনো একক এআই মডেল একা করেনি। অ্যানথ্রপিকের অসংখ্য আলাদা আলাদা ‘এআই এজেন্ট’ নিজেদের মধ্যে মানুষের মতো কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। কেউ উপপাদ্যের একটা অংশ ধরেছে, তো অন্য এজেন্ট আরেকটা অংশ নিয়ে কাজ করেছে।
অ্যানথ্রপিক নামে এআই কোম্পানিটি জানাল, তাদের এআই মডেল ক্লড টানা ১১ দিন ধরে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে ফার্মার শেষ উপপাদ্যের ফরম্যালাইজেশনের কাজ শেষ করে ফেলেছে!
মজার ব্যাপার হলো, মাঝেমধ্যে ঠিক অফিসের কনফিউজড কর্মচারীদের মতোই এই এআই এজেন্টরাও খেই হারিয়ে ফেলত! তারা প্রজেক্টের ট্র্যাক হারিয়ে ফেলত এবং নিজেদের মধ্যে ঠিকমতো কোলাবোরেশন বা সহযোগিতা করতে পারত না। তখন মানুষের গাণিতিক গবেষণার জন্য তৈরি ‘প্রুভটুমি’ (Prove2Me) নামের একটি কোলাবোরেশন টুলের সাহায্য নেওয়া হয়। এই টুলের সাহায্যে এআই এজেন্টরা আবার বুঝতে শেখে, কে কোন কাজটা করেছে এবং এর পরের কাজটা কী হওয়া উচিত।
অবশ্য পুরোটা সময় মানুষের ভূমিকা যে একেবারে ছিল না, তা নয়। মানব বিশেষজ্ঞরা মাঝে মাঝে হাই-লেভেল নির্দেশিকা দিয়ে এজেন্টদের ঠিক পথে রেখেছেন, যেন ওগুলো লাইনচ্যুত হয়ে না যায়। তবে মূল কাজটা এজেন্টরাই করেছে।
কেভিন বাজার্ড অ্যানথ্রপিকের এই ঘোষণায় বিন্দুমাত্র হতাশ হননি, বরং ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই প্রমাণের পর গণিতের চিরন্তন স্বতঃসিদ্ধ নিয়মগুলো ছাড়া আর কোনো অনুমানের ওপর ভরসা করতে হবে না।’
প্রুভটুমি টুলের সাহায্যে এআই এজেন্টরা আবার বুঝতে শেখে, কে কোন কাজটা করেছে এবং এর পরের কাজটা কী হওয়া উচিত। অবশ্য পুরোটা সময় মানুষের ভূমিকা যে একেবারে ছিল না, তা নয়।
বাজার্ডের মতে, ফার্মার উপপাদ্যের মতো এত জটিল একটা জিনিস যদি এআই এখন ফরম্যালাইজ করতে পারে, তবে আধুনিক গাণিতিক সাহিত্যের পুরোটাকেই মেশিনের ভাষায় রূপান্তর করার পথে আমরা এক বিশাল ধাপ পেরিয়ে গেলাম। এখন এআইয়ের এই শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ নতুন নতুন গাণিতিক রহস্যের সমাধান করতে পারবে।
সাড়ে তিন শ বছর আগে একজন ফরাসি বিচারক বইয়ের মার্জিনে জায়গা না থাকার অজুহাতে যে ফাঁদ পেতেছিলেন, তা পার হতে মানবজাতির লেগেছিল তিন শতাব্দীরও বেশি সময়। পৃথিবীর সেরা মেধাগুলো রাতের পর রাত চেষ্টা করে গেছেন সেই হেঁয়ালির সমাধান করতে। এখন সিলিকন চিপ আর অ্যালগরিদমের তৈরি কৃত্রিম মস্তিষ্ক সেই একই ধাঁধার চূড়ান্ত সিলমোহর দিয়ে দিল মাত্র ১১ দিনে!
গণিত সব সময়ই ছিল মানুষের মেধা, কল্পনা এবং শিল্পের চূড়ান্ত প্রকাশ। এআই আজ হয়তো মানুষের সেই আবিষ্কারকে নিঁখুতভাবে প্রমাণ করে দিল, কিন্তু আগামীতে যখন এআই নিজেই নতুন নতুন উপপাদ্য আবিষ্কার করতে শুরু করবে, তখন কি গণিতের সেই মানবিক সৌন্দর্যটুকু আর থাকবে? নাকি মানুষের মস্তিষ্ক ও মেশিনের লজিক মিলে গণিতের দুনিয়ায় এমন এক নতুন যুগের সূচনা করবে, যা আমরা এখনো কল্পনাই করতে পারছি না!
