ধারাবাহিক
দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ৬
মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।
অধ্যায় এক
মন্দিরের স্নিগ্ধ ছায়ায়
খুব অল্প বয়সে কাঙ্গায়ন প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় ইংরেজি শিখতে শুরু করেছিলেন রামানুজন। ১৮৯৭ সালের নভেম্বর মাসে দশ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি প্রাথমিক পরীক্ষায় পাস করেন। ইংরেজি, তামিল, পাটিগণিত এবং ভূগোলে তিনি শুধু পাসই করেননি, পুরো জেলায় প্রথম হয়েছিলেন। পরের বছর জানুয়ারিতে ভর্তি হন ইংরেজি মাধ্যমের টাউন হাই স্কুলে।
টাউন হাই স্কুলের শুরু হয়েছিল ১৮৬৪ সালে, শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিগ স্ট্রিটের ওপর দুটি বাড়িতে। কয়েক বছর পর স্থানীয় কলেজ যখন তাদের নিচের ক্লাসগুলো বন্ধ করে দেয়, তখন একদল সমাজসচেতন নাগরিক সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য এগিয়ে আসেন। তাঁরা টাউন হাই স্কুলকে বড় করার উদ্যোগ নেন। পরিকল্পনা ছিল পুরোনো দালান ভেঙে নতুন দালান করা হবে।
কিন্তু স্কুল ম্যানেজিং কমিটির এক প্রভাবশালী সদস্য বাঁধা দিলেন। তা অবশ্য ভালোর জন্যই। তার নাম থাম্বুস্বামী মুদালিয়ার। বিশাল গোঁফওয়ালা এই ব্যক্তি বললেন, আবার নতুন করে শুরু করা যাক। তিনি স্কুলের নতুন ক্যাম্পাসের জন্য সাত একর জমি দান করলেন। আগে সেখানে ছিল কলার বাগান। তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রথম ভবনগুলোর সেই নির্মাণকাজ তদারকি করলেন।
বর্তমানে টাউন হাই স্কুল এক চমৎকার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। সাদা রঙের সুন্দর ভবন, সামনে বালুময় মাঠ। বাইরের রাস্তার কোলাহল থেকে স্কুলটিকে আলাদা করে রেখেছে নিমগাছের সারি, যেন এক শান্তির মরুদ্যান। কিন্তু রামানুজন যখন সেখানে পড়তেন, তখন দৃশ্যটা একটু অন্যরকম ছিল। লাল রঙের মাটির টালির ছাদ আর তালপাতার ছাউনি দেওয়া বারান্দাওলা ক্লাসরুমগুলো তখন মাত্র তৈরি হয়েছে। লম্বালম্বিভাবে একটার পর একটা ক্লাসরুম সাজানো ছিল। দুপাশের জানালা দিয়ে যাতে বাতাস যাতায়াত করতে পারে, তাই এমন ব্যবস্থা।
রামানুজন যখন টাউন হাই স্কুলে পড়তেন, তখন দৃশ্যটা একটু অন্যরকম ছিল। লাল রঙের মাটির টালির ছাদ আর তালপাতার ছাউনি দেওয়া বারান্দাওলা ক্লাসরুমগুলো তখন মাত্র তৈরি হয়েছে।
অবশ্য ওই জানালা দিয়ে কিশোরদের হইচইও শোনার কথা ছিল, কিন্তু সম্ভবত সেখানে তেমন কিছু খুব একটা হতো না। বহু বছর পর এক প্রাক্তন ছাত্র স্মৃতিচারণ করেছিলেন সেসব দিনের কথা। শিক্ষকদের লম্বা কোট, মাথায় পাগড়ি, আর ছাত্রদের মনে তাঁদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধার কথা। রামানুজনের সময়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন এস. কৃষ্ণস্বামী আইয়ার। তিনি ছিলেন গম্ভীর ধরনের মানুষ। মোট ২২ বছর তিনি এই পদে ছিলেন। হুটহাট ক্লাসের মাঝখানে চলে আসতেন। তাঁর হাতের ছড়ির ঠকঠক শব্দ শুনলেই ছাত্র-শিক্ষক সবাই তটস্থ হয়ে যেতেন।
কখনো তিনি ক্লাসে ঢুকে শিক্ষকের কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে নিজেই পড়াতে শুরু করতেন, ছাত্রদের প্রশ্ন করতেন। তাঁর পড়ানোর ভঙ্গি এতই চমৎকার ছিল যে, তিনি যখন কবি গ্রে’র ইটন কলেজ কবিতাটি পড়াচ্ছিলেন, তখন এক ছাত্র কল্পনায় টাউন হাই স্কুলকেই ইটন কলেজ এবং ক্যাম্পাসের মাঝখান দিয়ে যাওয়া সেচ খালটিকে টেমস নদী ভেবে বসেছিল!
রামানুজনের বাড়ি থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথের এই স্কুলটি ছিল কুম্বকোনমের মেধাবী ছাত্রদের মিলনমেলা। এখান থেকেই তারা কলেজ ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াত। এখানে ছয়টি বছর কাটিয়েছিলেন রামানুজন। এটিই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুখকর শিক্ষাজীবন!
বিখ্যাত মানুষের ছেলেবেলার যেকোনো সাধারণ ঘটনাকেই আমরা অনেক সময় ভবিষ্যতের মহানায়ক হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখি। কিন্তু রামানুজনের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছিল। তাঁর প্রতিভা সত্যিই খুব অল্প বয়সে বোঝা যাচ্ছিল। দশ বছর বয়সে তিনি টাউন হাই স্কুলের ফার্স্ট ফর্মে (আমেরিকান গ্রেড সেভেনের সমতুল্য) ভর্তি হন। কিন্তু সেকেন্ড ফর্মে ওঠার আগেই দেখা গেল, তাঁর সহপাঠীরা গণিতের সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁর কাছে আসছে।
রামানুজনের সময়ে প্রধান শিক্ষক ছিলেন এস. কৃষ্ণস্বামী আইয়ার। তিনি ছিলেন গম্ভীর ধরনের মানুষ। মোট ২২ বছর তিনি এই পদে ছিলেন। হুটহাট ক্লাসের মাঝখানে চলে আসতেন।
শিগগিরই, সম্ভবত থার্ড ফর্মে পড়ার সময় তিনি শিক্ষকদেরও চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করলেন। একদিন গণিত শিক্ষক ক্লাসে বোঝাচ্ছিলেন, যেকোনো সংখ্যাকে সেই সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ফলাফল হয় ১। তিনি উদাহরণ দিয়ে বললেন, ‘তিনটি ফল যদি তিনজনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে প্রত্যেকে একটি করে পাবে। হাজারটি ফল হাজার জনের মধ্যে ভাগ করলেও প্রত্যেকে একটি করে পাবে।’ রামানুজন হুট করে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘স্যার, কিন্তু শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলেও কি উত্তর ১ হবে? যদি কোনো ফলই না থাকে এবং কোনো মানুষও না থাকে, তবুও কি প্রত্যেকে একটি করে পাবে?’
রামানুজনের পরিবারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। তাই তাঁরা প্রায়ই বাড়িতে ছাত্র রাখতেন। রামানুজনের বয়স যখন এগারো, তখন তাঁদের বাড়িতে দুজন ব্রাহ্মণ ছাত্র থাকত। একজন পাশের জেলা ত্রিচিনোপলি থেকে এসেছে, আরেকজন সুদূর দক্ষিণের তিরুনেলভেলি থেকে। তারা পাশের গভর্নমেন্ট কলেজে পড়ত। রামানুজনের গণিতের আগ্রহ দেখে তারা যা জানত, সব তাঁকে শেখাত।
কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই রামানুজন তাদের সব বিদ্যা শুষে নিলেন এবং কলেজের লাইব্রেরি থেকে আরও গণিতের বই এনে দেওয়ার জন্য তাদের বিরক্ত করতে লাগলেন। তারা যেসব বই এনে দিয়েছিল, তার মধ্যে ছিল এস. এল. লোনির ট্রিগনোমেট্রি। ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত এই বইটি দক্ষিণ ভারতের কলেজগুলোতে খুব জনপ্রিয় ছিল এবং এতে বেশ কিছু উচ্চতর গণিতের বিষয়ও ছিল। তেরো বছর বয়সের মধ্যেই রামানুজন বইটি পুরোপুরি আয়ত্ত করে ফেললেন।
তিনি তাঁর চেয়ে বড় এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করা শিখে নিলেন। ত্রিকোণমিতিক ফাংশনগুলোকে শুধু সমকোণী ত্রিভুজের বাহুর অনুপাত হিসেবে নয়, বরং অসীম ধারা হিসেবে বুঝতে শিখলেন। এই ধারা অনেক বেশি জটিল ও উন্নত ধারণা। পাই এবং e-এর মতো উচ্চতর গণিতের ট্রান্সসেন্ডেন্টাল সংখ্যাগুলোর মান তিনি দশমিকের পর যত ঘর খুশি গড়গড় করে বলে দিতে পারতেন। পরীক্ষার হলে তিনি নির্ধারিত সময়ের অর্ধেক সময়ের মধ্যেই খাতা জমা দিয়ে দিতেন। দুই ক্লাস ওপরে পড়া ছাত্ররা কঠিন কঠিন সব অঙ্ক নিয়ে তাঁর কাছে আসত, আর তিনি চোখের পলকে সেগুলোর সমাধান করে তাদের তাক লাগিয়ে দিতেন।
রামানুজন ত্রিকোণমিতিক ফাংশনগুলোকে শুধু সমকোণী ত্রিভুজের বাহুর অনুপাত হিসেবে নয়, বরং অসীম ধারা হিসেবে বুঝতে শিখলেন। এই ধারা অনেক বেশি জটিল ও উন্নত ধারণা।
মাঝেমধ্যে তাঁর এই ক্ষমতা স্কুলের কাজেও লাগত। স্কুলে প্রায় বারো শ ছাত্র এবং তিন ডজন শিক্ষক ছিলেন। কে কোন ক্লাসে যাবে, কোন শিক্ষকের রুটিন কী হবে, এসব ঠিক করা ছিল বিশাল ঝামেলার কাজ। স্কুলের সিনিয়র গণিত শিক্ষক গণপতি সুব্বিয়ার এই বিরক্তিকর কাজটা নিয়মিত রামানুজনকে দিয়ে করাতেন।
চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি যখন ফোর্থ ফর্মে পড়েন, তখন তাঁর কিছু সহপাঠী তাঁকে এমন একজন হিসেবে দেখতে শুরু করল, যার সঙ্গে কথা বলাই দায়। তিনি যেন অন্য কোনো গ্রহের মানুষ। তাঁর এক সহপাঠী পঞ্চাশ বছর পর স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘আমরা এমনকি শিক্ষকরাও তাঁকে খুব কমই বুঝত।’ হয়তো কিছু শিক্ষক তাঁর মেধা দেখে অস্বস্তিতে পড়তেন। কিন্তু স্কুলের বেশিরভাগ মানুষ—বুঝুক বা না বুঝুক—তাঁকে একধরনের শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ের চোখে দেখত!
তিনি স্কুলে ছোটখাটো তারকায় পরিণত হয়েছিলেন। স্কুলজীবনে মেধার স্বীকৃতি হিসেবে বহু সার্টিফিকেট এবং ইংরেজি কবিতার বই পুরস্কার পেয়েছিলেন রামানুজন। অবশেষে ১৯০৪ সালে এক অনুষ্ঠানে রামানুজনকে গণিতের জন্য কে. রঙ্গনাথ রাও পুরস্কার দেওয়ার সময় প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণস্বামী আইয়ার দর্শকদের সামনে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এই ছাত্রটিকে যদি সম্ভব হতো, তবে পূর্ণমানের চেয়েও বেশি নম্বর দিতাম।’ মানে ১০০-তে ১০০ দিয়ে তাঁকে মাপা যাবে না। রামানুজন ছিলেন এই হিসেবের বাইরে।
তবুও স্কুলের এই সময়টাতে রামানুজনের জীবন একটা ভারসাম্যের মধ্যে ছিল। স্কুল শেষে তিনি ছিলেন তাঁর মায়ের বাধ্য সন্তান, পড়াশোনায় ভালো। পরের বছর স্কলারশিপ নিয়ে শহরের অন্য প্রান্তের গভর্নমেন্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন...। সামনে উজ্জ্বল শিক্ষাজীবন, ক্যারিয়ার, বিয়ে...
কিন্তু খুব শিগগিরই সেই সাজানো ভারসাম্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। রামানুজন এমন এক নতুন জগতে প্রবেশ করবেন, এক মানসিক অস্থিরতা, বুদ্ধিবৃত্তিক নেশা এবং তীব্র একরোখা জেদের জগতে, যা নিয়ন্ত্রণ করবে তাঁর বাকি জীবন।
কারণ রামানুজনের যুক্তিবাদী মনের পাশেই বাস করত এক তীব্র অযৌক্তিক সত্তা। এই দিকটা কখনোই পুরোপুরি বুঝতে পারেননি তাঁর পশ্চিমা বন্ধুরা। কিন্তু রামানুজন নিজে এই সত্তার সঙ্গে খুব স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন এবং আনন্দের সঙ্গেই এর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।
