চার শ বছর আগের কথা। পৃথিবীতে তখন বিদ্যুৎ নেই, কম্পিউটার নেই, নেই কোনো সাধারণ ক্যালকুলেটরও। সে যুগের কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়তো রাতের পর রাত জেগে টেলিস্কোপে চোখ রেখে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান লিখে রাখছেন। কিন্তু সমস্যা বাঁধে পরের দিন সকালে! কারণ, মহাকাশের এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহের দূরত্ব তো আর দশ-বিশ কিলোমিটার নয়; লাখ লাখ বা কোটি কোটি কিলোমিটার! এই বিশাল বিশাল সংখ্যাগুলোর একটির সঙ্গে আরেকটি গুণ বা ভাগ করতে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে পড়ার জোগাড়। মাসের পর মাস হয়তো তিনি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শুধু গুণ ও ভাগ করছেন। এর মধ্যে যদি ঘুণাক্ষরেও কোনো একটা সংখ্যায় ছোট একটা ভুলও হয়ে যায়, তবে গত এক মাসের সব হিসাব বাতিল হয়ে যাবে। আবার শুরু করতে হবে প্রথম থেকে!
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর বিজ্ঞানীদের জন্য এই বিশাল গাণিতিক হিসাবগুলো ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক বিভীষিকা। বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম হারাম করা বিভীষিকা যিনি দূর করেছিলেন, তিনি কোনো পেশাদার গণিতবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের এক অভিজাত জমিদার! দুটি জাদুকরী আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি পুরো বিশ্বের হিসাব-নিকাশের ইতিহাস চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর একটি আবিষ্কারের নাম হলো লগারিদম, যা আমরা মাধ্যমিক স্কুলে শিখি। আর অন্যটির নাম শুনলে হয়তো একটু গা ছমছম করে উঠবে—নেপিয়ারের হাড়! হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, এই মহান গণিতবিদের নাম জন নেপিয়ার। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী।
বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম হারাম করা বিভীষিকা যিনি দূর করেছিলেন, তিনি কোনো পেশাদার গণিতবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের এক অভিজাত জমিদার জন নেপিয়ার।
দুই
জন নেপিয়ার ১৫৫০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্কটল্যান্ডের এডিনবরার মারচিস্টন ক্যাসেলে এক অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন স্কটল্যান্ডের লর্ড। তাই প্রথম দিকে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় বাড়িতেই। এরপর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটির সেন্ট সালভেটরস কলেজে।
সেখানে তিনি কত দিন ছিলেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, তিনি এরপর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েক বছর ভ্রমণ করেন এবং নতুন জ্ঞান অর্জন করেন। ১৫৭১ সালে আবারও নিজের দেশ স্কটল্যান্ডে ফিরে আসেন তিনি।
১৫৭২ সালে নেপিয়ার বিয়ে করেন ১৬ বছর বয়সী এলিজাবেথ স্টার্লিং নামে এক অভিজাত ঘরের মেয়েকে। এই দম্পতির দুটি সন্তান হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৫৭৯ সালে এলিজাবেথ মারা যান। এরপর নেপিয়ার অ্যাগনেস চিশোম নামে আরেক নারীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে আরও দশটি সন্তানের জন্ম হয়।
১৬০৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর নেপিয়ার সপরিবারে মারচিস্টন ক্যাসেলে চলে আসেন। জীবনের বাকি সময়টা এই দুর্গের মতো রাজপ্রাসাদেই কাটিয়ে দেন তিনি।
১৫৭২ সালে নেপিয়ার ১৬ বছর বয়সী এলিজাবেথ স্টার্লিং নামে এক অভিজাত ঘরের মেয়েকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির দুটি সন্তান হয়। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে ১৫৭৯ সালে এলিজাবেথ মারা যান।
তিন
গণিতে তাঁর অন্যতম আবিষ্কার লগারিদম। মাধ্যমিকের স্কুলে আমরা লগারিদমের সঙ্গে পরিচিত হই। অনেকেই লগারিদম দেখেই ভয় পায়। আমরা অনেক বন্ধুরা ভয়ে এই অধ্যায়ের অঙ্কই করত না। কিন্তু এই লগারিদম আবিষ্কারই করা হয়েছিল অঙ্কের ভয় কমানোর জন্য! সেই আবিষ্কারের কাহিনিটা আগে বলা যাক।
জন নেপিয়ার খেয়াল করলেন, বড় বড় সংখ্যার গুণ বা ভাগ করা দারুণ কষ্টকর। ধরুন, আপনাকে ১০০০০০-এর সঙ্গে ১০০০ গুণ করতে বলা হলো। সাধারণ নিয়মে করতে গেলে অনেকগুলো শূন্য মেলাতে হবে। কিন্তু নেপিয়ার এমন এক পদ্ধতি বের করলেন, যেখানে গুণ করার কোনো দরকারই নেই, শুধু যোগ করলেই গুণের কাজ হয়ে যাবে!
কীভাবে? তিনি দেখলেন, ১০০০০০ মানে হলো ১০৫, মানে ১-এর পর ৫টি শূন্য। আর ১০০০ মানে ১০৩ যা ১-এর পরে ৩টি শূন্য। এখন এই দুটি সংখ্যা গুণ করতে হলে শুধু তাদের পাওয়ার বা সূচকগুলো যোগ করে দিলেই হয়। অর্থাৎ ৫ + ৩ = ৮। অর্থাৎ উত্তর হবে ১০৮।
সহজভাবে বললে, লগারিদম হলো এমন এক জাদুকরী সারণি বা টেবিল, যা ব্যবহার করে বিশাল বিশাল গুণ বা ভাগকে খুব সহজেই শুধু যোগ বা বিয়োগের মাধ্যমে সমাধান করে ফেলা যায়!
নেপিয়ার এমন এক পদ্ধতি বের করলেন, যেখানে গুণ করার কোনো দরকারই নেই, শুধু যোগ করলেই গুণের কাজ হয়ে যাবে!
নেপিয়ার এই লগারিদমের টেবিল তৈরি করার জন্য জীবনের টানা ২০ বছর ব্যয় করেছিলেন! তিনি লাখ লাখ সংখ্যার হিসাব নিজে হাতে করেছিলেন। অবশেষে ১৬১৪ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত বই মিরিফিকি লগারিদমোরাম ক্যানোনিস ডেসক্রিপটিও প্রকাশ করেন। বইটির নাম বাংলা করলে হয় এমন—লগারিদমের চমৎকার সারণির বর্ণনা। ১৪৭ পৃষ্ঠার এই বইয়ের ৯০ পৃষ্ঠা জুড়েই ছিল শুধু তাঁর নিজের হাতে করা সেই লগারিদমের সারণি!
তাঁর এই আবিষ্কার সে যুগের বিজ্ঞানীদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই জাদুর মতো মনে হয়েছিল। ১৬১৫ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ হেনরি ব্রিগস তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাঁরা দুজন মিলে এটিকে আরও উন্নত করেন। তাঁদের দুজনের সেই কাজকে এখন আমরা বলি ১০-ভিত্তিক লগারিদম। টাইকো ব্রাহের মতো সে যুগের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের বিশাল বিশাল হিসাব-নিকাশও এই লগারিদমের কারণে সহজ হয়ে গিয়েছিল।
অঙ্কের মধ্যে আমরা যে দশমিক বিন্দু ব্যবহার করি—যেমন ২.৫ বা ৩.১৪—এই দশমিক বিন্দুর ব্যবহারকেও প্রথম জনপ্রিয় করেছিলেন জন নেপিয়ার!
১৬১৫ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ হেনরি ব্রিগস নেপিয়ারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তাঁরা দুজন মিলে এটিকে আরও উন্নত করেন। তাঁদের দুজনের সেই কাজকে এখন আমরা বলি ১০-ভিত্তিক লগারিদম।
চার
১৬১৭ সালের ৪ এপ্রিল নেপিয়ার মারা যান। কিন্তু মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি বিজ্ঞানীদের জন্য আরেকটি জাদুকরী যন্ত্র বানিয়ে গিয়েছিলেন। এর নাম নেপিয়ারস বোনস বা নেপিয়ারের হাড়।
নেপিয়ার মূলত হাতির দাঁত বা পশুর হাড় কেটে লম্বা লম্বা কিছু কাঠি বানিয়েছিলেন বলে এর এমন নাম দেওয়া হয়েছিল। কাঠ বা শক্ত কাগজের বোর্ড দিয়েও এটি বানানো যায়। একে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটর বলা যায়। এই হাড় বা কাঠিগুলো ব্যবহার করে যেকোনো বড় সংখ্যার গুণ খুব সহজেই শুধু যোগের মাধ্যমে করে ফেলা যায়!
নেপিয়ারের হাড় ব্যবহার করে একটি গুণ করার চেষ্টা করলে বিষয়টা আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে। ছবিতে দেওয়া নিয়মগুলো ধাপে ধাপে দেখুন।
প্রথমে এই ছবিটি দেখুন। এখানে ০ থেকে ৯ পর্যন্ত মোট ১০টি উলম্ব কাঠি আছে। প্রতিটি কাঠিতে মূলত নামতা লেখা আছে! যেমন, ৫ নম্বরের কাঠিটির দিকে তাকান। এটি ৫-এর ঘরের নামতা। এখানে প্রতিটি ঘরকে একটি কোনাকুনি দাগ দিয়ে ভাগ করা হয়েছে। দাগের ওপরে থাকে দশকের অঙ্ক, আর নিচে থাকে এককের অঙ্ক। যেমন, ৫ সাতে ৩৫ (৫ × ৭ = ৩৫)। এখানে দাগের ওপরে ৩ এবং নিচে ৫ লেখা আছে। আর যদি গুণফল ১০-এর কম হয়, তবে দাগের ওপরে একটি ০ বসে।
নেপিয়ার মূলত হাতির দাঁত বা পশুর হাড় কেটে লম্বা লম্বা কিছু কাঠি বানিয়েছিলেন বলে এর নাম দেওয়া হয়েছিল নেপিয়ারস বোনস বা নেপিয়ারের হাড়। কাঠ বা শক্ত কাগজের বোর্ড দিয়েও এটি বানানো যায়।
ধরা যাক, আমরা ২৮৪ এবং ৫৭২ গুণ করব। আপনি যেকোনো সংখ্যা আগে নিতে পারেন। আমরা ৫৭২-কে বেছে নিলাম। এখন আপনার কাজ হলো নেপিয়ারের হাড় থেকে ৫, ৭ এবং ২ নম্বরের কাঠি তিনটি পাশাপাশি সাজিয়ে রাখা। ওপরের ছবিতে সেভাবে সাজানো আছে। এখন বাঁ-দিকের উলম্ব ঘরে ১ থেকে ৯ পর্যন্ত লেখা আছে। আমরা যেহেতু ২৮৪ দিয়ে গুণ করব, তাই আমাদের শুধু ২, ৮ এবং ৪ নম্বর সারির দিকে তাকাতে হবে। এবার নিচের ছবিটি দেখুন।
এবার আসল জাদুর পালা। আমরা গুণ করব না, শুধু যোগ করব! নিচের ছবিটি দেখুন। আমরা শুধু ২, ৮ এবং ৪ নম্বর সারি আলাদা করে নিয়েছি। এবার এখানে যে কোনাকুনি চ্যানেলগুলো তৈরি হয়েছে, সেই চ্যানেলের ভেতরের সংখ্যাগুলো যোগ করব। যোগ শুরু করতে হবে একদম ডানদিকের নিচের কোনা থেকে।
যোগ করতে নিচের ছবিটা দেখুন, তাহলে আরও সহজ হবে।
একদম নিচে ডানদিকে প্রথম কোনায় শুধু ৮ আছে। তাই নিচে বসবে ৮।
দ্বিতীয় কোনাকুনি চ্যানেলে আছে ৮ + ০ + ৬ = ১৪। আমরা ১৪-এর ৪ বসাব, আর হাতে থাকবে ১। এই ১ চলে যাবে পরের চ্যানেলে।
এবার তৃতীয় কোনাকুনি চ্যানেল দেখুন। এখানে আছে ০, ২, ৬, ১ ও ৪। এগুলো যোগ করলে হয় ১৩। আগের হাতের ১ যোগ করলে হয় ১৪। আবার ৪ বসাব, হাতে আবার থাকবে ১।
চতুর্থ কোনাকুনি চ্যানেলে আছে ২, ০, ৫, ৪, ০। এগুলো যোগ করলে হয় ১১। আগের হাতের ১ যোগ করলে হয় ১২। এবার বসাব ২, হাতে থাকবে ১।
পঞ্চম কোনাকুনি চ্যানেলে আছে ৪, ০, ১। যোগ করলে হয় ৫। আগের হাতের ১ যোগ করলে হয় ৬। তাই ৬ বসাব। এখন আর হাতে কিছু নেই।
ষষ্ঠ বা শেষ কোনায় শুধু ১ আছে। তাই এখানে বসে যাবে ১।
এবার ফলাফলগুলো ওপর থেকে নিচ এবং বাঁ থেকে ডান দিকে সাজিয়ে লিখলেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত গুণফল পেয়ে যাব! ফলাফলগুলো হলো: ১ ৬ ২ ৪ ৪ ৮। অর্থাৎ, ২৮৪ × ৫৭২ = ১,৬২,৪৪৮! বিশ্বাস না হলে এখুনি আপনার মোবাইলে ক্যালকুলেটর বের করে মিলিয়ে দেখতে পারেন!
চতুর্থ কোনাকুনি চ্যানেলে আছে ২, ০, ৫, ৪, ০। এগুলো যোগ করলে হয় ১১। আগের হাতের ১ যোগ করলে হয় ১২। এবার বসাব ২, হাতে থাকবে ১।
আপনি হয়তো ভাবছেন, কাঠি পাশাপাশি রেখে কোনাকুনি যোগ করলে গুণফল মিলে যায় কীভাবে? আসলে এটি কোনো জাদু নয়, এটি হলো আমাদের প্রচলিত গুণেরই একটি স্মার্ট রূপ! আমরা স্কুলে যেভাবে ওপর-নিচ করে গুণ করা শিখেছি, সেখানে আমরা প্রথমে এককের অঙ্ক দিয়ে পুরোটাকে গুণ করি, তারপর দশকের অঙ্ক দিয়ে গুণ করে নিচে একটা শূন্য বসাই। তারপর শতকের ঘর দিয়ে গুণ করে দুটি শূন্য বসাই। এরপর সব যোগ করি, নিচের ছবির মতো।
এখানে আমরা ৫৭২ ও ২৮৪ গুণ করব। প্রথমে ৫৭২-কে ৪ দিয়ে গুণ করলে হয় ২২৮৮। নেপিয়ারের হাড়ের ৪ নম্বর সারির কোনাকুনি যোগফলও কিন্তু ঠিক ২২৮৮! ওপরের ছবিতে তা দেখা যাচ্ছে। এরপর ৫৭২-কে ৮ দিয়ে গুণ করলে হয় ৪৫৭৬। দশকের ঘরের নিয়মে শেষে একটি শূন্য বসিয়ে আমরা পাই ৪৫৭৬০। নেপিয়ারের হাড়ের 8 নম্বর সারিতে তাকালেও দেখবেন, সেখানেও ওই ৪৫৭৬ লুকিয়ে আছে!
সবশেষে ৫৭২-কে ২ দিয়ে গুণ করলে হয় ১১৪৪। শতকের নিয়মে দুটি শূন্য বসালে হয় ১১৪৪০০। নেপিয়ারের ২ নম্বর সারির কোনাকুনি যোগফলও সেই ১১৪৪! অর্থাৎ, নেপিয়ারের হাড় আসলে আমাদের স্কুলের গুণের নিয়মটিকেই চোখের সামনে এমন একটি জ্যামিতিক ছকে সাজিয়ে দেয়, যাতে আমাদের আলাদা করে গুণ করার কোনো দরকার হয় না। আমরা শুধু ছোট ছোট সংখ্যা যোগ করেই বিশাল বিশাল গুণের উত্তর বের করতে পারি!
৫৭২-কে ৮ দিয়ে গুণ করলে হয় ৪৫৭৬। দশকের ঘরের নিয়মে শেষে একটি শূন্য বসিয়ে আমরা পাই ৪৫৭৬০। নেপিয়ারের হাড়ের 8 নম্বর সারিতে তাকালেও দেখবেন, সেখানেও ওই ৪৫৭৬ লুকিয়ে আছে!
পাঁচ
মহাকাশের বিশাল সব হিসাব মেলাতে মেলাতে মানুষটা হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে, তাঁর নিজের জীবনের হিসাবের খাতাটাও ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে। বছরের পর বছর এক জায়গায় বসে একটানা ওই হাড়ভাঙা খাটুনি আর লাখ লাখ সংখ্যার হিসাব তাঁর শরীরে এক চরম নীরব ঘাতককে ডেকে এনেছিল। রোগটির নাম গাউট বা গেঁটেবাত। এই রোগের অসহ্য যন্ত্রণায় তাঁর শেষ জীবনের দিনগুলো হয়ে উঠেছিল চরম দুর্বিষহ। ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে শরীরটা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। অবশেষে ১৬১৭ সালের ৪ এপ্রিল, চিরতরে থেমে গেল তাঁর জীবনের ঘড়ির কাঁটা। ৬৭ বছর বয়সে স্কটল্যান্ডের এডিনবরার সেই নীরব মারচিস্টন ক্যাসেলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন এই মহান গণিতবিদ।
প্রাথমিকভাবে এডিনবরার সেন্ট জাইলস গির্জার প্রাঙ্গণে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছিল। পরে ওই জায়গায় অন্য স্থাপনা তৈরির কারণে তাঁর দেহাবশেষ সযত্নে সরিয়ে নেওয়া হয় এডিনবরারই সেন্ট কাথবার্টস প্যারিশ গির্জায়। সেখানে একটি ভূগর্ভস্থ ভল্টে আজও তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।
যে মানুষটি আমাদের জন্য মহাবিশ্বের কোটি কোটি কিলোমিটারের অসীম দূরত্ব ও গ্রহ-নক্ষত্রের জটিল হিসাবকে একদম হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছিলেন, তিনি নিজেই একদিন হারিয়ে গেলেন মহাকালের অনন্ত শূন্যতায়। কিন্তু আজ যখনই কোনো বিজ্ঞানী রকেটের গতি মাপেন, নভোযান চাঁদে পাঠান, কিংবা ক্যালকুলেটর বের করে কয়েক সেকেন্ডে বিশাল কোনো হিসাব করে ফেলেন; তখন সেই ক্যালকুলেটরের বোতামের প্রতিটা চাপে নীরবে বেঁচে ওঠেন জন নেপিয়ার!
