সবচেয়ে মূল্যবান বিজ্ঞান সেটাই, যা মানুষের কাজে লাগে — মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)

বড় বিনিয়োগ ছাড়াই পোশাকশিল্পে কার্বন নির্গমন ও পরিবেশদূষণ কমানোর অভিনব উপায় বাতলে এশিয়ার সেরা বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পেয়েছেন বুটেক্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দীন শায়ক। তাঁর এই উদ্ভাবন, গবেষণার নেপথ্য গল্প এবং তরুণদের বিজ্ঞানী হওয়ার পরামর্শ নিয়ে বিজ্ঞানচিন্তার সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সেই কথোপকথনের চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো। বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সৈয়দ রিফাত মোসলেম

বিজ্ঞানচিন্তা:

এশিয়ান সায়েন্টিস্ট প্রকাশিত এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় আপনার নাম এসেছে। এমন স্বীকৃতি পেয়ে কেমন লাগছে?

মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক: প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল বিস্ময়, আনন্দ এবং দায়িত্ববোধের এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। আমি কখনোই কোনো স্বীকৃতি পাওয়ার উদ্দেশ্যে গবেষণা করিনি; বরং সব সময় বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা করেছি। তাই তালিকায় নিজের নাম দেখে সবচেয়ে বেশি যে অনুভূতি হয়েছিল, তা হলো কৃতজ্ঞতা—আমার শিক্ষক, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, শিল্প খাতের সহযোগী এবং পরিবারের প্রতি। সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই ভেবে যে হয়তো বাংলাদেশের কোনো তরুণ খবরটি পড়ে বিশ্বাস করবে, বিশ্বমানের গবেষণা বাংলাদেশ থেকেও সম্ভব।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার গবেষণার বিষয়টি বিজ্ঞানচিন্তার পাঠকদের জন্য সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করবেন কি?

মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক: আমরা যখন একটি রঙিন কাপড় দেখি, তখন শুধু তার রংটাই দেখি। কিন্তু সেই রং তৈরির পেছনে কত পানি, জ্বালানি, রাসায়নিক ও কার্বন নিঃসরণ জড়িত, তা সাধারণত আমাদের চোখে পড়ে না। আমার গবেষণার মূল লক্ষ্য, এই অদৃশ্য অংশকে আরও টেকসই করা।

গত দুই দশকে শত শত টেক্সটাইল কারখানায় কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি, একই ধরনের পরিবেশগত সমস্যা বারবার ফিরে আসে—অতিরিক্ত পানির ব্যবহার, উচ্চ জ্বালানি খরচ ও অদক্ষ উৎপাদনপ্রক্রিয়া। তখন থেকেই আমার মনে প্রশ্ন ছিল, আমরা কি শুধু দূষণ নিয়ন্ত্রণই করব, নাকি উৎপাদনপ্রক্রিয়াটিকেই আরও দক্ষ ও কম কার্বননির্ভর করতে পারি?

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী টেক্সটাইল ও ফ্যাশনশিল্পকে অন্যতম দূষণকারী শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্যারিস চুক্তির লক্ষ্য অর্জন, পানির ক্রমবর্ধমান সংকট এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কার্বন ও পানি ব্যবহার হ্রাসের অঙ্গীকার—সব মিলিয়ে শিল্পটিকে পরিবর্তিত হতেই হবে।

আমি বিশেষভাবে কাজ করছি উৎপাদনপ্রক্রিয়ার কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রযুক্তি নিয়ে। সহজ ভাষায় বললে, একই কাপড় কীভাবে কম পানি, কম বিদ্যুৎ, কম রাসায়নিক ও কম কার্বন নিঃসরণে তৈরি করা যায়, সেটিই আমার গবেষণার মূল লক্ষ্য।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

আপনার এই গবেষণা বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের সম্ভাবনা বা সুফল বয়ে আনতে পারে?

বুটেক্সের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক
ছবি: লেখক

মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক: বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ও। আমাদের দেশে বিপুলসংখ্যক টেক্সটাইল ও পোশাক কারখানা রয়েছে। ফলে আমরা যদি উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় পানি, জ্বালানি ও রাসায়নিকের ব্যবহার সামান্যও কমাতে পারি, তাহলে তার সামগ্রিক প্রভাব হবে বিশাল। অর্থাৎ আমাদের চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি উন্নতির সম্ভাবনাও অনেক বড়।

বিশ্ব এখন কম কার্বন অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোও তাদের সরবরাহব্যবস্থায় কার্বন নিঃসরণ, পানি ব্যবহার এবং রাসায়নিকনির্ভরতা কমানোর জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা শুধু কম খরচে উৎপাদন নয়; বরং টেকসই, দক্ষ এবং কম কার্বন উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার মধ্যেই নিহিত।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

গবেষণার এই স্বীকৃতি আপনার ভবিষ্যৎ কাজ ও পরিকল্পনায় কী ধরনের প্রভাব ফেলবে? সামনে কী নিয়ে কাজ করতে চান?

মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক: এই স্বীকৃতি আমাকে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে। আমি মনে করি, গবেষণার প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন তা বাস্তবে মানুষের উপকারে আসে।

ভবিষ্যতে আমি ডিজিটাল টুল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে টেক্সটাইল ডিকার্বনাইজেশনের সঙ্গে যুক্ত করতে চাই। আমার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো, বাংলাদেশকে টেক্সটাইল ডিকার্বনাইজেশন গবেষণা ও উদ্ভাবনের একটি বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

বিজ্ঞানচিন্তা:

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে যাঁরা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী বা গবেষক হতে চান, তাঁদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক: অনুসন্ধিৎসা ছাড়া বিজ্ঞান হয় না আর বাস্তব সমস্যার প্রতি সংবেদনশীলতা ছাড়া ভালো গবেষণা হয় না। ‘কেন’, ‘কীভাবে’ এবং ‘এমন যদি হতো’—এ প্রশ্নগুলো থেকেই বিজ্ঞানের শুরু। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলে, গবেষণায় সফল হওয়ার জন্য শুধু মেধা যথেষ্ট নয়। আমি বলব মাইন্ডসেট, মাইন্ডসেট, মাইন্ডসেট (মানসিকতা)।

কৌতূহলী হতে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, দায়িত্ব নিতে হবে এবং কোনো সমস্যাকে অন্য কারও সমস্যা হিসেবে না দেখে নিজের সমস্যা হিসেবে ভাবতে হবে। লেগে থাকতে হবে, প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে, কানকথা কম শুনতে হবে, হতাশ হওয়া যাবে না এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিজের কাছে সৎ থাকতে হবে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

কেউ যদি আপনার গবেষণার ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন, তাহলে তাঁর কী ধরনের প্রস্তুতি বা দক্ষতা থাকা প্রয়োজন?

মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক: সবার আগে প্রয়োজন পড়াশোনা। বিজ্ঞানের মৌলিক জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। গণিত, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা প্রকৌশলের ভিত্তি যত শক্ত হবে, নতুন কিছু তৈরি করার সক্ষমতাও তত বাড়বে।

একই সঙ্গে নতুন কিছু জানার আগ্রহ থাকতে হবে। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই শেখার প্রক্রিয়াও কখনো থামিয়ে রাখা যাবে না।

আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আজ শুরু করেই কাল রকেট সায়েন্টিস্ট হয়ে যাওয়া যায় না। প্রতিটি আবিষ্কার, প্রতিটি প্রযুক্তি এবং প্রতিটি গবেষণার পেছনে বছরের পর বছর শ্রম, ব্যর্থতা এবং শেখার গল্প থাকে।

আমি তরুণদের আরেকটি বিষয় বলতে চাই। শুধু এসি রুমে বসে গবেষণা করলে হবে না। প্রয়োজন হলে গায়ে কাদা লাগাতে হবে, কাপড়চোপড় ময়লা করতে হবে, কারখানায় যেতে হবে, শ্রমিকদের সঙ্গে বসে খেতে হবে, মাঠে সময় দিতে হবে। কারণ, ল্যাবরেটরিতে যে সমাধান কাজ করে, বাস্তব জগতে সেটি সব সময় কাজ না–ও করতে পারে। গবেষণা ও বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়েছে।

আরও পড়ুন
বিজ্ঞানচিন্তা:

বিজ্ঞানচিন্তার বেশির ভাগ পাঠক কিশোর ও তরুণ। তাদের উদ্দেশে আপনার বার্তা কী?

ড. মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক
ছবি: লেখক

মোহাম্মদ আব্বাস উদ্‌দীন শায়ক: আমি তরুণদের একটি কথাই বলতে চাই, হাল ছেড়ে দিয়ো না। আমরা একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের সামনে অনেক সমস্যা আছে—পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, শিল্প—সবখানেই রয়েছে চ্যালেঞ্জ। কিন্তু অন্য কেউ এসে আমাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করে দিয়ে যাবে না। আমাদের তোমাদেরই দরকার। তোমাদের নতুন কিছু করার শক্তি আছে, তারুণ্য আছে, কৌতূহল আছে, ক্ষুধা আছে। সেই শক্তিগুলোকে কাজে লাগাও। প্রশ্ন করো, শেখো, পরীক্ষা করো, ব্যর্থ হও, আবার চেষ্টা করো।

আজ তোমরা যে সমস্যাগুলো দেখছ, সেগুলোই আগামী দিনের গবেষণার বিষয়। তোমাদের মধ্য থেকেই কেউ হয়তো এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করবে, যা আমাদের নদীগুলোকে বাঁচাবে। কেউ হয়তো এমন একটি সমাধান তৈরি করবে, যা শিল্পকে আরও টেকসই করবে। আবার কেউ হয়তো এমন একটি উদ্ভাবন করবে, যা লাখো মানুষের জীবন সহজ করে দেবে।

তাই বড় স্বপ্ন দেখো, কিন্তু মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলোকে কখনো ভুলে যেয়ো না। কারণ, সবচেয়ে মূল্যবান বিজ্ঞান সেই বিজ্ঞান, যা মানুষের কাজে লাগে।

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন