প্রকৃতির কথা ভাবলে একটা সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগে, জাগে বিস্ময় আর রহস্যবোধ— স্টিভেন ওয়াইনবার্গ, নোবেলজয়ী পদার্থবিদ

বিশ শতকের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান স্থপতি স্টিভেন ওয়াইনবার্গ (১৯৩৩–২০২১ খ্রি.)। প্রকৃতির মৌলিক বলগুলোর মেলবন্ধন ঘটানো ইলেক্ট্রোউইক ইউনিফিকেশন তত্ত্বের জনক হিসেবে তিনি বিজ্ঞানজগতে চিরস্মরণীয়। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবেই ১৯৭৯ সালে পান নোবেল পুরস্কার।

বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে প্রাঞ্জল ভাষায় তুলে ধরতে ১৯৯৩ সালে লেখেন দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস। বইটি আজও বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়।

২০০৯ সালে তাঁর সাক্ষাৎকার নেন জার্মান পদার্থবিদ, অধ্যাপক ও বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক স্টিফান ক্লেইন। সে বছরই তা জার্মানির বিখ্যাত সাপ্তাহিক ডি জাইট-এ প্রকাশিত হয়। সেই কথোপকথনের চুম্বক অংশ রইল পাঠকদের জন্য।

নোবেলজয়ী পদার্থবিদ স্টিভেন ওয়াইনবার্গছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

স্টিফান ক্লেইন: অধ্যাপক ওয়াইনবার্গ, আপনি নাকি আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারটি একটি লাল স্পোর্টস কারে বসে করেছিলেন—কথাটা কি সত্যি?

স্টিভেন ওয়াইনবার্গ: হ্যাঁ, একটি শেভ্রোলে কামারোতে বসে। সময়টা ছিল ১৯৬৭ সাল। পরমাণুর নিউক্লিয়াসকে একত্রে ধরে রাখে, এমন শক্তিশালী বল বোঝার চেষ্টা করছিলাম তখন। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। আমার হিসাব–নিকাশ বারবার শূন্য ভরের একটি কণার অস্তিত্ব ইঙ্গিত করছিল। কিন্তু এর সঙ্গে পরীক্ষালব্ধ সব ফলাফল ছিল উল্টো। তারপর হুট করেই আমার মাথায় খেলে গেল যে ওই ভরহীন কণাটি আসলে ফোটন ছাড়া আর কিছুই নয়...

ক্লেইন: ফোটন, মানে আলোর সেই বহু পরিচিত মৌলিক কণা।

ওয়াইনবার্গ: একদম ঠিক। আমার ধারণাগুলো সঠিক ছিল। তবে আমি যা ভেবেছিলাম, তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সমস্যার ক্ষেত্রে সেগুলো প্রযোজ্য ছিল। আমি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তিশালী বলের ব্যাখ্যা দেয়, এমন একটি তত্ত্ব খুঁজছিলাম। কিন্তু এর বদলে এমন একটি তত্ত্ব পেয়ে গেলাম, যা আলো ও দুর্বল নিউক্লীয় বলকেই ব্যাখ্যা করে।

ক্লেইন: যেন কোনো গোয়েন্দা একটি অপরাধের সূত্র ধরে এগোতে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অপরাধের সমাধান করে ফেললেন।

ওয়াইনবার্গ: সে রকমই কিছু একটা। আর আমার অফিসের উদ্দেশ্যে বোস্টনের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালানোর সময় এই পুরো ব্যাপারটা আমার মাথায় আসে।

ক্লেইন: ব্যাপারটা কিন্তু খুব একটা নিরাপদ নয়।

ওয়াইনবার্গ: সে সময় অন্তত স্টিয়ারিং হুইলে বসে আমি ফোনে কথা বলছিলাম না। তবে এটাও সত্যিই একটি সমস্যা—আমরা তাত্ত্বিক পদার্থবিদেরা সব সময় আমাদের কাজের বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তায় মগ্ন থাকি, হয়তো সুরকার বা কবিদের মতো। সে কারণেই আমি ভুলে যাই যে কোথায় গাড়ি পার্ক করেছি কিংবা যে দোকানে এইমাত্র ঢুকলাম, সেখানে আসলে কী কিনতে চেয়েছিলাম।

আরও পড়ুন
আমি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তিশালী বলের ব্যাখ্যা দেয়, এমন একটি তত্ত্ব খুঁজছিলাম। কিন্তু এর বদলে এমন একটি তত্ত্ব পেয়ে গেলাম, যা আলো ও দুর্বল নিউক্লীয় বলকেই ব্যাখ্যা করে।

ক্লেইন: গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে আপনার ওই উপলব্ধি মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছিল। এর ফলেই জন্ম নেয় স্ট্যান্ডার্ড মডেল। বর্তমানে পদার্থের গঠন ও মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে এ মডেলই বহুল স্বীকৃত একটি ধারণা। সেই মুহূর্তে কি আপনি এসব আঁচ করতে পেরেছিলেন?

ওয়াইনবার্গ: বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায়, একদম শেষে গিয়ে আপনি কোনো না কোনো কানাগলিতে আটকে যাবেন। সেবার আমার মনে হয়েছিল, আমার এ ধারণার মধ্যে হয়তো কোনো সারবস্তু আছে। তাই এমন একটি তত্ত্ব নিয়ে কাজ করাটা ভীষণ আনন্দের ছিল। কারণ, এর সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আমি যে সত্যিই ঠিক ছিলাম, তা পরের ছয় বছর কোনো পরীক্ষা–নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু যখন প্রমাণিত হলো, সেটা ছিল দ্বিতীয় পরম আনন্দের মুহূর্ত।

ক্লেইন: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে শক্তি ও পাল্লার ওপর ভিত্তি করে চারটি পরিচিত মৌলিক বল রয়েছে, যেমন মহাকর্ষ, বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় বল, সবল নিউক্লীয় বল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল। আপনি ও আপনার সহকর্মীরা আবিষ্কার করেছেন, প্রকৃতির এই বলগুলোর মধ্যে দুটির উৎস আসলে একটিমাত্র মৌলিক বল। সেগুলো হলো বিদ্যুৎ–চুম্বকীয় ও দুর্বল বল। আপাতদৃষ্টিতে এদের পরস্পরের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে হয়। একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদের কাছে বিভিন্ন ঘটনাকে একীভূত করার মানে হলো যেন পরম আরাধ্য কোনো কিছু অর্জন করা। আসলে ব্যাপারটা এমন কেন?

ওয়াইনবার্গ: কারণ, আমরা প্রকৃতিকে আরও সহজভাবে বুঝতে চাই। সেই সরলতার পথ হলো একীভূত করা। নিউটনের কথা ভাবুন—তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে মাটিতে পড়ন্ত একটি পাথর যে নিয়ম মেনে চলে, গ্রহগুলোও ঠিক একই নিয়ম অনুসরণ করে। কাজেই আকাশ ও পৃথিবীর জন্য আলাদা কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নেই। অথচ মানুষ তখন পর্যন্ত বিশ্বাস করত উল্টোটা। নিউটন বললেন, বরং সর্বত্র একই মহাকর্ষের আইন কাজ করে। এটি ছিল বিজ্ঞানের এক বিশাল অগ্রগতি।

ক্লেইন: কিন্তু এই একত্রীকরণের জন্য তো চড়া মূল্য দিতে হয়। আপনি হয়তো প্রাকৃতিক নিয়মের সংখ্যা কমিয়ে আনছেন, কিন্তু বাইরের বেশির ভাগ মানুষের কাছে সেই গুটিকয় মৌলিক নিয়ম বোঝা ক্রমেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

ওয়াইনবার্গ: দুঃখজনক হলেও ব্যাপারটা সত্য। সপ্তদশ শতাব্দীতে নিউটনের তত্ত্বগুলো বুঝতে সাধারণ মানুষেরও বেশ সমস্যা হতো। কিন্তু এখন হাইস্কুল পেরোনো যেকোনো শিক্ষার্থীই তাঁর আবিষ্কৃত সূত্রগুলো বোঝে। ভলতেয়ার তাঁর ব্যাখ্যার মাধ্যমে এগুলোকে সাধারণের বোধগম্য করে তুলেছিলেন।

আরও পড়ুন
বেশির ভাগ সময়ই দেখা যায়, একদম শেষে গিয়ে আপনি কোনো না কোনো কানাগলিতে আটকে যাবেন। সেবার আমার মনে হয়েছিল, আমার এ ধারণার মধ্যে হয়তো কোনো সারবস্তু আছে।

ক্লেইন: এর কৃতিত্বের সিংহভাগ আসলে ভলতেয়ারের প্রেমিকা এমিলি দ্যু শাতলের প্রাপ্য। বেশির ভাগ ব্যাখ্যা তিনিই লিখেছিলেন। যাহোক, ধরুন, কোনো পার্টিতে কেউই আপনার কাজ বুঝতে পারছে না। ব্যাপারটা কি আপনার জন্য বিরক্তিকর?

ওয়াইনবার্গ: হ্যাঁ। কখনো কখনো এটা খুব হতাশাজনক। যেমন একবার আমি এখানে টেক্সাসে একটি পার্টিকেল একসিলারেটর প্রকল্পের বিষয়ে কংগ্রেসের সামনে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। তখন এক কংগ্রেসম্যান আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার একসিলারেটরের কী দরকার? একটা বড় কম্পিউটার দিয়েই তো কাজটা করতে পারেন।’ তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না, যে বিষয় সম্পর্কে কেউই কিছু জানে না, কম্পিউটার তার কিছুই হিসাব করতে পারে না। ওই একসিলারেটর দিয়ে আমরা প্রকৃতির নতুন নিয়ম আবিষ্কার করতে চেয়েছিলাম। এর চেয়ে খারাপ হলো সেসব লোক, যারা আপনার প্রশংসা করে। কারণ, আপনি এমন কিছু করছেন, যা তারা বোঝে না। অনেকেই আবার বিশ্বাস করে যে দুর্বোধ্য কবিতাই বোধ হয় গভীর অর্থপূর্ণ। পদার্থবিজ্ঞান বোঝা কঠিন বলে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত নয়; বরং এ বিষয়ে আমাদের কিছু করা উচিত।

ক্লেইন: কী করতে হবে?

ওয়াইনবার্গ: তরুণদের সামনে পদার্থবিজ্ঞান শেখার কেবল একটি পথই খোলা রাখা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের একই পাঠ্যক্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রথমে তাদের বলবিদ্যা শেখানো হয়, তারপর তাপ ও বিদ্যুৎ সম্পর্কে কিছু ধারণা দেওয়া হয়, এরপর পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি। এর সবকিছুকেই গণিতের ভাষায় মুড়িয়ে উপস্থাপন করা হয়। যারা পদার্থবিজ্ঞানী হতে চায় এবং হিসাব–নিকাশ করতে আনন্দ পায়, তাদের জন্য ব্যাপারটা খুবই ভালো। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষের জন্যই ব্যাপারটা তা নয়। এর চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ উপায় হলো শিক্ষার্থীদের এমন সব গল্প বলা, যা তাদের মহান পদার্থবিজ্ঞানীদের আবিষ্কারগুলো বুঝতে সাহায্য করে। সেই নীতি মাথায় রেখে একবার আমি বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে আস্ত একটি বই লিখেছিলাম। আমি স্কুলে বিজ্ঞান পড়ানোর ধরনে একটা বিপ্লব আনতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বইটি ভালোই কাজ করবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কিছুই বদলাতে পারেনি।

আরও পড়ুন
প্রথমে তরুণদের বলবিদ্যা শেখানো হয়, তারপর তাপ ও বিদ্যুৎ সম্পর্কে কিছু ধারণা দেওয়া হয়, এরপর পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান ইত্যাদি। এর সবকিছুকেই গণিতের ভাষায় মুড়িয়ে উপস্থাপন করা হয়।

ক্লেইন: টেক্সাসে পার্টিকেল একসিলারেটর নির্মাণের প্রকল্পটিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ মহাবিস্ফোরণের পর প্রথম মুহূর্তগুলোয় যে অত্যন্ত উচ্চ শক্তির অবস্থা বিরাজ করেছিল, যে শক্তিস্তরে প্রকৃতির মৌলিক বলগুলো একীভূত হয়ে যায়, সে ধরনের শক্তি সৃষ্টি করার জন্য একটি কণা ত্বরক প্রয়োজন ছিল।

ওয়াইনবার্গ: দুর্ভাগ্যবশত, রাজনৈতিক বিষয়গুলোয় আমি খুব একটা সফল ছিলাম না।

ক্লেইন: তবু এখন পর্যন্ত সব কটি পরীক্ষায় স্ট্যান্ডার্ড মডেলটি দারুণ সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে। এসব পরীক্ষা করা হয়েছে জেনেভা পারমাণবিক গবেষণাকেন্দ্র—সার্নের তুলনামূলক কম শক্তিশালী একসিলারেটর ব্যবহার করে। ২০০৮ সালে সেখানে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার বা এলএইচসি নামের একটি যন্ত্র চালু করা হয়। এর শক্তিমাত্রা আপনার টেক্সাসে কাঙ্ক্ষিত যন্ত্রটির মতোই হওয়ার কথা। দুর্ভাগ্যবশত, চালুর পরপরই একসিলারেটরের ভূগর্ভস্থ টানেলে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। তাতে এক বছরের বেশি সময় ধরে এলএইচসিকে মেরামতের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। ফলে এখন পরীক্ষা–নিরীক্ষাগুলো নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। এ নিয়ে আপনি কি হতাশ?

ওয়াইনবার্গ: কিছুটা। আমরা এই যন্ত্রটির জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি যে দুর্ঘটনার কারণে এই বিলম্ব খুব বড় কোনো বিষয় নয়।

ক্লেইন: আপনি কী কী আবিষ্কারের আশা করছেন?

ওয়াইনবার্গ: কী ঘটবে, তা যদি কেউ আগেই জানতে পারত, তাহলে এসব পরীক্ষা–নিরীক্ষার ঝক্কি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারতাম। আমাদের বেশির ভাগই প্রত্যাশা করছি যে হিগস বোসন নামের একটি নতুন মৌলিক কণা ধরা পড়বে।*

আরও পড়ুন
২০০৮ সালে সেখানে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডার বা এলএইচসি নামের একটি যন্ত্র চালু করা হয়। এর শক্তিমাত্রা আপনার টেক্সাসে কাঙ্ক্ষিত যন্ত্রটির মতোই হওয়ার কথা।

ক্লেইন: সবকিছুর ভর থাকার পেছনে যে কণাটি দায়ী বলে ধারণা করা হয়।

ওয়াইনবার্গ: কিন্তু যদি আমরা শুধু ওটাই খুঁজে পাই, তাহলে ব্যাপারটা খুবই হতাশাজনক হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে গভীর ধারণা পেতে চাই...

ক্লেইন: এক রহস্যময় পদার্থ, যা মহাবিশ্বে পরিচিত সব ধরনের পদার্থের চেয়ে অন্তত পাঁচ গুণ বেশি পরিমাণে থাকার কথা।

ওয়াইনবার্গ: এখন পর্যন্ত এই ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে গঠিত, সে সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। পরিচিত মৌলিক কণাগুলোর জগতে সুপারসিমেট্রি নামের একটি কাঠামোর প্রমাণ খুঁজে পাওয়াটাও দারুণ ব্যাপার হবে। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা এটি নিয়ে কথা বলছি। বাস্তবে সুপারসিমেট্রি দেখতে পাওয়া খুব রোমাঞ্চকর হবে।

ক্লেইন: আপনি আপনার লাল শেভ্রোলে কামারোতে বসে যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছিলেন, সেটা কিন্তু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। প্রথমত, এর মধ্যে মহাকর্ষকে অন্তর্ভুক্ত করার সব চেষ্টাই এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, এর মধ্যে এমন কিছু সংখ্যাগত মান রয়েছে, যা তত্ত্বটি থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসে না; বরং পরিমাপের ফলাফল হিসেবে সেগুলোকে আলাদাভাবে জুড়ে দিতে হয়। এ কারণেই পদার্থবিজ্ঞানীরা ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরের মৌলিক প্রাকৃতিক নিয়মগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। এখন পর্যন্ত তাঁরা সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেননি।

ওয়াইনবার্গ: স্ট্যান্ডার্ড মডেল দারুণভাবে সফল। কিন্তু এদিকে একটু দেখুন। (তিনি ডেস্কের ড্রয়ার থেকে একটি লাল বুকলেট বের করলেন।) মৌলিক কণা সম্পর্কে আজ পর্যন্ত আমরা যা যা জানি, তার সবই এতে আছে: অসংখ্য ছক, সংখ্যার সারণি। যদি এটাই আমাদের তত্ত্ব হতো, তাহলে তা দেখতে কতট কুৎসিতই না লাগত! আমরা তো এমনটা চাই না। আসলে আমাদের কাজের ধরনের সঙ্গেই সৌন্দর্যবোধ মিশে আছে।

ক্লেইন: তাহলে প্রকৃতির একটি সুন্দর তত্ত্ব বলতে আপনি কী বোঝাবেন?

ওয়াইনবার্গ: এমন একটি তত্ত্ব, যেখানে সংযোগগুলো অবধারিতভাবেই উঠে আসে। সবকিছু একে অপরের সঙ্গে মিলে যায়। আর আপনি যদি এর ছোট্ট একটি অংশও পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন, তাহলে পুরো ইমারতই ভেঙে পড়বে। এমন তত্ত্ব কিন্তু আছে। যেমন কোয়ান্টাম মেকানিকসের কথাই ধরুন। এই তত্ত্ব পরমাণু ও মৌলিক কণাগুলোর গতিবিদ্যা বর্ণনা করে। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মধ্যে সে ধরনের সংগতি নেই।

আরও পড়ুন
এখন পর্যন্ত ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে গঠিত, সে সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণাও নেই। পরিচিত মৌলিক কণাগুলোর জগতে সুপারসিমেট্রি নামের একটি কাঠামোর প্রমাণ খুঁজে পাওয়াটাও দারুণ ব্যাপার হবে।

ক্লেইন: প্রকৃতি আসলে এমনভাবে গঠিত হবে কেন, যাতে মানুষ এর নিয়মগুলোকে অবধারিত ও সুন্দর বলে মনে করে?

ওয়াইনবার্গ: আমি যদি জানতে পারতাম! এমনও হতে পারে যে এটি সেভাবে গঠিত নয় এবং আমরা কেবলই আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাল্পনিক চিন্তায় মেতে আছি। অন্যদিকে সৌন্দর্যের এই খোঁজ ইতিমধ্যে আমাদের অনেক দূর নিয়ে এসেছে: সময়ের পরিক্রমায় বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির বেশ কিছু চমৎকার নিয়ম আবিষ্কার করেছেন। আমরা যদি এই অনুসন্ধান বন্ধ করে দিই, তাহলে নতুন কিছু আবিষ্কার হওয়ার সম্ভাবনাও নিশ্চিতভাবে শেষ হয়ে যাবে। আমার কাছে অন্তত এই অনিশ্চিত লক্ষ্যটিকে আকর্ষণীয় মনে হয় যে এর পেছনে গোটা জীবন কাটিয়ে দেওয়াটা সার্থক বলে মনে হয়।

ক্লেইন: এমনকি আপনি যদি সেই লক্ষ্যকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে পৌঁছাতে দেখে যেতে না–ও পারেন?

ওয়াইনবার্গ: আমি শুধু চাই, বিজ্ঞানের এই অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক। এতে সত্যিই অনেক দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। যেমন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে পরমাণু সম্পর্কে অনুমান করেছিলেন। কিন্তু তারও ২ হাজার ৩০০ বছর পর, ১৯০০ সালের দিকে এসে আমরা এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছি। ডেমোক্রিটাসের সমস্যা ছিল স্কেল বা মাত্রার। মানুষ খালি চোখে দেখতে পারে, এমন যেকোনো কিছুর চেয়ে পরমাণু এক লাখ গুণ ছোট। কিন্তু আজ কণাপদার্থবিজ্ঞানে সত্যিকারের একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করতে হলে আমাদের আরও লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে। একটি সত্যিকারের একত্রীকরণ বা ইউনিফিকেশন অর্জন করার জন্য আমাদের প্রকৃতির এমন এক শক্তির পর্যায়ে গিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে, যা আমাদের বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে এক লাখ গুণ নয়; বরং ১০১৭ গুণ বেশি।

আরও পড়ুন
গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ অব্দে পরমাণু সম্পর্কে অনুমান করেছিলেন। কিন্তু তারও ২ হাজার ৩০০ বছর পর, ১৯০০ সালের দিকে এসে আমরা এর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছি।

ক্লেইন: সেটি সত্যিই এক চমকপ্রদ সংখ্যা—একের পিঠে ১৭টি শূন্য। কিন্তু মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে বাধা শুধু এই স্কেলের বিশালতা না–ও হতে পারে। আপনার নিজের তত্ত্বই হয়তো এই অনুসন্ধানের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলটি এতই সফল হয়েছে যে সেটাই এখন সবকিছুকে ঢেকে ফেলেছে। বোস্টনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আপনার সেই উপলব্ধি নিয়ে আপনি কি কখনো আফসোস করেছেন?

ওয়াইনবার্গ: না। একটি ধারণার ওপর ভিত্তি করেই নতুন ধারণা গড়ে ওঠে। পরবর্তী ধাপে পা রাখার আগে স্ট্যান্ডার্ড মডেল ছিল একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ। পদার্থবিজ্ঞানের কোনো আবিষ্কার নিয়ে যদি আমার অনুশোচনা থেকে থাকে, তাহলে সেটি নিউক্লিয়ার ফিশন। অবশ্য এর কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

ক্লেইন: আপনি এমন একটি সূত্রের সন্ধান করছেন, যা গোটা মহাবিশ্বকে বর্ণনা করতে পারবে। অনেকেই একে থিওরি অব এভরিথিং বা সবকিছুর তত্ত্ব বলে থাকেন।

ওয়াইনবার্গ: এই শব্দবন্ধ আমার মোটেও পছন্দ নয়। এর মানে দাঁড়ায় যে ওই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারলে আমরা বোধ হয় সবকিছুই বুঝে ফেলব। কিন্তু বাস্তবে তা হবে না। মানুষের চেতনা কিংবা তরল ও গ্যাসের মধ্যকার আলোড়নের মতো ঘটনাগুলোর কথাই ধরুন। এগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকা ভৌত ও রাসায়নিক নিয়মগুলো আজ আমাদের জানা। তবু আমরা আমাদের চেতনা বা আবহাওয়াকে বোঝার পর্যায় থেকে এখনো যোজন যোজন দূরে। সে কারণেই আমাদের এই অনুসন্ধানের লক্ষ্যকে আমি একটি ফাইনাল থিওরি বা চূড়ান্ত তত্ত্ব বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

ক্লেইন: অনেক পদার্থবিদ এমন একটি ফাইনাল থিওরির গুরুত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, যা মহাবিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় কিছু বিষয় সম্পর্কে আসলে আমাদের খুব বেশি জ্ঞানী করে তুলবে না।

ওয়াইনবার্গ: এমন সন্দেহ দুটি কারণে অযৌক্তিক। প্রথমত, আমাদের তত্ত্বটি অন্য যেকোনো তত্ত্বের চেয়ে অনেক বেশি মৌলিক হবে। কারণ, এটি সর্বত্র প্রযোজ্য হবে। জগতের অন্যান্য সব বর্ণনাই কোনো না কোনোভাবে সীমাবদ্ধ। যেমন হাইড্রোডায়নামিকস বা প্রবাহী বলবিদ্যার নিয়মগুলো কেবল সেখানেই তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে গ্যাস বা তরল রয়েছে। কিন্তু আমাদের এই চূড়ান্ত তত্ত্বটি মহাবিশ্বের সর্বত্র সীমাহীনভাবে প্রযোজ্য হবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের এই তত্ত্ব হবে সব ব্যাখ্যার শেষ ধাপ। আমাদের জগতে আমরা দুই ধরনের জিনিস দেখি—আকস্মিক ঘটনা এবং নীতি বা প্রিন্সিপাল। আকস্মিক ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায় না। সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে কেন একটি ধূমকেতু পৃথিবীতে আঘাত হেনে ডাইনোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, তা জিজ্ঞাসা করা অর্থহীন। এ প্রশ্নের কোনো গভীর ব্যাখ্যা নেই, এটি একটি দুর্ঘটনামাত্র।

অন্যদিকে ডাইনোসর ও অন্য সব জীবের মধ্যে বংশগতির নিয়মগুলো বোঝার চেষ্টা করাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। এর সঙ্গে অন্তর্নিহিত নীতিগুলো জড়িত। আরও নিখুঁতভাবে বললে, জৈব রসায়নের নীতিগুলো। আর জৈব রাসায়নিক নিয়মগুলোকে আবার পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। এরপর আসে কণাপদার্থবিজ্ঞান এবং এভাবে ধাপে ধাপে চলতে থাকে। পরিশেষে এর সবকিছু গিয়ে ঠেকে সেই চূড়ান্ত তত্ত্বে। সেখানেই সব ‘কেন’র সমাপ্তি ঘটে।

আরও পড়ুন
সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে কেন একটি ধূমকেতু পৃথিবীতে আঘাত হেনে ডাইনোসরদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, তা জিজ্ঞাসা করা অর্থহীন। এ প্রশ্নের কোনো গভীর ব্যাখ্যা নেই, এটি একটি দুর্ঘটনামাত্র।

ক্লেইন: আপনি কি রাশিয়ার ম্যাট্রিওশকা পুতুলের সঙ্গে পরিচিত?

ওয়াইনবার্গ: আপনি কি কাঠের তৈরি ওই পুতুলগুলোর কথা বলছেন, যেগুলোর একটার ভেতরে আরেকটা থাকে?

ক্লেইন: ঠিক তা–ই। বাইরের পুতুলটি খুললে ভেতরে একটি ছোট পুতুল পাওয়া যায়, সেটি খুললে আরও একটি পাওয়া যায়। এভাবে খুলতে খুলতে শেষমেশ আপনি সবচেয়ে ছোট, অবিভাজ্য পুতুলটি পান। ফাইনাল থিওরি নিয়ে আপনার স্বপ্নের কথা শুনে আমার এই পুতুলের কথাই মনে পড়ছে। কিন্তু কে বলতে পারে যে এই অনুসন্ধান কখনো শেষ হবে? এমন তো হতেই পারে যে প্রতিটি স্তরেই এর চেয়ে ছোট আরও একটি পুতুল রয়ে গেছে।

ওয়াইনবার্গ: সেটাও সম্ভব। অন্যদিকে আমরা দেখি যে এ পর্যন্ত আমরা যতগুলো ধাপ পেরিয়েছি, প্রতিটি ধাপে ব্যাখ্যাগুলো ক্রমেই আরও বেশি ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে। এটাই আমাকে আশাবাদী করে। আরেকটি প্রশ্ন হলো, আমাদের মস্তিষ্ক কি এই ক্রমবর্ধমান ব্যাপক নিয়মগুলো বোঝার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী? দিন শেষে আপনি তো আর একটি কুকুরকে শ্রোডিঙ্গারের সমীকরণ সমাধান করার প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন না।

ক্লেইন: আমি ভাবি, মহাবিশ্বের সর্বব্যাপী একটি নিয়মের জন্য এই যে আকাঙ্ক্ষা, তা কতখানি আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলমানরা একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টাকে বিশ্বাস করেন। মাঝেমধ্যে একটি চূড়ান্ত তত্ত্বের এই অনুসন্ধানকে আমার কাছে একেশ্বরবাদেরই একটি নতুন এবং আরও বেশি ধর্মনিরপেক্ষ রূপ বলে মনে হয়।

ওয়াইনবার্গ: চমৎকার ভাবনা—আমরা বিজ্ঞানকে যেভাবে চিনি, তার জন্ম তো ইউরোপেই। তবে আমি আপনার যুক্তির উল্টো পিঠটাও দেখাব: এক ঈশ্বর ও সমগ্র মহাবিশ্বের একটি তত্ত্বের আকাঙ্ক্ষার পেছনে একই ধরনের মানসিক বা বৌদ্ধিক কারণ থাকতে পারে। একেশ্বরবাদের বিকাশ ঘটেছিল; কারণ, মানুষ বহু–ঈশ্বরবাদকে খুব জটিল মনে করেছিল। আর ঝড়ের জন্য জিউসকে, মহামারির জন্য অ্যাপোলোকে ও ফসলের ফলনের জন্য ডিমিটারকে দায়ী করাটা যেমন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নয়, ঠিক তেমনি আমরা পদার্থবিদেরাও জগৎকে বোঝার জন্য জটিল স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বদলে একটি সমন্বিত ও একীভূত ব্যাখ্যা পেতেই বেশি পছন্দ করব।

আরও পড়ুন
তবে আমি আপনার যুক্তির উল্টো পিঠটাও দেখাব: এক ঈশ্বর ও সমগ্র মহাবিশ্বের একটি তত্ত্বের আকাঙ্ক্ষার পেছনে একই ধরনের মানসিক বা বৌদ্ধিক কারণ থাকতে পারে।

ক্লেইন: আপনি কি বলতে চাইছেন যে সবকিছুর জন্য একটিমাত্র কারণ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা মানব প্রকৃতিরই একটি সহজাত প্রবৃত্তি?

ওয়াইনবার্গ: আমাদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য আছে। যদিও আমাদের মধ্যে এর ঠিক বিপরীত আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে। আপনি যখন কোনো অপেরা দেখতে যান, তখন আপনি কোনো সহজ ব্যাখ্যা খোঁজেন না; বরং মঞ্চে জীবনের সমগ্র বৈচিত্র্য ও জটিলতাকে অনুভব করতে চান।

ক্লেইন: ভিন্ন ভিন্ন মানুষের নান্দনিক চাহিদাও ভিন্ন হয়।

ওয়াইনবার্গ: না, বিষয়টা বরং এই যে আমরা সবাই নিজেদের ভেতরে পরস্পরবিরোধী চাহিদা বহন করি। আমরা একই সঙ্গে সরলতা ও প্রাচুর্য—দুটিই চাই।

ক্লেইন: উচ্চতর গণিতের প্রতীকগুলোর সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয়ের অভিজ্ঞতাকে আপনি একবার জাদুকরি চিহ্ন দেখার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।

ওয়াইনবার্গ: আমি তখন ব্রঙ্কসের একটি স্কুলে পড়তাম। একদিন লাইব্রেরিতে তাপীয় তত্ত্বের ওপর লেখা একটি বই ঘটনাক্রমে আমার হাতে আসে এবং তাতে আমি ∮ চিহ্নটা দেখতে পাই।

এটি অসীম ক্ষুদ্র ক্যালকুলাসের একটি অপারেশনকে বোঝায়—একটি বদ্ধ বক্ররেখার ওপর একটি সমাকলন। কিন্তু তখন আমি তা জানতাম না। আমি কেবল অনুভব করেছিলাম যে আমার কাছে দুর্বোধ্য এই চিহ্ন নিশ্চয়ই খুব শক্তিশালী কিছু হবে। গ্যেটের ফাউস্ট নাটকের শুরুতে ফাউস্ট যখন পেন্টাগ্রামটি দেখতে পান, তখন তাঁর যেমন অনুভূতি হয়েছিল, অনেকটা সেরকম। যখন জানলাম, এই চিহ্ন দিয়ে তাপকে নিখুঁত গাণিতিক ভাষায় বর্ণনা করা যায়, তখন সেটা আমার কাছে আরও বেশি রোমাঞ্চকর মনে হলো। আমি ভেবেছিলাম, যে এ ধরনের প্রতীকগুলো বোঝে, সে প্রকৃতিকে শাসন করতে পারবে।

ক্লেইন: আপনি ক্ষমতার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

ওয়াইনবার্গ: আমি আমার জ্ঞান দিয়ে কিছু একটা করতে চেয়েছিলাম, ঠিক এই অর্থে নয়। আমি প্রকৃতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে জয় করতে চেয়েছিলাম, এর রহস্যের গভীরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম। তাই আমি নিজে নিজেই উচ্চতর গণিত শিখতে শুরু করি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন এই প্রতীকগুলো সম্পর্কে আমার বোঝাপড়া বাড়তে থাকল, তখন নিজেকে একজন জাদুকরের শিক্ষানবিশ বলে মনে হতো।

আরও পড়ুন
আমি তখন ব্রঙ্কসের একটি স্কুলে পড়তাম। একদিন লাইব্রেরিতে তাপীয় তত্ত্বের ওপর লেখা একটি বই ঘটনাক্রমে আমার হাতে আসে এবং তাতে আমি ∮ চিহ্নটা দেখতে পাই।

ক্লেইন: এর পরের ছয় দশকে আপনি হয়তো অন্য যেকোনো পদার্থবিদের চেয়ে বেশি অর্জন করেছেন। আপনাকে কি প্রায়ই অন্যের ঈর্ষার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে?

ওয়াইনবার্গ: খুব একটা নয়। পদার্থবিদেরা যখন অন্যদের কাজ নিয়ে আগ্রহী হন, তখন তাঁরা মূলত তা থেকে শিখতেই চান। এখানে ঈর্ষার খুব একটা সুযোগ নেই, যেমনটা লেখকদের মধ্যে বা শিল্পজগতে দেখা যায়। এর কারণ হয়তো এই যে শিল্পে কে খ্যাতির যোগ্য, তা নির্ধারণ করার জন্য আসলে কোনো বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড নেই। ফলে সহজেই আপনার মনে হতে পারে যে আপনি প্রতারিত হয়েছেন। কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে কোনো একটি নির্দিষ্ট অর্জনের মূল্য নিয়ে সন্দেহের অবকাশ খুব সামান্যই থাকে। আমি যখন বেশ তরুণ ছিলাম, তখন চীন থেকে আসা আমার সহকর্মী সুং দাও লি ও চেন নিং ইয়াং কণাপদার্থবিজ্ঞানে বিস্ময়কর এক ঘটনা আবিষ্কার করেছিলেন। সেটা ‘প্যারিটি ভায়োলেশন’ নামে পরিচিতি পায়। সেটা সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের উভয়কে নোবেল পুরস্কার এনে দেয়। লির বয়স তখনো ৩০ পেরোয়নি। আমি একটু বিরক্ত হয়েছিলাম। কারণ, ওই আবিষ্কার আমার পক্ষে করা সম্ভব ছিল। কিন্তু আমি কোনো ঈর্ষা বোধ করিনি।

ক্লেইন: আপনি কেবল বিষয়টা নিয়ে ভাবেননি—এর জন্য আপনাকে কেবল নিজেকেই দোষ দিতে হতো।

ওয়াইনবার্গ: একদম তা–ই। এরপর যেদিন আমি আমার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কথা জানতে পারলাম, সেদিন আমার স্ত্রী এমন একটি মন্তব্য করেছিল, যা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে বলেছিল, ‘এখন তোমাকে এমন কিছু গবেষণাপত্র লিখতে হবে, যেগুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

ক্লেইন: কারণ, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে নইলে আপনি কাজের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলবেন?

ওয়াইনবার্গ: হ্যাঁ। সে আমাকে অতিরিক্ত প্রশংসার প্রভাব থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল এবং সমাধান করা যায় না, এমন অমীমাংসিত সব প্রশ্নের চোরাবালিতে আটকে যাওয়া থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল।

আরও পড়ুন
সেদিন আমার স্ত্রী এমন একটি মন্তব্য করেছিল, যা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে বলেছিল, ‘এখন তোমাকে এমন কিছু গবেষণাপত্র লিখতে হবে, যেগুলো খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।’

ক্লেইন: অন্য কথায়, তিনি আপনাকে এমন এক বিজ্ঞানীর পরিণতি এড়াতে চেষ্টা করছিলেন। যেমন আইনস্টাইন। তিনি তাঁর জীবনের শেষ বছরগুলো থিওরি অব এভরিথিং বা সবকিছুর তত্ত্বের এক নিষ্ফল অনুসন্ধানে কাটিয়েছিলেন।

ওয়াইনবার্গ: বিশ শতকের আরও অনেক বিখ্যাত পদার্থবিদ টেলিপ্যাথি বা কার্ল জাংয়ের মনোবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। আইনস্টাইনের ব্যর্থতার তুলনায় ওই বিজ্ঞানীদের এই সাধনা তাঁদের আরও বেশি বিপথগামী করেছিল। কোনো একটি ক্ষেত্রে সত্যিই কিছু অবদান রাখার একমাত্র উপায় হলো, সেটিকে একেবারে শিক্ষানবিশের চোখ দিয়ে দেখতে হয়। এ কারণেই আমি কণাপদার্থবিজ্ঞান থেকে কিছুটা মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পরে আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করি। আমি কসমোলজি বা বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাপত্র লিখেছিলাম। সেটা গুটিকয় বিশেষজ্ঞ ছাড়া আর কারও আগ্রহ জাগাতে পারেনি। কিন্তু এভাবেই আমি প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন কিছু শিখতে পেরেছিলাম।

ক্লেইন: আজ যখন প্রকৃতির কথা ভাবেন, তখন আপনার কেমন অনুভূতি হয়?

ওয়াইনবার্গ: প্রকৃতির কথা ভাবলে একটা সৌন্দর্যের অনুভূতি জাগে, জাগে বিস্ময় আর রহস্যবোধ। একটি চূড়ান্ত তত্ত্বের সন্ধানে আমরা যতই বহুদূর এগিয়ে যাই না কেন, আমরা কখনোই জানতে পারব না যে প্রকৃতির নিয়মগুলো ঠিক এমন কেন। একটা রহস্য সব সময়ই থেকে যাবে।

ক্লেইন: আপনার কিছু সহকর্মীসহ অনেকেই একে ঈশ্বর বলে ডাকেন।

ওয়াইনবার্গ: কিন্তু আমি নই।

আরও পড়ুন
আমি কসমোলজি বা বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাপত্র লিখেছিলাম। সেটা গুটিকয় বিশেষজ্ঞ ছাড়া আর কারও আগ্রহ জাগাতে পারেনি। কিন্তু এভাবেই আমি প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন কিছু শিখতে পেরেছিলাম।

ক্লেইন: কেন নয়?

ওয়াইনবার্গ: আমাদের ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই আমি এটা বলি না। পশ্চিমে ‘ঈশ্বর’ শব্দটি শত শত বছর ধরে মোটামুটি একটি সুনির্দিষ্ট অর্থ বহন করে আসছে। এর অর্থ হলো, এমন কোনো সত্তা, একজন স্রষ্টা, যিনি ভালো–মন্দের প্রশ্ন নিয়ে ভাবেন। আইনস্টাইন যখন সৌন্দর্য ও সম্প্রীতির এক মহাজাগতিক আত্মাকে ‘ঈশ্বর’ বলে ডাকেন, তখন তিনি শব্দটিকে সম্পূর্ণ নতুন একটি অর্থ প্রদান করেন। আমার কাছে মনে হয়, তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত একটি শব্দের ওপর একরকম জোর–জুলুম করছেন। শেষমেশ প্রকৃতির কথা ভাবলে আমার ভেতরে এমন কোনো আবেগ জাগে না, যা একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরের প্রতি থাকতে পারে। প্রকৃতির নিয়মগুলো নৈর্ব্যক্তিক। আমাদের নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। অন্য একজন মানুষ কিংবা আমার সিয়ামিজ বিড়ালটির প্রতি আমার যেমন উষ্ণ অনুভূতি কাজ করে, এই নিয়মগুলোর প্রতি তা কাজ করবে কীভাবে?

ক্লেইন: আপনার লেখা দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস বইটিতে আপনি স্ট্যান্ডার্ড মডেল ব্যাখ্যা করেছেন। বইটি একটি বিখ্যাত বাক্য দিয়ে শেষ হয়েছে: ‘মহাবিশ্বকে যত বেশি বোধগম্য বলে মনে হয়, একে ততটাই উদ্দেশ্যহীন বলেও মনে হয়।’ এ কথা দিয়ে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছিলেন?

ওয়াইনবার্গ: আমি বোঝাতে চেয়েছি যে আমরা এমন কিছুই পাই না, যা আমাদের জীবনকে কোনো বস্তুনিষ্ঠ অর্থ দেয়। প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে এমন কিছুর ইঙ্গিত নেই, যা প্রমাণ করে যে এই মহাবিশ্বে আমাদের কোনো বিশেষ জায়গা রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে আমি আমার জীবনকে অর্থহীন মনে করি। আমরা একে অপরকে ভালোবাসতে পারি এবং এই জগৎটাকে বোঝার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু আমাদের জীবনের এই অর্থটুকু আমাদের নিজেদেরই তৈরি করে নিতে হবে। হয়তো আপনার মনে আছে, আপনি যে বাক্যটির কথা উল্লেখ করেছেন, ঠিক তার পরপরই আরেকটি বাক্য আছে: ‘মহাবিশ্বকে বোঝার এই চেষ্টা হলো সেই গুটিকয় কাজের একটি, যা মানবজীবনকে কিছুটা হলেও সস্তা প্রহসনের স্তর থেকে ওপরে তুলে আনে এবং ট্র্যাজেডির মতো কিছু মর্যাদা বা সৌন্দর্য প্রদান করে।’

আরও পড়ুন
প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে এমন কিছুর ইঙ্গিত নেই, যা প্রমাণ করে যে এই মহাবিশ্বে আমাদের কোনো বিশেষ জায়গা রয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে আমি আমার জীবনকে অর্থহীন মনে করি।

ক্লেইন: ট্র্যাজেডি কেন?

ওয়াইনবার্গ: আগে মানুষ যা বিশ্বাস করত, তার সঙ্গে তুলনা করলে এটি একটি ট্র্যাজেডি। মানুষ নিজেদের একটি মহাজাগতিক নাটকের চরিত্র বলে মনে করত! কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি, আমরা বরং কোনো নির্দেশনা ছাড়াই মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা অভিনেতাদের মতো। আর এখানে–সেখানে একটু নাটক, একটু কমেডি নিজে থেকে বানিয়ে নেওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কোনো উপায় নেই। এটিকে আমি একধরনের শূন্যতা হিসেবে দেখি।

* ২০১২ সালের জুলাইয়ে জেনেভার ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা সার্নে (CERN) হিগস বোসন কণা শনাক্ত করা হয়। তবে এই আবিষ্কারের সম্পূর্ণ তাৎপর্য এখনো অধরা রয়ে গেছে। বিশেষ করে ডার্ক ম্যাটার বা গুপ্ত বস্তুর রহস্য সমাধান করা থেকে পদার্থবিজ্ঞানীরা এখনো অনেক দূরে।

ভাষান্তর: আবুল বাসার

*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় জুন সংখ্যায় প্রকাশিত

আরও পড়ুন