রাতে কুয়াশা পড়ছে নাকি ধোঁয়াশা

ঢাকায় বায়ুদূষণফাইল ছবি

৪ মার্চ সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা উঠেছে, ‘বাইরে আজ কুয়াশা পড়েছে। ঘরের বাইরে আজ বিপজ্জনক আবহাওয়া।’ ঢাকার বিষাক্ত বাতাস ও বিপজ্জনক বায়ুমানের কারণেই মূলত এই উদ্বেগের শুরু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই বলেছেন, ‘আজ বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না, বাসায় থাকা উচিত।’ স্কুল বন্ধ থাকায় শিশু-কিশোরদের হয়তো বাইরে বের না হলেও চলছে, তবে কর্মজীবী মানুষদের তো ঠিকই বাইরে যেতে হচ্ছে। হুট করে এই আলোচনা শুরু হয়েছে মূলত কুয়াশার মতো ধোঁয়ার কারণে। সকালে ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় ঘন কুয়াশা দেখা গেছে। আসলে ঢাকার আকাশে এমন কুয়াশা সপ্তাহখানেক ধরেই পড়ছে। ইদানীং রাতে জানালা খুলে বাইরে তাকালে মনে হচ্ছে, শহরটা যেন সাদা ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে গেছে। বিশেষ করে খোলা জায়গাগুলোতে এই ধোঁয়াশা জমছে বেশি।

আরও পড়ুন
ঢাকার আকাশে এমন কুয়াশা সপ্তাহখানেক ধরেই পড়ছে। ইদানীং রাতে জানালা খুলে বাইরে তাকালে মনে হচ্ছে, শহরটা যেন সাদা ধোঁয়ার চাদরে ঢেকে গেছে।

এটি কি কুয়াশা নাকি অন্য কিছু

বুধবার, ৪ মার্চ সকাল ১০টার দিকে ঢাকায় বায়ুর মান বা একিউআই সূচক ছিল ২৭০। বিশ্বের ১২৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। বায়ুর এই মানকে বলা হয় খুব অস্বাস্থ্যকর। দুর্ভাবনার বিষয় হলো, ওই একই সময়ে ঢাকার পাশের এলাকা সাভারের বায়ুর মান ছিল ৬৪০! সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার বিশ্বের বিভিন্ন শহরের বায়ুমান পরিমাপ করে এই সূচক প্রকাশ করে। তাদের স্কেলে ০–৫০ ভালো, ৫১–১০০ মাঝারি, ১০১–১৫০ সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১–২০০ অস্বাস্থ্যকর, ২০১–৩০০ খুব অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০০-এর ওপরে গেলে তাকে দুর্যোগপূর্ণ বা বিপজ্জনক ধরা হয়। অর্থাৎ, সাভারের বায়ুমান ছিল দুর্যোগপূর্ণ মাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি!

বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র পানির কণায় পরিণত হলে সাধারণ কুয়াশা তৈরি হয়। শীতকালে বা ভোরে আমরা যে কুয়াশা দেখি, তা মূলত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু গত এক সপ্তাহ ধরে যা দেখা যাচ্ছে, তা নিছক কুয়াশা নয়; এটি মূলত ধোঁয়াশা। অর্থাৎ ধোঁয়া ও কুয়াশার এক বিষাক্ত মিশ্রণ।

আরও পড়ুন
বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র পানির কণায় পরিণত হলে সাধারণ কুয়াশা তৈরি হয়। শীতকালে বা ভোরে আমরা যে কুয়াশা দেখি, তা মূলত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।

সাভারে বেশ কিছু ইট ভাটা রয়েছে। আবার ঢাকার আমিনবাজারে রয়েছে বিশাল ময়লার ভাগাড়। শুষ্ক মৌসুমে সেখানে ময়লা পোড়ানো হয়, আবার অনেক সময় ময়লায় আপনা-আপনিও আগুন লেগে যায়। সেই বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে সাভারে। একইভাবে মাতুয়াইলের ভাগাড়ের ধোঁয়া প্রবেশ করে ঢাকায়। এর সঙ্গে শহরের যানবাহনের ধোঁয়া, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং দূরের কোনো এলাকার ধূলিঝড় মিলে বাতাসে প্রচুর ক্ষুদ্র কণা জমে থাকে। এগুলোকে বলা হয় পিএম ২.৫ ও পিএম ১০। পিএম ২.৫ কণাগুলো এতই সূক্ষ্ম যে এগুলো শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসের একদম গভীরে ঢুকে সরাসরি রক্তে মিশে যেতে পারে।

মাতুয়াইলের ভাগাড়ের বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসের মাধ্যমে ঢাকায় প্রবেশ করে
ছবি: প্রথম আলো

রাতে যখন বাতাসের গতি কমে যায় এবং তাপমাত্রা নিচে নেমে আসে, তখন দূষিত কণাগুলো আর ওপরে উঠতে পারে না। ফলে পুরো শহরের ওপরে ধোঁয়ার এক অদৃশ্য ঢাকনা তৈরি হয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে টেম্পারেচার ইনভারশন বা তাপমাত্রার বিপরীতায়ন। এই প্রক্রিয়ায় দূষণ মাটির কাছাকাছি আটকে যায়। তাই রাতে আমরা যে সাদা পর্দা দেখি, তাতে পানির কণার চেয়ে দূষণ কণাই বেশি থাকে। আর এ কারণেই এই দূষিত কুয়াশাকে ধোঁয়াশা বলা হয়।

আরও পড়ুন
রাতে যখন বাতাসের গতি কমে যায় এবং তাপমাত্রা নিচে নেমে আসে, তখন দূষিত কণাগুলো আর ওপরে উঠতে পারে না। ফলে পুরো শহরের ওপরে ধোঁয়ার এক অদৃশ্য ঢাকনা তৈরি হয়।

অবস্থা কতটা খারাপ

বায়ুমান সূচক ২০০ পার হলেই তা সবার জন্য ক্ষতিকর। ৩০০-এর ওপরে গেলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। আর ৫০০-এর বেশি মান অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং বিপজ্জনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন মাত্রার দূষণ দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালাপোড়া, গলা খুসখুস, মাথাব্যথা, এমনকি হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও মারাত্মকভাবে বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

দূষণের এই মাত্রা যে শুধু সাময়িক অস্বস্তি দেয় তা নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, নিরাপদ পিএম ২.৫-এর মাত্রা বর্তমান অবস্থার চেয়ে বহু গুণ কম।

এই ধোঁয়াশা আসলে আমাদের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। আমরা যে উন্নয়নের পথে হাঁটছি, তার সঙ্গে যদি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় না রাখি, তবে এর চড়া মূল্য চোকাতে হবে। বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর তালিকার প্রথম দিকেই রয়েছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ। প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষাক্ত বায়ু টেনে নিয়ে আমরা নিজেদের এসব রোগের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। রাতের বেলা জমে থাকা এই ধোঁয়াশা আমাদের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে।

আরও পড়ুন
দূষণের এই মাত্রা যে শুধু সাময়িক অস্বস্তি দেয় তা নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

আমাদের কী করা উচিত

প্রথমত, ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বায়ুমান ২০০-এর ওপরে থাকলে দীর্ঘ সময় বাইরে অবস্থান করা থেকে বিরত থাকা ভালো। প্রয়োজনে বাইরে বের হলে অবশ্যই এন৯৫-এর মতো ভালো মানের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের খোলা মাঠে খেলাধুলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা প্রয়োজন। ঘরের জানালা বন্ধ রাখলে এবং এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করলে কিছুটা উপকার পাওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, সরকারিভাবে কঠোর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজের ধুলা নিয়ন্ত্রণ, মেয়াদোত্তীর্ণ পুরোনো যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, ইটভাটার আধুনিকীকরণ, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পকারখানার দূষণ নির্গমন কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। শহরে বেশি করে গাছ লাগানো ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করা এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের একটি বড় অংশ।

আমরা ভয়ংকর এই দূষণকে স্বাভাবিক ধরে নিয়েই দৈনন্দিন জীবন পার করছি। কিন্তু কোনোভাবেই এটিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যাবে না। বায়ুমান ৩০০ বা ৫০০-এর ওপরে উঠলে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অবিলম্বে জরুরি সতর্কতা জারি করা প্রয়োজন।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলো

সূত্র: আইকিউএয়ার ও প্রথম আলো

আরও পড়ুন