আইনস্টাইনের বিখ্যাত সমীকরণের মানে কি
যদি প্রশ্ন করা হয়, বিজ্ঞানের তথা পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে নামকরা সমীকরণ কোনটি? নিঃসন্দেহে বলা যায়, সবাই চোখ বন্ধ করে বলবেন, E=mc2। যাঁরা বিজ্ঞানের তেমন খোঁজখবর রাখেন না, তাঁদের কাছেও সমীকরণটি পরিচিত। সিংহভাগ মানুষের কাছে বিজ্ঞানের অধিকাংশ সমীকরণ মিসরের হায়ারোগ্লিফিকসের মতো দুর্বোধ্য।
সেখানে এই সমীকরণ অনেকের কাছেই যেন সুপরিচিত ব্র্যান্ডের লোগো। সহজে মনে রাখার মতো। এই সমীকরণের কাঁধে চেপে একসময় পরমাণুর হৃদয় খুঁড়ে কোয়ান্টাম পদার্থবিদেরা বের করে আনেন বিপুল পরিমাণ শক্তি। সেই শক্তির দাপটে ১৯৪৫ সালে তছনছ হয়ে গিয়েছিল জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহর।
পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণগুলো আসলে নিছক বীজগণিতের আঁকিবুঁকি নয়, বরং সেগুলো কোনো না কোনো ভৌত জগৎ ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করে। সাধারণ মানুষের মনের গভীরে এই সমীকরণ গেঁথে যাওয়ার এটিও একটি কারণ। আবার এই সমীকরণ যে ভৌত ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করে, সেটিও সহজ ও বোধগম্য। এখানে সমীকরণের E অর্থ এনার্জি বা শক্তি, m-এর অর্থ মাস বা ভর এবং c-এর অর্থ শূন্যস্থানে আলোর বেগ—যার পরিমাণ সেকেন্ডে ২৯,৯৭,৯২,৪৫৮ মিটার। এটি বলে, শক্তি হলো ভর আর আলোর বেগের বর্গের গুণফলের সমান।
সমীকরণটি ইঙ্গিত করে যে সেগুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু এটুকুই কি সব? এর আসল অর্থ কী? ভর, শক্তি ও আলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয় কীভাবে? আর তাদের মধ্যকার এই সম্পর্ক আমাদের নিজেদের এবং মহাবিশ্বের মৌলিক প্রকৃতি সম্পর্কে কী অর্থ প্রকাশ করে?
আমাদের অধিকাংশেরই ধারণা, ভর হলো সেই বস্তু, যা দিয়ে আমরা বা আমাদের দেহ গঠিত হয়েছে। স্কুলের বিজ্ঞান বইয়েও পড়ানো হয় যে কোনো কিছু পদার্থ হওয়ার অন্যতম শর্ত তার ভর থাকা। ভর নেই মানে, সেটা অপদার্থ!
E=mc2 সমীকরণে E অর্থ এনার্জি বা শক্তি, m-এর অর্থ মাস বা ভর এবং c-এর অর্থ শূন্যস্থানে আলোর বেগ। এটি বলে, শক্তি হলো ভর আর আলোর বেগের বর্গের গুণফলের সমান।
সেই হিসাবে কাউকে অপমান-অপদস্থ করতে আর অপদার্থ বলার উপায় নেই। ভর বলতেই আমরা বুঝি, সেটি ভারী, তাগড়াই। অন্যদিকে কম ভরের কিছু মানে সেটি হালকা-পাতলা, বায়বীয়। নিউটন বলেছিলেন, বস্তুর ত্বরণে যা বাধা দেয়, সেটিই হলো ভর।
একেবারে ছোটবেলা থেকেই এ রকম ধারণা আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে যেতে থাকে। সেটিই ধরা পড়েছে নিউটনের গতির সূত্রে: F=ma। কয়েক শতাব্দী ধরে সমীকরণটি পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রেখেছিল। এখানে F হলো বস্তুতে প্রয়োগকৃত বল, m মানে ভর এবং a হলো ত্বরণ। সূত্রটি থেকে জানা যায়, কোনো বস্তুর ভর অনেক বেশি হলে, তা নাড়াতে অনেক বেশি বল প্রয়োগ করতে হবে। আর ভর কম হলে, তা নাড়ানো যাবে সামান্য ধাক্কাতেই।
সাধারণ হিসাবে, ভর হলো বস্তুর মোট পরিমাণ। বেশি ভরের বস্তু, যেমন পাহাড় বা কোনো গ্রহ বেশি দৃঢ় বা কঠিন বলে মনে হয়। অন্যদিকে শক্তিকে ভাবা হয় ভরের চেয়ে একেবারেই আলাদা কিছু। শক্তিকে বরং তাপ, আলো, আগুন বা গতির সঙ্গে মেলাতে আমরা বেশি পছন্দ করি। আবার একে কোনো ক্ষণস্থায়ী কিছু ভাবা হয়, যা প্রবাহিত হয় বা যাকে স্থানান্তরিত করা যায়। এটি আমাদের কোনো কাজ করার বা কিছু পুড়িয়ে ফেলার ক্ষমতা দেয়। জাদুকরি কোনো কিছুর মতো একে জমিয়ে রাখা যায় এবং প্রয়োজনমতো বের করে দেওয়া যায়।
ভর হলো বস্তুর মোট পরিমাণ। বেশি ভরের বস্তু, যেমন পাহাড় বা কোনো গ্রহ বেশি দৃঢ় বা কঠিন বলে মনে হয়। অন্যদিকে শক্তিকে ভাবা হয় ভরের চেয়ে একেবারেই আলাদা কিছু।
দীর্ঘদিন ধরে ভর ও শক্তি–সম্পর্কিত আমাদের এই সহজাত ভাবনা নিউটনের সূত্রের সঙ্গে বেশ মানানসই ছিল। এমনকি মহাবিশ্বকে আমরা একসময় যেমন ধারণা করতাম, তার সঙ্গেও মিল ছিল সেই ভাবনার।
আমরা ভাবতাম, ভর ও শক্তি পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করলেও এ দুটি পুরোপুরি ভিন্ন। যেমন আমাদের ধারণা, কোনো কাপে কিছু পানি যোগ করলে তার ভর বাড়ে। কিন্তু সেখানে শক্তি যোগ করলে, ভর বাড়বে না, শুধু কাপের পানির অণুগুলোর গতি বাড়বে। মোটকথা, তাপ বাড়ালে কাপে অণুর পরিমাণ বাড়ে না, শুধু অণুগুলোতে আলোড়ন তুলবে।
১৮৮০–এর দশকে পদার্থবিদেরা প্রশ্ন তুলতে লাগলেন, ভর কোথা থেকে আসে? এটি আসলে কী? জবাবে অনেকে ভাবলেন, কোনো বস্তুর ভরের জন্য দায়ী আসলে ইলেকট্রন। কারণ, তখন সবে ইলেকট্রন আবিষ্কার করেছেন পদার্থবিদ জে জে টমসন। তাই তাঁর ঘাড়ে ভরের দোষ চাপাতে চেষ্টা করলেন বিজ্ঞানীরা।
পদার্থবিদেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পান, ইলেকট্রনের মতো কোনো চার্জিত কণা যখন চলাফেরা করে, তখন তা একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি কণার পেছনে ধাক্কা দেয়, যার কারণে কণাটির পক্ষে দ্রুত বেগে চলা কঠিন হয়ে ওঠে। ঘটনাটির এই প্রভাবের সঙ্গে আরেক বিষয়ের মিল খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। ধাক্কা দিয়ে নাড়ানো কঠিন কোনো পদার্থের যেমন ভর থাকে, ইলেকট্রনের প্রভাবও অনেকটা সে রকম। এখান থেকেই পদার্থবিদেরা প্রথম ধারণা পান যে ভর ও শক্তি (চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের শক্তি) স্রেফ আলাদা বিষয় নয়, বরং অন্য কিছুও হতে পারে। কিন্তু সেই অন্য কিছুটা কী?
ইলেকট্রনের মতো কোনো চার্জিত কণা যখন চলাফেরা করে, তখন তা একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি কণার পেছনে ধাক্কা দেয়, যার কারণে কণাটির পক্ষে দ্রুত বেগে চলা কঠিন হয়ে ওঠে।
২
১৯০৫ সালে ঠিক এই সময়ে একটি চমৎকার যুক্তি নিয়ে ময়দানে হাজির হন আলবার্ট আইনস্টাইন। তাতে পদার্থবিজ্ঞানের এই বিতর্কের অবসান হয়। সে সময় আপেক্ষিকতার তাত্ত্বিক ধারণা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন এই জার্মান বিজ্ঞানী। পরস্পরের সাপেক্ষে চলমান বস্তুগুলোর ওপর পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মকানুন কী হবে, সেটিই ছিল আপেক্ষিক তত্ত্বের সারকথা। তখনই প্রথম জানা গেল, আলোর চেয়ে বেশি বেগে কিছুই চলতে পারে না। কোনো ব্যক্তি বা কোনো কিছু কতটা জোরে ছুটছে, তার ওপর আলোর এই বেগ নির্ভর করে না।
আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে মনে হয়, টর্চলাইট হাতে নিয়ে দৌড়ালে আলোর বেগ বাড়বে (অর্থাৎ আলোর মোট বেগ = আপনার দৌড়ানোর বেগ + আলোর বেগ)। কিন্তু আইনস্টাইন বললেন, এ ধারণা ভুল। খুব জোরে ছুটলেও দেখা যাবে, আলো একই গতিতে চলছে। এটিই মহাজাগতিক গতিসীমা। এই মৌলিক সীমার কারণে পৃথিবীতে স্থির থাকা এবং রকেটে চেপে অতিদ্রুত চলা দুই ব্যক্তির মধ্যে কিছু অদ্ভুত প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়।
বিষয়টি বোঝাতে মহাকাশে কোনো পাথর থেকে তাপ নিঃসরণের উদাহরণ টেনেছেন আইনস্টাইন। পাথর থেকে তাপ বেরিয়ে আসবে অবলোহিত আলো রূপে। মানে, ইনফ্রারেড ফোটন। আপনি যদি ওই পাথরের পাশে মহাকাশে ভাসেন, তাহলে সেখানে কিছুই অদ্ভুত বলে মনে হবে না। কিন্তু পাথর থেকে ইনফ্রারেড ফোটন বেরিয়ে আসতে দেখা গেলে এবং তা মাপা হলে দেখা যেত, ওই ফোটনের শক্তি নির্দিষ্ট (আসলে সব ফোটনের শক্তিও নির্দিষ্টই থাকে)।
কিন্তু আপনি যদি পৃথিবীর পাশ দিয়ে দ্রুতগামী কোনো রকেটে থাকেন, তাহলে ভিন্ন কিছু ব্যাপার চোখে পড়ত। নিজের আপেক্ষিক তত্ত্বের সূত্র ব্যবহার করে আইনস্টাইন হিসাব কষে দেখেন, এ ক্ষেত্রে পাথর থেকে বেরিয়ে আসা আলোর কম্পাঙ্ক ভিন্ন হবে। এ ঘটনাকে বলা হয় রিলেটিভিস্টিক ডপলার ইফেক্ট। পুলিশের গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার সময় বা কাছে আসার সময় সাইরেনের শব্দ যে রকম বদলে যায়, এটাও অনেকটা সে রকম। সাইরেনের ক্ষেত্রে শব্দের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিচ্যুতি হয়।
পাথর থেকে তাপ বেরিয়ে আসবে অবলোহিত আলো রূপে। মানে, ইনফ্রারেড ফোটন। আপনি যদি ওই পাথরের পাশে মহাকাশে ভাসেন, তাহলে সেখানে কিছুই অদ্ভুত বলে মনে হবে না।
আবার আমাদের কাছ থেকে কোনো নক্ষত্র বা ছায়াপথ দূরে গেলে আলোর লোহিত বিচ্যুতি ঘটে এবং কাছে আসতে থাকলে ঘটে নীল বিচ্যুতি। কিন্তু পাথরের আলোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটি একটু অদ্ভুত। তার পেছনে রয়েছে আপেক্ষিকতার নিয়মকানুন। কারণ, কোনো ফোটনকে কখনোই আলোর চেয়ে বেশি জোরে বা ধীরে চলতে দেখা যায় না। এর নিট ফল হলো, পাথরের পাশে মহাকাশে ভাসমান কারও কাছে আর রকেটে চেপে দ্রুতবেগে চলা কারও কাছে পাথর থেকে আসা ফোটনের শক্তির পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন হয়। কিন্তু ফোটনগুলো তো দুই ক্ষেত্রেই একই, তাহলে পরিবর্তনটি হচ্ছে কার? নিঃসন্দেহে সেটি অন্য কিছু।
আইনস্টাইনের মতে, পরিবর্তনটি হবে পাথরটির গতিশক্তির। কিন্তু কোনো বস্তুর গতিশক্তি আসে ভর ও বেগ থেকে। কিন্তু এখানে তো ফোটন নিঃসরণের সময় পাথরটির বেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই আইনস্টাইন শেষমেশ সিদ্ধান্তে এলেন, এখানে নিশ্চয়ই ভরের কোনো পরিবর্তন হয়েছে। তিনি অঙ্ক কষে দেখতে পান, পাথরটির ভরের যে পরিবর্তন হয়েছে, তার পরিমাণ ও ফোটনের শক্তির পরিমাণের সঙ্গে আলোর বেগের বর্গের গুণফলের সমান।
অর্থাৎ ফোটনের শক্তি = (পাথরের ভরের পরিবর্তন) × (আলোর বেগ)২। মানে, পাথরটি থেকে যখন ফোটন বেরিয়ে আসছে, তখন পাথরের ভর বদলে যাচ্ছে। ভরের এই পরিবর্তনের পরিমাণ (একে যদি আলোর বেগের বর্গ দিয়ে গুণ করা হয়) আর ফোটনের শক্তি পরিমাণ একদম সমান। এ থেকে মনে হয়, পাথরটির কিছু ভর রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে শক্তিতে, যা ফোটন রূপে বেরিয়ে আসছে। এখানে মনে রাখতে হবে, ফোটনের কোনো ভর নেই, এরা বিশুদ্ধ শক্তি।
কোনো বস্তুর গতিশক্তি আসে ভর ও বেগ থেকে। কিন্তু এখানে তো ফোটন নিঃসরণের সময় পাথরটির বেগের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এই ফলাফল ছিল যুগান্তকারী। কারণ, হাজার হাজার বছর ধরে আমরা ভর ও শক্তিকে পুরোপুরি ভিন্ন বলে ভাবতাম। সেই ভাবনায় আঘাত করল আইনস্টাইনের এই ফলাফল। আইনস্টাইনের সমীকরণ থেকে দেখা গেল, ভর ও শক্তিকে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত এবং একটিকে আরেকটিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, এর মানে আসলে কী? বস্তুর ভরের মতো কোনো কিছু শক্তিতে রূপান্তর হয় কীভাবে? কিংবা শক্তি কীভাবে রূপান্তরিত হয় ভরে? শুরুতে মনে হতে পারে, পাথরের অণুর কিছু পরমাণু কোনো একভাবে ভেঙে বা ক্ষয় হয়। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে ফোটনগুলো। অবশ্য পাথরটির ভর কমে যাওয়ার এটি একটি উপায় হতে পারে। কিন্তু এখানে শুধু এটিই সব নয়। ফোটন বেরিয়ে আসার আগে বা পরে পাথরটির পরমাণুর সংখ্যা একই থাকে। কিন্তু কোনো একভাবে পাথরটির ভর কমে যায়।
বিষয়টি বেশ উদ্ভট। কারণ, কোনো বস্তুর ভর এভাবে রূপান্তর হওয়ার বিষয়টিতে আমরা অভ্যস্ত নই। একটি ঘরে যদি এক কেজি ভরের কোনো ধাতব খণ্ড থাকে, ঘরের এসি চালু করার কারণে সেই ভর কমে বা বেড়ে যাবে বলে আমরা আশা করি না। আবার এক কেজি চিনি ফ্রিজে রাখলেও সেটি এক কেজিই থাকবে বলে আমরা আশা করি। কিন্তু আসলেই কি তা–ই? এখানে আসলে কী ঘটছে, তা বুঝতে হলে আমাদের আরেকটু গভীরে ঢুকতে হবে। বুঝতে হবে, কোনো বস্তুর ভর থাকার মানে আসলে কী। সেখান থেকেই মিলতে পারে এই ধাঁধার সমাধান।
পাথরের অণুর কিছু পরমাণু কোনো একভাবে ভেঙে বা ক্ষয় হয়। আর সেখান থেকেই বেরিয়ে আসে ফোটনগুলো। অবশ্য পাথরটির ভর কমে যাওয়ার এটি একটি উপায় হতে পারে।
৩
সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আমরা নিজেরা কঠিন বা দৃঢ় উপাদান দিয়ে তৈরি বলে মনে করি। কথায় বলে, আমরা যা খাই, নিজেরাই ঠিক তা–ই। আর মানুষ তো বিভিন্ন পদার্থ বা বস্তু খায়। গাছপালার মতো সূর্যের আলো বা ভূতের মতো চাঁদের আলো খায় না। আবার চোখের সামনে নিজের হাত বা আঙুল সামনে আনলেও সেগুলো নিরেট শক্ত বা দৃঢ় দেখতে পাবেন। কাজেই সন্দেহ করার কোনো উপায় নেই।
আরও কাছ থেকে যদি দেখা সম্ভব হতো, কিংবা বলা যায়, দেহের গাঠনিক উপাদানগুলোকে অনেক বড় করে দেখা সম্ভব হতো, তাহলে দেখা যেত, সেখানে খুব বেশি কিছু নেই। দেখা যেত, তার বেশির ভাগই ফাঁকা জায়গা। আপনার দেহের কোনো একটি পরমাণুর দিকে তাকালে দেখা যাবে, এর মধ্যে অনেক শূন্যস্থান রয়েছে। একটি পরমাণুর বেশির ভাগ ভর থাকে তার কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে। কারণ, পরমাণুর ইলেকট্রনের চেয়ে প্রোটন বা নিউট্রনের ভর প্রায় দুই হাজার গুণ বেশি।
প্রোটন আর নিউট্রনকে ভাঙলে পাওয়া যায় কোয়ার্ক। একটি প্রোটন গঠিত হয় দুটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ক পরস্পর যুক্ত হয়ে। নিউট্রন গঠিত হয় দুটি ডাউন আর একটি আপ কোয়ার্কে। কাজেই দেহের বেশির ভাগ ভর জোগায় আসলে এসব কোয়ার্ক। কিন্তু এখানেই আছে আরেক চমক। এই কোয়ার্কগুলোকে আলাদা করতে গেলেই একটি মজার ব্যাপার ঘটতে দেখা যায়। অবশ্য কোয়ার্কদের আলাদা করা যা–তা ব্যাপার নয়, খুব কঠিন। সেটা এখানে আলোচ্য নয়।
প্রোটনের তিনটি কোয়ার্কের ভর একত্রে মাপা হলে ভর পাওয়া যাবে ৯৩৮ MeV/c2। এক MeV/c2 হলো প্রায় ১.৭×১০-৩০ কিলোগ্রাম। কিন্তু প্রোটনটি ভেঙে প্রতিটি কোয়ার্ক আলাদা আলাদাভাবে মাপা হলে আপ কোয়ার্কের ভর পাওয়া যাবে মাত্র ২ MeV/c2 এবং ডাউন কোয়ার্কের ভর পাওয়া যাবে ৪.৮ MeV/c2। সাধারণ যোগ করেই বোঝা যাচ্ছে, বিপুল পরিমাণ ভরের কোনো হদিস নেই এখানে। বেমালুম গায়েব! নিউট্রনের কোয়ার্কগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে প্রোটনের বাকি ভর গেল কোথায়? এই গায়েবি ভর আসে কোথা থেকে?
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, আলাদাভাবে কোয়ার্কদের খুব বেশি ভর নেই। প্রতিটির ভর প্রোটনের মোট ভরের মাত্র ১ শতাংশ। তারপরও কোয়ার্ক তিনটিকে একত্র করলে তাদের ভর ম্যাজিকের মতো প্রায় ১০০ গুণ বেড়ে যায়। যেন তিনটি লেগো খণ্ড একসঙ্গে জুড়ে দিলাম, আর বলা নেই, কওয়া নেই হুট করে তার ভর হয়ে গেল ৩০০ লেগো খণ্ডের সমান। সুকুমার রায়ের ‘হ য ব র ল’র মতো। ‘ছিল রুমাল, হয়ে গেল একটা বেড়াল’। এর মানেটা কী? হুট করে প্রোটনে এই ভর এল কোথা থেকে?
এর উত্তরটা সরল, কিন্তু বিস্ময়কর। আসলে তিনটি কোয়ার্ক একত্র হয়ে গঠন করে প্রোটন বা নিউট্রন। তিনটি কোয়ার্ককে একত্র করতে যে শক্তির প্রয়োজন, প্রোটন বা নিউট্রনের বাকি ভর আসে সেই শক্তি থেকে। আগেই দেখেছি, শক্তিও ভরের মতো আচরণ করে। ধরা যাক, দুটি কণার বন্ধন হিসেবে তাদের মাঝখানে সামান্য কিছু শক্তি আটকে আছে। দেখা যাবে, ওই শক্তিকে অনেক ঠেলা–ধাক্কা দিয়ে চেষ্টা করেও সরানো যাচ্ছে না। অনেক বেশি ভরকে নাড়ানো যেমন কষ্টকর, এটিও অনেকটা সে রকম। কিন্তু কণা দুটিকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে শক্তিটুকু ক্ষয় করে ফেলা যায়, তাহলে কণা দুটিকে সহজেই নাড়ানো যায়। অন্য কথায়, শক্তির নিজের মধ্যেই জড়তা আছে।
শুধু তা–ই নয়, মহাকর্ষ বলও অনুভব করে শক্তি। আটকে পড়া সামান্য শক্তিও ভরের মতো কোনো স্থানকে বাঁকিয়ে দিতে পারে এবং অন্য বস্তুকে আকর্ষণও করতে পারে। কাজেই প্রোটনের ক্ষেত্রে তার ভর হলো তিনটি কোয়ার্ক কণার ভর এবং তাদের একত্রে আটকে রাখা শক্তির যোগফল। কোয়ার্ক কণাদের একত্রে আটকে রাখে শক্তিশালী পারমাণবিক বল। আরও সঠিকভাবে বললে, কোয়ার্কদের শক্ত বন্ধনে আটকে রাখে শক্তিশালী পারমাণবিক বলবাহী গ্লুয়ন কণা।
শুধু প্রোটনের ক্ষেত্রেই নয়, প্রকৃতির সব ক্ষেত্রেই এটি সত্য। কাজেই আপনার বা একজন মানুষের মোট ভর আসলে তার সব কণা এবং কণাগুলোকে একত্রে আটকে রাখতে প্রয়োজনীয় শক্তির যোগফল। সুতরাং কোনো বস্তুর সব কণা আলাদা আলাদা মাপা হলে তার পরিমাণ আদি বস্তুর ভরের চেয়ে অনেক কম পাওয়া যাবে।
প্রোটন আর নিউট্রনকে ভাঙলে পাওয়া যায় কোয়ার্ক। একটি প্রোটন গঠিত হয় দুটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ক পরস্পর যুক্ত হয়ে। নিউট্রন গঠিত হয় দুটি ডাউন আর একটি আপ কোয়ার্কে।
তাহলে হারিয়ে যাওয়া ভরের সমতুল্য শক্তিটি নির্ণয় করা যাবে কীভাবে? সেটি তো আগেই বলা হয়েছে। হ্যাঁ, ঠিকই অনুমান করেছেন, ওই বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 ব্যবহার করে। এই সমীকরণ আসলে আংশিকভাবে সেটিই প্রকাশ করে; অর্থাৎ ভর আর শক্তি সমতুল্য। কাজেই সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আমাদের দেহের বেশির ভাগ বা ৯৯ শতাংশ আমরা ভর হিসেবে ভেবে নিলেও সেগুলো আসলে শক্তি। তাহলে প্রশ্ন আসে, বাকি ১ শতাংশ আসলে কী? সেগুলো আসলেই পদার্থ। তবে তার পরিমাণও কিন্তু খুব বেশি নয়।
গত ১০০ বছরে মৌলিক কণার ভরের প্রকৃতি সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। কোয়ার্ক এবং ইলেকট্রনকে অনেক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও দেখা হয়েছে। কিন্তু এর সেগুলো তার চেয়ে ছোট কোনো কণা দিয়ে তৈরি বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কাজেই বলা যায়, অন্য কোনো ছোট কণা একত্র করতে ব্যবহৃত কোনো শক্তি তাদের ভরের পেছনে জড়িত নেই। তাহলে তাদের ভরের উৎস কী? কোথা থেকে আসে এই ভর?
ইলেকট্রনের প্রকৃতি সম্পর্কে সেই ১৮৮০–এর দশকে জে জে টমসন যে রকম ধারণা করেছিলেন, সেটি সঠিক পথেই ছিল। তখন দেখা গিয়েছিল, ইলেকট্রনকে নাড়ানো বেশ কঠিন কাজ। কারণ, এই কণা চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে। আরও অনেক পরে জানা গেল, এখানে আরেকটি ক্ষেত্রও আছে, যেটা তাদের পেছন থেকে ধাক্কা দেয়। সেটি হলো হিগস ফিল্ড বা হিগস ক্ষেত্র। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে হিগস বোসন কণা। ২০১২ সালে লার্জ হ্যার্ডন কলায়ডারে এই কণার অস্তিত্ব শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, গোটা মহাবিশ্বেই এই কোয়ান্টাম ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। সেগুলো বস্তুকণাদের ঘাড়ে চড়াও হয়ে টানাটানি করছে। তাই তাদের নাড়ানো কঠিন। এখান থেকেই আসলে প্রতিটি কণার ভর আসে। প্রায় প্রতিটি কণাই হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। তবে কণার ভরের উৎসের এটি হলো আংশিক ব্যাখ্যা। পুরো ব্যাখ্যাটি হলো, ভর আসে হিগস ক্ষেত্রের শক্তি থেকে। কিছু কণা হিগস ক্ষেত্রে সংরক্ষিত শক্তির সঙ্গে অনেক বেশি মিথস্ক্রিয়া করে। তাই সেসব কণাকে নাড়ানো কঠিন।
আবার হিগস ক্ষেত্রের সঙ্গে কিছু কণার মিথস্ক্রিয়া বেশ দুর্বল। সেসব কণা নাড়ানোও বেশ সহজ। কাজেই প্রতিটি কণার ভর নির্ভর করে হিগস ক্ষেত্রের শক্তির সঙ্গে ওই কণার যোগাযোগ কতটুকু, তার ওপর। প্রায় ১৩৭০ কোটি বছর আগে মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্বের জন্মের পর সেখানে ছিল কেবল তাপ আর শক্তি। তা থেকে জন্মেছিল কিছু কণা। শুরুতে তারা ভরহীন ছিল। কিন্তু হিগস বোসন কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে কিছু কণা হয়ে গেল ভারী, বাকিগুলো হিগস-বোসন কণার ধার ধারেনি। তাই সেগুলো আজও ভরহীন রয়ে গেছে। মহাবিশ্বে তারাই ছুটে বেড়ায় আলোর বেগে। যেমন ফোটন।
এখান থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারি। কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, কোয়ার্ক ও ইলেকট্রন কণা আসলে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রের ছোট্ট ঢেউ ছাড়া কিছু নয়। আর এই ক্ষেত্র ছড়িয়ে আছে গোটা মহাবিশ্বে। কোয়ান্টাম তত্ত্বে একটি কণা হলো শক্তির বিস্ফোরণ বা শক্তির ঝলক। চিৎকার করলে বা জোরে শব্দ করলে বাতাসে শব্দতরঙ্গের যেমন ঢেউ ওঠে কিংবা সাগরের পানিতে যেমন ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, এটিও তেমন। কাজেই কণারা নিজেও আসলে একধরনের শক্তি।
প্রায় ১৩৭০ কোটি বছর আগে মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্বের জন্মের পর সেখানে ছিল কেবল তাপ আর শক্তি। তা থেকে জন্মেছিল কিছু কণা। শুরুতে তারা ভরহীন ছিল।
৪
কাজেই এখান থেকে কয়েকটা সিদ্ধান্তে আসা যায়। কোনো বস্তুর ভর আসলে ওই বস্তুর ভেতরে কণাগুলোকে আটকে রাখার জন্য তাদের ভেতরের বন্ধনের শক্তি। আবার প্রতিটি কণার ভর আসলে এক প্রকার শক্তি। এর মাধ্যমে আরেকটি বিস্ময়কর উপসংহারে আসা যায়। সেটি হলো, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানে আমরা যেটাকে ভর বলে মনে করি, তার কোনো অস্তিত্ব নেই। আসলে সবকিছুই শক্তি।
এবার সেই মহাকাশের পাথরের কাছে ফেরা যাক। মহাকাশের পাথরটি আসলে ফোটন বিকিরণের সময় এভাবে ভর হারাতে পারে। তবে বস্তুকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার কারণে সেটি ভর হারায় না। সব বস্তুই তো আগে থেকেই শক্তি। কাজেই পাথরটি আসলে একধরনের শক্তি থেকে আরেক শক্তিতে রূপান্তরিত হয় মাত্র। এ ক্ষেত্রে পাথরটি তার অণুগুলোর গতি বা কম্পনের শক্তিকে রূপান্তর করে ফোটনে।
কাজেই মহাকাশে এরপর কোনো পাথর দেখলে ভেবে বসবেন না যে সেটার ভর ও শক্তি আছে; বরং ভাববেন, পাথরটি আসলে একগাদা শক্তির গোলা। তার কিছু শক্তি আছে কণার রূপে, কিছু শক্তি আছে কণাগুলোর ভেতর বন্ধন হিসেবে আর কিছু আছে কণাদের গতি হিসেবে।
অবশ্য বিপরীতটাও ঘটে। পাথরটি সূর্যের আলো শোষণ করে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তাতে শক্তি যোগ হবে। আর বাড়তি শক্তির মানে পাথরটি নাড়ানো আরও কঠিন হবে। মহাকর্ষের কারণে তার ভরও বেড়ে যাবে। অর্থাৎ, কোনো উত্তপ্ত পাথর আসলে ঠান্ডা পাথরের চেয়ে বেশি ভারী। অবশ্য পার্থক্যটা খুব সামান্য।
কারণ, সমতুল্য ভরের পরিবর্তন নির্ণয় করতে হলে ফোটনের শক্তিকে আলোর বেগের বর্গ দিয়ে ভাগ দিতে হয়। আলোর বেগের বর্গ অনেক বড় একটি সংখ্যা। তাই দেখা যাবে, এ ক্ষেত্রে সমতুল্য ভরের পরিমাণ অনেক কম পাওয়া যাবে।
কাজেই E=mc2 সমীকরণ থেকে আমরা পাই: ভর ও শক্তি পরস্পরের সমতুল্য। ইদানীং পদার্থবিদেরা বলতে শুরু করেছেন, ভরও আসলে শক্তির একটা রূপ। এর কারণ, অন্য কিছু ধরনের শক্তি দেখা যায়। যেমন ফোটন। এর শক্তি আছে, কিন্তু কোনো ভর নেই। তবে ভর ও শক্তির ভেতরের গভীর সম্পর্কটা আসলে কী, তা বিখ্যাত সমীকরণ থেকে জানা যায় না।
ভর যে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে, এটুকু জানাই আসলে এই দুইয়ের সবটুকু জানা নয়। আমরা জেনেছি, সব ভরই আসলে শক্তি। কোনো বস্তুর কণাদের শক্তি হয় তাদের বন্ধনের মধ্যে কিংবা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়ার ফলাফল।
তবে শক্তির যে জড়তা আছে বা তার যে ভর আছে, এই ধারণা হজম করতে অনেকের জন্যই কষ্টকর। আসলে অনেক বছর ধরে ভর সম্পর্কে আমরা ভুলভাবে চিন্তা করেছি। সেই ভুল সহজে ভাঙার নয়। নতুন ধারণা অনুসারে, বস্তু বা পদার্থ বলতে আসলে কিছু নেই, সবই শক্তি। এ ধারণা এখন মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। এখন পদার্থবিদেরা মহাবিশ্বে বস্তু আর শক্তিতে পরিপূর্ণ বলে ভাবেন না, বরং গোটা মহাবিশ্ব আছে শুধু শক্তি। এমনকি আমরাও ব্যতিক্রম নই।
সত্যি বলতে, আমরা হলাম শক্তি দিয়ে তৈরি দীপ্তিমান, আলোকময় এক সত্তা। নিজের ভেতর বিপুল শক্তিটা টের পাচ্ছেন? টের পাচ্ছেন নিজের ভেতরের প্রায় অফুরন্ত আলোর ভান্ডারটা? ব্যাপারটি জেনে খুশি লাগছে, তা–ই না? তবে সাবধান! তথ্যটুকু জেনে এখনই আপনার চোখ থেকে লেজার রশ্মি ছুড়তে চেষ্টা করবেন না, কিংবা আঙুল উঁচিয়ে কাউকে ভস্ম করতেও যাবেন না। তাতে কোনো লাভ হবে না।
