প্রবাহ, কম্পন ও শব্দের জাদুকরী বিজ্ঞান

পুকুরে একটা ঢিল ছুড়লে যেমন গোল হয়ে ঢেউ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, বিজ্ঞানের ভাষায় সেটাই হলো তরঙ্গ বা ওয়েভছবি: ড্রিমসটাইম ডটকম

প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে খেয়াল করলে দেখা যায়, চারপাশের প্রতিটি ঘটনায় একধরনের অদৃশ্য ছন্দ লুকিয়ে আছে। পানির স্রোত হোক কিংবা গিটারের তারের কম্পন, পদার্থবিজ্ঞানের এই ছন্দগুলোই আমাদের জীবনকে সচল রাখে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে দেয়। আজ আমরা কথা বলব ফ্লুইড ডায়নামিক্স, তরঙ্গ এবং শব্দের মতো এমন কিছু চমৎকার বিষয় নিয়ে, যা আমরা প্রতিনিয়ত অনুভব করি কিন্তু হয়তো গভীরে গিয়ে দেখার সুযোগ পাই না।

আরও পড়ুন
রেনল্ডস সংখ্যার মান যদি কম হয়, তবে প্রবাহী খুব শান্ত ও মসৃণভাবে চলে। একে বলে ল্যামিনার প্রবাহ। এই সংখ্যার মান যদি খুব বেশি হয়, তখন পানি বা বাতাস আর শান্ত থাকে না।

ফ্লুইড ডায়নামিক্স: প্রবাহের প্রকৌশল

সহজ কথায়, তরল বা গ্যাসের প্রবাহ নিয়ে বিজ্ঞানের যে শাখা কাজ করে, সেটাই ফ্লুইড ডায়নামিক্স। একটি নৌকা যখন পানির বুক চিরে এগিয়ে যায়, তখন সে মূলত দুই ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়। প্রথমটি পানির জড়তা। অর্থাৎ পানির গতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। দ্বিতীয়টি সান্দ্রতা, যা তরল পদার্থের অণুগুলোর মধ্যে ঘর্ষণের সৃষ্টি করে। প্রবাহের এই ধরনগুলো বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা রেনল্ডস নম্বর ব্যবহার করেন, যাকে সংক্ষেপে Re লেখা হয়। বিজ্ঞানী অসবর্ন রেনল্ডসের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। সহজ একটি গাণিতিক সূত্রের সাহায্যে এটি বের করা যায়:

Re = ρvl/μ

এখানে, ρ = প্রবাহীর ঘনত্ব, v = প্রবাহীর বেগ, l = বস্তুর দৈর্ঘ্য বা পাইপের ব্যাস, μ= প্রবাহীর সান্দ্রতার গুণাঙ্ক।

রেনল্ডস সংখ্যার মান যদি কম হয়, তবে প্রবাহী খুব শান্ত ও মসৃণভাবে চলে। একে বলে ল্যামিনার প্রবাহ। এই সংখ্যার মান যদি খুব বেশি হয়, তখন পানি বা বাতাস আর শান্ত থাকে না। চারদিকে তৈরি হয় এলোমেলো ঘূর্ণি ও বিশৃঙ্খলা! একে বলে টারবুলেন্ট প্রবাহ।

ছবি: ফসিল কনসাল্টিং সার্ভিসেস

ফ্লুইড ডায়নামিক্সের সবচেয়ে সুন্দর প্রয়োগ দেখা যায় বার্নোলির নীতির মধ্যে। এই নীতি অনুযায়ী, প্রবাহের গতি বাড়লে তার চাপ কমে যায়। উড়োজাহাজের ডানার ওপরের অংশটা এমনভাবে বাঁকানো থাকে, যাতে ওপরের বাতাসকে অনেক দূর পথ ঘুরে দ্রুত পার হতে হয়। বাতাস দ্রুত চলায় ডানার ওপরের অংশে চাপ কমে যায়, কিন্তু ডানার নিচের বাতাস চলে ধীরগতিতে। তাই সেখানে চাপ থাকে বেশি। নিচের এই বেশি চাপের বাতাস তখন উড়োজাহাজটিকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন লিফট বা ঊর্ধ্বমুখী বল। এভাবেই হাজার টনের উড়োজাহাজ নিমেষেই আকাশে ভেসে বেড়ায়!

আরও পড়ুন
আমাদের চেনা আলো কিন্তু একধরনের অনুপ্রস্থ তরঙ্গ! দৃশ্যমান আলোসহ সব ধরনের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণে বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো তরঙ্গের গতির সঙ্গে সমকোণে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চলে।

তরঙ্গ: শক্তির অদৃশ্য বাহন

পুকুরে একটা ঢিল ছুড়লে যেমন গোল হয়ে ঢেউ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, বিজ্ঞানের ভাষায় সেটাই হলো তরঙ্গ বা ওয়েভ। সহজ কথায়, বাতাস বা পানির মতো কোনো মাধ্যম কিংবা শূন্যস্থানের ভেতর দিয়ে যখন কোনো আন্দোলন এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় শক্তি বয়ে নিয়ে যায়, তাকেই তরঙ্গ বলে। তরঙ্গ কিন্তু মাধ্যমের কণাগুলোকে চিরতরে সরিয়ে দেয় না, শুধু শক্তিটাকে এক হাত থেকে অন্য হাতে চালান করে দেয়!

আমাদের চারপাশে মূলত দুই ধরনের প্রধান তরঙ্গ দেখা যায়। এদের চলার ধরনটা বেশ চমৎকার। একটা অনুপ্রস্থ তরঙ্গ, একটা অনুদৈর্ঘ্য। অনুপ্রস্থ তররঙ্গের ক্ষেত্রে আন্দোলনের দিক ও তরঙ্গের এগিয়ে যাওয়ার দিক একে অপরের সঙ্গে সমকোণে বা ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকে। অর্থাৎ তরঙ্গের শক্তি যদি সামনের দিকে যায়, তবে মাধ্যমের কণাগুলো ওপর-নিচে কাঁপতে থাকে। আমাদের চেনা আলো কিন্তু একধরনের অনুপ্রস্থ তরঙ্গ! দৃশ্যমান আলোসহ সব ধরনের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণে বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্রগুলো তরঙ্গের গতির সঙ্গে সমকোণে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে চলে।

আমাদের চারপাশে মূলত দুই ধরনের প্রধান তরঙ্গ দেখা যায়।একটা অনুপ্রস্থ তরঙ্গ, একটা অনুদৈর্ঘ্য

আর অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের বেলায় আন্দোলন ও তরঙ্গের গতি চলে সমান্তরালভাবে। অর্থাৎ শক্তি যেদিকে যাবে, মাধ্যমের কণাগুলোও ঠিক সেদিকেই সামনে-পেছনে কাঁপবে। ফলে মাধ্যমে কোথাও বাতাস বা কণাগুলো ঠাসাঠাসি করে (সংকোচন), আবার কোথাও ফাঁকা হয়ে (প্রসারণ) যায়। গ্যাস ও তরল পদার্থের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা শব্দতরঙ্গ হলো অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের নিখুঁত উদাহরণ।

পানির ওপরের ঢেউ কিন্তু একাধারে অনুপ্রস্থ এবং অনুদৈর্ঘ্য দুটিই! পানির ওপর একটা কর্ক বা শোলার টুকরো ভাসিয়ে দিলে খেয়াল করবেন, ঢেউ চলে যাওয়ার সময় সেটি কেবল ওপর-নিচ বা সামনে-পেছনে করে না; বরং গোল হয়ে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে।

আরও পড়ুন
অনুদৈর্ঘ্য তরঙ্গের বেলায় আন্দোলন ও তরঙ্গের গতি চলে সমান্তরালভাবে। অর্থাৎ শক্তি যেদিকে যাবে, মাধ্যমের কণাগুলোও ঠিক সেদিকেই সামনে-পেছনে কাঁপবে।

তরঙ্গের তিন চেনা রূপ:

তরঙ্গদৈর্ঘ্য: একটি ঢেউয়ের চূড়া থেকে ঠিক পরের ঢেউয়ের চূড়া পর্যন্ত দূরত্বই হলো তরঙ্গদৈর্ঘ্য।

কম্পাঙ্ক: প্রতি সেকেন্ডে ঠিক কতগুলো ঢেউ একটি নির্দিষ্ট বিন্দু পার হয়ে চলে যেতে পারে, সেটাই তার কম্পাঙ্ক।

বিস্তার: একটি ঢেউ তার স্বাভাবিক অবস্থা থেকে সর্বোচ্চ কতটা উঁচুতে উঠতে পারে, তা-ই হলো তার বিস্তার বা তীব্রতা।

যখন গিটারের কোনো তারে টোকা দেওয়া যায়, তখন তারের দুই প্রান্তের মাঝে তরঙ্গটি আটকে গিয়ে কাঁপতে থাকে
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

সব তরঙ্গই যে কেবল সামনের দিকে ছুটে চলে, তা কিন্তু নয়! কিছু তরঙ্গ এক জায়গায় বন্দী হয়ে আটকে থাকে। এদের বলা হয় স্থির তরঙ্গ। যেমন, আপনি যখন গিটারের কোনো তারে টোকা দেন, তখন তারের দুই প্রান্তের মাঝে তরঙ্গটি আটকে গিয়ে কাঁপতে থাকে। এই স্থির তরঙ্গগুলো সব সময় পূর্ণসংখ্যা বা অর্ধেক সংখ্যার তরঙ্গ তৈরি করে। আর ঠিক এ কারণেই গিটারের তারের দৈর্ঘ্যই ঠিক করে দেয় সেখানে কেমন তরঙ্গদৈর্ঘ্য তৈরি হবে এবং তা থেকে কেমন সুর বের হবে!

আরও পড়ুন
তরঙ্গের কম্পাঙ্ক যত বেশি হবে, বাতাসের চাপ তত দ্রুত ওঠানামা করবে। তখনই আমরা তীব্র বা চিকন সুর শুনতে পাই। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে উচ্চ পিচ।

শব্দ: আমাদের ইন্দ্রিয়ের এক অদ্ভুত কম্পন

শব্দ ছাড়া আমাদের জীবন অনেকটাই নিস্তেজ। বিজ্ঞানের ভাষায়, শব্দ হলো একধরনের চাপের তারতম্য বা কম্পন, যা গ্যাস, তরল কিংবা কঠিন মাধ্যমের ভেতর দিয়ে ঢেউয়ের মতো বয়ে চলে। তবে একটি মজার তথ্য হলো, শূন্যস্থানে শব্দের কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ, শব্দ ভ্রমণের জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। আমাদের কান যখন এই চাপের দোলনকে গ্রহণ করে, তখন তা কানের পর্দার কম্পন তৈরি করে। এই কম্পনই স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং আমরা তা শব্দ হিসেবে উপলব্ধি করি।

আমরা কীভাবে শুনি?

আমরা যে শব্দ শুনি, তার পেছনে রয়েছে আমাদের কানের এক চমৎকার মেকানিজম। বাতাসের সেই অদৃশ্য ঢেউ যখন আমাদের কানের পর্দায় এসে আঘাত করে, তখন পর্দাটি কাঁপতে শুরু করে। এই কম্পন কানের ভেতরের সূক্ষ্ম নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মস্তিষ্ক তখন সেই সংকেত ডিকোড করে আমাদের চারপাশের চেনা শব্দ হিসেবে শোনায়। তরঙ্গের কম্পাঙ্ক যত বেশি হবে, বাতাসের চাপ তত দ্রুত ওঠানামা করবে। তখনই আমরা তীব্র বা চিকন সুর শুনতে পাই। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে উচ্চ পিচ। একজন সুস্থ মানুষ সাধারণত ২০ থেকে ২০ হাজার হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এই শোনার সর্বোচ্চ সীমাটা আস্তে আস্তে কমতে থাকে।

আরও পড়ুন
আমাদের সাধারণ কথাবার্তার তীব্রতা থাকে প্রায় ৬০ ডেসিবল। আর রাস্তা দিয়ে যখন কোনো মোটরবাইকের ইঞ্জিন গর্জন করে চলে যায়, তখন তার তীব্রতা ১০০ ডেসিবলও ছাড়িয়ে যেতে পারে!

শব্দের গতি ও তীব্রতার খেলা

শব্দ কত দ্রুত চলবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সে কোন মাধ্যমের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তার ওপর। যেমন, সমুদ্রপৃষ্ঠে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বাতাসের ভেতর দিয়ে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৪৩ মিটার বেগে ছুটে চলে! মাধ্যম যত ঘন হবে, শব্দের গতিও সাধারণত তত বাড়বে। শব্দ কতটা জোরে হচ্ছে বা এর তীব্রতা কত, তা মাপা হয় ডেসিবল এককে। আমাদের সাধারণ কথাবার্তার তীব্রতা থাকে প্রায় ৬০ ডেসিবল। আর রাস্তা দিয়ে যখন কোনো মোটরবাইকের ইঞ্জিন গর্জন করে চলে যায়, তখন তার তীব্রতা ১০০ ডেসিবলও ছাড়িয়ে যেতে পারে!

ফ্লুইড ডায়নামিক্স থেকে শুরু করে শব্দের সূক্ষ্ম কম্পন—সবকিছুর মূলেই রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের সহজ কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম। আমরা হয়তো প্রতিদিন এসব নিয়ে ভাবি না, কিন্তু আমাদের চারপাশে ঘটে চলা প্রতিটি ঘটনার পেছনেই কাজ করছে বিজ্ঞানের এই দারুণ সব সূত্র। এই সূত্রগুলোই আমাদের শিখিয়েছে, কীভাবে উড়োজাহাজ আকাশে ওড়াতে হয়, কীভাবে সুরের মায়ায় মুগ্ধ হতে, কীভাবে প্রকৃতির ভাষা বুঝতে হয়।

সূত্র: হেজেল মুইরের সায়েন্স ইন সেকেন্ডস বই অবলম্বনে

আরও পড়ুন