পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো কোথা থেকে এল
আপনি যদি একটা পুকুরে ঢিল ছোঁড়েন, সেটা টুপ করে ডুবে যাবে। কণাগুলোকে একসঙ্গে জোরে ধাক্কা দিলে তারা নির্দিষ্ট কিছু নিয়মে ভেঙে আলাদা হয়ে যাবে। আবার একটা সুইচ টিপলেই বাতি জ্বলে উঠবে। আমাদের এই মহাবিশ্ব, তার এত এত মহাজাগতিক নাটকীয়তা ও সৌন্দর্যের পরও, মনে হয় যেন খুব ধারাবাহিকভাবে এবং আগে থেকে অনুমান করা যায় এমন একটা নিয়মে চলছে।
আমার মতো পদার্থবিজ্ঞানীরা এই দারুণ ব্যাপারটির কৃতিত্ব দেন প্রকৃতির নিয়ম বা লজ অব নেচারকে। এই নিয়মগুলো সব জায়গায় একইভাবে কাজ করে। যে মহাকর্ষ বল দূরের নক্ষত্র থেকে আসা আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, সেই একই বল আপনাকেও মাটিতে আটকে রাখে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এরা কখনোই বদলায় না। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের সময় থেকে শুরু করে অনন্তকাল পর্যন্ত এরা একইভাবে সত্যি। পদার্থবিজ্ঞানে এগুলোকে এতই ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেওয়া হয় যে, খুব কম মানুষই এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সত্যি বলতে, এর পেছনে ভালো কারণও আছে। যদি সোজাসুজি প্রশ্ন করা হয়, ‘পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো কোথা থেকে এল?’, তবে মনে হতে পারে ল্যাবরেটরির ভেতরে কেউ যেন জোর করে দর্শনবিদ্যা ঢোকানোর চেষ্টা করছে। এটি আমাদের বেশ ঝুঁকিপূর্ণ পথে নিয়ে যেতে পারে—এমনটা ভাবলে হয়তো আমরা আশা করতে শুরু করব, নক্ষত্রগুলো হঠাৎ অন্যভাবে জ্বলতে শুরু করবে বা পরমাণুগুলো এমনিতেই ভেঙে পড়বে।
কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, প্রকৃতির নিয়মগুলোর জন্ম কোথা থেকে; এই প্রশ্নটা আমরা চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারি না। গত কয়েক বছর ধরে আমি এই বিষয়টি নিয়েই ভাবছি। এর আগে অনেকেই এই নিয়মগুলোর উৎপত্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাঁরা শেষমেশ নতুন কোনো গভীর নিয়মের অবতারণা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে অবশেষে, আমার মনে হয় আমি আরও ভালো কিছু পেয়েছি। আমি এমন একটি কাঠামোর কথা ভাবছি, যা ব্যাখ্যা করে, মহাবিশ্বের শুরুতে বিজ্ঞানের নিয়মগুলো পাগলের মতো বদলাচ্ছিল এবং একটা পর্যায়ে এসে আজকের এই স্থিতিশীল রূপ পেয়েছে। আমি যদি সঠিক হই, তবে এই প্রকৃতির নিয়মগুলো হয়তো মোটেও মৌলিক কোনো কিছু নয়।
যে মহাকর্ষ বল দূরের নক্ষত্র থেকে আসা আলোকে বাঁকিয়ে দেয়, সেই একই বল আপনাকেও মাটিতে আটকে রাখে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এরা কখনোই বদলায় না।
প্রকৃতির মৌলিক নিয়মগুলো আসলে কী
প্রকৃতির নিয়ম বলতে আমি আসলে কী বোঝাচ্ছি? আমি পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান সমীকরণগুলোর কথা বলছি। যেমন, আইজ্যাক নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র; জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ, যা বিদ্যুৎ ও চুম্বকত্ব নিয়ন্ত্রণ করে; এবং আলবার্ট আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশন, যা স্থান-কাল বা স্পেস-টাইমের কাজ করার ধরন ব্যাখ্যা করে। এই সমীকরণগুলোর সঙ্গে আবার কিছু মৌলিক ধ্রুবক জুড়ে দেওয়া থাকে। এগুলো হলো এমন কিছু সংখ্যা, যা সমীকরণের ভেতরে গেঁথে থাকে এবং আমাদের দেখা মহাবিশ্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে। যেমন মহাকর্ষের শক্তি বা একটি ইলেকট্রনের চার্জ। এই সমীকরণ ও ধ্রুবকগুলো শুধু বাস্তবতার কোনো সুবিধাজনক সারমর্ম নয়; এগুলো হলো সেই মূল খুঁটি, যার ওপর পদার্থবিজ্ঞানের পুরো তাত্ত্বিক ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে।
তবে আমরা যদি প্রশ্ন তুলতেই চাই যে প্রকৃতির নিয়মগুলো কোথা থেকে এসেছে, তবে আমাদের একটি অস্বস্তিকর সম্ভাবনার কথা মাথায় রাখতে হবে। এমন একটা সময় ছিল, যখন কোনো নিয়মই ছিল না!। তখনো কোনো কণা তৈরি হয়নি, জ্যামিতি ছিল না, এমনকি সময় বলতেও কিছু ছিল না। পুরো বাস্তবতা ছিল একটা চরম বিশৃঙ্খল জগাখিচুড়ি।
দূরদর্শী পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার এই ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মতো নিয়মকানুনহীন অবস্থাকে নাম দিয়েছিলেন হিগলডি-পিগলডি। এটি কোনো সাধারণ কথা ছিল না। আমি যখন প্রথম হুইলারের এই মন্তব্যটি দেখি, আমার ইংরেজি জ্ঞান ওই হিগলডি-পিগলডি পর্যন্ত পৌঁছাত না, তাই আমি এর অর্থ ডিকশনারিতে খুঁজেছিলাম। এর একটা সমার্থক শব্দ পেলাম হেলটার-স্কেলটার, যেটাকে আমি বিটলসের ওই একই নামের গানটির সঙ্গে মেলালাম। আমার কাছে মনে হলো, এটাই একদম সঠিক অর্থ—এক বেসুরো মহাবিশ্ব, যেখানে গিটারগুলো একদমই সুরে নেই, আর তাল বা স্কেলেরও কোনো ঠিকঠিকানা নেই!।
দূরদর্শী পদার্থবিজ্ঞানী জন হুইলার ওয়াইল্ড ওয়েস্টের মতো নিয়মকানুনহীন অবস্থাকে নাম দিয়েছিলেন হিগলডি-পিগলডি।
সে সময় আমি ছিলাম কসমোলজিস্ট। আমার চারপাশে তখন প্রথাগত তত্ত্বে বিশ্বাসীদের জয়জয়কার। স্ফীতি, ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি নিয়ে মাতামাতি; তাত্ত্বিকরা এগুলোকে মহাবিশ্বের ল্যাম্বডা-সিডিএম মডেল নামে একটি প্যাকেজে ভরে ফেলেছিলেন। এই মডেলে কেন আমাদের এই নিয়মগুলোই আছে, তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে না; বরং এটি বলে যে নিয়মগুলো এমনই এবং সবসময় এমনই ছিল। হয়তো ঠিক এর প্রতিক্রিয়ায় আমি এর বিকল্প কিছু খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। যেমন, এমন সব কসমোলজিক্যাল তত্ত্ব, যেখানে মহাবিশ্বের শুরুর দিকে আলোর বেগ পরিবর্তন হতে পারে। ধারণা যত পাগলাটে হতো, ততই ভালো লাগত!
হুইলারের এই হিগলডি-পিগলডি ধারণাটি আমাকে নেশার মতো আকৃষ্ট করেছিল, আবার একই সঙ্গে আমাকে ভয়ও পাইয়ে দিয়েছিল। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো যদি সত্যিই পরিবর্তিত হতে পারে, এমনকি বিশৃঙ্খলভাবেও, তবে বাস্তবতাকে ধরে রেখেছে কে? এটা কি এমন কোনো প্রশ্ন যার উত্তর পদার্থবিজ্ঞান দিতে পারবে, নাকি এটা শুধু ল্যাবরেটরির সাদা কোট গায়ে চড়ানো কোনো দর্শনবিদ্যা?
বেশির ভাগ পদার্থবিজ্ঞানী এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতেই পছন্দ করেন। কিন্তু আমাদের আসলে সেই বিলাসিতা করার সুযোগ নেই। পদার্থবিজ্ঞানের মূল কাজই হলো, মহাবিশ্ব কেন এমন হলো এবং অন্যরকম কেন হলো না—তা ব্যাখ্যা করা। আর আমরা যদি নিয়মগুলোকে এমনিতেই ধরে নিই, তবে সেই ব্যাখ্যার কাজটা অসম্পূর্ণই থেকে যায়। আপনি যদি এই প্রশ্নের গভীরে যেতে থাকেন, তবে এটি আপনাকে আরও একটি চরম ধারণার দিকে নিয়ে যাবে—এমন এক সময়ের কথা, যখন কোনো নিয়মই ছিল না!
পদার্থবিজ্ঞানের মূল কাজই হলো, মহাবিশ্ব কেন এমন হলো এবং অন্যরকম কেন হলো না—তা ব্যাখ্যা করা।
পবিত্র নিয়ম ও প্রতিসাম্য
নিয়মহীন মহাবিশ্বের কথা শুনলে বেশির ভাগ পদার্থবিজ্ঞানীই প্যাভলভের কুকুরের মতো একটা বৈদ্যুতিক শক খান! অবশ্য এর পেছনে ভালো কারণও আছে। এর একটা কারণ আমি আগেই বলেছি, এই নিয়মগুলো আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কাঠামোর একেবারে অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই আমাদের একটা সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করে যে, এই নিয়মগুলো চিরস্থায়ী, নিখুঁত এবং অপরিবর্তনশীল হওয়া উচিত।
কিন্তু এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কাজ করে, আর তা হলো প্রতিসাম্য। জ্যামিতির ভাষায়, একটি আকার তখনই প্রতিসম হয়, যখন আপনি সেটিকে ঘুরিয়ে দিলেও সেটি দেখতে একই রকম থাকে। পদার্থবিজ্ঞানেও ঠিক একই ধরনের সিমেট্রি আছে। আপনি আজ বা কাল, এখানে বা অন্য কোথাও, উত্তর বা দক্ষিণ দিকে মুখ করে যে কোনো পরীক্ষা চালান না কেন, ফলাফল একই হবে; অন্তত আমরা এমনটাই ধরে নিই।
জ্যামিতির ভাষায়, একটি আকার তখনই প্রতিসম হয়, যখন আপনি সেটিকে ঘুরিয়ে দিলেও সেটি দেখতে একই রকম থাকে।
এই ধরে নেওয়ার প্রভাব বিশাল! এই ব্যাপারটি প্রথম সবার সামনে আনেন গণিতবিদ এমি নোয়েদার, ১৯১৮ সালে। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের কারণে তাঁর ক্যারিয়ার বছরের পর বছর বাধাগ্রস্ত হলেও, তাঁর কাজ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল। নোয়েদার দেখিয়েছিলেন, প্রতিটি অবিচ্ছিন্ন প্রতিসাম্য—অর্থাৎ স্থান বা কালের মধ্যে মসৃণ পরিবর্তনের পরও যে প্রতিসাম্য বজায় থাকে—তা একটি সংরক্ষিত রাশির জন্ম দেয়। তিনি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছিলেন, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো যদি সব জায়গায় একই হয়, তবে এর যৌক্তিক অর্থ হলো ভরবেগ অবশ্যই সংরক্ষিত থাকতে হবে। তার মানে, সব বস্তুর মধ্যে ভাগাভাগি হওয়া মোট ভরবেগ কখনো বদলায় না। সংরক্ষিত রাশিগুলো হয়তো সংঘর্ষের সময় এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে স্থানান্তরিত হতে পারে, কিন্তু এদের মোট পরিমাণ সব সময় স্থির থাকে।
তবে একটি সিমেট্রি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো যদি এক মুহূর্ত থেকে পরের মুহূর্তে একই থাকে, যাকে আমরা টাইম-ট্রান্সলেশন ইনভ্যারিয়েন্স বলি; তবে এর মানে হলো শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস করা সম্ভব নয়। নিজের জায়গায় এই ধারণাটি ঠিক আছে। সমস্যা হলো, এর উল্টোটাও সত্যি! আপনি যদি বিশ্বাস করেন, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তবে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি লঙ্ঘিত হয়। একটি ভাঙলে অন্যটিও রক্তক্ষরণে মারা যাবে! আমার অনেক সহকর্মীর জন্যই এটি একটি বড় সমস্যা। কারণ পদার্থবিজ্ঞানের নীতিগুলোর মধ্যে শক্তির সংরক্ষণশীলতাকে সবচেয়ে পবিত্র বলে মানা হয়।
জ্যামিতির ভাষায়, একটি আকার তখনই প্রতিসম হয়, যখন আপনি সেটিকে ঘুরিয়ে দিলেও সেটি দেখতে একই রকম থাকে।
নিয়মহীন এক মহাবিশ্বকে বশে আনা
তবুও কিছু পদার্থবিজ্ঞানী ভয় পাননি। এই বিদ্রোহের পূর্বসূরি ছিলেন পল ডিরাক, যিনি কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং স্পেশাল রিলেটিভিটি একত্র করার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ডিরাক ছিলেন ভীষণ খামখেয়ালি স্বভাবের। নিজের স্বভাবের মতোই, ১৯৩৭ সালে ইংল্যান্ডের ব্রাইটনে হানিমুনে থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম চরম একটি গবেষণাপত্র লিখেছিলেন!
ওই পেপারে ডিরাক এক দুঃসাহসিক প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্রকৃতির ধ্রুবকগুলো, অর্থাৎ আমাদের মৌলিক সূত্রগুলোতে থাকা ওই গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাগুলো মহাবিশ্বের বয়স তুলে ধরে। এটি যদি সত্যি হয়, তবে ধ্রুবকগুলো আসলে মোটেও ধ্রুবক নয়, বরং তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিবর্তিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো আর চিরস্থায়ী বা সময়হীন থাকে না।
কয়েক দশক পর, আমার বন্ধু লি স্মোলিন বিবর্তিত নিয়মের এই ধারণাকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যান। লির এই প্রস্তাবটিকে বলা হয় কসমোলজিক্যাল ন্যাচারাল সিলেকশন বা মহাজাগতিক প্রাকৃতিক নির্বাচন। এটি একটি সাধারণ অপ্রচলিত ধারণা থেকে শুরু হয়—ব্ল্যাকহোল হয়তো মহাজাগতিক কোনো শেষ রাস্তা নয়। বরং, প্রতিটি ব্ল্যাকহোল তার সীমানার বা দিগন্তের ওপারে একটি নতুন সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের জন্ম দেয়, যা অনেকটা মহাজাগতিক সন্তানের মতো। এই ধারণাটি পুরোপুরি রূপকথা নয়। সাধারণ আপেক্ষিকতা ব্ল্যাকহোলের ভেতরে স্থান-কালের চরম পরিবর্তনের অনুমতি দেয়, এবং এর কিছু সমাধানকে নতুন অঞ্চলে যাওয়ার সেতু হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
প্রতিটি ব্ল্যাকহোল তার সীমানার বা দিগন্তের ওপারে একটি নতুন সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের জন্ম দেয়, যা অনেকটা মহাজাগতিক সন্তানের মতো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্মোলিন বলেছিলেন, এই প্রক্রিয়ায় নিয়ম এবং ধ্রুবকগুলো নিখুঁতভাবে কপি হয় না। প্রতিটি নতুন মহাবিশ্ব আগেরটার তুলনায় সামান্য পরিবর্তিত ধ্রুবক নিয়ে জন্মায়। কণার ভরের শক্তিতে অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন থাকে। কিছু মহাবিশ্ব অন্যদের তুলনায় ব্ল্যাকহোল তৈরি করতে বেশি পারদর্শী হয়। ফলে তারা তাদের ধ্রুবকগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতেও বেশি পারদর্শী হয়। বহু প্রজন্ম ধরে, সফল ধ্রুবক থাকা মহাবিশ্বগুলোই আধিপত্য বিস্তার করে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এই ধারণাটি কিন্তু হুইলারের সেই পুরোপুরি হিগলডি-পিগলডি অবস্থা থেকে একটু দূরেই থেমে যায়। হুইলারের ভাবনায়, সমীকরণে বসানো ধ্রুবকগুলো শুধু বিবর্তিতই হয় না, সমীকরণগুলো নিজেও অনবরত বদলাতে থাকে; আদৌ যদি সেখানে সমীকরণ বলে কিছুর অস্তিত্ব থাকে।
কিন্তু দাঁড়ান, নোয়েদারের সময় থেকে যে বড় বাধাটি আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল, তার কী হবে?। ওই যে, আপনি যদি প্রকৃতির নিয়মগুলোকে বদলানোর অনুমতি দেন, তবে আপনাকে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি থেকে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে! দীর্ঘদিন ধরে একে বিবর্তিত নিয়ম নিয়ে কাজ না করার একটি বড় কারণ হিসেবে ধরা হতো। কিন্তু গত দুই বছরে আমি অবশেষে বুঝতে পেরেছি, ব্যাপারটি আসলে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমি এর মধ্যে একটি বিশাল সুযোগের দরজা দেখতে পেয়েছি!
আপনি যদি প্রকৃতির নিয়মগুলোকে বদলানোর অনুমতি দেন, তবে আপনাকে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি থেকে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে!
কীভাবে একটি মহাবিশ্ব তৈরি করা যায়
ব্যাপারটা হলো, কিছু কিছু পরিস্থিতিতে শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যাবে না—এই বিষয়টি খুব ঝামেলার। যেমন ধরুন, বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের কথা। বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, আজ আমরা যত পদার্থ ও শক্তি দেখছি, তার সবকিছুই মহাবিশ্বের একেবারে শুরুতে উপস্থিত থাকতে হবে। আর এটি মহাবিশ্বের শুরুটাকে বাধ্য করে অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দুতে পরিণত হতে। কিন্তু এর আসল অর্থ কী, তা আমরা জানি না, আর এই অসীমত্ব আমাদের সমীকরণগুলোকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। তবে আমরা যদি এই শর্তটিকে একটু শিথিল করি, তবে মহাবিশ্বে পদার্থ তৈরি হওয়াটা হঠাৎ ঘটা কোনো ঘটনা থাকবে না, বরং এটি একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে। এমন কিছু যা প্রসারিত, নির্ভরশীল এবং ভুল হতে পারে।
নীতিগতভাবে, এটি একটি বড় সমস্যার সমাধান করে। কিন্তু এই গল্পের আরেকটি দিকও আছে। পদার্থ ও শক্তি যদি তৈরি করা যায়, তবে সেগুলো ধ্বংসও হতে পারে। যে প্রক্রিয়া এক হাতে দেয়, সে অন্য হাতে নিয়েও নেয়। তাই আমাদের এমন কোনো ব্যাখ্যা দরকার, যা বোঝাতে পারবে কীভাবে এই প্রক্রিয়ার শেষে এসে আমরা শূন্যতার বদলে কিছু একটা পাই। যেমন, আমাদের চারপাশের এই মহাবিশ্ব।
মহাবিশ্বে পদার্থ তৈরি হওয়াটা হঠাৎ ঘটা কোনো ঘটনা থাকবে না, বরং এটি একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হবে। এমন কিছু যা প্রসারিত, নির্ভরশীল এবং ভুল হতে পারে।
গত বছর প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে, আমার পিএইচডি শিক্ষার্থী পাওলো বাসানি এবং আমি, ইভোল্যুশনারি বায়োলজি এবং ফিন্যান্সিয়াল ম্যাথমেটিকস থেকে কিছু হাতিয়ার ধার নিয়েছি। এই দুই শাস্ত্র এমন সব সিস্টেম নিয়ে কাজ করে যা কখনোই স্থির থাকে না, এবং বিবর্তিত নিয়মের ভেতরেই প্রকৃত র্যান্ডমনেসকে জায়গা দেয়। আমাদের এই মডেলে, স্থিতিশীল নিয়ম তৈরি হওয়ার আগে মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর দিকে কোনো কিছুর ওপরই ভরসা করা যেত না। ধ্রুবকগুলো পাগলের মতো ওঠানামা করত। সংরক্ষণের নিয়মগুলো চরমভাবে ব্যর্থ হতো। পদার্থ এলোমেলোভাবে তৈরি হতো, আবার ধ্বংসও হতো। ধনাত্মক শক্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যতটা ছিল, নেগেটিভ এনার্জিরও ঠিক ততটাই ছিল; সৃষ্টির সম্ভাবনা যতটা, ধ্বংসের সম্ভাবনাও ঠিক ততটাই। ছক্কার এক দানে আপনি যে পদার্থগুলো পেলেন, পরের দানেই হয়তো সেগুলো আবার হারিয়ে যেতে পারে।
মহাবিশ্ব তখন আক্ষরিক অর্থেই জুয়া খেলছিল; হয়তো কোনো ভালো দানে বেশ কিছু উদ্বৃত্ত জমিয়ে ফেলছিল, আর পরক্ষণেই আবার সব হারিয়ে ফেলছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়মগুলো বদলাতে থাকে, ততক্ষণ পদার্থের রূপে পাওয়া কোনো লাভই আর নিরাপদ নয়। সামান্য একটি খারাপ ওঠানামা সবকিছু ধুয়েমুছে সাফ করে দিতে পারে। স্থায়ী কিছু পেতে হলে আপনাকে এমন একটা উপায় বের করতে হবে, যেন এই প্রক্রিয়াটা একটা জায়গায় এসে থামে এবং মহাবিশ্ব যা যা অর্জন করেছে, সেগুলো যেন আটকে যায়।
সৌভাগ্যবশত, আমাদের বিশৃঙ্খল মহাবিশ্বের মতো র্যান্ডম সিস্টেমগুলোতে একটি অন্তর্নির্মিত বৈশিষ্ট্য থাকে। এর ফলে তারা এমন একটি অবস্থায় গিয়ে হোঁচট খেয়ে আটকে যেতে পারে, যেখান থেকে তারা আর বের হতে পারে না। একে বলা হয় শোষণকারী অবস্থা। যেমন ধরুন, কোনো মিউটেশন যখন পুরো জনসংখ্যার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, কোনো কোম্পানি যখন দেউলিয়া হয়ে বাজার থেকে হারিয়ে যায়, অথবা কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়া যখন সম্পূর্ণ হয়ে যায়। প্রতি ক্ষেত্রেই সিস্টেমটি এমন একটি অবস্থায় পৌঁছায়, যেখান থেকে তার গতিশীলতা আর কোনো নতুন চাল দেওয়ার সুযোগ দেয় না, ফলে এই এলোমেলো পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
পদার্থ এলোমেলোভাবে তৈরি হতো, আবার ধ্বংসও হতো। ধনাত্মক শক্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যতটা ছিল, নেগেটিভ এনার্জিরও ঠিক ততটাই ছিল।
আমাদের ক্ষেত্রে, এই অ্যাবজর্বিং স্টেট হলো সেই বিশৃঙ্খল বিবর্তনের ভেতরের এমন একটি নির্দিষ্ট বিন্দু, যেখানে এসে নিয়মগুলো বাধ্য হয়ে স্ফটিকের মতো শক্ত হয়ে যায়, এবং তাদের এলোমেলো বদলানোর প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি ও ধ্বংসের সেই দ্বৈত খেলাটিও বন্ধ হয়ে যায়। কিছু মহাবিশ্ব সেই বিন্দুতে এসে পৌঁছায় একেবারে খালি হাতে বা বিশাল দেনা মাথায় নিয়ে। আবার কেউ কেউ পৌঁছায় দারুণ দৌড় শেষ করে। আর যেহেতু সৃষ্টি ও ধ্বংসের খেলাটি এখন বন্ধ হয়ে গেছে, তাই তারা তাদের অর্জনগুলোকে নিজেদের কাছেই রেখে দিতে পারে। আমরা হলাম সেই অর্জিত লাভ!
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, মহাবিশ্বে শৃঙ্খলা নির্বাচন করা হয়েছে এটি খুব সুন্দর বা সত্য বলে নয়, বরং এটি টিকে থাকে এবং যা তৈরি করেছে তা ধরে রাখতে পারে বলে। এভাবে চিন্তা করলে, আমাদের ধ্রুবকগুলোর মান বর্তমানে যেমন আছে তেমনই কেন কিংবা এমন অনেক দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত রহস্যকে আর ততটা জাদুকরী মনে হয় না। ধ্রুবকগুলোর মান যে একেবারেই অদ্বিতীয় বা অনন্য হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই; এগুলোকে কেবল দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার যোগ্য হতে হবে।
এটি পরীক্ষা করা বেশ কঠিন হবে, তবে একেবারে অসম্ভব নয়। এটি খোঁজার সবচেয়ে পরিষ্কার জায়গা হলো সময় মাপার অতি-সূক্ষ্ম যন্ত্রগুলো। অ্যাটমিক ক্লক বা পারমাণবিক ঘড়িগুলো এখন এতটাই স্থিতিশীল যে, এগুলো মৌলিক ধ্রুবকগুলোর অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তনও ধরতে পারে। যেহেতু বিভিন্ন ঘড়ি এই ধ্রুবকগুলোর ওপর ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নির্ভর করে, তাই ধ্রুবকে যেকোনো পরিবর্তন ঘড়িগুলোর সময়কে ধীরে ধীরে একে অপরের থেকে আলাদা করে দেবে, যা প্রমাণ করবে যে নিয়মগুলো সত্যিই পরিবর্তিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আমাদের পরিমাপগুলো এতটাই সূক্ষ্ম যে, বর্তমানে যদি এমন কোনো প্রভাব থেকেও থাকে, তা অবশ্যই অত্যন্ত ক্ষুদ্র হবে। কিন্তু ঠিক এই কারণেই এটি একটি প্রতিশ্রুতিশীল পরীক্ষা। এত সূক্ষ্ম ঘড়ির কাছে নিয়মগুলোর অতি সামান্যতম কাঁপুনিও লুকানোর কোনো জায়গা পাবে না!।
অ্যাটমিক ক্লক বা পারমাণবিক ঘড়িগুলো এখন এতটাই স্থিতিশীল যে, এগুলো মৌলিক ধ্রুবকগুলোর অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তনও ধরতে পারে।
এই সমস্ত কাজ আমাকে ২০০৩ সালের দিকে শেখা একটি বড় শিক্ষাকে মনে করিয়ে দেয়। তখন আমি লি স্মোলিনের সঙ্গে দুই বছর একটি বাড়ি শেয়ার করেছিলাম। আমরা দুজনেই তখন কানাডার ওয়াটারলুতে সদ্য গড়ে ওঠা পেরিমিটার ইনস্টিটিউট ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিকসের গবেষক ছিলাম। লির একটি চমৎকার লাইব্রেরি ছিল, যেখানে দর্শনের ধ্রুপদি এবং সাধারণ বইপত্র সব জায়গায় স্তূপ করে রাখা থাকত।
লির সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে, দার্শনিক বিষয়ে আমি ছিলাম সাধারণ মানের একজন গোঁড়া মানুষের মতো। আমি বিশ্বাস করতাম, পদার্থবিজ্ঞানীদের মেটাফিজিকস নিয়ে কাজ করার কোনো দরকার নেই, নিয়ম বা ব্যাখ্যার প্রকৃতি নিয়ে মাথা ঘামানো অন্যদের কাজ।
কিন্তু লির লাইব্রেরিতেই আমি অন্যান্য অনেক কিছুর পাশাপাশি দার্শনিক পল ফায়রাবেন্ডের কাজের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই। তিনি গোঁড়া বিজ্ঞানকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে এবং একটি বহুত্ববাদ বা প্লুরালিজম-এর পক্ষে ছিলেন—শুধু মানব সংস্কৃতিতেই নয়, বিজ্ঞানের পদ্ধতি এবং তত্ত্বগুলোতেও। লির সঙ্গে আমার বৈজ্ঞানিক আলোচনাগুলোতে এই চেতনা দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছিল। আমরা প্রায়ই আমাদের যুক্তিগুলো কোথায় গিয়ে পৌঁছায় তা দেখার জন্য এলোমেলোভাবে একে অপরের বিপক্ষে অবস্থান নিতাম। এটি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং একটি শক্তি। বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রস্তাব করা কোনো ফুটবল দলকে সমর্থন করার মতো ব্যাপার নয়; এখানে অনিয়ন্ত্রিত বহুগামিতা বা একই সঙ্গে একাধিক তত্ত্বে বিশ্বাস করাটা বেশ গ্রহণযোগ্য!।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, খোদ মহাবিশ্বও হয়তো একই রকমভাবে ফায়রাবেন্ডের বহুত্ববাদ অনুসরণ করে। সে হয়তো পাগলের মতো সব তত্ত্ব একবার করে পরখ করে দেখে, এলোমেলোভাবে প্রতিটি ফুটবল দলকে সমর্থন দেয়, যতক্ষণ না এমন কাউকে পাওয়া যায় যে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট স্থিতিশীল। এই প্রক্রিয়ায়, মহাবিশ্ব আবিষ্কার করে কোন জিনিসটা আসলে কাজ করে। এটি খুব নিখুঁত বা আগে থেকে নির্ধারিত ছিল বলে নয়, বরং এটি এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকে যে তাকে আমাদের নিয়তি বলে ভুল হয়!