দূরত্ব ও সরণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়

আপাতদৃষ্টিতে দূরত্ব এবং সরণ শব্দ দুটি একই মনে হলেও পদার্থবিজ্ঞানে এদের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতালছবি: জেমিনি এআই

মহাবিশ্বের সবকিছুই গতিশীল। হয় প্রত্যক্ষভাবে, নয়তো পরোক্ষভাবে। মানুষ যখন থেকে হাঁটতে শুরু করেছে, তখন থেকেই দূরত্বের ধারণা আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা, স্কুলে বা অফিসে যাওয়া, রিকশায় চড়া, আঁকাবাঁকা গলি পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো; সবই গতির নানা রূপ। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের চোখে আমাদের এই প্রাত্যহিক চলাফেরাকে মাপা হয় খুব নিখুঁত ও আলাদা দুটি রাশির মাধ্যমে। এই রাশি দুটি হলো দূরত্ব এবং সরণ।

আপাতদৃষ্টিতে শব্দ দুটি একই মনে হলেও পদার্থবিজ্ঞানে এদের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। এই পার্থক্য বোঝা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এর মাধ্যমেই গতিবিদ্যার প্রথম দরজাটা খুলে যায়।

প্রথমে দূরত্বের কথায় আসা যাক। ধরা যাক, একটা বস্তু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেল। বস্তুটি যে পথটুকু পাড়ি দিল, এর মোট দৈর্ঘ্যকেই দূরত্ব বলে। ধরুন, আপনি বাসা থেকে বেরিয়ে আঁকাবাঁকা গলি, বাজার এবং মোড় পেরিয়ে ২ কিলোমিটার হেঁটে একটি পার্কে পৌঁছালেন। আপনার পায়ের ছাপ যেখান দিয়ে গেছে, পুরো পথের মোট মাপই হলো অতিক্রান্ত দূরত্ব।

একটা বস্তু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেল। বস্তুটি যে পথটুকু পাড়ি দিল, এর মোট দৈর্ঘ্যকেই দূরত্ব বলে
ছবি: শাটারস্টোক

একটা গাড়ির মিটারের কথা ভাবুন। মিটার মূলত এই দূরত্বই মাপে। আপনি সোজা রাস্তায় গেলেন নাকি দশবার ঘুরে ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছালেন, তা নিয়ে মিটারের কোনো মাথাব্যথা নেই। চাকা যতক্ষণ ঘুরবে, মিটার ততক্ষণ পথের দৈর্ঘ্য মাপতে থাকবে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় দূরত্ব হলো স্কেলার রাশি। কারণ, এর কেবল মান আছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দিক নেই। আপনি উত্তর দিকে হাঁটলেন নাকি দক্ষিণ দিকে, তা দূরত্বের ক্ষেত্রে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। আপনি হাঁটলেই দূরত্ব বাড়বে, এটি কখনোই শূন্য বা ঋণাত্মক হবে না।

আরও পড়ুন
ধরুন, একটা বস্তু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেল। বস্তুটি যে পথটুকু পাড়ি দিল, এর মোট দৈর্ঘ্যকেই দূরত্ব বলে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় দূরত্ব হলো স্কেলার রাশি। কারণ, এর কেবল মান আছে।

অন্যদিকে, সরণ হলো দূরত্বের একেবারে কাঠখোট্টা ও নিয়মতান্ত্রিক রূপ। কোনো ধরনের আঁকাবাঁকা পথ এখানে অচল। এখানে শুধু দুটি জায়গা গুরুত্বপূর্ণ—প্রাথমিক বিন্দু এবং শেষ বিন্দু। প্রাথমিক বিন্ধু মানে যেখান থেকে আপনি যাত্রা শুরু করেছেন। আর শেষ বিন্দু মানে যেখানে গিয়ে আপনার যাত্রা শেষ হয়েছে। মাঝপথে আপনি কী করেছেন, কোথায় চা খেতে দাঁড়িয়েছেন বা কতগুলো গলি ঘুরেছেন, তার কোনো হিসাবই সরণের খাতায় আসবে না।

সরণ দিকের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু দূরত্ব দিকের উপর নির্ভরশীল নয়
ছবি: শাটারস্টোক

এবার প্রাথমিক বিন্দু থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত একটি কাল্পনিক সরলরেখা টানুন। এই রেখার দৈর্ঘ্যই হবে আপনার সরণ। অর্থাৎ, দুটি বিন্দুর মধ্যবর্তী সবচেয়ে কম এবং সোজাসুজি দূরত্বই হলো সরণ। এই সোজা রেখাটি একটি নির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে; যেমন শুরু থেকে শেষের দিকে। তাই সরণ হলো একটি ভেক্টর রাশি। একটি ভেক্টর রাশির মান এবং দিক উভয়ই থাকে। তাই আপনি শুধু বলতে পারবেন না যে একটা গাড়ির সরণ ১০ মিটার। আপনাকে বলতে হবে, গাড়ির সরণ ১০ মিটার উত্তর দিকে বা দক্ষিণ দিকে। অর্থাৎ, দিক ছাড়া সরণের ধারণা অসম্পূর্ণ।

সুতরাং এখানেই আমরা দূরত্ব ও সরণের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা পেয়ে গেলাম।

আরও পড়ুন
দুটি বিন্দুর মধ্যবর্তী সবচেয়ে কম এবং সোজাসুজি দূরত্বই হলো সরণ। এই সোজা রেখাটি একটি নির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে; যেমন শুরু থেকে শেষের দিকে। তাই সরণ হলো একটি ভেক্টর রাশি।

২.

ধরা যাক, আপনি একটা বটগাছের নিচ থেকে হাঁটা শুরু করলেন। ৪ ঘণ্টা ঘুরে ঘুরে আবার ফিরে এলেন সেই বটগাছের নিচে। এখানে আপনার প্রাথমিক ও শেষ বিন্দু একই। তাই ৪ ঘণ্টা হাঁটার পরও আপনার সরণ হবে শূন্য! অন্যদিকে, দূরত্ব কখনো শূন্য হবে না। আপনি স্থান পরিবর্তন করেছেন মানেই কিছু না কিছু পথ পাড়ি দিয়েছেন। ফলে আপনার প্রাথমিক ও শেষ বিন্দুর মধ্যে দূরত্বের মান যোগ হয়েছে।

আবার ধরা যাক, আগের ওই বটগাছের নিচে একটা বৃত্তাকার পথ আছে। আপনি A বিন্দু থেকে হাঁটতে শুরু করলেন। ধরুন, ১০ মিনিট পর আপনি পুরো পথটা পাড়ি দিলেন, অর্থাৎ আবার A বিন্দুতে ফিরে এলেন। এখানে প্রাথমিক ও শেষ বিন্দু এক হলেও আপনি পুরো ২০০ মিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন। তাই আপনার অতিক্রান্ত দূরত্ব ২০০ মিটার। সরণের মতো এখানে সরলরেখার হিসাব খাটে না। আবার দিক বদলালেও দূরত্বের মান কমে না। তাই আপনি প্রাথমিক অবস্থান থেকে যেদিকেই যান, কিছু না কিছু পথ আপনাকে পাড়ি দিতেই হবে; আর দূরত্ব তাই কখনোই শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই।

ছবি: জেমিনি এআই

সরণের মান ঋণাত্মকও হতে পারে, যা শুধু ভেক্টর রাশিতেই সম্ভব। ধরা যাক, আপনি A বিন্দু থেকে উত্তর দিকে যাচ্ছেন। এখানে আমরা উত্তর দিকটাকে ধনাত্মক ধরে নেব। ৩০ মিটার পথ পাড়ি দিয়ে আপনি B বিন্দুতে পৌঁছালেন। সেখান থেকে ইউটার্ন নিয়ে আবার A বিন্দুতে ফিরে এলেন। কিন্তু A বিন্দুতে থামলেন না; এগিয়ে চললেন আরও দক্ষিণ দিকে। আরও ৪০ মিটার পথ অতিক্রম করার পর আপনি C বিন্দুতে গিয়ে থামলেন।

আরও পড়ুন
আপনি প্রাথমিক অবস্থান থেকে যেদিকেই যান, কিছু না কিছু পথ আপনাকে পাড়ি দিতেই হবে; আর দূরত্ব তাই কখনোই শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই।

আপনার সরণ হবে A থেকে C বিন্দু পর্যন্ত সরলরেখা বরাবর দূরত্বের সমান। A ও C বিন্দুর মধ্যে দূরত্ব ৪০ মিটার। তাই বলে কি সরণের মান শুধু ৪০ মিটার হবে? না, সরণ হবে মাইনাস ৪০ মিটার! কারণ, আমরা প্রাথমিক বিন্দু A থেকে উত্তর দিকটাকে ধনাত্মক ধরেছিলাম। তা ছাড়া আপনি যাত্রাও শুরু করেছিলেন B-এর দিকে, অর্থাৎ উত্তর দিকে। তাই B-এর বিপরীত দিক, অর্থাৎ C-এর দিক (দক্ষিণ দিক) হবে ঋণাত্মক। এ কারণেই সরণের মান ঋণাত্মক হবে। আবার আপনি যে প্রথমে A থেকে B বিন্দু পর্যন্ত সোজা পথে ৩০ মিটার পাড়ি দিয়ে পুনরায় ফিরে এসেছিলেন, তার কোনো মূল্যই সরণের কাছে নেই!

দূরত্ব সব সময় সর্বোচ্চ যতটা পথ পাড়ি দেওয়া হয়েছে, সেটার মানই প্রকাশ করে। কিন্তু সরণ সব সময় প্রাথমিক বিন্দু থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথের হিসাব কষে। সমতলে প্রাথমিক থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত সোজা সরলরেখাই হলো সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ।

ধরা যাক, পাহাড়ের কোলঘেঁষে একটি শহর আছে। পাহাড়ের ঠিক অপর পাশেই আছে দ্বিতীয় আরেকটি শহর। এখন প্রথম শহর থেকে দ্বিতীয় শহরে যেতে হলে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু পথ ধরে গাড়ি চালিয়ে যেতে হবে। ধরা যাক, এই পথের মোট দূরত্ব ৬০ কিলোমিটার। কিন্তু আপনার সরণ ৬০ কিলোমিটার নয়। আপনার সরণ হবে প্রথম শহর থেকে দ্বিতীয় শহরের মধ্যকার সোজাসুজি সরলরেখার সমান। পাহাড়ের ভেতর দিয়ে কাল্পনিক সোজা একটা সুড়ঙ্গ কাটলে যে সরলরেখা পাওয়া যাবে, তার দৈর্ঘ্যই হবে আপনার সরণ। ধরা যাক, সেটা মাত্র ১০ কিলোমিটার।

মোটকথা, দূরত্ব ও সরণকে আমরা একই রাশি ভেবে ভুল করলেও এদের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। মানের ব্যবধানও অনেক কমবেশি হতে পারে। সরণ ধনাত্মক, ঋণাত্মক, এমনকি শূন্যও হতে পারে। কিন্তু দূরত্ব কখনো শূন্য হবে না, এটি কখনো ঋণাত্মকও হবে না।

আরও পড়ুন
দূরত্ব সব সময় সর্বোচ্চ যতটা পথ পাড়ি দেওয়া হয়েছে, সেটার মানই প্রকাশ করে। কিন্তু সরণ সব সময় প্রাথমিক বিন্দু থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথের হিসাব কষে।

দূরত্ব ও সরণের পার্থক্য বোঝা কি খুবই জরুরি? হ্যাঁ, জরুরি। কারণ, আপনি যদি পদার্থবিজ্ঞান ভালোভাবে শিখতে চান, তাহলে গতিবিদ্যা আপনাকে জানতেই হবে। আর গতিবিদ্যায় হাতেখড়ি নিতে হলে দূরত্ব ও সরণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখতে হবে। এই দুই রাশির সূক্ষ্ম পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলেই দ্রুতি ও বেগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এবং জানা যায় এদের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলোও।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন