স্কেলার ও ভেক্টর রাশি কী, এদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়

ভেক্টর রাশি ও স্কেলার রাশির উদাহরণছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ - ১৮

পদার্থবিজ্ঞানে রাশি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা কিছু পরিমাপযোগ্য, পদার্থবিজ্ঞানে তাকেই রাশি বলে। রাশি কী, রাশি ও এককের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে আমরা দ্বিতীয় অধ্যায়ে আগেই আলোচনা করেছি। পরিমাপযোগ্য এই রাশিগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, একটি হলো স্কেলার অন্যটি ভেক্টর রাশি।

স্কেলার রাশি

যেসব রাশির শুধু মান আছে, কিন্তু কোনো দিক নেই, তাদের স্কেলার রাশি বলে। যেমন, একটি পাথরের ভর ৩০ কেজি হলে এখানে শুধু ৩০ কেজি মানটাই যথেষ্ট, দিক বলার কোনো প্রয়োজন নেই। তাই ভর হলো অদিক বা স্কেলার রাশি। একইভাবে, একটি কাজ করতে আপনার ১ ঘণ্টা সময় লাগলে এখানে সময় হলো একটি রাশি। কাজটা করতে ১ ঘণ্টা বা ৩৬০০ সেকেন্ড লেগেছে। এখানেও শুধু মানটাই কাজে লাগছে, দিকের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই সময় একটি স্কেলার রাশি।

স্কেলার রাশির উদাহরণ
ছবি: সায়েন্স নোট ডটঅর্গ

তেমনি, কোনো বস্তুর তাপমাত্রা মাপতেও দিকের প্রয়োজন হয় না। তাই তাপমাত্রাও স্কেলার রাশি। এ ছাড়া বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, আয়তন, ঘনত্ব, কাজ, দূরত্ব এবং দ্রুতি সবই স্কেলার রাশির উদাহরণ।

যেসব রাশির শুধু মান আছে, কিন্তু কোনো দিক নেই, তাদের স্কেলার রাশি বলে। যেমন, একটি পাথরের ভর ৩০ কেজি হলে এখানে শুধু ৩০ কেজি মানটাই যথেষ্ট, দিক বলার কোনো প্রয়োজন নেই।

ভেক্টর রাশি ও বেগের ধারণা

দ্রুতি কী? কোনো বস্তু এক সেকেন্ডে যতটুকু পথ পাড়ি দেয়, তাকে দ্রুতি বলে। এই ব্যাপারে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। দ্রুতির সংজ্ঞা যদি এটি হয়, তাহলে বেগ কী? দ্রুতি ও বেগের সংজ্ঞা প্রায় কাছাকাছি হওয়ায় আমরা প্রায়ই দ্রুতিকে বেগ বলে ভুল করি।

ভেক্টর রাশির উদাহরণ
ছবি: সায়েন্স নোট ডটঅর্গ

বেগ হলো একটি ভেক্টর রাশি। নির্দিষ্ট দিকে কোনো বস্তু এক সেকেন্ডে যে দূরত্ব পাড়ি দেয়, তাকে বেগ বলে। অর্থাৎ বেগের সঙ্গে দিক সরাসরি জড়িত। শুধু বেগ নয়, যেসব রাশির মান ও দিক উভয়ই আছে, তাদের ভেক্টর রাশি বলে। পরিচিত কয়েকটি ভেক্টর রাশি হলো সরণ, বেগ, ত্বরণ, বল, ওজন, ভরবেগ, কৌণিক ভরবেগ, টর্ক ইত্যাদি।

নির্দিষ্ট দিকে কোনো বস্তু এক সেকেন্ডে যে দূরত্ব পাড়ি দেয়, তাকে বেগ বলে। অর্থাৎ বেগের সঙ্গে দিক সরাসরি জড়িত। শুধু বেগ নয়, যেসব রাশির মান ও দিক উভয়ই আছে, তাদের ভেক্টর রাশি বলে।

সরণ ও দূরত্বের পার্থক্য

সরণ এবং দূরত্বের ক্ষেত্রেও আমাদের অনেক সময় ঝামেলা হয়। কোনো বস্তু যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অবস্থান বদলায়, তখন নির্দিষ্ট দিকে তার অতিক্রান্ত রৈখিক দূরত্বকে সরণ বলে। বস্তুটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার সময় ঠিক কোন দিকে গেল, তা এই রাশির ভেতর লুকিয়ে থাকে। তাই সরণ একটি ভেক্টর রাশি।

সরণ দিকের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু দূরত্ব দিকের উপর নির্ভরশীল নয়
ছবি: শাটারস্টোক

অন্যদিকে দূরত্ব হলো যেকোনো দিকে অতিক্রান্ত মোট পথ। ঢাকা থেকে যশোরের দূরত্ব বোঝানোর জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিকের প্রয়োজন হয় না। তাই দূরত্ব হলো স্কেলার রাশি। দূরত্ব ও সরণের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য আছে, তা নিয়ে আমরা ২০তম পর্বে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব।

কোনো বস্তু যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় অবস্থান বদলায়, তখন নির্দিষ্ট দিকে তার অতিক্রান্ত রৈখিক দূরত্বকে সরণ বলে। যেহেতু সরণ দিক ও মানের উপর নির্ভর করে, তাই এটি একটি ভেক্টর রাশি।

রাশির মান: ধনাত্মক, ঋণাত্মক ও শূন্য

এবার আসা যাক রাশিগুলোর মানের কথায়। স্কেলার রাশির মান সব সময় ধনাত্মক বা শূন্য হবে; এটি ঋণাত্মক হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ভেক্টর রাশির মান ধনাত্মক, ঋণাত্মক কিংবা শূন্য—যেকোনোটিই হতে পারে।

ধরা যাক, একটি বস্তু A বিন্দু থেকে প্রথমে ডান দিকের B বিন্দুতে গেল। সেখান থেকে ইউটার্ন নিয়ে আবার A বিন্দুতে ফিরে এল। ধরি, A থেকে B-এর মাঝখানের দূরত্ব ২০ মিটার। বস্তুটি A থেকে B-তে গিয়ে আবার ইউটার্ন নিয়ে A বিন্দুতে ফিরে আসতে মোট ৪০ মিটার পথ পাড়ি দিল। স্কেলার রাশি দূরত্ব-এর ক্ষেত্রে বস্তুটি মোট ৪০ মিটার পথ অতিক্রম করেছে।

কিন্তু আমরা যদি ভেক্টর রাশি সরণ-এর কথা চিন্তা করি, হিসাবটা অন্য রকম হবে। ধরা যাক, A থেকে B-এর দিকটি ধনাত্মক। অর্থাৎ প্রথম পর্যায়ে বস্তুটির সরণ হলো +২০ মিটার। ইউটার্ন নেওয়ার পর তার দিক বদলে গেল। বিপরীত দিকে ফিরে এসে বস্তুটি যখন আবার A বিন্দুতে পৌঁছাল, তখন উল্টো দিকের যাত্রায় তার সরণ হলো -২০ মিটার।

ছবি: আইড্রিম ক্যারিয়ার

তাহলে A থেকে B-তে গিয়ে আবার A-তে ফিরে আসা পর্যন্ত বস্তুটির মোট সরণ হলো: (+২০) + (-২০) = ০ মিটার! এখানে দিক আছে বলেই বস্তুটি ৪০ মিটার পথ পাড়ি দেওয়ার পরও তার মোট সরণ শূন্য হলো।

আবার সরণ ঋণাত্মকও হতে পারে। ধরা যাক, বস্তুটি A থেকে B-তে গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে A বিন্দুতে পৌঁছানোর পরও থামল না। সেটি A বিন্দু পার হয়ে আরও বাঁ দিকে C বিন্দু পর্যন্ত গিয়ে থামল। ধরি, A থেকে C-এর রৈখিক দূরত্ব ১০ মিটার। যেহেতু আমরা A থেকে ডান দিকের পথকে ধনাত্মক ধরেছি, তাই বাঁ দিকের C বিন্দুর অবস্থান হবে ঋণাত্মক (-১০ মিটার)।

তাহলে A থেকে যাত্রা শুরু করে B-তে গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে C-তে পৌঁছানো পর্যন্ত বস্তুটির মোট সরণ দাঁড়াবে: (+২০) + (-২০) + (-১০) = -১০ মিটার। সুতরাং ভেক্টর রাশির মান ঋণাত্মকও হতে পারে।

স্কেলার রাশির মান সব সময় ধনাত্মক বা শূন্য হবে, এটি ঋণাত্মক হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ভেক্টর রাশির মান ধনাত্মক, ঋণাত্মক কিংবা শূন্য—যেকোনোটিই হতে পারে।

ভেক্টরের গাণিতিক নিয়ম ও প্রতীক

স্কেলার রাশির যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ হয় সাধারণ বীজগাণিতিক নিয়মে। কিন্তু ভেক্টর রাশির যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা গাণিতিক পদ্ধতি আছে। তাই ভেক্টরের হিসাব-নিকাশ সাধারণ বীজগণিতের নিয়মে করলে ভুল হবে।

খাতায় লেখার সময় ভেক্টর ও স্কেলার রাশির মধ্যে পার্থক্য বোঝানোর জন্য ভেক্টর রাশিগুলোর প্রতীকের ওপর তীর চিহ্ন লাগিয়ে দেওয়া হয়। যেমন—u, v ও y যদি তিনটি ভেক্টর রাশি হয়, তবে সাধারণ অক্ষরে লিখলে তা বোঝার উপায় নেই। তাই এদের ভেক্টর হিসেবে বোঝাতে মাথার ওপর তীর চিহ্ন দিয়ে লেখা হয়। যেমন ū, ⊽ ও ў।

লেখক: সাংবাদিক