পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ১৬
গতির রকমফের আছে। প্রতিটি গতিরই নানা ধরন আছে, রয়েছে নানা দশা। পর্যাবৃত্ত গতির একটি বিশেষ রূপ হলো সরল ছন্দিত গতি। তবে মনে রাখতে হবে, সব পর্যাবৃত্ত গতিই কিন্তু সরল ছন্দিত গতি নয়। তাহলে এটি কী? নামেই পরিচয়!
সরল ছন্দিত গতি হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের পর্যাবৃত্ত বা স্পন্দন গতি। এ ক্ষেত্রে একটি বস্তু একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দুপাশে কাঁপতে বা দুলতে থাকে। এই নির্দিষ্ট বিন্দুটিকে বলা হয় সাম্যবিন্দু বা কেন্দ্রবিন্দু। সাম্যবিন্দুতে বস্তুর বেগ থাকে সর্বোচ্চ।
কেন্দ্রবিন্দু থেকে বস্তুটি যত সামনে বা পেছনে এগোয়, এর বেগ তত কমতে থাকে। এরপর একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে (বিস্তার বা চরম বিন্দুতে) গিয়ে বেগ শূন্য হয়ে যায়। বেগ শূন্য হওয়ার পর বস্তুটি আবার বিপরীত দিকে অর্থাৎ কেন্দ্রবিন্দুর দিকে এগোতে থাকে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেগ বাড়তে থাকে।
কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এলে বেগ আবারও সর্বোচ্চ হয়। এরপর বস্তুটি জড়তার কারণে বিপরীত দিকে এগিয়ে যায় এবং অন্য প্রান্তের চরম বিন্দুতে গিয়ে আবারও বেগ শূন্য হয়। এভাবেই বস্তুটি কেন্দ্রবিন্দুর দিকে বারবার ফিরে আসে এবং দুলতে থাকে।
সরল ছন্দিত গতির সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো সরল দোলক। একটি সুতায় কোনো ভারী বস্তু ঝুলিয়ে দিলে তা ডানে-বাঁয়ে দুলতে থাকে। দুলতে দুলতে বস্তুটি যখন ঠিক খাড়া বা ভূমি বরাবর আসে, সেই বিন্দুটাই হলো কেন্দ্রবিন্দু। গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের সেকেন্ডের কাঁটা বা পেন্ডুলামের গতি হলো সরল ছন্দিত গতির সবচেয়ে চমৎকার উদাহরণ। এ ছাড়া শিশুর দোলনাও একধরনের সরল দোলক।
সরল ছন্দিত গতি হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের পর্যাবৃত্ত বা স্পন্দন গতি। এ ক্ষেত্রে একটি বস্তু একটি নির্দিষ্ট বিন্দুর দুপাশে কাঁপতে বা দুলতে থাকে। এই নির্দিষ্ট বিন্দুটিকে বলা হয় সাম্যবিন্দু বা কেন্দ্রবিন্দু।
সরল দোলকের গতিবিষয়ক সত্যিকারের কাজটি প্রথম করেছিলেন বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি। একটি গির্জার ঝুলন্ত ঝাড়বাতির দুলুনি দেখে সরল দোলকের চরিত্র ও ধর্মের খোঁজ পেয়ে যান তিনি। এ বিষয়ে আমরা ১৪তম পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। শুধু সরল দোলক বা পেন্ডুলাম নয়, সরল ছন্দিত গতির আরও উদাহরণ আছে। স্প্রিংয়ে ঝোলানো কোনো বস্তুর দুলুনিও সরল ছন্দিত গতির অন্যতম উদাহরণ। স্প্রিংয়ে কোনো বস্তু ঝুলিয়ে টেনে ছেড়ে দিলে বস্তুটি ওপর-নিচে দুলতে থাকে। এই ওপর-নিচ বরাবর সরল ছন্দিত গতি সৃষ্টি হয়।
টিউনিং ফর্ক বা সুরশলাকায় আঘাত করলেও এর বাহু দুটো সামনে-পেছনে কাঁপতে থাকে। ফলে জন্ম হয় সরল ছন্দিত গতি। সপ্তদশ শতকে নিউটনের সমসাময়িক ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস সরল ছন্দিত গতি ব্যবহার করে সময় পরিমাপক যন্ত্র তৈরি করেন। এই ঘড়ি এখন পেন্ডুলাম ঘড়ি নামে পরিচিত। অর্থাৎ আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও সরল ছন্দিত গতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে শব্দবিজ্ঞানে এর গুরুত্ব অপরিসীম। কোথাও কোন শব্দ হচ্ছে কিংবা আমরা কথা বলছি, এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সরল ছন্দিত গতি। শুধু শব্দের জন্ম হলেই তো চলবে না, সেটাকে দূরদূরান্তে পৌঁছে দেওয়ার কাজটা করে শব্দতরঙ্গ। বাতাস শব্দকে সামনের দিকে ঠেলে দেয়—শুধু এটুকু তথ্য দিয়ে শব্দতরঙ্গের নিখুঁত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। শব্দতরঙ্গ কীভাবে ছড়িয়ে পড়ে, কীভাবে বাতাসের অণুগুলো স্পন্দিত হয়ে শব্দকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়, এর বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা দিতে পারে কেবল সরল ছন্দিত গতির সূত্রগুলো।
সপ্তদশ শতকে নিউটনের সমসাময়িক ডাচ বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান হাইগেনস সরল ছন্দিত গতি ব্যবহার করে সময় পরিমাপক যন্ত্র তৈরি করেন। এই ঘড়ি এখন পেন্ডুলাম ঘড়ি নামে পরিচিত।
গিটারের তারের কম্পন ও সুর সৃষ্টির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সরল ছন্দিত গতির ধারণা। বৈদ্যুতিক ক্রিয়া আসলে কম্পন গতিরই ফল। এসি বা অল্টারনেটিং কারেন্টও সরল ছন্দিত গতির সূত্রগুলো মেনে চলে। এসি কারেন্টে বৈদ্যুতিক প্রবাহ একবার সামনের দিকে প্রবাহিত হয়, পরক্ষণেই আবার পেছন দিকে ফিরে আসে। তাই বিদ্যুৎগতিবিদ্যায় সরল ছন্দিত গতির প্রভাব ব্যাপক।
ক্ল্যাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের মতো কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতেও রয়েছে সরল ছন্দিত গতির ব্যবহার। পরমাণু কিংবা ইলেকট্রনের মতো বস্তুকণার যেমন কণা ধর্ম আছে, তেমনি আছে তরঙ্গ ধর্ম। সেসব তরঙ্গ ধর্মের ব্যাখ্যা দেয় কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় তো তরঙ্গ ধর্ম হুট করে আকাশ থেকে পড়েনি! সাধারণ তরঙ্গগতিবিদ্যার সূত্রগুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আধুনিকীকরণ করেই তবেই বিজ্ঞান আজকের পর্যায়ে এসেছে। তাই শেষমেশ আধুনিক কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতেও প্রাচীন সরল ছন্দিত গতি বড় ভূমিকা রাখে।