কঠিন পদার্থের তাপীয় প্রসারণ এবং প্রসারণ সহগের সম্পর্ক

গ্রীষ্ম বা বর্ষায় তারগুলো অনেকটাই ঝুলে পড়েছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ১৫

পদার্থের তাপমাত্রিক ধর্মের একটা হলো আয়তন প্রসারণ। তাপ প্রয়োগ করলে বস্তুর আয়তন বাড়ে। কীভাবে বাড়ে বা কেন বাড়ে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে অণুর বিন্যাসে। যেকোনো পদার্থ অসংখ্য অণু দিয়ে তৈরি। কঠিন পদার্থে অণুগুলো পাশাপাশি ঠাসাঠাসি করে থাকে এবং অণুগুলোর মধ্যে থাকে শক্তিশালী আণবিক বন্ধন। তাই এদের ভেতর ফাঁক থাকে না বললেই চলে। 

এবার কঠিন পদার্থে তাপ প্রয়োগ করুন। অণুগুলো কাঁপতে শুরু করবে। ফলে অণুরা একে অপরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করবে। এতে তাদের আণবিক বন্ধন কিছুটা আলগা হয়ে যায়, কিন্তু একেবারে ভেঙে যায় না। ফলে অণুদের মধ্যে কিছুটা ফাঁক তৈরি হয়। এভাবে প্রতিটা অণু একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যায় বলেই পদার্থের সামগ্রিক আয়তন কিছুটা বাড়ে।

এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই আছে। একটু আশপাশের বৈদ্যুতিক তারগুলো পুরো বছর জুড়ে দেখুন। ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে দেখবেন, তারগুলো বেশ টানটান থাকে। কিন্তু বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে তারগুলো যেন অনেকটাই ঝুলে পড়ে। এর কারণ কী?

কারণ হলো, শীতে পরিবেশের তাপমাত্রা অনেক কম থাকে। তাই বৈদ্যুতিক তারের ভেতরকার অণুগুলো খুব কাছাকাছি বা সংকুচিত অবস্থায় থাকে। কিন্তু গ্রীষ্ম বা বর্ষায় পরিবেশের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ফলে তারের ভেতরকার অণুগুলোর মধ্যে ফাঁক তৈরি হয়। এতে বেড়ে যায় তারের দৈর্ঘ্য ও ব্যাস। দৈর্ঘ্য বেড়ে যায় বলেই তার ঝুলে পড়ে। আবার শীতকালে ঠিক তার উল্টো ঘটনা ঘটে।

কঠিন পদার্থে তাপ প্রয়োগ করলে অণুগুলো কাঁপতে শুরু করবে। ফলে অণুরা একে অপরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করবে। এতে তাদের আণবিক বন্ধন কিছুটা আলগা হয়ে যায়, কিন্তু একেবারে ভেঙে যায় না।

কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা নির্দিষ্ট থাকে। তাই তাপ দিলে এর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান হারে বাড়ে। কিন্তু মনে রাখবেন, সমান বাড়া ও সমপরিমাণ বাড়া কিন্তু এক কথা নয়। আমাদের অনেক বইয়ে এই ব্যাপারটা স্পষ্ট করে বলা থাকে না। বলা হয়, তাপ দিলে কঠিন বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমানভাবে বাড়ে। কথাটা এক অর্থে ঠিক। সমানভাবে বা সমান হারে বাড়ে, কিন্তু সম পরিমাণে নয়। 

ধরা যাক, একটা বস্তুর দৈর্ঘ্য ১০ মিটার, প্রস্থ ৫ মিটার ও উচ্চতা ৩ মিটার। আবার ধরে নিই, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ প্রয়োগ করলে এর প্রসারণ হয় ১ শতাংশ। তার মানে, তাপ প্রয়োগে এর দৈর্ঘ্য বেড়ে যায় ১০ সেন্টিমিটার, প্রস্থ বাড়ে ৫ সেন্টিমিটার ও উচ্চতা বাড়ে ৩ সেন্টিমিটার। সবদিকেই সমান হারে বা ১ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু সমপরিমাণ বাড়ছে না (১০, ৫ ও ৩ সেমি এক নয়)। তাই সমান হারে বাড়ছে বলাই ভালো। সমপরিমাণও বাড়তে পারে, যদি বস্তুটি ঘনক হয়। অর্থাৎ বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান হলে।

তাপ দিলে কঠিন বস্তুর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমানভাবে বাড়ে। কথাটা এক অর্থে ঠিক। সমানভাবে বা সমান হারে বাড়ে, কিন্তু সম পরিমাণে নয়।

প্রসারণ সহগ কী

তাপ প্রয়োগ করলে যেকোনো কঠিন বস্তুর আয়তন বাড়ে, সেকথা আগেই বলেছি। কিন্তু সব বস্তুর আয়তন সমান হারে বাড়ে না। ধাতব পদার্থের আয়তন বাড়ে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু রাবার, কাঠ ইত্যাদির আয়তন বাড়ে খুব কম। কোনটা বেশি বাড়ছে, কোনটা কম বাড়ছে, এ ব্যাপারটা তাপগতিবিদ্যার সূত্রকে কিছুটা ঝামেলায় ফেলে দেয়। পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক সূত্রগুলো সার্বজনীন। তাই একই সূত্র যেকোনো জায়গায়, যেকোনো অবস্থায় প্রয়োগ করা যায়।

তাপ প্রয়োগ করলে কঠিন বস্তুর আয়তন প্রসারণের একটা গাণিতিক সূত্র আছে। আছে, কিন্তু এই সূত্রে কিছুটা ঝামেলা তৈরি হয়। কারণ সব বস্তুর প্রসারণের হার সমান নয়। কোনটা কম বাড়ছে, কোনটা বেশি বাড়ছে, এই ব্যাপারটা সূত্রে কীভাবে বোঝানো যায়? এজন্য এমন কিছু দরকার, যেটা সূত্রে যোগ করলে তা সর্বজনীন রূপ নেয়। সেই ‘কিছু’টা হলো সহগ। ইংরেজিতে যাকে বলে কোইফিসিয়েন্ট।

পদার্থবিজ্ঞানে অনেক সূত্রেই অনেক রকম সহগ যোগ করা হয়। বস্তুর প্রসারণ সূত্রকে সর্বজনীন করতে ব্যবহার করা হয় প্রসারণ সহগ। ইংরেজিতে একে বলে কোইফিসিয়েন্ট অব এক্সপানশন। ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার করা দরকার। তামা তাপ দিলে প্রসারিত হয়, লোহাও তাপে প্রসারিত হয়। কিন্তু এদের প্রসারণের হার সমান নয়।

কোন বস্তু কত কম বা বেশি প্রসারিত হচ্ছে, সেটার ব্যাখ্যা সূত্রেই থাকা জরুরি। সহগ না থাকলে আপনি শুধু জানতে পারবেন, তাপ প্রয়োগ করলে বস্তু প্রসারিত হয়। কিন্তু কতটুকু প্রসারিত হয়, তা জানা কঠিন। জানা কঠিন, লোহা কেন পাথরের চেয়ে বেশি প্রসারিত হয়। 

স্তুর প্রসারণ সূত্রকে সর্বজনীন করতে ব্যবহার করা হয় প্রসারণ সহগ। ইংরেজিতে একে বলে কোইফিসিয়েন্ট অব এক্সপানশন। তামা তাপ দিলে প্রসারিত হয়, লোহাও তাপে প্রসারিত হয়।

অন্যদিকে সহগ বলে দেয়, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বাড়লে লোহার আয়তন কতটুকু প্রসারিত হয়, তামাই-বা কতটুকু প্রসারিত হয়। তাই প্রসারণের সমীকরণে প্রসারণ সহগ জুড়ে দিতে হয়। প্রসারণ সহগের মান একেক বস্তুর জন্য একেক রকম। তাই যে বস্তুটা নিয়ে আপনি কাজ করবেন, তার প্রসারণ সহগ জানা থাকলে খুব সহজেই হিসাব করে বের করে ফেলতে পারবেন, ২ ডিগ্রি কিংবা ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়ালে বস্তুটা ঠিক কতখানি প্রসারিত হবে।

বস্তুর প্রসারণ সহগ আসলে তিন রকম। দৈর্ঘ্য প্রসারণ সহগ, ক্ষেত্রফল প্রসারণ সহগ ও আয়তন প্রসারণ সহগ। বেশিরভাগ বস্তুরই দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা সমান হয় না, তাই তিন রকম প্রসারণ সহগ ব্যবহার করা হয়। ধরা যাক, আপনি একটা লোহার তারের শুধু দৈর্ঘ্যের প্রসারণ মাপবেন। তাহলে এর দৈর্ঘ্য প্রসারণ সহগটা জানা থাকলেই চলবে। আবার ধরা যাক, এখন আপনার হাতে একটা আয়তাকার লোহার বার আছে। এর যেকোনো একটি পৃষ্ঠের প্রসারণ মাপবেন।

এবার কিন্তু শুধু দৈর্ঘ্য প্রসারণ সহগ দিয়ে কাজ চলবে না। তখন ক্ষেত্রফল প্রসারণ সহগ জানা লাগবে। তেমনি পুরো বারটার আয়তন প্রসারণের পরিমাণ যদি জানতে চান, তাহলে আয়তন প্রসারণ সহগ জানা দরকার। বস্তুর তিন ধরনের প্রসারণ সহগ জানার জন্য একটা গাণিতিক সমীকরণ আছে। সেই সমীকরণ কীভাবে পাওয়া গেল, আছে তারও প্রতিপাদন। সেগুলো খুব কঠিনও নয়। কিন্তু সেটা এখানে আমরা ব্যাখ্যা করব না। এই সিরিজের গাণিতিক অংশে সেগুলোর বিস্তারিত প্রতিপাদন করব।

লেখক: সাংবাদিক