তরল পদার্থের তাপীয় প্রসারণ

তাপ প্রয়োগ করলে তরলের আয়তন প্রসারণ হয়ছবি: ইয়াক্লাস

পদার্থবিদ্যার সহজপাঠ: ১৭

কঠিন পদার্থের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা তিনটিই আছে। তাপ প্রয়োগ করলে কঠিন পদার্থ সব দিকে সমানভাবে বাড়ে। তাই তাপ প্রয়োগে কঠিন পদার্থ কতটুকু বাড়ে, তা সহজেই বের করা যায়। কিন্তু তরল পদার্থের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এত সহজ নয়। তরলের নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা নেই, তবে আয়তন আছে। তাই তাপ প্রয়োগ করলে তরলের আয়তন প্রসারণ হয়। আর এটা মাপা যায় সহজেই।

কঠিন পদার্থে সরাসরি তাপ প্রয়োগ করা যায়, কিন্তু তরলে সরাসরি তাপ প্রয়োগ করা যায় না। তরলের নির্দিষ্ট আকার নেই, তাই একে খোলা অবস্থায় রাখা যায় না; রাখলে গড়িয়ে পড়ে বা বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তাই এর ওপর সরাসরি তাপ প্রয়োগ করলে তাপ নষ্ট হবে এবং সব অংশে সমানভাবে তাপ পৌঁছাবে না। সুতরাং, তরলে তাপ প্রয়োগ করতে হলে সেটিকে কোনো একটি পাত্রে রাখতে হয়। আর সেই পাত্রের আকারের ওপরই তরলের আকার নির্ভর করে।

তরলের নির্দিষ্ট আকার নেই, তাই একে খোলা অবস্থায় রাখা যায় না
ছবি: মিডজার্নির সাহায্যে তৈরি

তাপ প্রয়োগের ফলে তরলের আয়তন প্রসারণের বিষয়টি বুঝতে আমরা একটা সহজ কাজ করতে পারি। ধরা যাক, আমাদের কাছে ১ লিটার পানি আছে। তাহলে আমাদের এমন একটা পাত্র নিতে হবে, যার আয়তন এক লিটারের চেয়ে খানিকটা বেশি। নইলে তরলের আয়তন বেড়ে গেলে পানি পাত্র থেকে উপচে পড়বে। এজন্য আমরা দেড় লিটারের একটা পাত্র নিতে পারি। ধরা যাক, সেই পাত্রের গায়ে মিলিলিটারের মাপে প্রচুর দাগ কাটা আছে। এখন যদি তরলসহ পাত্রটিকে গরম করি, তাহলে পানির আয়তন বেড়ে যাবে। পানির উচ্চতা বেড়ে কয় দাগ বেশি হলো, তা দেখেই বের করতে পারি, তাপমাত্রা কতটা বাড়ালে পানির আয়তন কতখানি বাড়ল।

কঠিন পদার্থে সরাসরি তাপ প্রয়োগ করা যায়, কিন্তু তরলে সরাসরি তাপ প্রয়োগ করা যায় না। তরলের নির্দিষ্ট আকার নেই, তাই একে খোলা অবস্থায় রাখা যায় না; রাখলে গড়িয়ে পড়ে।

ব্যাপারটা কি খুব সহজ মনে হচ্ছে?

তাহলে আপনি একটি বিষয় ভুলে গেছেন। তাপমাত্রা বাড়লে কিন্তু কঠিন পদার্থেরও প্রসারণ হয়। তাই শুধু পানি নয়, পাত্রও প্রসারিত হবে।

আবার সব বস্তুর প্রসারণের হার সমান নয়। কঠিন পদার্থের প্রসারণ তরলের চেয়ে বেশ কম। মোদ্দাকথা হলো, পানি যতটুকু প্রসারিত হবে, পাত্রের প্রসারণ ততখানি হবে না। পাত্রসহ পানিকে গরম করলে পানির আয়তন যেমন বাড়বে, তেমনি পাত্রের আয়তনও বাড়বে। তাই পাত্রের গায়ে মিলিলিটারের যেসব দাগ কাটা আছে, সেগুলোর মধ্যেও দূরত্ব সমানভাবে বেড়ে যাবে। দূরত্ব আসলেই বেড়েছে কি না, সেটা বোঝা মুশকিল হবে।

পানি যতটুকু প্রসারিত হবে, পাত্রের প্রসারণ ততখানি হবে না
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

পাত্রের দাগ দেখে আমরা যে প্রসারণ পাব, সেটা তরলের প্রকৃত প্রসারণ নয়। এটাকে বলে আপাত প্রসারণ। অন্যদিকে তরলের সত্যিকার যে প্রসারণটা হয়, সেটাকে বলে প্রকৃত প্রসারণ।

আবারও বলছি, পাত্রের তুলনায় তরলের প্রসারণ বেশি হয়। তা যদি না হতো, তাহলে আমরা কোনো প্রসারণই বুঝতে পারতাম না। পাত্রের প্রসারণ তরলের চেয়ে বেশি হলে আমরা দেখতাম তরল উল্টো সংকুচিত হয়ে নিচে নেমে গেছে।

সব বস্তুর প্রসারণের হার সমান নয়। কঠিন পদার্থের প্রসারণ তরলের চেয়ে বেশ কম। মোদ্দাকথা হলো, পানি যতটুকু প্রসারিত হবে, পাত্রের প্রসারণ ততখানি হবে না।

তরল পদার্থের যে প্রসারণ ঘটছে, সেটা বোঝার সহজ উপায় কী?

একটা থার্মোমিটার নিন। তারপর থার্মোমিটারের বাল্বে তাপ দিন। দেখবেন থার্মোমিটারের ভেতরে থাকা পারদের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ এখানে পারদের আয়তন প্রসারিত হচ্ছে।

থার্মোমিটারে তরল পদার্থের তাপীয় প্রসারণ
ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

এখানে কি আপাত প্রসারণ হচ্ছে, নাকি প্রকৃত প্রসারণ?

এখানেও আপাত প্রসারণ হচ্ছে। কিন্তু এখানে পাত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বেশ পুরু কাচ। কাচের প্রসারণের হার খুব কম। কাচ তাপের কুপরিবাহী। তবু থার্মোমিটারের বাল্বে তাপ দিলে সেটা কিছুটা উত্তপ্ত হয়। আর পারদের প্রসারণের জন্য ওইটুকু উত্তপ্ত হওয়াই যথেষ্ট। দ্রুত প্রসারিত হয়ে বেড়ে যায় পারদের তাপমাত্রা। অর্থাৎ থার্মোমিটারে আমরা পারদের যে প্রসারণ দেখি, সেটা আপাত প্রসারণ। কিন্তু পাত্রের পারদের তুলনায় কাচের প্রসারণ অতি নগণ্য বলে সেটাকে হিসাবে না ধরেই আমরা কাজ চালিয়ে নিই।

কাচের প্রসারণের হার খুব কম। কাচ তাপের কুপরিবাহী। তবু থার্মোমিটারের বাল্বে তাপ দিলে সেটা কিছুটা উত্তপ্ত হয়। আর পারদের প্রসারণের জন্য ওইটুকু উত্তপ্ত হওয়াই যথেষ্ট।

যেভাবে প্রকৃত প্রসারণ বের করবেন

পাত্রে তরলের প্রকৃত ও আপাত প্রসারণের একটি তুলনামূলক চিত্র
ছবি: নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ছবির ওপর ভিত্তি করে চ্যাটজিপিটি দিয়ে আঁকা

তরলের প্রকৃত প্রসারণ কীভাবে হিসাব করবেন? ওপরের ছবির মতো একটি বাল্ব আকৃতির পাত্রে পানি নিন। ধরা যাক, স্বাভাবিক অবস্থায় পাত্রে পানির উচ্চতা A বিন্দু পর্যন্ত।

এবার পাত্রে তাপ প্রয়োগ করুন। পাত্রটির গায়ে সরাসরি তাপ প্রয়োগ করছেন, তাই পাত্রটি আগে প্রসারিত হবে। পাত্রের দেয়াল ভেদ করে তাপ পানি পর্যন্ত পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। ততক্ষণে পাত্রটি খানিকটা প্রসারিত হয়ে যাবে। কিন্তু পানি তখনো আগের আয়তনেই আছে। তাই মনে হবে পাত্রের ভেতরকার পানি সংকুচিত হয়েছে এবং এর উচ্চতা কমে B বিন্দুতে নেমে আসবে।

তাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখুন। এবার পানিও উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে এবং প্রসারিত হচ্ছে। ফলে বাড়তে থাকবে পাত্রের ভেতর পানির উচ্চতা। কঠিন পদার্থের তুলনায় পানি অর্থাৎ তরল পদার্থের প্রসারণ বেশি হয়। তাই প্রসারিত পাত্রের আয়তনকে ছাপিয়ে পানির উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে। একসময় পানির উচ্চতা বেড়ে A বিন্দুকে টপকে C বিন্দুতে পৌঁছে যাবে।

পাত্রটির গায়ে সরাসরি তাপ প্রয়োগ করছেন, তাই পাত্রটি আগে প্রসারিত হবে। পাত্রের দেয়াল ভেদ করে তাপ পানি পর্যন্ত পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে। ততক্ষণে পাত্রটি খানিকটা প্রসারিত হয়ে যাবে।

এখন ছোট্ট একটা হিসাবের সাহায্যে তরলের প্রকৃত প্রসারণ, আপাত প্রসারণ এবং পাত্রের প্রসারণ বের করা যাক।

ধরা যাক:

  • তরলের প্রকৃত প্রসারণ = VL

  • আপাত প্রসারণ = Va

  • পাত্রের প্রসারণ = Vb

বাল্বের নলের প্রস্থচ্ছেদ জানা থাকলে উচ্চতা দিয়ে গুণ করে আয়তন বের করা যায়। প্রথমে পানি A বিন্দুতে ছিল, পাত্র বাড়ার ফলে B বিন্দুতে নেমেছে। অর্থাৎ AB উচ্চতাটুকুই হলো পাত্রের প্রসারণ। তাপ পাওয়ার পর পানি B থেকে প্রসারিত হয়ে একদম C বিন্দুতে উঠল। অর্থাৎ BC হলো তরলের মোট বা প্রকৃত প্রসারণ। কিন্তু আমরা চোখে দেখছি পানি A থেকে C বিন্দুতে উঠেছে। অর্থাৎ AC হলো আপাত প্রসারণ। চিত্র ও জ্যামিতিক হিসাব অনুযায়ী আমরা দেখতে পাই:

BC = AC + AB

অর্থাৎ, তরলের প্রকৃত প্রসারণ = আপাত প্রসারণ + পাত্রের প্রসারণ। বাকি থাকল কেবল আপাত প্রসারণ বের করা। সমীকরণটি পক্ষান্তর করলেই তা পাওয়া যায়।

Va = V­ - Vb

অর্থাৎ, প্রকৃত প্রসারণ থেকে পাত্রের প্রসারণ বাদ দিলেই আপাত প্রসারণ পাওয়া যাবে।