পদার্থবিদ্যার সহজপাঠ ১৯
তাপ দিলে বস্তু প্রসারিত হয়। কঠিন পদার্থের নির্দিষ্ট আকার ও আয়তন আছে, তাই এর প্রসারণটা বোঝা যায় সহজেই। ১৫তম পর্বে আমরা দেখেছি, কীভাবে কঠিন পদার্থের আকার ও আয়তন প্রসারণ মাপা যায়। তরলের নির্দিষ্ট আকার নেই, কিন্তু আয়তন আছে। তাই বিশেষ পাত্রে রেখে এর আয়তন প্রসারণ মাপাও সম্ভব। ১৭তম পর্বে আমরা সে প্রক্রিয়াও দেখে এসেছি।
কিন্তু বায়বীয় অর্থাৎ গ্যাসের নির্দিষ্ট কোনো আকার বা আয়তন নেই। এদের অণুগুলোর মধ্যে আন্তআণবিক বন্ধন কাজ করে না বললেই চলে। তাই খোলা অবস্থায় রেখে একে পরীক্ষা করার কোনো উপায় নেই। গ্যাসের ধর্ম পরীক্ষা করতে হলে একে আগে একটি বদ্ধ পাত্রে রাখতে হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, একে যখন যে পাত্রে রাখা হয়, তখন সে পাত্রের পুরোটা জুড়েই গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ ১০ ঘনমিটারের একটি পাত্রে যদি ১ কেজি গ্যাস রাখা হয়, তাহলে এর আয়তন হবে ১০ ঘনমিটার। আবার একই পরিমাণ গ্যাস ২০ ঘনমিটারের পাত্রে রাখলে তার আয়তন হবে ২০ ঘনমিটার।
তাহলে কি তাপ দিলে গ্যাসের প্রসারণ হবে না?
অবশ্যই হবে। আবদ্ধ পাত্রে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ গ্যাস রাখুন। এরপর সেই পাত্রের তাপমাত্রা বাড়ান, দেখবেন গ্যাসের অণুগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। অর্থাৎ গ্যাসও প্রসারিত হচ্ছে।
বায়বীয় অর্থাৎ গ্যাসের নির্দিষ্ট কোনো আকার বা আয়তন নেই। এদের অণুগুলোর মধ্যে আন্তআণবিক বন্ধন কাজ করে না বললেই চলে।
ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটি মুরগির খামারের কথা চিন্তা করতে পারেন। ধরা যাক, একটি কক্ষে ১০০টি মুরগি পুরো ঘরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কোনো মুরগি কোনোটার গা ঘেঁষে নেই। এবার ঘরে একটু গরম বাতাস ঢোকানোর ব্যবস্থা করুন। দেখবেন, মুরগিগুলো পরস্পর থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। এবার উল্টোভাবে পরীক্ষাটি করে দেখুন। অর্থাৎ ঠান্ডা বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা করুন। মুরগিগুলোর যখন শীত লাগবে, তখন তারা পরস্পরের গা ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকার চেষ্টা করবে।
এর থেকে একটি ব্যাপার নিশ্চিত, তাপমাত্রা বাড়লে মুরগিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবে, আর কমালে পরস্পরের কাছে আসবে। আবদ্ধ একটি পাত্রের ভেতর গ্যাসের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। তাপমাত্রা কমালে অণুগুলো পরস্পরের কাছে চলে আসবে, আর বাড়ালে পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব বাড়বে। এতে গ্যাসের আয়তনের অবশ্য কোনো হেরফের হবে না, তবে ভেতরকার চাপের পরিবর্তন হবে।
তার মানে কী? আয়তন না বদলালেও গ্যাসের তাপমাত্রা বাড়ালে-কমালে তাদের প্রসারণ ও সংকোচন হবে, তবে ভেতরকার চাপ বেড়ে বা কমে যাবে। একই পরিমাণ গ্যাস আলাদা আলাদা আয়তনের পাত্রে রাখলে চাপও আলাদা হবে। এখানে চাপটা কীভাবে কাজ করে, সেটা বুঝতে হবে।
তাপমাত্রা কমালে অণুগুলো পরস্পরের কাছে চলে আসবে, আর বাড়ালে পরস্পরের মধ্যে দূরত্ব বাড়বে। এতে গ্যাসের আয়তনের অবশ্য কোনো হেরফের হবে না, তবে ভেতরকার চাপের পরিবর্তন হবে।
তাপ দিলে যেমন বস্তুর প্রসারণ হয়, চাপ প্রয়োগ করলে ঘটে ঠিক উল্টোটা। কোনো বস্তুর ওপর কোনো কিছুর সাহায্যে চাপ প্রয়োগ করলে তার আয়তন সংকুচিত হয়।
কেন হয়?
চাপ দিলে বস্তুর অণুগুলো পরস্পরের খুব কাছে চলে আসে। ফলে এদের মধ্যে দূরত্ব কমে। কঠিন পদার্থে চাপ প্রয়োগ করে একে খুব বেশি সংকুচিত করা যায় না। কারণ এদের অণুগুলো প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। যে বস্তুর ঘনত্ব যত কম, অল্প চাপে তাকে তত সহজেই সংকুচিত করা যায়। মাটি বা কম ঘনত্বের বস্তুকে হয়তো সহজেই সংকুচিত করা যায়, কিন্তু এক খণ্ড লোহাকে চাপ দিয়ে সংকুচিত করা খুব কঠিন।
তরল পদার্থকে চাপ প্রয়োগ করে সামান্য সংকুচিত করা সম্ভব। কিন্তু স্বাভাবিক বায়ুচাপ তরল পদার্থের ওপর খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারে না। তবে চাপের সামান্য হেরফেরও গ্যাসীয় পদার্থের সংকোচন-প্রসারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই তাপমাত্রা বাড়িয়ে গ্যাসের প্রসারণ মাপতে গেলে অবশ্যই চাপ সমান রাখতে হবে।
চাপ সমান রাখার জন্য একটি সহজ পদ্ধতি আছে। ধরা যাক, এমন একটি পাত্র নিলেন যার ওপরের মুখটি (পিস্টন) ওপরে-নিচে ওঠানামা করতে পারে। ফলে এর ভেতরের আয়তন সহজেই কমবেশি হবে। এর ওপরের দিকে একটি ভারী বস্তু চাপিয়ে দিলেন; এটার কাজ হবে ভেতরের চাপ সব সময় সমান রাখা।
কঠিন পদার্থে চাপ প্রয়োগ করে একে খুব বেশি সংকুচিত করা যায় না। কারণ এদের অণুগুলো প্রায় গায়ে গায়ে লেগে থাকে। যে বস্তুর ঘনত্ব যত কম, অল্প চাপে তাকে তত সহজেই সংকুচিত করা যায়।
এবার পাত্রের তাপমাত্রা বাড়ান, গ্যাসের অণুগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব বাড়বে। ফলে অণুগুলো বাইরের দিকে বেরোনোর জন্য পুরো পাত্রের ভেতরের দেয়ালগুলোতে আরও বেশি চাপ দেবে। সুতরাং পাত্রের ভেতরকার চাপ বেড়ে যাবে। কিন্তু পাত্রের ওপরের দেয়াল অর্থাৎ আবদ্ধ মুখটা যেহেতু নড়াচড়া করতে পারে, তাই চাপ বাড়লে সেটি ওপরের দিকে উঠে যাবে এবং পাত্রের ভেতরের আয়তন বেড়ে যাবে।
একই পরিমাণ অণু যখন আরও বেশি জায়গা দখল করবে, তখন গ্যাসের ঘনত্ব কমে যাবে। ফলে ভেতরের সার্বিক চাপও আবার কমে আগের জায়গায় ফিরে আসবে। আয়তন প্রসারণের ব্যাপারটি বুঝতে হলে এবং সঠিক হিসাব পেতে হলে আয়তন বাড়লেও চাপ কমানো বা বাড়ানো যাবে না। তাই পাত্রের ওপরের দিকের দেয়ালে একটি বিশেষ ব্যবস্থা করা থাকে। সেখানে একটি নির্দিষ্ট ভরের বস্তু রাখা থাকে, যেটা চাপকে সব সময় একই বা স্থির রাখবে।
এই যে আয়তন প্রসারণ হলো, এটা মাপা কিন্তু কঠিন কিছু নয়। সমস্যা হলো সব গ্যাসের প্রকৃতি এক রকম নয়। হাইড্রোজেনের এক রকম তো নাইট্রোজেনের আরেক রকম। কার্বন ডাই-অক্সাইড, ইথেন কিংবা মিথেনের মতো যৌগিক গ্যাসের চরিত্র আবার আরেক রকম। তাই সবগুলোকে যাতে একই সূত্রে ফেলে হিসাব করা যায়, এ জন্য একটি প্রসারণ সহগ দরকার হবে। প্রসারণ সহগ আসলে কীভাবে কাজ করে, তা জানতে হলে ১৫তম পর্বটি আরেকবার পড়ে দেখতে পারেন।
একই পরিমাণ অণু যখন আরও বেশি জায়গা দখল করবে, তখন গ্যাসের ঘনত্ব কমে যাবে। ফলে ভেতরের সার্বিক চাপও আবার কমে আগের জায়গায় ফিরে আসবে।
প্রসারণ সহগ বের করার আগে আরেকটি ব্যাপার আমাদের জানতে হবে। সেটা হলো গ্যাসের আয়তনের সঙ্গে তাপমাত্রা ও চাপের সম্পর্ক। এর জন্য একটি বিখ্যাত সূত্র আছে, যেটাকে আদর্শ গ্যাসের সমীকরণ বলে। সেটি হলো—
PV = nRT
এখানে P হচ্ছে চাপ, V আয়তন, n গ্যাসের পরিমাণ বা মোল সংখ্যা, R একটি ধ্রুবক (একে মোলার গ্যাস ধ্রুবক বলে)। এই ধ্রুবকের মান 8.314 JK-1mol-1। আর T হলো কেলভিন স্কেলে তাপমাত্রা।
এখানে একটি প্রশ্ন অবধারিতভাবেই এসে যাবে—মোল জিনিসটা কী?
মোল হলো পরিমাণের একটি আন্তর্জাতিক একক। যেকোনো গ্যাসের ওজন যা-ই হোক না কেন, এক মোল পরিমাণ গ্যাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক (6.022 × 1023) অণু, পরমাণু বা আয়ন থাকবে। মৌলিক গ্যাসের ক্ষেত্রে পরমাণু, যৌগিক গ্যাসের ক্ষেত্রে অণু এবং আয়নিত গ্যাসের ক্ষেত্রে আয়নের হিসাব আসবে।
এখন আমরা গ্যাসের জন্য প্রসারণ সহগ বের করতে পারি। ধরা যাক, শুরুতেই তাপমাত্রা ছিল T1, তখন গ্যাসের আয়তন ছিল V1। গ্যাসকে কিছুক্ষণ উত্তপ্ত করা হলো। ফলে তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়াল T2 এবং গ্যাসের আয়তন বেড়ে হলো V2। তাহলে স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ সহগ হবে—
βp =[(V2 - V1) / V1 ]/(T2- T1)... … …(1)
আমরা আদর্শ গ্যাসের সমীকরণ থেকে জানি—
PV1 = nRT1
PV2 = nRT2
সমীকরণ দুটি বিয়োগ করে পাই:
P(V2 - V1) = nR (T2 - T1) ... … …(২) এখন (২) নং সমীকরণের বাঁ পাশে PV1 এবং ডান পাশে nRT1 দিয়ে ভাগ করে পাই—
(V2 - V1)/V1 = (T2 - T1)/T1
বা, [ (V2-V1)V1]/V1 = [(T2-T1) T1]/T1... … …(৩)
এখন (১) ও (৩) নং সমীকরণ থেকে পাই—
βp = 1/T1 ... … …(৪)
মোল হলো পরিমাণের একটি আন্তর্জাতিক একক। যেকোনো গ্যাসের ওজন যা-ই হোক না কেন, এক মোল পরিমাণ গ্যাসে নির্দিষ্ট সংখ্যক অণু, পরমাণু বা আয়ন থাকবে।
সুতরাং (৪) নং সমীকরণ থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থির চাপে গ্যাসের আয়তন প্রসারণ সহগ এর প্রাথমিক তাপমাত্রার ব্যস্তানুপাতিক (1/T1)। অর্থাৎ গ্যাসের প্রাথমিক তাপমাত্রা যত কম হবে, আয়তনের প্রসারণ সহগও তত বেশি হবে।
বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করে বোঝা যাক। ধরা যাক, একটি পাত্রের প্রাথমিক তাপমাত্রা ৪০০ কেলভিন। চাপ একই রেখে গ্যাসটির তাপমাত্রা ১০ কেলভিন বাড়ানো হলো। তাহলে এর প্রসারণ সহগ হবে βp = ১/৪০০ = ০.০০২৫।
এবার একই পাত্রে রাখা গ্যাসটির প্রাথমিক তাপমাত্রা ধরা যাক ৩০০ কেলভিন। এবারও তাপমাত্রা ১০ কেলভিন বাড়ানো হলো, তাহলে প্রসারণ সহগ হবে ১/৩০০ = ০.০০৩৩। অর্থাৎ প্রাথমিক তাপমাত্রা যত কম হবে, প্রসারণ সহগ তত বেশি হবে।
আরেকটি ব্যাপার খেয়াল করুন, (৪) নং সমীকরণে T2 রাশিটি নেই। এর মানে হলো, তাপমাত্রা আপনি যতই বাড়ান না কেন, প্রসারণ সহগের কোনো হেরফের হবে না। অর্থাৎ ১০ কেলভিন বাড়ালেও প্রসারণ সহগ যা পাবেন, ২০ কেলভিন বাড়ালেও প্রসারণ সহগ তা-ই পাবেন!